মহামন্দার পটভূমি: আমেরিকার উত্থান, শেয়ারবাজারে জল্পনা ও ঋণনির্ভর সমৃদ্ধি
সিরিজ: মহামন্দা (১৯২৯): বিশ্ব অর্থনীতির বিপর্যয়
সমৃদ্ধির ঝলমলে আড়ালে জমছিল ঋণ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বীজ।
১৯২০-এর দশকের আমেরিকায় ভবিষ্যৎকে মনে হচ্ছিল ক্রমাগত সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি। কারখানায় উৎপাদন বাড়ছিল, রাস্তায় মোটরগাড়ির সংখ্যা বাড়ছিল, ঘরে ঢুকছিল রেডিও ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। শেয়ার কিনে দ্রুত ধনী হওয়ার গল্প সংবাদপত্র থেকে নাপিতের দোকান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এই উত্থানের নিচে জমছিল এমন কিছু দুর্বলতা, যা সাধারণ মানুষের চোখে সহজে ধরা পড়েনি। ১৯২৯ সালের মহামন্দা বুঝতে হলে শুধু শেয়ারবাজারের পতন দেখলে চলে না; দেখতে হয় সেই সমৃদ্ধি কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং কার ঋণের ওপর দাঁড়িয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার, উৎপাদনের প্রসার, আয়বৈষম্য এবং দুর্বল আর্থিক কাঠামো মিলে সংকটের পটভূমি তৈরি করেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের অর্থনৈতিক শক্তিকে বিপুলভাবে ক্ষয় করলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে শক্তিশালী করেছিল। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধের জন্য আমেরিকা থেকে খাদ্য, অস্ত্র, ইস্পাত ও অন্যান্য সরঞ্জাম কিনেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত না হওয়ায় তার কারখানা, রেলপথ ও কৃষিজমি ব্যাপক ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়। যুদ্ধকালীন চাহিদা শিল্প উৎপাদন ও কৃষির সম্প্রসারণ ঘটায়। একই সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলো আমেরিকার কাছে ঋণী হয়ে পড়ে। যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক পুঁজির যে কেন্দ্রীয় অবস্থান লন্ডনের ছিল, যুদ্ধের পরে নিউইয়র্ক তার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে।
তবে যুদ্ধোত্তর আমেরিকার উত্থান একটানা চলেনি। ১৯২০–১৯২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র তীব্র মন্দার মুখোমুখি হয়েছিল, যখন যুদ্ধকালীন অর্থনীতি থেকে শান্তিকালীন অর্থনীতিতে রূপান্তর, মূল্যপতন এবং ঋণের কঠোরতা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে আঘাত হানে। এরপর পুনরুদ্ধার শুরু হয়। বিদ্যুতের বিস্তার, উন্নত যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদন পরিচালনার নতুন পদ্ধতি শ্রমিকপ্রতি উৎপাদন বাড়াতে থাকে। বড় কারখানায় বৈদ্যুতিক মোটরের ব্যবহার উৎপাদনের বিন্যাসকে নমনীয় করে। একই পরিমাণ শ্রম দিয়ে বেশি পণ্য তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মুনাফা ও সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়ে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক ছিল মোটরগাড়ি। হেনরি ফোর্ডের সংযোজনপদ্ধতি যুদ্ধের আগেই গাড়ি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটিয়েছিল; বিশের দশকে তার ব্যাপক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। গাড়ির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে ইস্পাত, রাবার, কাচ, পেট্রোলিয়াম ও সড়ক নির্মাণের কাজও বাড়ে। গাড়ি মেরামত, জ্বালানি বিক্রি এবং সড়কপথের ব্যবসা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। ফলে একটি শিল্পের প্রসার বহু খাতকে টেনে তোলে। কিন্তু এই পারস্পরিক নির্ভরতার বিপরীত দিকও ছিল: গাড়ির বিক্রি কমলে সংশ্লিষ্ট বহু শিল্পে একসঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারত।
নতুন ভোক্তা অর্থনীতিকে গতিশীল করেছিল কিস্তিতে কেনাকাটা ও ভোক্তাঋণ। আগে কোনো পণ্য কেনার জন্য পুরো অর্থ জমাতে হতো; এখন অগ্রিম কিছু অর্থ দিয়ে বাকি মূল্য মাসে মাসে পরিশোধ করা যাচ্ছিল। মোটরগাড়ি, আসবাব, রেডিও এবং গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি সাধারণ পরিবারের নাগালে আসে। এতে জীবনযাত্রার বাস্তব উন্নতি হয় এবং কারখানার বিক্রি বাড়ে। তবে ভবিষ্যতের আয়ের একটি অংশ আগেই ঋণ পরিশোধের জন্য নির্ধারিত হয়ে যায়। চাকরি চলে গেলে বা মজুরি কমলে একই পরিবারকে ভোগব্যয় কমাতে হতো, অথচ কিস্তির দায় থেকে মুক্তি মিলত না।
সমৃদ্ধির বণ্টনও ছিল অসম। বহু শ্রমিকের প্রকৃত আয় বাড়লেও উৎপাদনশীলতা ও ব্যবসায়িক মুনাফার বৃদ্ধির সুফল সমানভাবে ছড়ায়নি। কৃষক, কম মজুরির শ্রমিক এবং বৈষম্যের শিকার জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এই উত্থানে সীমিত সুবিধা পেয়েছিল। উচ্চ আয়ের মানুষের হাতে বিপুল সঞ্চয় জমে, যার একাংশ শেয়ার ও অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ হয়। অন্যদিকে সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা উৎপাদনের সঙ্গে একই গতিতে বাড়েনি। আয়বৈষম্য একা মহামন্দা ঘটায়নি, কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের জন্য স্থিতিশীল গণচাহিদা তৈরির ভিত্তিকে দুর্বল করেছিল।
কৃষিক্ষেত্রে সংকট আরও আগে থেকে চলছিল। যুদ্ধের সময় ইউরোপের খাদ্যচাহিদা মেটাতে আমেরিকান কৃষকেরা আবাদ বাড়ান, যন্ত্র কেনেন এবং জমি কেনার জন্য ঋণ নেন। যুদ্ধ শেষে ইউরোপের কৃষি উৎপাদন ফিরতে থাকলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়। শস্যের দাম কমলেও কৃষকের ঋণ কমেনি। অনেকেই আয় ধরে রাখতে আরও বেশি ফসল ফলানোর চেষ্টা করেন, যা অতিরিক্ত সরবরাহের সমস্যা বাড়ায়। কৃষিজমির মূল্য কমে গেলে বন্ধকের নিরাপত্তাও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে শহরের উচ্ছ্বাসের মধ্যেই গ্রামীণ আমেরিকার বহু পরিবার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় বাস করছিল।
এই কৃষিসংকট ব্যাংকব্যবস্থার দুর্বলতাও প্রকাশ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে অসংখ্য ছোট ব্যাংক ছিল, যাদের ব্যবসা সীমিত অঞ্চল ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপর নির্ভর করত। কোনো কৃষিপ্রধান অঞ্চলে কৃষকেরা ঋণ ফেরত দিতে না পারলে সেখানকার ব্যাংক দ্রুত সমস্যায় পড়ত। ব্যাংকের শাখা সম্প্রসারণসংক্রান্ত বিধিনিষেধও অনেক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ সীমিত রেখেছিল। বিশের দশকেই বহু ব্যাংক বন্ধ হয়। তখন ফেডারেল পর্যায়ে ব্যাংক আমানতের বীমা ছিল না, ফলে ব্যাংক ব্যর্থ হলে আমানতকারীর সঞ্চয় হারানোর আশঙ্কা বাস্তব ছিল। আস্থা নষ্ট হলে এই ব্যবস্থা সহজেই আতঙ্কের শিকার হতে পারত।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও স্থিতিশীলতার আড়ালে ছিল ঋণের জটিল প্রবাহ। যুদ্ধের পরে ব্রিটেন ও ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধঋণ পরিশোধ করছিল; অন্যদিকে জার্মানির ওপর ছিল ক্ষতিপূরণের দায়। ১৯২৪ সালের ডস পরিকল্পনার পর আমেরিকান ঋণ জার্মানির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জার্মানি বিদেশি পুঁজি পেত, ক্ষতিপূরণ দিত এবং মিত্রদেশগুলো নিজেদের ঋণ পরিশোধ করত। পুরো ব্যবস্থাটি কোনো সরল হিসাবের চক্র ছিল না, তবে আমেরিকান অর্থায়নের ওপর এর নির্ভরতা ছিল গভীর। যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন ঋণ কমে গেলে ইউরোপের ঋণগ্রহীতাদের ওপর চাপ বাড়ার পরিস্থিতি তৈরি ছিল।
স্বর্ণমান এই ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করে রেখেছিল। বহু দেশের মুদ্রার মূল্য নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। মুদ্রার সেই মূল্য বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে স্বর্ণের মজুত ও আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহের দিকে নজর রাখতে হতো। কোনো দেশ থেকে স্বর্ণ বেরিয়ে গেলে সুদ বাড়ানো ও ঋণ সংকুচিত করার চাপ তৈরি হতে পারত। অর্থনীতি দুর্বল হলেও কর্মসংস্থান রক্ষার পরিবর্তে মুদ্রার নির্ধারিত মূল্য রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। পাশাপাশি আমেরিকার উঁচু আমদানি শুল্ক বিদেশি দেশগুলোর জন্য সেখানে পণ্য বিক্রি করে ডলার আয়ের পথ কঠিন করেছিল। ফলে আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধ ও বাণিজ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ ছিল না।
এদিকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ ও জল্পনার সীমারেখা ঝাপসা হতে থাকে। শিল্পের বাস্তব উন্নতি অনেক প্রতিষ্ঠানের মূল্য বাড়ার যুক্তিসংগত কারণ দিয়েছিল। কিন্তু ক্রমে অনেক ক্রেতার প্রধান আশা হয়ে দাঁড়ায়, কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয় যা-ই হোক, আরেকজন আরও বেশি দামে শেয়ারটি কিনবে। বিনিয়োগ তহবিল, প্রচার এবং বাজারে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড এই আশাবাদকে বাড়ায়। শেয়ারের দাম বাড়ছিল বলে মানুষ কিনছিল, আর মানুষ কিনছিল বলে দাম বাড়ছিল। এই আত্মপুষ্ট প্রত্যাশা বাস্তব ব্যবসায়িক সম্ভাবনার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে গেলে বাজারের ভিত ভঙ্গুর হয়ে ওঠে।
ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনা সেই ভঙ্গুরতাকে বাড়িয়েছিল। ক্রেতা নিজের অর্থের একটি অংশ দিয়ে বাকি টাকা দালালের কাছ থেকে ধার করতেন; কেনা শেয়ারই থাকত ঋণের জামানত। দাম বাড়লে অল্প নিজস্ব পুঁজির বিপরীতে বড় লাভ পাওয়া যেত। কিন্তু দাম কমলে ঋণদাতা অতিরিক্ত অর্থ বা জামানত চাইতে পারতেন। ক্রেতা তা দিতে না পারলে শেয়ার বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় করা হতো। একজনের বাধ্যতামূলক বিক্রি অন্যজনের জামানতের মূল্য কমিয়ে আরও বিক্রি ডেকে আনতে পারত। ফলে ঋণ শুধু কেনার ক্ষমতা বাড়ায়নি; পতনের সময় বিক্রির চাপও বহুগুণ করার ব্যবস্থা তৈরি করেছিল।
১৯২৮–১৯২৯ সালে শেয়ারবাজারের অতিরিক্ত জল্পনা নিয়ে ফেডারেল রিজার্ভের উদ্বেগ বাড়ে এবং ঋণ কঠোর করার উদ্যোগ দেখা যায়। কিন্তু জল্পনা থামানোর চেষ্টা সাধারণ ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক ঋণপ্রবাহেও প্রভাব ফেলতে পারত। একই সময়ে নির্মাণ ও কিছু ভোগ্যপণ্যের বাজারে দুর্বলতা দেখা দিচ্ছিল। উঁচু শেয়ারমূল্য, ঋণগ্রস্ত পরিবার, সংকটাপন্ন কৃষি এবং বিদেশি অর্থায়নের নির্ভরতা মিলিয়ে অর্থনীতি ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা হারাচ্ছিল। শেয়ারবাজারের পতন তখনও অবধারিত কোনো পূর্বনির্ধারিত ঘটনা ছিল না; তবে বিপর্যয় ঘটলে তা ছড়িয়ে পড়ার বহু পথ প্রস্তুত ছিল।
এই পটভূমিতে ১৯২৯ সালের শরৎ এসে হাজির হয়। আমেরিকার সমৃদ্ধি পুরোপুরি কল্পিত ছিল না—প্রযুক্তি, উৎপাদন ও জীবনযাত্রায় প্রকৃত পরিবর্তন ঘটেছিল। সমস্যা ছিল সেই অগ্রগতির সঙ্গে বেড়ে ওঠা ঋণ, অসম ক্রয়ক্ষমতা এবং অস্থিতিশীল আর্থিক সম্পর্ক। শেয়ারবাজারের ধস এই দুর্বলতাগুলোকে উন্মুক্ত করবে; পরবর্তী ব্যাংকসংকট ও নীতিগত ব্যর্থতা মন্দাকে আরও গভীর করবে। কিন্তু তার আগে ওয়াল স্ট্রিটে ঘটতে যাচ্ছিল আস্থার নাটকীয় ভাঙন—যেখানে ক্রমাগত লাভের প্রত্যাশা কয়েক দিনের মধ্যে বিক্রির আতঙ্কে বদলে যাবে।
বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও জেমস ওয়াট: কয়লা ও বাষ্পশক্তি কীভাবে শিল্পবিপ্লব বদলে দিয়েছিল?
বস্ত্রশিল্পে যন্ত্রের বিপ্লব: স্পিনিং জেনি, ওয়াটার ফ্রেম ও পাওয়ার লুমের ইতিহাস
কৃষিবিপ্লব থেকে শিল্পবিপ্লব: জমির ঘেরাও, কৃষি প্রযুক্তি ও জনসংখ্যায় ব্রিটেনের রূপান্তর
শিল্পবিপ্লবের সূচনা: অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটেন কেন প্রথম শিল্পায়িত হয়েছিল?
বোরাবোরার নীল লেগুন কীভাবে তৈরি হলো? আগ্নেয় দ্বীপ ও প্রবালপ্রাচীরের ইতিহাস
আল্পস পর্বতমালা কীভাবে তৈরি হয়েছিল? আট দেশের পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস