মেকং নদী: ছয় দেশের জীবন, কৃষি ও অর্থনীতিকে যুক্ত করা……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মেকং নদী: ছয় দেশের জীবন, কৃষি ও অর্থনীতিকে যুক্ত করা এশিয়ার মহান জলধারা

মেকং নদী: ছয় দেশের জীবন, কৃষি ও অর্থনীতিকে যুক্ত করা এশিয়ার মহান জলধারা
একই নদীর প্রবাহে বাঁধা ছয় দেশের জীবন ও জীবিকা।

তিব্বতের উঁচু মালভূমি থেকে নেমে আসা মেকং নদী দক্ষিণ চীন সাগরে পৌঁছানোর আগে ছয় দেশের জীবনকে স্পর্শ করে। কোথাও তার প্রবাহ বিদ্যুৎ উৎপাদনের শক্তি, কোথাও মাছ ধরার অবলম্বন, কোথাও ধানখেতের জল। একই নদী সীমান্ত তৈরি করে, বাজারকে যুক্ত করে এবং পলি জমিয়ে নতুন ভূমি গড়ে তোলে। তাই মেকং শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দীর্ঘ নদী নয়; এটি এমন একটি আন্তঃনির্ভর ব্যবস্থা, যেখানে উজানের সিদ্ধান্তের প্রভাব ভাটির খাবার, জীবিকা ও অর্থনীতিতে পৌঁছে যায়।

মেকংয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় চার হাজার নয়শ কিলোমিটার। চীনে এর নাম লানছাং। তিব্বত মালভূমি থেকে ইউনান পেরিয়ে নদীটি মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তবে ছয় দেশের সম্পর্ক মানে প্রতিটির মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত হওয়া নয়। মিয়ানমারের সঙ্গে এর যোগ মূলত সীমান্তসংলগ্ন অংশে; লাওস ও থাইল্যান্ডের মধ্যে দীর্ঘ কিছু অংশে এটি সীমান্ত গঠন করেছে। কম্বোডিয়ার সমভূমি পেরিয়ে ভিয়েতনামে নদীটি বিস্তৃত বদ্বীপ তৈরি করেছে। অবস্থানের এই পার্থক্য দেশগুলোর নদীনির্ভর চাহিদাকেও আলাদা করেছে।

উজানের মেকং পাহাড়ি ও দ্রুতগামী। গভীর গিরিখাত এবং উচ্চতার পার্থক্য সেখানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি করে। ভাটিতে এসে গুরুত্ব বাড়ে প্লাবনভূমি, জলাভূমি ও কৃষিজমির। একটি দেশের কাছে নদীর মূল্য যেখানে বিদ্যুৎ বিক্রির আয়, অন্য দেশের মানুষের কাছে তা মাছের প্রজননক্ষেত্র বা ফসলের পলি। এই ভিন্ন ব্যবহার পরস্পর সম্পর্কিত। উজানে জল ধরে রাখার সময় বদলালে ভাটির প্রবাহের ছন্দ পাল্টাতে পারে; পলি আটকে গেলে বদ্বীপ পর্যন্ত তার প্রভাব পৌঁছায়।

মেকংয়ের বার্ষিক ছন্দের প্রধান ভিত্তি মৌসুমি বৃষ্টি। বর্ষায় মূল নদী ও উপনদীগুলো ফুলে ওঠে, নিচু জমি প্লাবিত হয় এবং জলাভূমির সঙ্গে নদীর সংযোগ বাড়ে। শুষ্ক মৌসুমে জল নেমে চর ও নদীতীরের জমি উন্মুক্ত হয়। তিব্বতের বরফগলা জল ভূমিকা রাখলেও পুরো মেকংকে শুধু বরফগলা নদী ভাবা ভুল। নিম্ন অববাহিকায় মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও উপনদীর জল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নদীর অবস্থা বুঝতে কেবল উৎসের দিকে তাকালে চলে না; পুরো অববাহিকার বৃষ্টির চিত্র দেখতে হয়।

এই নদীর মৌসুমি বন্যা একই সঙ্গে সম্পদ ও ঝুঁকি। স্বাভাবিক প্লাবন জমিতে পলি আনে, মাছকে নতুন খাদ্যক্ষেত্রে পৌঁছে দেয় এবং জলাভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করে। আবার অস্বাভাবিক বন্যায় ঘরবাড়ি ও ফসল নষ্ট হয়। ফলে সব বন্যা ঠেকানোই মেকং ব্যবস্থাপনার একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক প্লাবনের উপকারও ধরে রাখতে হয়। বাঁধ দিয়ে জল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করলে কোনো জমি রক্ষা পেলেও মাছের চলাচল ও পলি জমার সুযোগ কমতে পারে।

কম্বোডিয়ার টনলে সাপ এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ। বিশাল হ্রদটি টনলে সাপ নদীর মাধ্যমে মেকংয়ের সঙ্গে যুক্ত। শুষ্ক মৌসুমে হ্রদের জল মেকংয়ে যায়। বর্ষায় মেকংয়ের জলস্তর যথেষ্ট বেড়ে গেলে সংযোগকারী নদীর প্রবাহ উল্টে হ্রদের দিকে যায়। এতে হ্রদ বিস্তৃত হয় এবং আশপাশের বন ও নিচু জমি ডুবে যায়। পুরো মেকং উল্টো দিকে বয় না; দিক বদলায় নির্দিষ্ট সংযোগকারী নদীটি। এই প্লাবিত অঞ্চল মাছের খাবার সংগ্রহ ও বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

মেকংয়ের মৎস্যসম্পদ লাখ লাখ মানুষের খাবার ও আয়ের সঙ্গে যুক্ত। নদী, হ্রদ, খাল ও প্লাবনভূমি মিলিয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল প্রাকৃতিক মৎস্যব্যবস্থা। মাছ ধরা ছাড়াও শুকানো, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রিতে বহু মানুষ কাজ করেন। অনেক পরিবারের কাছে মাছ দৈনন্দিন প্রাণিজ পুষ্টির সহজলভ্য উৎস। ফলে মাছ কমে গেলে ক্ষতি শুধু জেলের আয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবারের খাবার, স্থানীয় বাজার এবং ছোট ব্যবসাও চাপে পড়ে। এই বিস্তৃত মূল্য সব সময় বড় অবকাঠামোর আর্থিক হিসাবে ধরা পড়ে না।

অনেক মাছ জীবনচক্রে নদীর বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে। প্রজননের জন্য এক জায়গায় যাওয়া, পোনার অন্যত্র বেড়ে ওঠা এবং বর্ষায় প্লাবনভূমিতে খাবার খোঁজা—এসবের জন্য সংযোগ দরকার। বাঁধ বা অন্য প্রতিবন্ধকতা সেই চলাচল ব্যাহত করতে পারে। মাছ পারাপারের ব্যবস্থা কিছু ক্ষেত্রে সাহায্য করলেও বহু প্রজাতির ভিন্ন চাহিদা সামলানো কঠিন। শুধু পূর্ণবয়স্ক মাছ উজানে উঠতে পারলেই সমস্যার সমাধান হয় না; ডিম ও পোনার ভাটিতে নিরাপদে নামার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষিতে মেকং জল সরবরাহের পাশাপাশি পলি বহন করে। ভিয়েতনামের বদ্বীপ ধান, ফল ও জলজ চাষের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। শাখানদী ও খালের জালিকা সেখানে জমি, বসতি ও বাজারকে যুক্ত করেছে। কিন্তু একই এলাকার সব উৎপাদনের চাহিদা এক নয়। ধান ও অনেক ফলের জন্য মিঠাপানি দরকার, অথচ কিছু জলজ চাষ লবণাক্ত পরিবেশ ব্যবহার করে। ফলে কোথায় জল আটকানো হবে বা লবণাক্ত জল ঢুকতে দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তে একদল উপকৃত হলেও অন্যদল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বদ্বীপের আরেকটি সংকট পলির ঘাটতি ও লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ। বাঁধে পলি আটকে যাওয়া এবং অতিরিক্ত বালু উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক ভূমি গঠনের ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে। নদীখাত গভীর হলে লবণাক্ত জল ভেতরে প্রবেশের পরিস্থিতিও বদলায়। এর সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ, জোয়ার ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রতিটি লবণাক্ততার ঘটনাকে শুধু একটি উজানি বাঁধের ফল বলা সঠিক নয়। কার্যকর প্রতিকার পেতে একাধিক কারণ ও তাদের সম্মিলিত প্রভাব বুঝতে হয়।

জলবিদ্যুৎ মেকংয়ের অর্থনীতিতে বড় সুযোগ তৈরি করেছে, বিশেষত চীন ও লাওসে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের চাহিদা মেটাতে এবং প্রতিবেশী বাজারে বিক্রি করতে পারে। তবে আয় ও পরিবেশগত খরচ একই জায়গায় পড়ে না। এক অঞ্চলে বিদ্যুতের সুবিধা তৈরি হলেও অন্য অঞ্চলে মাছ বা পলি কমতে পারে। জলাধার পরিচালনা উপযুক্ত হলে কিছু পরিস্থিতিতে শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ বাড়ানোর সুবিধাও থাকে। তাই প্রতিটি প্রকল্পের অবস্থান, পরিচালনার নিয়ম এবং একাধিক বাঁধের সম্মিলিত প্রভাব বিচার করা জরুরি।

নৌপরিবহনেও মেকং গুরুত্বপূর্ণ, যদিও উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত একটানা বাধাহীন পথ নয়। পাথুরে অংশ, অগভীর জল, জলপ্রপাত ও মৌসুমি পরিবর্তন চলাচল সীমিত করে। নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার জন্য ১৯৯৫ সালে কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম মেকং নদী কমিশন প্রতিষ্ঠা করে; চীন ও মিয়ানমার সংলাপের অংশীদার। তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় এখানে অপরিহার্য। মেকংকে সুস্থ রাখার অর্থ শুধু জল ধরে রাখা নয়; মাছ, পলি, মৌসুমি প্লাবন এবং ছয় দেশের মানুষের জীবিকার সংযোগটিও অক্ষুণ্ণ রাখা।


আপনার পছন্দ হতে পারে