বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ব্ল্যাক ডেথের উৎপত্তি: এশিয়া থেকে ইউরোপে প্লেগ ছড়ানোর ইতিহাস

সিরিজ: ব্ল্যাক ডেথ: ইউরোপের ভয়াবহ মহামারি

ব্ল্যাক ডেথের উৎপত্তি: এশিয়া থেকে ইউরোপে প্লেগ ছড়ানোর ইতিহাস
এশিয়ার বাণিজ্যপথ ধরে ইউরোপে পৌঁছেছিল মৃত্যুর ছায়া।

১৩৪৭ সালের শরতে সিসিলির মেসিনা বন্দরে বাণিজ্যজাহাজ পৌঁছানোর সঙ্গে এমন এক বিপর্যয়ের ইতিহাস জড়িয়ে যায়, যা কয়েক বছরের মধ্যে ইউরোপের জনজীবন ওলটপালট করে দেয়। জাহাজে অসুস্থ নাবিক ছিলেন, আর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত মানুষের চলাচল সংক্রমণ বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছিল। তবে ব্ল্যাক ডেথের শুরু মেসিনায় হয়নি। ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর আগেই প্লেগ ইউরেশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উপস্থিত ছিল। এর উৎপত্তি বুঝতে তাই ইউরোপের বন্দর থেকে অনেক দূরে মধ্য এশিয়ার পাহাড়ঘেরা জনপদ, প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র এবং আন্তমহাদেশীয় বাণিজ্যসংযোগের দিকে তাকাতে হয়।

ব্ল্যাক ডেথ বলতে সাধারণত চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ প্লেগ মহামারিকে বোঝানো হয়। এর প্রধান জীবাণু ছিল ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস নামের ব্যাকটেরিয়া। ইউরোপের বিভিন্ন সমাধিক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করা মানবদেহাবশেষে এই জীবাণুর প্রাচীন ডিএনএ পাওয়া গেছে। ফলে মহামারির জীবাণু শনাক্ত করার প্রশ্নে শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু জীবাণুটির পরিচয় জানা এবং সেটি ঠিক কোন পথে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পৌঁছেছিল, তা জানা এক বিষয় নয়। দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর এখনো আংশিকভাবে অসম্পূর্ণ।

অনেক দিন ধরে ব্ল্যাক ডেথের উৎপত্তিস্থল হিসেবে চীন, মধ্য এশিয়া কিংবা কৃষ্ণসাগরসংলগ্ন অঞ্চলকে সামনে আনা হয়েছে। মধ্যযুগীয় লেখকেরা প্রায়ই দূরবর্তী পূর্বাঞ্চল থেকে রোগ আসার কথা বলতেন, কিন্তু তাঁদের ভৌগোলিক বর্ণনা সব সময় নির্ভুল ছিল না। চীনে দুর্ভিক্ষ বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিবরণ থাকলেই সেগুলোকে একই প্লেগের নিশ্চিত প্রমাণ বলা যায় না। “ব্ল্যাক ডেথ নিশ্চিতভাবে চীনেই শুরু হয়েছিল”—এমন সরল দাবি প্রমাণের তুলনায় বেশি দৃঢ়। লিখিত ইতিহাসের সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক ও জিনগত তথ্য মিলিয়ে দেখলেই উৎপত্তির প্রশ্নটি পরিষ্কার হতে শুরু করে।

এই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র বর্তমান কিরগিজস্তানের চুই উপত্যকার কারা-জিগাচ ও বুরানা সমাধিক্ষেত্র। অঞ্চলটি ইসিক-কুল হ্রদের পশ্চিমে, তিয়েন শান পর্বতমালার কাছাকাছি অবস্থিত। সেখানে পাওয়া সমাধিফলকে ১৩৩৮ ও ১৩৩৯ সালে অস্বাভাবিক সংখ্যক মৃত্যুর চিহ্ন রয়েছে; কিছু ফলকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে মহামারির উল্লেখও আছে। ইউরোপে ব্যাপক সংক্রমণের কয়েক বছর আগের এই মৃত্যুগুচ্ছ গবেষকদের আগ্রহী করেছিল। তবে শুধু সমাধিলিপি দিয়ে রোগ নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল না। প্রাচীন মানুষের দাঁতের ভেতরে সংরক্ষিত জীবাণুর চিহ্ন সেই সীমাবদ্ধতা কাটানোর সুযোগ দেয়।

২০২২ সালে প্রকাশিত গবেষণায় সংশ্লিষ্ট দেহাবশেষের কয়েকটিতে প্লেগের জীবাণুর ডিএনএ শনাক্ত করা হয়। পুনর্গঠিত জিনোমের সঙ্গে পরবর্তী ব্ল্যাক ডেথের জীবাণুর ঘনিষ্ঠ বংশগত সম্পর্ক পাওয়া যায়। বিশেষ তাৎপর্য ছিল, এই প্রাচীন জীবাণুটি এমন একটি বংশগত অবস্থানে রয়েছে, যেখান থেকে পরবর্তী কয়েকটি প্রধান শাখার উদ্ভব ব্যাখ্যা করা যায়। এতে মধ্য এশিয়াকে ব্ল্যাক ডেথের উৎপত্তির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখার শক্ত প্রমাণ মেলে। কিন্তু এটি প্রথম সংক্রমিত মানুষটির পরিচয় কিংবা একটি নির্দিষ্ট গ্রাম থেকেই সব সংক্রমণ বেরিয়েছিল—এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করে না।

মানুষের মহামারি শুরু হওয়ার আগেও প্লেগের জীবাণু প্রকৃতিতে টিকে থাকতে পারে। কিছু অঞ্চলে বুনো কৃন্তক প্রাণী ও তাদের গায়ের পিসুর মধ্যে জীবাণুর সংক্রমণচক্র বজায় থাকে। মধ্য এশিয়ার পাহাড়ি পরিবেশে মারমটসহ বিভিন্ন প্রাণীর বসতি এমন প্রাকৃতিক আশ্রয় তৈরি করতে পারে। মানুষ যখন শিকার, পশুর চামড়া সংগ্রহ, বসতি সম্প্রসারণ বা পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে এসব পরিবেশের সংস্পর্শে আসে, তখন সংক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়। তবে চতুর্দশ শতকের বিশেষ ঘটনায় কোন প্রাণী থেকে প্রথম মানুষের সংক্রমণ ঘটেছিল, তা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি।

প্লেগের বিস্তারের পরিচিত একটি প্রক্রিয়া হলো সংক্রমিত পিসুর কামড়। আক্রান্ত প্রাণী মারা গেলে পিসু অন্য পোষক খুঁজতে পারে, যার মধ্যে মানুষও পড়ে। মানুষের শরীরে সংক্রমণের পর লসিকাগ্রন্থি ফুলে বেদনাদায়ক গুটি তৈরি হতে পারে; এই রূপকে বিউবোনিক প্লেগ বলা হয়। ফুসফুস আক্রান্ত হলে নিউমোনিক প্লেগের ক্ষেত্রে কাছাকাছি অবস্থানে শ্বাসতন্ত্রের ফোঁটার মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। তবে মধ্যযুগের প্রতিটি শহরে একই বাহক ও একই সংক্রমণপ্রক্রিয়া সমান ভূমিকা রেখেছিল বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। স্থানীয় পরিবেশ, বাসস্থান এবং মানুষের চলাচল ফলাফলে পার্থক্য তৈরি করেছিল।

মধ্য এশিয়ার একটি আঞ্চলিক প্রাদুর্ভাব কীভাবে দূরবর্তী জনপদে পৌঁছাতে পারল, তার ব্যাখ্যায় বাণিজ্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিল্ক রোড কোনো একটিমাত্র রাস্তা ছিল না; এটি ছিল শহর, বাজার, মরুদ্যান, নদীপথ ও কাফেলার পথের বিস্তৃত সংযোগ। রেশমের পাশাপাশি শস্য, কাপড়, চামড়া এবং নানা পণ্য এই ব্যবস্থায় চলাচল করত। পণ্যের সঙ্গে প্রাণী বা পরজীবী স্থানান্তরিত হতে পারত, আবার মানুষও সংক্রমণ বহন করতে পারত। ফলে একটি দূরবর্তী জনপদের রোগ ধাপে ধাপে বৃহত্তর বাণিজ্যব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়েছিল।

মঙ্গোল সাম্রাজ্যের বিস্তার ইউরেশিয়ার বহু অঞ্চলের যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ করেছিল। চতুর্দশ শতকে সাম্রাজ্য একক রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে অটুট না থাকলেও তার উত্তরসূরি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও চলাচল চলছিল। ব্যবসায়ী, সৈন্য, দূত এবং পরিবহনকারীরা এই সংযোগ ব্যবহার করতেন। তবে মধ্য এশিয়া থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত প্লেগের যাত্রাকে একটি অবিচ্ছিন্ন, তারিখসহ প্রমাণিত রেখায় আঁকা যায় না। বাণিজ্যসংযোগ বিস্তারের সম্ভাব্য কাঠামো ব্যাখ্যা করে; প্রতিটি কাফেলা বা প্রতিটি বিরতির পরিচয় দেয় না। এখানে প্রমাণিত উপস্থিতি ও অনুমিত যাত্রাপথের পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।

১৩৪০-এর দশকের মাঝামাঝি কৃষ্ণসাগর ও গোল্ডেন হোর্ডের অধীন অঞ্চলগুলো মহামারির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্রিমিয়ার কাফা, বর্তমান ফেওদোসিয়া, ছিল জেনোয়ীয় বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র। আজভ সাগরের তানা বন্দরও দূরপাল্লার বাণিজ্যে যুক্ত ছিল। এসব বন্দরে স্থলভাগের পণ্য জাহাজে ওঠানো হতো এবং সমুদ্রপথে অন্য বাজারে পাঠানো হতো। ফলে কৃষ্ণসাগর ছিল কেবল একটি জলভাগ নয়, এশীয় স্থলবাণিজ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় নৌবাণিজ্যের সংযোগস্থল। মহামারি এই ব্যবস্থায় প্রবেশ করলে দূরবর্তী বন্দরের মানুষও তার নাগালে চলে আসতে পারত।

কাফার অবরোধ নিয়ে বহুল প্রচলিত একটি বিবরণে বলা হয়, ১৩৪৬ সালে অবরোধকারী বাহিনী প্লেগে মৃত মানুষের দেহ শহরের ভেতরে নিক্ষেপ করেছিল। ইতালীয় লেখক গাব্রিয়েলে দে মুসির রচনায় এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তাঁকে অবরোধের নিশ্চিত প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে গণ্য করা যায় না, এবং বিবরণের যথার্থতা ও সংক্রমণে তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আছে। ঘটনাটি ঘটলেও সেটিই ইউরোপীয় মহামারির একমাত্র কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্ত টেকে না। বন্দর, পণ্য, প্রাণী ও জাহাজের স্বাভাবিক চলাচলও সংক্রমণ বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা।

কৃষ্ণসাগর থেকে বসফরাস হয়ে ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার পথে কনস্টান্টিনোপল ছিল প্রধান কেন্দ্র। ১৩৪৭ সালে সেখানে প্লেগের উপস্থিতি দেখা যায়, পরে ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন বন্দর আক্রান্ত হয়। একই বছরের অক্টোবরে মেসিনায় রোগাক্রান্ত জাহাজ আসার ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে। কিন্তু কাফা থেকে কয়েকটি জাহাজ সরাসরি এসে গোটা ইউরোপে রোগ ছড়িয়ে দিয়েছিল—এমন গল্প বিস্তারের জটিলতা আড়াল করে। বহু জাহাজ, একাধিক বন্দর এবং ধারাবাহিক যাতায়াতের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর ব্যাখ্যা বেশি বাস্তবসম্মত। বাণিজ্যে বাধা কিংবা পণ্য পরিবহন পুনরায় শুরু হওয়াও বিস্তারের সময়কে প্রভাবিত করতে পারত।

বন্দরে পৌঁছানোর পর প্লেগ উপকূলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গুদাম, বাজার ও পরিবহনব্যবস্থা সমুদ্রবন্দরকে দেশের অভ্যন্তরের সঙ্গে যুক্ত করত। ১৩৪৮ সালে ইতালির বিভিন্ন অঞ্চল, ফ্রান্স ও আইবেরীয় উপদ্বীপে মহামারি বিস্তৃত হয়; ইংল্যান্ডও আক্রান্ত হয়। পরবর্তী সময়ে উত্তর ও পূর্ব ইউরোপের আরও অঞ্চলে রোগ পৌঁছায়। ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ উপকূল এবং পূর্বাঞ্চলও বিপর্যস্ত হয়। এই বিস্তার বোঝায়, ব্ল্যাক ডেথ কেবল ইউরোপীয় ঘটনা ছিল না; এটি ছিল পরস্পরসংযুক্ত একাধিক সমাজের দুর্যোগ, যার লিখিত ইতিহাস ইউরোপে তুলনামূলকভাবে বেশি সংরক্ষিত হয়েছে।

ব্ল্যাক ডেথের উৎপত্তির সবচেয়ে শক্ত ব্যাখ্যা তাই কয়েক স্তরের প্রমাণের ওপর দাঁড়ায়: মধ্য এশিয়ায় প্রাচীন জীবাণুর উপস্থিতি, ইউরেশিয়ার বাণিজ্যসংযোগ এবং কৃষ্ণসাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে মহামারির ঐতিহাসিক বিস্তার। কোথাও জিনগত প্রমাণ দৃঢ়, কোথাও যাত্রাপথের পুনর্গঠন এখনো অসম্পূর্ণ। মহামারির ইতিহাস বুঝতে এই অনিশ্চয়তা স্বীকার করাও নির্ভুলতার অংশ। মধ্য এশিয়ার সমাধিফলক থেকে ইউরোপের বন্দর পর্যন্ত ঘটনাগুলো দেখায়, যে যোগাযোগব্যবস্থা মানুষের সম্পদ ও জ্ঞান বাড়িয়েছিল, সেই ব্যবস্থাই অজানা সংক্রমণকে বহু সমাজের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল।