পঞ্চম ক্রুসেড (১২১৭–১২২১): মিশর জয় করে জেরুজালেম……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

পঞ্চম ক্রুসেড (১২১৭–১২২১): মিশর জয় করে জেরুজালেম দখলের পরিকল্পনা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

সিরিজ: ক্রুসেড: ধর্ম, সাম্রাজ্য ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস

পঞ্চম ক্রুসেড (১২১৭–১২২১): মিশর জয় করে জেরুজালেম দখলের পরিকল্পনা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
পঞ্চম ক্রুসেড (১২১৭–১২২১)

চতুর্থ ক্রুসেডের বিপর্যয়কর সমাপ্তির পর পশ্চিমা খ্রিস্টান জগতে একটি বিষয় ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল—জেরুজালেমকে সরাসরি আক্রমণ করার চেয়ে মিশরকে দখল করা সম্ভব হলে পবিত্র ভূমির রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দেওয়া সহজ হতে পারে। মিশর ছিল আইয়ুবি শক্তির অর্থনৈতিক হৃদয়, বিপুল কৃষি সম্পদ ও রাজস্বের উৎস এবং জেরুজালেম ও সিরিয়ায় মুসলিম সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় পঞ্চম ক্রুসেডের মূল পরিকল্পনা।

পঞ্চম ক্রুসেডের আনুষ্ঠানিক সূচনা ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে হলেও এর ধর্মীয় ভিত্তি তৈরি হয়েছিল পোপ তৃতীয় ইনোসেন্টের উদ্যোগে। তিনি ১২১৩ সালে নতুন ক্রুসেডের আহ্বান জানান এবং ১২১৫ সালের চতুর্থ ল্যাটেরান কাউন্সিলে ক্রুসেডকে চার্চের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল একটি বৃহৎ, নিয়ন্ত্রিত এবং পোপীয় নেতৃত্বাধীন অভিযান, যা পূর্ববর্তী ক্রুসেডগুলোর রাজনৈতিক বিভাজন থেকে শিক্ষা নেবে।

কিন্তু ইনোসেন্ট ১২১৬ সালে মারা যান। তাঁর উত্তরসূরি পোপ তৃতীয় হনোরিয়াস অভিযান চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রুসেডের জন্য অর্থ, সৈন্য ও ধর্মীয় সমর্থন সংগঠিত হতে থাকে।

প্রথম পর্যায়ে অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন হাঙ্গেরির রাজা দ্বিতীয় আন্দ্রাস, অস্ট্রিয়ার ডিউক ষষ্ঠ লিওপোল্ড এবং জেরুজালেমের রাজা জন অব ব্রিয়েন। ১২১৭ সালে তারা পবিত্র ভূমিতে পৌঁছান। কিন্তু শুরুতে সিরিয়া ও প্যালেস্টাইনে পরিচালিত অভিযানগুলো বড় কোনো স্থায়ী সাফল্য এনে দিতে পারেনি।

এই পর্যায়েই কৌশলগত দৃষ্টি আরও স্পষ্টভাবে মিশরের দিকে ঘুরে যায়। কারণ ক্রুসেডার নেতারা বুঝতে পারছিলেন, মিশর দখল করা গেলে আইয়ুবিদের জেরুজালেম ধরে রাখার ক্ষমতা গুরুতরভাবে দুর্বল হবে। একই সঙ্গে মিশরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ শহরকে জেরুজালেমের বিনিময়ে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

এই পরিকল্পনার প্রথম লক্ষ্য ছিল দামিয়েত্তা। নীলনদের বদ্বীপে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মিশরে প্রবেশের একটি প্রধান দরজা ছিল। ভূমধ্যসাগর থেকে নীলনদের ভেতরের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য শহরটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১২১৮ সালের মে মাসে ক্রুসেডাররা দামিয়েত্তার কাছে পৌঁছে অবরোধ শুরু করে। শহরের প্রতিরক্ষা শুধু দেয়ালের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। নীলনদের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি শক্তিশালী শৃঙ্খল ও নদীতীরবর্তী টাওয়ার ব্যবহৃত হতো, যা জাহাজের চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারত।

ক্রুসেডারদের প্রথম বড় লক্ষ্য ছিল এই প্রতিরক্ষা ভাঙা। তারা বিশেষভাবে পরিবর্তিত জাহাজ ও উঁচু আক্রমণ কাঠামো ব্যবহার করে টাওয়ারে হামলা চালায়। দীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ের পর ১২১৮ সালের আগস্টে তারা গুরুত্বপূর্ণ নদী-টাওয়ারটি দখল করতে সক্ষম হয়।

এই সাফল্য ক্রুসেডারদের মনোবল বাড়িয়ে দেয়। তারা এখন মনে করতে শুরু করে যে দামিয়েত্তা পতন শুধু সময়ের ব্যাপার। কিন্তু বাস্তবে অভিযান দ্রুত দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে পরিণত হয়।

এ সময় মিশরের শাসক ছিলেন সুলতান আল-কামিল, সালাহউদ্দিনের ভাই আল-আদিলের পুত্র। ক্রুসেডারদের আক্রমণের সংবাদে আইয়ুবি নেতৃত্ব মিশরের প্রতিরক্ষায় মনোনিবেশ করে। ১২১৮ সালে আল-আদিল মারা গেলে আল-কামিলের ওপর সংকট আরও বাড়ে।

দামিয়েত্তার বাইরে মুসলিম বাহিনী শিবির স্থাপন করে ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রা থামানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যেও রাজনৈতিক সমস্যা ছিল। এমনকি আল-কামিলের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা তৈরি হয়, যার ফলে এক পর্যায়ে তিনি সাময়িকভাবে নিজের শিবির ছেড়ে যেতে বাধ্য হন।

ক্রুসেডাররা এই অস্থিরতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। কারণ তাদের নিজেদের নেতৃত্বও বিভক্ত হয়ে পড়ছিল। জন অব ব্রিয়েন ছিলেন বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা। কিন্তু ১২১৮ সালের শেষ দিকে পোপীয় প্রতিনিধি কার্ডিনাল পেলাজিয়াস অব আলবানো এসে অভিযানের ওপর ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন।

এখান থেকেই পঞ্চম ক্রুসেডের অন্যতম বড় সমস্যা সৃষ্টি হয়—সামরিক নেতৃত্ব আর ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব। জন মনে করতেন ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলোর বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। পেলাজিয়াসের অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে কঠোর; তিনি মনে করতেন পোপীয় অনুমোদিত অভিযানকে পূর্ণ বিজয়ের লক্ষ্য থেকে সরে আসা উচিত নয়।

দামিয়েত্তা অবরোধ চলতে থাকে। রোগ, খাদ্যসংকট, যুদ্ধ ও নীলনদের পরিবেশে ক্রুসেডার শিবিরে মৃত্যু বাড়তে থাকে। মুসলিম রক্ষীরাও শহরের ভেতরে ক্রমশ ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছিল।

এই সময় আল-কামিল এমন একটি শান্তি প্রস্তাব দেন, যা পঞ্চম ক্রুসেডের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। তিনি মিশর থেকে ক্রুসেডাররা সরে গেলে জেরুজালেমসহ পবিত্র ভূমির একটি বড় অংশ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

প্রস্তাবের সুনির্দিষ্ট শর্ত বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তিত হয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু মূল বিষয় ছিল—মিশরকে রক্ষা করার বিনিময়ে ক্রুসেডারদের এমন ভূখণ্ড দেওয়া হতে পারে, যার মধ্যে জেরুজালেমও থাকবে।

রাজা জন অব ব্রিয়েনসহ কিছু নেতা এই প্রস্তাবকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে চেয়েছিলেন। তাদের জন্য ক্রুসেডের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল জেরুজালেম পুনরুদ্ধার। যদি যুদ্ধ ছাড়াই সেই লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ থাকে, তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করার কারণ খুব কম।

কিন্তু পেলাজিয়াস এবং তাঁর সমর্থকেরা আরও বড় বিজয়ের আশা করছিলেন। তারা বিশ্বাস করতেন দামিয়েত্তা দখল করা গেলে পুরো মিশর ক্রুসেডারদের হাতে চলে আসতে পারে। তখন শুধু জেরুজালেম নয়, মুসলিম শক্তির প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তিই ধ্বংস করা সম্ভব হবে।

এ সিদ্ধান্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা কাজ করছিল—পবিত্র রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক নিজে বড় বাহিনী নিয়ে আসবেন। তিনি বহুবার ক্রুসেডে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পেলাজিয়াস ও অন্যান্য নেতারা আশা করছিলেন তাঁর আগমন যুদ্ধের ভারসাম্য চূড়ান্তভাবে তাদের পক্ষে নিয়ে যাবে।

কিন্তু ফ্রেডেরিকের আগমন বারবার বিলম্বিত হয়।

এই সময়ে দামিয়েত্তার পরিস্থিতি ক্রমশ অসহনীয় হয়ে ওঠে। অবশেষে ৫ নভেম্বর ১২১৯ ক্রুসেডাররা শহরটি দখল করে। দীর্ঘ অবরোধ, রোগ ও খাদ্যসংকটে নগরীর জনসংখ্যা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

দামিয়েত্তার পতন ছিল পঞ্চম ক্রুসেডের সর্বোচ্চ সাফল্য। মিশরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার এখন ক্রুসেডারদের হাতে। ইউরোপে এই বিজয়ের সংবাদ বিশাল আশা সৃষ্টি করে।

কিন্তু বিজয়ের পরপরই পুরোনো সমস্যা আরও তীব্র হয়—এখন কী করা হবে?

জন অব ব্রিয়েন চাইছিলেন সামরিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে সতর্কভাবে এগোতে। পেলাজিয়াস পূর্ণ মিশর জয়ের পক্ষে ছিলেন। দামিয়েত্তার মালিকানা এবং ভবিষ্যৎ শাসন নিয়েও দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তখনও ছিল। আল-কামিল আবারও আলোচনা করতে প্রস্তুত ছিলেন এবং জেরুজালেমকেন্দ্রিক ভূখণ্ড ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন আলোচনায় আসে। কিন্তু ক্রুসেডার শিবিরে বিজয়ের আত্মবিশ্বাস এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে অনেকেই মনে করছিলেন আলোচনায় যা পাওয়া যাবে, সামরিকভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি অর্জন করা সম্ভব।

এই আত্মবিশ্বাসের বিপজ্জনক দিক ছিল, মিশরের বাস্তব ভূগোল সম্পর্কে তাদের জ্ঞান সীমিত। নীলনদের বদ্বীপে যুদ্ধ ইউরোপ বা প্যালেস্টাইনের যুদ্ধের মতো নয়। নদীর মৌসুমি বন্যা, খাল, বাঁধ এবং জলপথ পুরো যুদ্ধক্ষেত্রকে মুহূর্তের মধ্যে বদলে দিতে পারে।

১২২০ সালে ক্রুসেডাররা দামিয়েত্তায় অপেক্ষা করতে থাকে। সম্রাট ফ্রেডেরিকের বড় বাহিনী আসবে—এই প্রত্যাশা অভিযানকে স্থবির করে রাখে। কিছু নতুন সৈন্য এলেও সম্রাট নিজে আসেননি।

এই দীর্ঘ অপেক্ষা আল-কামিলের পক্ষে কাজ করেছিল। তিনি মিশরের প্রতিরক্ষা পুনর্গঠন করেন, নতুন অবস্থান তৈরি করেন এবং পরিবারের অন্যান্য আইয়ুবি শাসকদের কাছ থেকে সাহায্য সংগ্রহ করেন।

১২২১ সালে ক্রুসেডার নেতৃত্ব অবশেষে কায়রোর দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। জন অব ব্রিয়েন এই সিদ্ধান্তের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন বলে সূত্রে ইঙ্গিত রয়েছে, কিন্তু পেলাজিয়াস ও আক্রমণপন্থী নেতারা এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন।

জুলাই মাসে বাহিনী দামিয়েত্তা ছেড়ে নীলনদের দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল আল-কামিলের বাহিনীকে পরাজিত করে মিশরের রাজনৈতিক কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

প্রথম দেখায় ক্রুসেডারদের পরিস্থিতি শক্তিশালী মনে হচ্ছিল। তাদের হাতে বড় বাহিনী ছিল এবং দামিয়েত্তা একটি নিরাপদ পশ্চাৎঘাঁটি হিসেবে থাকার কথা। কিন্তু তারা এমন সময় অগ্রসর হচ্ছিল যখন নীলনদের বার্ষিক বন্যা শুরু হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।

আল-কামিল সরাসরি একটি বিশাল সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েননি। পরিবর্তে তিনি মিশরের ভূগোলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।

ক্রুসেডাররা আল-মানসুরার কাছাকাছি পৌঁছালে তাদের অবস্থান ক্রমে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। মুসলিম বাহিনী তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে এবং যোগাযোগপথের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

এরপর নীলনদের পানি বাড়তে থাকে। বাঁধ ও খাল ব্যবস্থার মাধ্যমে জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল। আইয়ুবি বাহিনী এই সুবিধা ব্যবহার করে ক্রুসেডারদের আশপাশের নিম্নভূমি প্লাবিত করতে সক্ষম হয়।

যে ভূমি দিয়ে তারা অগ্রসর হয়েছিল, সেটিই এখন কাদা ও পানির ফাঁদে পরিণত হয়।

ভারী বর্মধারী নাইট, ঘোড়া, রসদবাহী গাড়ি ও বিপুল পদাতিক বাহিনীর চলাচল অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ক্রুসেডারদের পিছনের পথও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

একই সময়ে মুসলিম নৌবাহিনী ও স্থলবাহিনী তাদের সরবরাহপথের ওপর আঘাত করে। দামিয়েত্তা থেকে খাদ্য ও সামরিক সরঞ্জাম আনা কঠিন হয়ে যায়। বাহিনীতে খাদ্যসংকট শুরু হয়।

এখন পরিস্থিতি ছিল ১২১৯ সালের সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন ক্রুসেডাররা দামিয়েত্তা অবরোধ করে মুসলিমদের আলোচনায় বাধ্য করছিল। ১২২১ সালে তারাই পানি, ক্ষুধা ও শত্রু বাহিনীর মধ্যে আটকা পড়েছে।

পশ্চাদপসরণের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। প্লাবিত মাঠ এবং মুসলিম বাহিনীর চাপের মধ্যে সংগঠিতভাবে দামিয়েত্তার দিকে ফিরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

শেষ পর্যন্ত ক্রুসেডার নেতৃত্ব বুঝতে পারে তাদের সামনে আর বাস্তব সামরিক বিকল্প নেই। যে শান্তি প্রস্তাব তারা বিজয়ের সময় প্রত্যাখ্যান করেছিল, এখন তার চেয়েও কঠিন শর্ত মেনে আলোচনায় বসতে হয়।

আগস্ট ১২২১-এ ক্রুসেডাররা আল-কামিলের সঙ্গে সমঝোতায় বাধ্য হয়। এর শর্তের কেন্দ্রে ছিল দামিয়েত্তা মুসলিমদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ক্রুসেডার বাহিনীকে নিরাপদে মিশর ত্যাগের সুযোগ দেওয়া।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে দামিয়েত্তা হস্তান্তর করা হয়। কয়েক বছরের যুদ্ধ, বিপুল অর্থব্যয় এবং অসংখ্য প্রাণহানির পর পঞ্চম ক্রুসেড কার্যত যেখানে শুরু হয়েছিল, সেখানেই ফিরে আসে—কোনো স্থায়ী ভূখণ্ডগত লাভ ছাড়া।

সবচেয়ে নাটকীয় বিষয় হলো, জেরুজালেমও তাদের হাতে আসেনি।

এই ব্যর্থতার জন্য শুধু একটি ব্যক্তিকে দায়ী করা সহজ, বিশেষত পেলাজিয়াসকে। বহু ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাঁকে এমন এক কঠোর ধর্মীয় নেতা হিসেবে দেখানো হয়, যিনি সামরিক বাস্তবতা না বুঝে শান্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর সিদ্ধান্ত যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু পঞ্চম ক্রুসেডের ব্যর্থতা আরও বহুমাত্রিক।

প্রথম সমস্যা ছিল নেতৃত্বের বিভক্তি। রাজা জন অব ব্রিয়েন, পোপীয় প্রতিনিধি পেলাজিয়াস, বিভিন্ন ইউরোপীয় অভিজাত এবং সামরিক ধর্মীয় সংঘগুলোর মধ্যে একক কর্তৃত্ব ছিল না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রায়ই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিযোগিতার মধ্যে নেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় সমস্যা ছিল অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। দামিয়েত্তা দখলের পর ক্রুসেডাররা মনে করেছিল মিশর ভেঙে পড়ার পথে। কিন্তু একটি সীমান্তবর্তী বন্দর দখল এবং পুরো নীলনদীয় রাষ্ট্র জয় করা সম্পূর্ণ ভিন্ন সামরিক কাজ।

তৃতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুল ছিল নীলনদের পরিবেশ সম্পর্কে অপর্যাপ্ত কৌশলগত উপলব্ধি। মিশরের ভূগোল নিজেই একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল। নদী, খাল, বাঁধ ও মৌসুমি বন্যাকে আল-কামিল এমনভাবে ব্যবহার করেছিলেন যে ক্রুসেডারদের ভারী বাহিনী তার সবচেয়ে বড় শক্তি থেকে সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়।

চতুর্থ সমস্যা ছিল ফ্রেডেরিক দ্বিতীয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। তাঁর আগমনের প্রত্যাশায় সময় নষ্ট হয়েছিল। অভিযান যখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে, তখন সেই প্রত্যাশিত সম্রাট নিজে উপস্থিত ছিলেন না।

আরেকটি বড় ভুল ছিল রাজনৈতিক সুযোগ হারানো। আল-কামিলের জেরুজালেম ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব যদি গ্রহণ করা হতো, তাহলে পঞ্চম ক্রুসেড কোনো বড় শহর স্থায়ীভাবে জয় না করেও তার ঘোষিত প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি অর্জন করতে পারত।

তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম সমস্যা ছিল। প্রস্তাবিত জেরুজালেমের প্রতিরক্ষা কতটা কার্যকর থাকত এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ বা অঞ্চল ক্রুসেডারদের হাতে আসত কি না—এ নিয়ে জটিলতা ছিল। ফলে প্রস্তাব গ্রহণ করলেই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ জেরুজালেম রাজ্য নিশ্চিত হয়ে যেত, এমন বলা ঠিক নয়।

তবুও ১২২১ সালের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করলে সুযোগটি অসাধারণ ছিল। ক্রুসেডাররা আলোচনায় জেরুজালেম পাওয়ার সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করে পুরো মিশর জয়ের ঝুঁকি নিয়েছিল—শেষ পর্যন্ত দামিয়েত্তাও হারায়।

আল-কামিলের ভূমিকাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাপতি ছিলেন না; কূটনৈতিকভাবেও নমনীয় ছিলেন। যখন প্রয়োজন হয়েছে তিনি বড় ভূখণ্ড ছাড়ার প্রস্তাব দিয়ে মিশর রক্ষার চেষ্টা করেছেন, আবার ক্রুসেডাররা দুর্বল হয়ে পড়লে সেই দুর্বলতাকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগিয়েছেন।

এই অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায় ছিল ফ্রান্সিস অব আসিসির মিশর সফর। ১২১৯ সালে দামিয়েত্তার যুদ্ধ চলাকালে তিনি মুসলিম শিবিরে গিয়ে আল-কামিলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের কথোপকথনের নির্দিষ্ট বিবরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও সাক্ষাৎটি ঘটেছিল বলে শক্ত প্রমাণ রয়েছে।

যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে একজন খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রচারক এবং মুসলিম সুলতানের এই সাক্ষাৎ পঞ্চম ক্রুসেডের একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। এটি দেখায়, তীব্র ধর্মীয় সংঘর্ষের মধ্যেও আলোচনা ও সরাসরি যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ ছিল না।

পঞ্চম ক্রুসেডের পরিণতি পশ্চিম ইউরোপে হতাশা সৃষ্টি করলেও জেরুজালেম পুনর্দখলের আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়নি। বরং ব্যর্থতার জন্য বিশেষ করে সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিকের বিলম্ব নিয়ে ক্ষোভ বাড়ে। পরবর্তী সময়ে তাঁকেই ক্রুসেডে যাওয়ার জন্য প্রচণ্ড পোপীয় চাপের মুখে পড়তে হবে।

বিদ্রূপের বিষয় হলো, যে জেরুজালেম পঞ্চম ক্রুসেডের বিশাল সেনাবাহিনী চার বছরের যুদ্ধ করেও অর্জন করতে পারেনি, কয়েক বছর পর ফ্রেডেরিক দ্বিতীয় মূলত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সেটিই সাময়িকভাবে লাভ করবেন। ষষ্ঠ ক্রুসেড তাই পঞ্চম ক্রুসেডের সঙ্গে একটি অসাধারণ বৈপরীত্য তৈরি করবে।

পঞ্চম ক্রুসেডের ব্যর্থতা ক্রুসেডীয় সামরিক চিন্তার একটি মৌলিক সমস্যাও প্রকাশ করে। মিশরকে আক্রমণ করার ধারণাটি নিজে অযৌক্তিক ছিল না। বাস্তবে পরবর্তী বহু ক্রুসেডেও একই কৌশল ফিরে আসবে। কারণ মিশর সত্যিই পূর্ব ভূমধ্যসাগরের মুসলিম শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল।

কিন্তু সঠিক কৌশলগত ধারণাও ভুল নেতৃত্ব, দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা এবং স্থানীয় ভূগোল সম্পর্কে ভুল হিসাবের কারণে বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। পঞ্চম ক্রুসেড তার সবচেয়ে পরিষ্কার উদাহরণ।

দামিয়েত্তা দখলের পর ক্রুসেডাররা তাদের সর্বোচ্চ সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। তাদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ শহর, আলোচনার শক্তি এবং জেরুজালেম পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আরও বড় বিজয়ের আকাঙ্ক্ষায় তারা সেই সুবিধা ঝুঁকিতে ফেলে।

শেষ পর্যন্ত নীলনদের পানি তাদের এমন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়, যা ধর্মীয় আত্মবিশ্বাস বা ভারী অশ্বারোহী নাইট দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল না। আল-কামিল ক্রুসেডারদের এমন এক যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে দিয়েছিলেন, যেখানে মিশরের নদী ও খাল তাঁর সেনাবাহিনীর মতোই কার্যকর অস্ত্রে পরিণত হয়েছিল।

এই কারণে ১২১৭–১২২১ সালের পঞ্চম ক্রুসেড শুধু একটি ব্যর্থ মিশর অভিযান নয়। এটি ছিল সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সংঘর্ষ, যেখানে আলোচনায় সম্ভব একটি বড় সাফল্য পূর্ণ বিজয়ের আশায় প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।

পঞ্চম ক্রুসেডের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—যে মুহূর্তে ক্রুসেডাররা দামিয়েত্তা জয় করে নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী মনে করেছিল, ঠিক সেই সময়েই তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যা শেষ পর্যন্ত তাদের সব অর্জন হারানোর পথ তৈরি করে। জেরুজালেম জয়ের জন্য মিশরে শুরু হওয়া অভিযান শেষ পর্যন্ত জেরুজালেম তো দূরের কথা, দামিয়েত্তাও ধরে রাখতে পারেনি; আর নীলনদের প্লাবিত প্রান্তরে সেই ব্যর্থতা ক্রুসেডের ইতিহাসের অন্যতম বড় কৌশলগত বিপর্যয় হিসেবে স্থায়ী হয়ে যায়।