ব্ল্যাক ডেথের বিস্তার: ১৩৪৭–১৩৫৩ সালে ইউরোপে কোটি মানুষের মৃত্যু
সিরিজ: ব্ল্যাক ডেথ: ইউরোপের ভয়াবহ মহামারি
বন্দর থেকে গ্রামাঞ্চল—প্লেগে বিপর্যস্ত মধ্যযুগীয় ইউরোপ।
১৩৪৭ সালে ভূমধ্যসাগরের কয়েকটি বন্দরে দেখা দেওয়া প্লেগ পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে ইউরোপের জনজীবন বিপর্যস্ত করে দেয়। ইতালির বাণিজ্যনগর, ফ্রান্সের নদীবন্দর, ইংল্যান্ডের বাজারশহর এবং উত্তর ইউরোপের উপকূলীয় বসতি একের পর এক আক্রান্ত হয়। কোথাও পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়, কোথাও কৃষিজমির উত্তরাধিকার নেওয়ার মানুষও পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে বিপর্যয়টি একসঙ্গে সর্বত্র ঘটেনি। ব্ল্যাক ডেথ ছিল বহু স্থানীয় প্রাদুর্ভাবের সংযুক্ত বিস্তার, যার সময়, তীব্রতা ও মৃত্যুহার অঞ্চলভেদে আলাদা ছিল। এই পার্থক্য বুঝলেই কোটি মানুষের মৃত্যুর ইতিহাস আরও নির্ভুলভাবে দেখা যায়।
ইউরোপে মহামারির প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১৩৪৭ সালের শরতে সিসিলির মেসিনা বন্দরে রোগাক্রান্ত জেনোয়ীয় জাহাজের আগমন। কৃষ্ণসাগর ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বাণিজ্যসংযোগ ধরে সংক্রমণ ইতোমধ্যে পশ্চিমে এগিয়ে আসছিল। মেসিনায় নাবিক, বন্দরকর্মী ও স্থানীয় মানুষের যোগাযোগ রোগ বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। শহর থেকে মানুষের চলে যাওয়া এবং সিসিলির অন্যান্য জনপদের সঙ্গে চলাচলও বিপদ বাড়ায়। সমুদ্র এখানে প্রতিরক্ষামূলক বাধা হয়ে ওঠেনি; নিয়মিত নৌযোগাযোগ দূরবর্তী জনপদকে একই সংক্রমণব্যবস্থার মধ্যে এনেছিল।
১৩৪৭ সালের শেষভাগ ও ১৩৪৮ সালের শুরুতে জেনোয়া, পিসা এবং ভেনিসের মতো ইতালীয় বন্দর আক্রান্ত হয়। তখন ইতালি একক রাষ্ট্র ছিল না; বিভিন্ন নগররাষ্ট্র ও শাসনাঞ্চল বাণিজ্যের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সমুদ্রবন্দর থেকে মালামাল নদীপথ, সড়ক ও আঞ্চলিক বাজারে পৌঁছাত। সেই যোগাযোগ ধরে রোগও অভ্যন্তরে বিস্তারের সুযোগ পায়। উপকূল থেকে দূরে অবস্থান করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো না। বণিক, পরিবহনকর্মী, যাত্রী এবং স্থানীয় বাজারের চলাচল শহর ও গ্রামকে একত্রে যুক্ত রেখেছিল।
১৩৪৮ সালের ফ্লোরেন্স এই বিপর্যয়ের অন্যতম পরিচিত উদাহরণ। জোভান্নি বোক্কাচ্চোর লেখায় অসুস্থ মানুষের দুর্দশা, স্বাভাবিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যাঘাত এবং সামাজিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে তাঁর সাহিত্যিক বিবরণকে হুবহু জনসংখ্যার হিসাব হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। সিয়েনার আগনোলো দি তুরার বিবরণেও পরিবার ও সমাধিব্যবস্থার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা উঠে আসে। এই লেখাগুলোর মূল্য মানুষের অভিজ্ঞতা বোঝায়; প্রতিটি নাটকীয় সংখ্যা যাচাই ছাড়া গ্রহণ করায় নয়। নগরভেদে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও এক ছিল না।
ইতালির কিছু জনপদ তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উদাহরণও রয়েছে। মিলানকে প্রায়ই সামনে আনা হয়, যদিও সেখানকার প্রতিরোধব্যবস্থার সাফল্য নিয়ে প্রচলিত সব গল্প সমানভাবে প্রমাণিত নয়। জনবসতির বিন্যাস, চলাচলের ধরন, স্থানীয় সিদ্ধান্ত এবং সংক্রমণ প্রবেশের সময় ফলাফলে পার্থক্য তৈরি করতে পারত। পাশের নগরে বিপুল মৃত্যু ঘটেছে বলেই অন্য নগরেও একই অনুপাতে মানুষ মারা গেছে ধরে নেওয়া যায় না। ইউরোপের মোট মৃত্যুহার নির্ধারণের সময় এই অসম অভিজ্ঞতাগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্সে প্রবেশের প্রধান সামুদ্রিক কেন্দ্রগুলোর একটি ছিল মার্সেই। ১৩৪৭ সালের শেষদিকে সেখানে রোগের উপস্থিতির পর দক্ষিণ ফ্রান্সের অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তার ঘটে। রোন উপত্যকার যোগাযোগ মার্সেইকে আভিনিয়ঁ ও অভ্যন্তরের জনপদের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। আভিনিয়ঁ তখন পোপের দরবারের কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে প্রশাসক, ধর্মযাজক, দূত ও ব্যবসায়ীদের চলাচল ছিল উল্লেখযোগ্য। বাণিজ্যিক গুরুত্বের পাশাপাশি ধর্মীয় ও প্রশাসনিক গুরুত্বও একটি শহরকে বিস্তৃত যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। ফলে বন্দরনির্ভর সংক্রমণ দ্রুত বৃহত্তর নগরসমাজের সমস্যায় রূপ নেয়।
১৩৪৮ সালে প্যারিসসহ ফ্রান্সের আরও অঞ্চল আক্রান্ত হয়। একই সময়ে চলমান শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ অনেক অঞ্চলের জীবন আগেই অনিশ্চিত করে রেখেছিল। যুদ্ধ, খাদ্যসংকট ও বাস্তুচ্যুতি কিছু স্থানে দুর্ভোগ বাড়ালেও সেগুলোকে প্লেগের জীবাণুর বিকল্প কারণ ভাবা ভুল। সমকালীন চিকিৎসকেরা দূষিত বাতাস কিংবা গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান দিয়ে রোগ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতেন। জীবাণুর পরিচয় অজানা থাকায় কার্যকর প্রতিরোধের ভিত্তিও সীমিত ছিল। তবে মানুষ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল না; কেউ চলাচল কমিয়েছে, কেউ রোগীর পরিচর্যা করেছে, কেউ শহর ছেড়েছে।
ইংল্যান্ডে প্লেগের আগমনের পরিচিত প্রমাণ ১৩৪৮ সালের ডরসেটের মেলকম্ব রেজিস, বর্তমান ওয়েমাউথ অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত। দক্ষিণ উপকূলের নৌবাণিজ্য ইংল্যান্ডকে মহাদেশীয় ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত রেখেছিল। প্রথম রোগবাহী জাহাজটির সম্পূর্ণ যাত্রাপথ নিয়ে নিশ্চয়তা না থাকলেও ওই বছর দক্ষিণ ইংল্যান্ডে রোগ প্রবেশ প্রতিষ্ঠিত। এরপর বিভিন্ন বন্দর, বাজার ও সড়কসংযোগ ধরে তা বিস্তৃত হয়। ইংলিশ চ্যানেল ভৌগোলিক দূরত্ব তৈরি করেছিল, কিন্তু বাণিজ্যিক যোগাযোগ সেই দূরত্ব নিয়মিত অতিক্রম করত।
১৩৪৮ সালের শেষভাগ থেকে ১৩৪৯ সালে লন্ডন প্রবলভাবে আক্রান্ত হয়। বিদ্যমান সমাধিক্ষেত্রের ওপর চাপ বাড়ায় অতিরিক্ত কবরস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। ইস্ট স্মিথফিল্ডের জরুরি সমাধিক্ষেত্রের প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এই বিপর্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছে। সেখানে কবরের সারি ও দেহাবশেষ দেখায়, বিপুল মৃত্যুর মধ্যেও সংগঠিতভাবে দাফনের চেষ্টা চলেছিল। লন্ডনের প্রায় অর্ধেক অধিবাসীর মৃত্যুর অনুমান রয়েছে, যদিও সঠিক মোট সংখ্যা অনিশ্চিত। প্রতিটি কঙ্কাল এখানে একটি মানবজীবনের সাক্ষ্য, কেবল সামগ্রিক হিসাবের উপাদান নয়।
ইংল্যান্ডের গ্রামাঞ্চলেও ক্ষতি ছিল ব্যাপক। জমিদারি আদালতের নথি, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত লেনদেন এবং ধর্মীয় পদে শূন্যতার বিবরণ থেকে মৃত্যু ও সামাজিক পরিবর্তনের চিহ্ন পাওয়া যায়। কিন্তু এসব নথি সমাজের সব শ্রেণিকে সমানভাবে ধারণ করে না। ভূমিহীন শ্রমিক, নারী কিংবা শিশু অনেক ক্ষেত্রে কম দৃশ্যমান। ১৩৪৯ সালে দেশের বহু এলাকায় মৃত্যুর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে আয়ারল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডও আক্রান্ত হয়, যদিও প্রতিটি অঞ্চলের সময়ক্রম এবং ক্ষয়ক্ষতি একই মাত্রায় নথিবদ্ধ নয়।
মহাদেশীয় ইউরোপে ১৩৪৮–১৩৫০ সালের মধ্যে আইবেরীয় উপদ্বীপ, জার্মান অঞ্চল, আল্পসসংলগ্ন জনপদ এবং নিম্নদেশীয় এলাকায় প্লেগ বিস্তৃত হয়। রাজনৈতিক সীমানা সংক্রমণের কার্যকর সীমা হয়ে ওঠেনি। ১৩৪৯ সালে নরওয়েতে রোগ পৌঁছায়; এরপর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার আরও অঞ্চল আক্রান্ত হয়। উত্তর-পূর্ব ইউরোপ ও রুশ ভূখণ্ডের কিছু শহরে ১৩৫১–১৩৫৩ সালেও মহামারির বিবরণ রয়েছে। ফলে ১৩৫৩ সালকে একটি বড় বিস্তারপর্বের আনুমানিক সমাপ্তি বলা যায়, কিন্তু ওই বছর প্লেগ সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল বলা যায় না।
এত মানুষের মৃত্যু কেন হলো, তার কেন্দ্রে ছিল ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এবং কার্যকর চিকিৎসার অনুপস্থিতি। সংক্রমিত পিসুর কামড়ে বিউবোনিক প্লেগ হতে পারে; ফুসফুস আক্রান্ত হলে কিছু ক্ষেত্রে কাছাকাছি মানুষের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের ফোঁটার মাধ্যমেও রোগ ছড়ায়। তবে প্রতিটি শহরে একই বাহক সমান ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। ঘনবসতি, গৃহস্থালির ঘনিষ্ঠতা এবং পণ্য পরিবহন বিস্তারের সুযোগ বাড়াতে পারত। অপরিচ্ছন্নতাই একমাত্র কারণ—এমন ব্যাখ্যা রোগের জটিল বাস্তবতাকে ছোট করে।
মৃত্যুর চাপ নিজেই নতুন মানবিক সংকট তৈরি করেছিল। অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পরিচর্যাকারীও মারা গেছেন; খাদ্য সরবরাহ, ব্যবসা, ধর্মীয় সেবা ও স্থানীয় প্রশাসন ব্যাহত হয়েছে। কোথাও মৃতদেহ দাফনে বিলম্ব ঘটেছে, কোথাও পরিবারের সম্পত্তি ও শিশুদের দেখাশোনার প্রশ্ন উঠেছে। বিপদের সবটাই অবশ্য সমাজের অবক্ষয়ের গল্প নয়। অনেক মানুষ ঝুঁকি নিয়েও রোগীর পাশে থেকেছেন এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করেছেন। অন্যদিকে ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিথ্যা বিষপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিল না।
ইউরোপে মোট কত মানুষ মারা গিয়েছিল, তার নির্ভুল হিসাব নেই। বহুল ব্যবহৃত অনুমানে প্রায় আড়াই কোটি থেকে পাঁচ কোটি মানুষের মৃত্যু এবং মোট জনসংখ্যার আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক হারানোর কথা বলা হয়; কিছু গবেষণা আরও উচ্চ হার প্রস্তাব করে। কিন্তু মধ্যযুগের অসম্পূর্ণ জনসংখ্যাতথ্য, ভিন্ন গবেষণাপদ্ধতি এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হিসাবকে অনিশ্চিত রাখে। পরাগরেণু ও ভূমি ব্যবহারের গবেষণাও সর্বত্র সমান বিপর্যয়ের ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এসব পরোক্ষ সূচক আবার সরাসরি মৃত্যুগণনার বিকল্প নয়।
১৩৪৭–১৩৫৩ সালের ব্ল্যাক ডেথ তাই কোটি মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি জীবনযাত্রার গভীর পরিবর্তনের ইতিহাস। শ্রমিকের অভাব, উত্তরাধিকার বদল এবং জমি ব্যবহারের পরিবর্তন পরবর্তী সমাজকে প্রভাবিত করেছিল, যদিও ফলাফল সর্বত্র এক ছিল না। পরবর্তী দশকগুলোর নতুন প্লেগের ঢেউ জনসংখ্যা পুনরুদ্ধার আরও কঠিন করে তোলে। এই বিপর্যয়ের ব্যাপকতা বুঝতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা এবং স্থানীয় মানুষের পৃথক অভিজ্ঞতা—দুটিই দরকার। বন্দর, বাজার, গ্রাম ও পরিবারের বিচ্ছিন্ন ক্ষয়ক্ষতি মিলেই ইউরোপের এই বিশাল জনসংখ্যাগত বিপর্যয় তৈরি হয়েছিল।
ব্ল্যাক ডেথের উৎপত্তি: এশিয়া থেকে ইউরোপে প্লেগ ছড়ানোর ইতিহাস
আমেরিকার গৃহযুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য, নারী ও সাধারণ মানুষের ভূমিকা
ভিকসবার্গ অবরোধ: গ্রান্ট কীভাবে কনফেডারেসিকে দুই ভাগ করেছিলেন?
গেটিসবার্গের যুদ্ধ: তিন দিনের লড়াইয়ে রবার্ট ই. লি কেন পরাজিত হন?