ষষ্ঠ ক্রুসেড (১২২৮–১২২৯): যুদ্ধ ছাড়াই দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক কীভাবে জেরুজালেম ফিরে পেয়েছিলেন?
Series: ক্রুসেড: ধর্ম, সাম্রাজ্য ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস
- Author: Admin
- August 23, 2026
ষষ্ঠ ক্রুসেড (১২২৮–১২২৯)
ক্রুসেডের ইতিহাসে জেরুজালেম দখলের জন্য বিশাল সেনাবাহিনী, দীর্ঘ অবরোধ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর উদাহরণ অসংখ্য। ১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডাররা শহরটি রক্তাক্ত আক্রমণের মাধ্যমে দখল করেছিল, ১১৮৭ সালে সালাহউদ্দিন হাত্তিনের বিজয়ের পর সেটি পুনর্দখল করেছিলেন, আর তৃতীয় ও পঞ্চম ক্রুসেডেও জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের জন্য বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু ১২২৯ সালে এমন একটি ঘটনা ঘটে, যা পুরো ক্রুসেডের ইতিহাসে প্রায় অনন্য—একটি বড় যুদ্ধ ছাড়াই জেরুজালেম আবার লাতিন খ্রিস্টান নিয়ন্ত্রণে আসে।
এই অসাধারণ কূটনৈতিক সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন পবিত্র রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক। তিনি শুধু একজন ইউরোপীয় সম্রাট ছিলেন না; তাঁর শাসন বিস্তৃত ছিল জার্মানি, ইতালি ও সিসিলির ওপর। বহু ভাষা, বিজ্ঞান, দর্শন ও ইসলামী সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ তাঁকে সমসাময়িক ইউরোপীয় রাজাদের তুলনায় আলাদা ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। একই সঙ্গে তাঁর সঙ্গে পোপতন্ত্রের সম্পর্ক ছিল গভীরভাবে সংঘাতপূর্ণ।
ফ্রেডেরিক বহু আগেই ক্রুসেডে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পঞ্চম ক্রুসেডের সময় তাঁর আগমনের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করা হলেও তিনি নিজে মিশরে যাননি। দামিয়েত্তার বিপর্যয়ের জন্য তাঁর বিলম্বকে অনেকেই দায়ী করেছিলেন। পোপীয় নেতৃত্বের কাছে তাঁর প্রতিশ্রুতি ক্রমেই রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়।
১২২০ সালে সম্রাট হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার পরও ফ্রেডেরিক বারবার ক্রুসেডে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ইউরোপীয় রাজনীতি, সিসিলির প্রশাসন এবং নিজের সাম্রাজ্যিক সমস্যা দেখিয়ে অভিযান পিছিয়ে যেতে থাকে। পোপের ধৈর্য ক্রমেই শেষ হয়ে আসছিল।
পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন ফ্রেডেরিক জেরুজালেমের রাজ্যের উত্তরাধিকারী ইসাবেলা দ্বিতীয় বা ইয়োলান্ড অব ব্রিয়েনকে বিয়ে করেন। এই বিবাহের মাধ্যমে তাঁর জেরুজালেমের সিংহাসনের ওপর একটি রাজবংশীয় দাবি তৈরি হয়। ইসাবেলার পিতা জন অব ব্রিয়েন দীর্ঘদিন জেরুজালেমের রাজা হিসেবে কাজ করেছিলেন, কিন্তু ফ্রেডেরিক বিবাহের পর নিজেই রাজকীয় কর্তৃত্ব দাবি করতে শুরু করেন।
ফলে জেরুজালেম পুনরুদ্ধার তাঁর জন্য শুধু ধর্মীয় ক্রুসেডের প্রশ্ন ছিল না; এটি এখন নিজের রাজকীয় অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছিল।
অবশেষে ১২২৭ সালে ফ্রেডেরিক পূর্ব ভূমধ্যসাগরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু যাত্রার অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর বাহিনীতে রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে তিনি ফিরে আসতে বাধ্য হন।
পোপ নবম গ্রেগরি এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি। তাঁর চোখে ফ্রেডেরিক আবারও প্রতিশ্রুতি ভেঙেছেন। ফলে ১২২৭ সালে সম্রাটকে চার্চ থেকে বহিষ্কার বা এক্সকমিউনিকেট করা হয়।
এখানেই ষষ্ঠ ক্রুসেডের সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের একটি দেখা যায়। পরের বছর ফ্রেডেরিক যখন সত্যিই পূর্বদিকে যাত্রা করেন, তিনি তখনও বহিষ্কৃত। অর্থাৎ খ্রিস্টান পবিত্র নগরী পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা ক্রুসেডের নেতা নিজেই পোপের চোখে চার্চের শাস্তির অধীন ব্যক্তি।
১২২৮ সালের জুনে তিনি আবার যাত্রা শুরু করেন। তাঁর বাহিনী প্রথম বা তৃতীয় ক্রুসেডের মতো বিশাল ছিল না। বরং সামরিকভাবে তিনি সালাহউদ্দিনের উত্তরসূরি আইয়ুবি শক্তির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধ চালানোর মতো অবস্থায় ছিলেন না।
কিন্তু ফ্রেডেরিকের হাতে ছিল অন্য একটি শক্তি—কূটনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিভক্তি সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি।
সালাহউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্য একক শক্তিশালী শাসকের অধীনে টিকে থাকেনি। তাঁর পরিবার ও উত্তরসূরিদের মধ্যে মিশর, দামেস্ক এবং অন্যান্য অঞ্চল ভাগ হয়ে যায়। এই আইয়ুবি রাজপুত্রেরা নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়ে।
মিশরের শাসক ছিলেন সুলতান আল-কামিল, যিনি পঞ্চম ক্রুসেডের সময়ও ক্রুসেডারদের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন। দামিয়েত্তা অবরোধের সময় তিনিই জেরুজালেম ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে মিশর ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
আল-কামিলের বড় উদ্বেগ ছিল তাঁর নিজের আইয়ুবি আত্মীয়দের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। বিশেষত দামেস্ক ও সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁকে চিন্তিত করছিল। তিনি এমন একটি ইউরোপীয় শক্তির সঙ্গে সাময়িক সমঝোতা করতে আগ্রহী হতে পারেন, যা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে ভারসাম্য তৈরি করবে।
ফ্রেডেরিক ও আল-কামিলের মধ্যে যোগাযোগ ষষ্ঠ ক্রুসেড শুরু হওয়ার আগেই তৈরি হয়েছিল। দূত, চিঠিপত্র এবং প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দুই পক্ষ পরস্পরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছিল।
তাদের সম্পর্ককে পরবর্তী কাহিনিতে কখনো অতিরিক্ত রোমান্টিক করা হয়। দুই শিক্ষিত শাসক নাকি দর্শন, গণিত ও বিজ্ঞান নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করতেন—এমন নানা গল্প প্রচলিত। কিছু সাংস্কৃতিক যোগাযোগ অবশ্যই ছিল, কিন্তু মূল বিষয় ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতা।
ফ্রেডেরিকের দরকার ছিল জেরুজালেম, আর আল-কামিলের দরকার ছিল নিজের বৃহত্তর আইয়ুবি রাজনৈতিক অবস্থান নিরাপদ রাখা।
১২২৮ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রেডেরিক একরে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে তাঁকে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করা হয়নি। কারণ তিনি এখনও পোপের বহিষ্কারের অধীনে। নাইটস টেম্পলারসহ কিছু শক্তিশালী লাতিন গোষ্ঠী তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিল।
অন্যদিকে নাইটস টিউটনিক এবং কিছু ইউরোপীয় অভিজাত তাঁর প্রতি বেশি অনুগত ছিল। ফলে ষষ্ঠ ক্রুসেডের ভেতরেও রাজনৈতিক বিভাজন ছিল তীব্র।
ফ্রেডেরিক সামরিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য কিছু সীমিত অভিযান পরিচালনা করেন এবং জাফার প্রতিরক্ষা পুনর্গঠনের কাজও করেন। কিন্তু তাঁর প্রধান অস্ত্র ছিল যুদ্ধ নয়। তিনি আল-কামিলের সঙ্গে আলোচনাকে এগিয়ে নিতে থাকেন।
আলোচনার অবস্থাও সহজ ছিল না। আইয়ুবি পারিবারিক রাজনীতিতে পরিবর্তন ঘটে যাওয়ায় আল-কামিলের আগের কিছু উদ্বেগ কমে গিয়েছিল। ফলে ফ্রেডেরিক যে সময়ে লেভান্তে পৌঁছান, তখন সুলতানের তাঁর সাহায্যের প্রয়োজন আগের তুলনায় কম ছিল।
এদিকে ফ্রেডেরিকের নিজের অবস্থাও শক্তিশালী ছিল না। তিনি বিশাল বাহিনী আনেননি, পশ্চিমে পোপের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ চলছে এবং সময়ও সীমিত। দুই পক্ষই জানত অপর পক্ষকে সহজে সামরিকভাবে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
এই অবস্থায় জেরুজালেম একটি রাজনৈতিক বিনিময়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
শহরটি ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও ১২২৯ সালের পরিস্থিতিতে এর সামরিক মূল্য সালাহউদ্দিনের যুগের মতো ছিল না। ১২১৯ সালে, পঞ্চম ক্রুসেডের সময়, মুসলিমরা জেরুজালেমের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি অংশ ধ্বংস করেছিল, যাতে ক্রুসেডাররা শহর দখল করলেও সেটিকে শক্তিশালী দুর্গে পরিণত করতে না পারে।
ফলে জেরুজালেমকে সীমিত শর্তে ছেড়ে দেওয়া আল-কামিলের জন্য প্রতীকীভাবে ব্যয়বহুল হলেও সামরিকভাবে পুরো মিশর বা সিরিয়ার নিরাপত্তা বিসর্জনের সমান ছিল না।
দীর্ঘ আলোচনার পর ১২২৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সমঝোতা হয়, যা সাধারণত জাফার চুক্তি হিসেবে পরিচিত। এটি ষষ্ঠ ক্রুসেডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
চুক্তি অনুযায়ী জেরুজালেম, বেথলেহেম এবং নাজারেথসহ কিছু অঞ্চল খ্রিস্টান নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে। একই সঙ্গে উপকূলীয় ক্রুসেডার ভূখণ্ড থেকে জেরুজালেমের দিকে যোগাযোগ সহজ করার জন্য কিছু এলাকা ও পথ নিয়ে সমঝোতা করা হয়।
কিন্তু জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ ছিল সম্পূর্ণ নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম ছিল হারাম আল-শরিফ বা টেম্পল মাউন্ট। ডোম অব দ্য রক এবং আল-আকসা মসজিদ মুসলিম ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধীনেই থাকে। মুসলিমদের সেখানে প্রবেশ, ধর্মীয় কার্যক্রম ও প্রশাসনিক অধিকার বজায় থাকে।
এমনকি জেরুজালেমে বসবাসকারী মুসলিমদের কিছু অধিকারও সংরক্ষিত ছিল। অর্থাৎ ১০৯৯ সালের মতো শহরের পুরো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কাঠামো উল্টে দেওয়া হয়নি।
জেরুজালেমকে কার্যত একটি ভাগাভাগিকৃত ধর্মীয় ব্যবস্থার অধীনে রাখা হয়েছিল।
চুক্তি প্রায় দশ বছরের যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করে। এই সময়ে দুই পক্ষ নিজেদের প্রধান ভূখণ্ড ধরে রাখবে এবং বৃহৎ সংঘর্ষ এড়াবে।
খ্রিস্টান ইউরোপীয় দৃষ্টিতে এটি ছিল বিস্ময়কর অর্জন। রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়ে যা করতে পারেননি, ফ্রেডেরিক কয়েক মাসের আলোচনার মাধ্যমে তা অর্জন করলেন—জেরুজালেম আবার খ্রিস্টান নিয়ন্ত্রণে এল।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এই সাফল্য উভয় ধর্মীয় জগতেই তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে।
মুসলিম বিশ্বে আল-কামিলের সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে অপমানজনক মনে হয়। জেরুজালেম সালাহউদ্দিনের সবচেয়ে বিখ্যাত বিজয়ের প্রতীক ছিল। সেই শহর যুদ্ধ ছাড়াই ফ্রাঙ্কদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে—এই সংবাদ গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
দামেস্কে প্রতিবাদ ও শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বলে সমকালীন মুসলিম বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ধর্মীয় নেতারা জেরুজালেম ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।
আল-কামিলের দৃষ্টিতে অবশ্য এটি ছিল রাজনৈতিক বাস্তববাদ। তিনি শহরের ইসলামী পবিত্র স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন, মিশর ও বৃহত্তর আইয়ুবি ভূখণ্ড রক্ষা করেছেন এবং দীর্ঘ যুদ্ধ এড়িয়েছেন।
অন্যদিকে খ্রিস্টান শিবিরেও ফ্রেডেরিকের বিজয় সর্বসম্মতভাবে উদযাপিত হয়নি।
কারণ তিনি তখনও বহিষ্কৃত সম্রাট।
ফ্রেডেরিক ১২২৯ সালের মার্চে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন। শহরে তাঁর প্রবেশ প্রথম ক্রুসেডের মতো সামরিক বিজয়মিছিল ছিল না। কোনো দেয়াল ভাঙা হয়নি, কোনো বিশাল শত্রুবাহিনী পরাজিত হয়নি, কোনো রক্তাক্ত দখল ঘটেনি।
চুক্তির ভিত্তিতেই তিনি শহরে প্রবেশ করেছিলেন।
সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে চার্চ অব দ্য হোলি সেপালকারে। প্রচলিত রাজকীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পরিবর্তে পরিস্থিতি ছিল অস্বাভাবিক। পোপীয় বহিষ্কারের কারণে উচ্চপদস্থ ধর্মযাজকদের অনেকেই তাঁর রাজকীয় দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করতে প্রস্তুত ছিলেন না।
ফ্রেডেরিক সেখানে নিজের মাথায় জেরুজালেমের রাজমুকুট নিজেই স্থাপন করেন বলে বহুল প্রচলিত বিবরণ রয়েছে। ঘটনাটিকে সরাসরি আনুষ্ঠানিক রাজ্যাভিষেক বলা নিয়ে কিছু সূক্ষ্মতা থাকলেও, তিনি নিজেই নিজের রাজকীয় মর্যাদা প্রদর্শন করেছিলেন—এটি ষষ্ঠ ক্রুসেডের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকগুলোর একটি।
একজন বহিষ্কৃত সম্রাট, কোনো বড় সামরিক বিজয় ছাড়াই পুনরুদ্ধার করা জেরুজালেমে দাঁড়িয়ে নিজের রাজকীয় কর্তৃত্ব ঘোষণা করছেন—ক্রুসেডের ইতিহাসে এর চেয়ে অস্বাভাবিক দৃশ্য খুব কমই আছে।
ফ্রেডেরিকের অবস্থান আরও বিতর্কিত ছিল কারণ তাঁর স্ত্রী ইসাবেলা দ্বিতীয় ১২২৮ সালে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের ছেলে কনরাড আইনগতভাবে জেরুজালেমের উত্তরাধিকারী ছিল। ফ্রেডেরিক মূলত অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্রের অধিকারের ভিত্তিতে রাজ্য পরিচালনা করছিলেন।
স্থানীয় ক্রুসেডার অভিজাতদের একটি অংশ তাঁর কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব পছন্দ করত না। বিশেষ করে একরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তাঁর বিরোধ দ্রুত বাড়ে।
টেম্পলাররাও চুক্তির প্রতি উৎসাহী ছিল না। জেরুজালেমের প্রতিরক্ষা দুর্বল এবং মুসলিম ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থান করায় তারা শহরের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দিহান ছিল। চুক্তিতে পবিত্র নগরী পাওয়া গেলেও শক্তিশালী সামরিক দুর্গ হিসেবে সেটি পুনর্গঠনের ক্ষমতা সীমিত ছিল।
এখানেই ফ্রেডেরিকের সাফল্যের মূল দুর্বলতা।
তিনি জেরুজালেমের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছিলেন, কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণের পেছনে শক্তিশালী সামরিক বাস্তবতা ছিল না। শহরটি আইয়ুবি ভূখণ্ডের কাছাকাছি, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল এবং চুক্তির মেয়াদ সীমিত।
ফলে জেরুজালেম ফিরে পাওয়া এবং স্থায়ীভাবে নিরাপদ জেরুজালেম রাজ্য পুনর্গঠন করা একই বিষয় ছিল না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফ্রেডেরিক তাঁর নিজের ইউরোপীয় সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন পবিত্র ভূমিতে থাকতে পারছিলেন না। তাঁর অনুপস্থিতিতে পোপীয় বাহিনী দক্ষিণ ইতালিতে তাঁর রাজ্যের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছিল।
তাই ১২২৯ সালের মে মাসেই তিনি একর ছেড়ে ইউরোপের দিকে ফিরে যান। তাঁর বিদায়ও গৌরবময় ছিল না। স্থানীয় বিরোধ এতটাই তীব্র ছিল যে একরে তাঁর বিরুদ্ধে জনরোষ প্রকাশ পায় এবং কাহিনি অনুযায়ী তাঁর দিকে আবর্জনা পর্যন্ত নিক্ষেপ করা হয়।
অর্থাৎ জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করা সম্রাট বিজয়ীর মতো সম্মান নিয়ে পবিত্র ভূমি ছাড়তে পারেননি।
তবু কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর অর্জনকে ছোট করে দেখা কঠিন। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এবং বড় কোনো যুদ্ধ ছাড়াই তিনি এমন একটি ফলাফল অর্জন করেছিলেন, যার জন্য আগের কয়েকটি ক্রুসেড বিপুল রক্তপাত করেও ব্যর্থ হয়েছিল।
এটি সম্ভব হয়েছিল প্রধানত তিনটি কারণে। প্রথমত, আইয়ুবি বিশ্বের রাজনৈতিক বিভাজন ফ্রেডেরিককে দর-কষাকষির সুযোগ দিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, আল-কামিলের কাছে জেরুজালেমের সামরিক মূল্য সীমিত হলেও মিশরের নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তৃতীয়ত, ফ্রেডেরিক বুঝেছিলেন তাঁর সামরিক শক্তির সীমা এবং তাই যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনাকেই প্রধান অস্ত্র করেছিলেন।
ফ্রেডেরিকের ব্যক্তিত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সিসিলির বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে মুসলিম কর্মকর্তা, পণ্ডিত ও আরবি ভাষাভাষী সমাজের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল অনেক পশ্চিমা শাসকের তুলনায় গভীর। তিনি ইসলামী জগতকে শুধু ধর্মীয় শত্রু হিসেবে দেখতেন না; একটি জটিল রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবেও বুঝতে পারতেন।
তবে এটিকে আধুনিক অর্থে ধর্মীয় সহনশীলতার এক নিখুঁত কাহিনি হিসেবেও দেখা ঠিক নয়। ফ্রেডেরিক ও আল-কামিল দুজনেই নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করছিলেন। তাদের চুক্তির ভিত্তি ছিল ক্ষমতার হিসাব, আদর্শিক শান্তিবাদ নয়।
ষষ্ঠ ক্রুসেডের ফলও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১২২৯ সালের চুক্তিতে জেরুজালেম খ্রিস্টান নিয়ন্ত্রণে ফিরে এলেও ১২৪৪ সালে শহরটি আবার মুসলিম বাহিনীর হাতে চলে যায়। খাওয়ারেজমীয় যোদ্ধাদের আক্রমণে জেরুজালেম ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং লাতিন নিয়ন্ত্রণের এই অধ্যায় শেষ হয়ে যায়।
অর্থাৎ ফ্রেডেরিকের অর্জন স্থায়ী ছিল মাত্র প্রায় পনেরো বছর।
তবুও ১২২৮–১২২৯ সালের ষষ্ঠ ক্রুসেড ইতিহাসে বিশেষ স্থান ধরে রেখেছে। প্রথম ক্রুসেড জেরুজালেম জয় করেছিল অবরোধ ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে, তৃতীয় ক্রুসেড তা ফিরিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছিল একাধিক বড় যুদ্ধের পর, আর পঞ্চম ক্রুসেড মিশরে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। ফ্রেডেরিক দেখালেন, একই লক্ষ্য কখনো কখনো তলোয়ারের চেয়ে আলোচনার টেবিলে বেশি কার্যকরভাবে অর্জিত হতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ ছিল, পোপের অনুমোদিত ক্রুসেডের ধারণার মধ্যেই এই সাফল্য ঘটেছিল পোপের সঙ্গে বিরোধে থাকা একজন বহিষ্কৃত সম্রাটের হাতে। তিনি যুদ্ধের ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করলেও বিজয় অর্জন করেছিলেন কূটনৈতিক বাস্তববাদ দিয়ে।
এই কারণেই ষষ্ঠ ক্রুসেড শুধু জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের গল্প নয়। এটি মধ্যযুগীয় রাজনীতি, ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং বাস্তব কূটনীতির মধ্যে সংঘাতের এক অসাধারণ উদাহরণ। যুদ্ধ করার সামর্থ্য সীমিত জেনেও ফ্রেডেরিক প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক দুর্বলতা বুঝেছিলেন, আল-কামিল নিজের বৃহত্তর স্বার্থকে পবিত্র নগরীর সাময়িক নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বেশি মূল্য দিয়েছিলেন, আর সেই দুই হিসাবের মিলনেই ১২২৯ সালে জেরুজালেমের পতাকা বদলে যায়—কোনো বিশাল যুদ্ধ ছাড়াই।
ষষ্ঠ ক্রুসেডের সবচেয়ে বিস্ময়কর শিক্ষা এখানেই: যে জেরুজালেমের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম হাজার হাজার মানুষ যুদ্ধ করে প্রাণ দিয়েছিল, দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক সেই শহর সাময়িকভাবে ফিরে পেয়েছিলেন একটি চুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে, কূটনীতিতে অর্জিত ভূখণ্ড যদি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি না পায়, তাহলে সেই বিজয়ও অত্যন্ত ভঙ্গুর হতে পারে।
সপ্তম ক্রুসেড (১২৪৮–১২৫৪): ফ্রান্সের রাজা নবম লুইয়ের মিশর অভিযান ও বন্দিত্ব
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের পতন: উত্তরাধিকার সংকট ও দুর্বল সম্রাটদের যুগ
আওরঙ্গজেবের ধর্মনীতি ও বিদ্রোহ: জিজিয়া, রাজপুত, শিখ, জাট ও মারাঠা প্রতিরোধের ইতিহাস
শিবাজী ও মুঘল সাম্রাজ্য: আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে মারাঠা শক্তির উত্থানের ইতিহাস
আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য অভিযান: বিজাপুর, গোলকোন্ডা ও মারাঠাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধ
প্রথম এলিজাবেথ: যে রানির শাসনে ইংল্যান্ড হয়ে উঠেছিল বিশ্বশক্তি