বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ভিকসবার্গ অবরোধ: গ্রান্ট কীভাবে কনফেডারেসিকে দুই ভাগ করেছিলেন?

সিরিজ: আমেরিকার গৃহযুদ্ধ

ভিকসবার্গ অবরোধ: গ্রান্ট কীভাবে কনফেডারেসিকে দুই ভাগ করেছিলেন?
ভিকসবার্গের পতনে মিসিসিপি জয়ের পথ উন্মুক্ত

গেটিসবার্গে লির উত্তর অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পরদিন, ৪ জুলাই ১৮৬৩, পশ্চিমের রণাঙ্গনে কনফেডারেসি আরও গভীর আঘাত পায়। মিসিসিপি নদীর তীরের দুর্গনগরী ভিকসবার্গ ইউলিসিস এস. গ্রান্টের কাছে আত্মসমর্পণ করে। পূর্বে একটি আক্রমণকারী বাহিনী পিছিয়ে যাচ্ছিল; পশ্চিমে একটি সম্পূর্ণ সেনাবাহিনী অস্ত্র নামাচ্ছিল। তবে এই বিজয়ের গুরুত্ব বুঝতে শুধু আত্মসমর্পণের দিন নয়, নদীর ভূগোল এবং কয়েক মাসের ব্যর্থতা কাটিয়ে গ্রান্টের পরিকল্পনা বদলানোর ইতিহাসও দেখতে হবে।

মিসিসিপি ছিল আমেরিকার অভ্যন্তরীণ পরিবহনব্যবস্থার প্রধান ধমনিগুলোর একটি। নদীপথে বিপুল খাদ্য, তুলা, সামরিক সরঞ্জাম ও মানুষ পরিবহন করা যেত। কনফেডারেসির পশ্চিমাঞ্চল—বিশেষত টেক্সাস, আরকানসাস ও লুইজিয়ানার পশ্চিমাংশ—থেকে পূর্বের রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগেও নদী পারাপার গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইউনিয়ন পুরো নদী নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে দক্ষিণের দুই অংশের মধ্যে বড় আকারে সৈন্য ও রসদ স্থানান্তর কঠিন হয়ে পড়ত।

১৮৬২ সালে নিউ অরলিন্স ও মেমফিসসহ গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর ইউনিয়নের হাতে আসে। কিন্তু ভিকসবার্গ এবং আরও দক্ষিণে পোর্ট হাডসন তখনও বাধা হয়ে ছিল। ভিকসবার্গের উঁচু নদীতীরে বসানো কামান নিচ দিয়ে চলা জাহাজকে আঘাত করতে পারত। স্থলভাগে খাড়া ঢাল, গভীর খাত এবং প্রতিরক্ষাব্যূহ আক্রমণ কঠিন করে তুলেছিল। উত্তর দিকের জলাভূমিও বড় বাহিনী নিয়ে সরাসরি এগোনোর পথে বাধা ছিল।

শহরটি দখলের আগের উদ্যোগগুলো সফল হয়নি। ১৮৬২ সালের শেষ দিকে গ্রান্ট উত্তর মিসিসিপি দিয়ে স্থলপথে অগ্রসর হলেও হলি স্প্রিংসে তাঁর সরবরাহঘাঁটি ধ্বংস হওয়ায় অভিযান বাধাগ্রস্ত হয়। একই সময়ে উইলিয়াম টেকামসা শেরম্যানের চিকাসো বায়ু আক্রমণ ব্যর্থ হয়। এরপর খাল কাটা ও বিকল্প জলপথ ব্যবহার করে শহরের কামান এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এসব প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত পথ খুলতে না পারায় গ্রান্টকে অন্য উপায় খুঁজতে হয়।

১৮৬৩ সালের বসন্তে তিনি একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেনাবাহিনী মিসিসিপির পশ্চিম তীর ধরে ভিকসবার্গের দক্ষিণে যাবে; নৌবহর শহরের কামান অতিক্রম করে নিচে পৌঁছাবে; তারপর সৈন্যরা নদী পার হয়ে পূর্বতীরে নামবে। দুর্গের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্মুখভাগে আঘাত করার বদলে তার পেছনের স্থলযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা ছিল নতুন অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।

এই পরিকল্পনায় নৌবাহিনীর ভূমিকা অপরিহার্য ছিল। ১৬ এপ্রিল রাতে ডেভিড ডিক্সন পোর্টারের গানবোট ও পরিবহনজাহাজগুলো ভিকসবার্গের কামানের নিচ দিয়ে এগোয়। তীর থেকে আলো জ্বালিয়ে জাহাজগুলোকে দৃশ্যমান করা হয় এবং গোলাবর্ষণ চলে। ক্ষয়ক্ষতি হলেও অধিকাংশ জাহাজ নিচে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এর ফলে গ্রান্টের বাহিনীকে নদী পার করানো এবং পরবর্তী অভিযানে সহায়তার সুযোগ তৈরি হয়।

প্রথমে গ্র্যান্ড গালফের কাছে পারাপারের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু ২৯ এপ্রিলের নৌগোলাবর্ষণ সেখানকার প্রতিরক্ষা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করতে পারেনি। গ্রান্ট আরও দক্ষিণে যান। ৩০ এপ্রিল ব্রুইন্সবার্গে সৈন্য অবতরণ শুরু হয়, যা পরদিনও চলে। ১ মে পোর্ট গিবসনের যুদ্ধে জয় পাওয়ার পর ইউনিয়ন বাহিনীর পূর্বতীরের অবস্থান নিরাপদ হয়। গ্র্যান্ড গালফের কনফেডারেট অবস্থানও এরপর পরিত্যক্ত হয়।

এখন গ্রান্টের সামনে সিদ্ধান্ত ছিল, সরাসরি ভিকসবার্গে যাবেন, নাকি আগে আশপাশের শত্রুবাহিনী ও যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল করবেন। তিনি স্থলভাগের দিকে দ্রুত এগোনোর পথ নেন। স্থানীয় খাদ্য ও পশুখাদ্য সংগ্রহ করে দীর্ঘ সরবরাহপথের ওপর নির্ভরতা কমান। তবে তাঁর বাহিনী সম্পূর্ণ সরবরাহহীন ছিল না; গোলাবারুদ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা বজায় ছিল। গতিশীলতা বাড়াতে রসদব্যবস্থাকে অভিযানের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই ছিল তাঁর সাফল্য।

কনফেডারেট প্রতিরক্ষার নেতৃত্বে ছিলেন জন সি. পেম্বারটন। তাঁকে ভিকসবার্গ রক্ষা করতে বলা হচ্ছিল, আবার জোসেফ ই. জনস্টনের সঙ্গে মিলিত হয়ে গ্রান্টকে মোকাবিলার চাপও ছিল। শহর আঁকড়ে থাকা ও চলমান অভিযানে বাহিনী ব্যবহার করার মধ্যে এই দ্বন্দ্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ দুর্বল করে। গ্রান্ট সুযোগ পেয়ে দুই কনফেডারেট বাহিনীকে একত্র হওয়ার আগেই পৃথকভাবে মোকাবিলা করেন।

১২ মে রেমন্ডে জয়ের পর গ্রান্ট মিসিসিপির রাজধানী জ্যাকসনের দিকে অগ্রসর হন। ১৪ মে ইউনিয়ন সৈন্যরা শহর দখল করে; জনস্টন তাঁর সীমিত বাহিনী নিয়ে সরে যান। রেলপথ ও সামরিক স্থাপনার ক্ষতি করে গ্রান্ট ভিকসবার্গের পূর্বদিকের যোগাযোগ দুর্বল করেন। এরপর তিনি পশ্চিমে ঘুরে পেম্বারটনের বাহিনীর দিকে এগিয়ে যান। কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর আক্রমণের দিক পরিবর্তন শত্রুকে প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থায় রাখে।

১৬ মে চ্যাম্পিয়ন হিলের যুদ্ধ অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থলসংঘর্ষ হয়ে ওঠে। কঠিন লড়াইয়ের পর পেম্বারটন পরাজিত হয়ে পশ্চিমে পিছিয়ে যান। পরদিন বিগ ব্ল্যাক রিভারের সেতুর কাছে তাঁর পশ্চাদ্রক্ষী বাহিনীও ভেঙে পড়ে। ইউনিয়নের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে না পেরে কনফেডারেট সৈন্যরা ভিকসবার্গের প্রতিরক্ষাব্যূহে আশ্রয় নেয়। গ্রান্ট শহরটিকে বিচ্ছিন্ন করার অবস্থানে পৌঁছে যান।

তবে খোলা মাঠে পরাজিত বাহিনী দুর্গের আড়ালে গিয়ে আবার শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। গ্রান্ট দ্রুত শহর দখলের আশায় ১৯ মে এবং ২২ মে আক্রমণ চালান। খাড়া ঢাল, খাত, গাছের বাধা ও মাটির দুর্গের সামনে ইউনিয়ন সৈন্যদের অগ্রগতি থেমে যায়। বিশেষত দ্বিতীয় আক্রমণে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। গ্রান্ট বুঝতে পারেন, একইভাবে আঘাত চালিয়ে যাওয়ার মূল্য অত্যন্ত বেশি হবে।

এরপর তিনি নিয়মিত অবরোধে মনোযোগ দেন। ইউনিয়ন সৈন্যরা পরিখা ও আচ্ছাদিত পথ খুঁড়ে ধীরে ধীরে কনফেডারেট অবস্থানের কাছে পৌঁছাতে থাকে। স্থলভাগের কামান এবং নদীর নৌবহর গোলাবর্ষণ চালায়। শহরে ঢোকা-বেরোনোর পথ সংকুচিত হয়। ভিকসবার্গের ৪৭ দিনের অবরোধ বলতে সাধারণত ১৮ মে থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত ঘেরাওয়ের সময়কে বোঝানো হয়; সরাসরি আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর অবরোধযুদ্ধ আরও পদ্ধতিগত হয়।

ভিকসবার্গের সৈন্য ও নাগরিকদের জন্য প্রতিদিনের জীবন কঠিন হয়ে ওঠে। গোলা থেকে বাঁচতে অনেকে পাহাড়ের নরম মাটিতে খোঁড়া গুহায় আশ্রয় নেন। খাদ্যের রেশন কমতে থাকে, অসুস্থতা বাড়ে এবং চিকিৎসার সামগ্রী সীমিত হয়ে পড়ে। কিছু মানুষ খচ্চরের মাংস খেতে বাধ্য হন। সব বাসিন্দার অভিজ্ঞতা এক ছিল না, কিন্তু নিরাপদ আশ্রয় ও পর্যাপ্ত খাবারের অভাব শহরের প্রতিরোধক্ষমতা ক্ষয় করছিল।

পরিখার নিচেও যুদ্ধ চলছিল। ইউনিয়ন প্রকৌশলীরা কনফেডারেট প্রতিরক্ষার নিচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বিস্ফোরক বসান। ২৫ জুন একটি বিস্ফোরণে বড় গর্ত তৈরি হলেও তার সুযোগ নিয়ে ঢোকার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এমন ঘটনায় বোঝা যায়, অবরোধ নিছক অপেক্ষা ছিল না। কামান, নিশানাবাজ, সুড়ঙ্গ, পাল্টা খনন এবং ছোট সংঘর্ষে উভয় পক্ষ প্রতিদিন ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ছিল।

শহরের বাইরেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়েছিল। পশ্চিম তীরের মিলিকেনস বেন্ডে ৭ জুনের যুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ ইউনিয়ন সৈন্যরা কঠিন আক্রমণের মুখে লড়াই করেন। পূর্বদিকে জনস্টনের সম্ভাব্য উদ্ধারবাহিনী ঠেকাতে গ্রান্ট অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা গড়ে তোলেন। ইউনিয়নের শক্তিবৃদ্ধির বিপরীতে পেম্বারটন কার্যকর সাহায্য পাননি। অবরুদ্ধ বাহিনী ও বাইরের বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত অভিযান না হওয়ায় মুক্তির সম্ভাবনা ক্রমে কমে যায়।

৩ জুলাই পেম্বারটন আত্মসমর্পণ নিয়ে গ্রান্টের সঙ্গে আলোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত বন্দিদের আনুষ্ঠানিক বিনিময় না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্র না ধরার অঙ্গীকারে মুক্তি দেওয়ার শর্ত নির্ধারিত হয়। ৪ জুলাই প্রায় ২৯ হাজার কনফেডারেট সৈন্য আত্মসমর্পণ করেন। এত বন্দিকে উত্তরে পাঠানোর পরিবর্তে এই ব্যবস্থা গ্রান্টের পরিবহন ও খাদ্য সরবরাহের বোঝাও কমায়। শহর, কামান ও বিপুল সামরিক সরঞ্জাম ইউনিয়নের হাতে আসে।

কিন্তু ওই দিনই পুরো মিসিসিপি নদীর নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হয়নি। দক্ষিণে পোর্ট হাডসন তখনও প্রতিরোধ করছিল। ভিকসবার্গ পতনের সংবাদ পাওয়ার পর সেটিও ৯ জুলাই ন্যাথানিয়েল ব্যাংকসের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। দুই দুর্গের পতন মিলিয়ে ইউনিয়ন নদীর প্রধান চলাচলপথ নিয়ন্ত্রণে আনে। গ্রান্টের বিজয় তাই নৌবাহিনী এবং অন্য ইউনিয়ন বাহিনীর অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হয়েই পূর্ণ কৌশলগত ফল দেয়।

কনফেডারেসিকে ‘দুই ভাগ’ করার অর্থ কোনো অভেদ্য সীমারেখা তৈরি হওয়া নয়। গোপন পারাপার ও সীমিত যোগাযোগ চলতে থাকে। তবে পশ্চিম থেকে পূর্বে বড় আকারে খাদ্য, পশু, সরঞ্জাম ও সৈন্য পাঠানো অত্যন্ত কঠিন হয়। গেটিসবার্গে লির ব্যর্থতার সঙ্গে এই আঘাত যোগ হয়ে ১৮৬৩ সালের জুলাইকে যুদ্ধের মোড় ঘোরানো সময়ে পরিণত করে। গ্রান্টও প্রমাণ করেন, দ্রুত অভিযান ও ধৈর্যশীল অবরোধ একত্রে ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী শত্রুবাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায়—যে সাফল্য তাঁকে আরও বৃহত্তর সামরিক নেতৃত্বের পথে এগিয়ে দেবে।


আপনার পছন্দ হতে পারে