কৃত্রিম মাংস কীভাবে পরীক্ষাগারে তৈরি হয়? কোষ থেকে……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কৃত্রিম মাংস কীভাবে পরীক্ষাগারে তৈরি হয়? কোষ থেকে খাবার তৈরির বিজ্ঞান

কৃত্রিম মাংস কীভাবে পরীক্ষাগারে তৈরি হয়? কোষ থেকে খাবার তৈরির বিজ্ঞান
প্রাণীর কোষ থেকে মাংস তৈরির নতুন প্রযুক্তি।

কৃত্রিম মাংস বলতে আসলে কী বোঝায়

একটি মুরগি বা গরুকে বড় না করেই তার কোষ থেকে খাবারের উপযোগী মাংস তৈরি করা—শুনতে অস্বাভাবিক লাগলেও এর ভিত্তি পরিচিত জীববিজ্ঞান। প্রাণীর শরীরে কোষ বিভাজিত হয়ে সংখ্যা বাড়ায় এবং নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য অর্জন করে টিস্যু গঠন করে। গবেষকেরা শরীরের বাইরেও উপযুক্ত পরিবেশে এই প্রক্রিয়ার কিছু অংশ পরিচালনা করেন।

সাধারণভাবে একে কৃত্রিম মাংস বলা হলেও কোষচাষে উৎপাদিত মাংস কথাটি বেশি নির্ভুল। কারণ এতে প্রাণীর প্রকৃত কোষ ব্যবহার করা হয়। সয়া, মটর বা গমের আমিষ দিয়ে তৈরি উদ্ভিজ্জ মাংসের বিকল্প থেকে এটি আলাদা।

তবে কোষ বাড়িয়ে কিছু জৈব উপাদান তৈরি করা এবং প্রচলিত মাংসের মতো স্বাদ, গন্ধ ও আঁশযুক্ত খাবার বানানো একই কাজ নয়। দ্বিতীয়টি অনেক বেশি জটিল। তাছাড়া প্রযুক্তির সূচনা পরীক্ষাগারে হলেও বড় পরিসরে উৎপাদনের জন্য নিয়ন্ত্রিত খাদ্যকারখানার প্রয়োজন হয়।

প্রাণীর শরীর থেকে উপযুক্ত কোষ সংগ্রহ

প্রক্রিয়ার শুরুতে প্রাণীর শরীর থেকে অল্প টিস্যুর নমুনা নিয়ে উপযুক্ত কোষ আলাদা করা হয়। জীবিত প্রাণী থেকে নমুনা নেওয়া সম্ভব; পদ্ধতিভেদে কোষের উৎসও ভিন্ন হতে পারে। নমুনা সংগ্রহে প্রাণীটিকে জবাই করা আবশ্যক নয়।

পেশি তৈরির ক্ষেত্রে এমন কোষ বেছে নেওয়া যেতে পারে, যেগুলো সংখ্যা বাড়াতে এবং পরে পেশিকোষে পরিণত হতে সক্ষম। চর্বির জন্য ভিন্ন ধরনের কোষও ব্যবহার করা হয়। সব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনপদ্ধতি এক নয়; কোনো পণ্য মূলত কোষের সমষ্টি, আবার কোনোটি নির্দিষ্ট টিস্যুর বৈশিষ্ট্য তৈরির দিকে লক্ষ্য রাখে।

কোষ বেছে নেওয়ার গুরুত্ব

শুধু দ্রুত বাড়লেই কোনো কোষ উপযুক্ত হয়ে যায় না। সেটি দীর্ঘদিন কেমন আচরণ করছে, কী ধরনের উপাদান তৈরি করছে এবং উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে বৈশিষ্ট্য স্থিতিশীল থাকছে কি না—এসব পরীক্ষা করতে হয়।

নির্বাচিত কোষ সংরক্ষণ করে একটি কোষভাণ্ডার তৈরি করা যায়। সেখান থেকে বারবার উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হওয়ায় প্রতিটি চালানের জন্য নতুন প্রাণী থেকে নমুনা নেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে।

কোষচাষ মানেই বংশগত উপাদান সম্পাদনা করা নয়। কিছু পদ্ধতিতে এমন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতে পারে, অন্য পদ্ধতিতে তা প্রয়োজন হয় না।

পুষ্টিদ্রবণ ও নিয়ন্ত্রিত পাত্রে কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি

শরীরের ভেতরে রক্ত কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয় এবং বর্জ্য সরিয়ে নিতে সাহায্য করে। শরীরের বাইরে কোষ বাঁচিয়ে রাখতে এসব কাজের উপযুক্ত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়।

কোষগুলোকে রাখা হয় বিশেষ পুষ্টিদ্রবণে। এতে সাধারণত শক্তির উৎস হিসেবে শর্করা, আমিষ তৈরির উপাদান, ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং কোষের প্রয়োজন অনুযায়ী বৃদ্ধিসংকেত প্রদানকারী উপাদান থাকে। এটি শুধু পানি ও চিনি মেশানো তরল নয়; কোষের ধরন ও উৎপাদনপর্যায় অনুযায়ী এর গঠন বদলাতে পারে।

প্রাণীজ উপাদানের ব্যবহার

ঐতিহ্যগত কোষচাষে প্রাণীর রক্ত থেকে পাওয়া উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু খাদ্য উৎপাদনে খরচ, ধারাবাহিক মান এবং প্রাণীজ উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য সুনির্দিষ্ট গঠনের বিকল্প পুষ্টিদ্রবণ গুরুত্বপূর্ণ। সব পদ্ধতি সম্পূর্ণ প্রাণীজ উপাদানমুক্ত—এমন দাবি করা যায় না।

বড় পাত্রে বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ

প্রথমে অল্প পরিমাণ কোষ ছোট পাত্রে বাড়ানো হয়। পরে ধাপে ধাপে বড় বদ্ধ পাত্রে নেওয়া হয়। এসব পাত্রে তাপমাত্রা, অম্লতা, দ্রবীভূত অক্সিজেন এবং পুষ্টির সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

অনেক প্রাণীকোষ সংবেদনশীল। অতিরিক্ত নাড়াচাড়া বা প্রবাহের চাপ কোষ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আবার যথেষ্ট মেশানো না হলে সব কোষ সমানভাবে অক্সিজেন ও খাবার পায় না। তাই শুধু বড় ট্যাংক বসালেই উৎপাদন বাড়ানো যায় না।

কোষের সমষ্টি থেকে মাংসের গঠন তৈরি

প্রয়োজনীয় সংখ্যায় পৌঁছানোর পর কোষকে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য অর্জনে সহায়তা করা হয়। পুষ্টিদ্রবণের উপাদান ও বৃদ্ধিসংকেত পরিবর্তন করে কিছু কোষকে পেশির বৈশিষ্ট্য বা চর্বি জমার বৈশিষ্ট্য বিকাশের দিকে নেওয়া যেতে পারে।

প্রচলিত মাংস কেবল পেশিকোষের স্তূপ নয়। এতে পেশিতন্তু, চর্বি, সংযোজক টিস্যু এবং জটিল ত্রিমাত্রিক বিন্যাস থাকে। কামড়ানোর অনুভূতি, রসালতা ও রান্নার সময় আচরণ এই গঠনের ওপর নির্ভর করে।

সহায়ক কাঠামোর ভূমিকা

কিছু পদ্ধতিতে কোষকে আটকে বৃদ্ধি পেতে এবং নির্দিষ্ট দিকে সাজতে একটি সূক্ষ্ম সহায়ক কাঠামো ব্যবহার করা হয়। ভক্ষণযোগ্য উপাদানে তৈরি হলে সেটি শেষ পণ্যের অংশ হতে পারে। অন্য ক্ষেত্রে উৎপাদন শেষে কাঠামো থেকে কোষ আলাদা করার প্রয়োজন হয়।

এখানে বড় সমস্যা হলো টিস্যুর গভীরে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছানো। প্রাণীর শরীরে রক্তনালি এই কাজ করে। পরীক্ষাগারে মোটা টিস্যু তৈরি করলে ভেতরের কোষ পর্যাপ্ত সরবরাহ না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ কারণে কিমার মতো বিচ্ছিন্ন গঠনের উপাদান তৈরি করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে; বড়, মোটা ও আঁশযুক্ত মাংসের টুকরা তৈরি করা কঠিন। পেশি ও চর্বির সঠিক অনুপাত এবং বিন্যাস অর্জনেও আলাদা কাজ প্রয়োজন।

সংগ্রহ, খাবার প্রস্তুত ও নিরাপত্তা যাচাই

কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছালে কোষ বা টিস্যু সংগ্রহ করা হয়। উৎপাদনপদ্ধতি অনুযায়ী অবশিষ্ট পুষ্টিদ্রবণ সরানো, ধোয়া এবং পরবর্তী প্রক্রিয়াকরণ করা হতে পারে। এরপর সেটিকে রান্নার উপযোগী খাবারে রূপ দেওয়া হয়।

কিছু পণ্যে কোষচাষের উপাদানের সঙ্গে উদ্ভিজ্জ আমিষ, তেল, মসলা বা গঠন তৈরির অন্য উপাদান মেশানো সম্ভব। ফলে পরীক্ষাগারে উৎপন্ন সব মাংস একই ধরনের বা একই অনুপাতে প্রাণীকোষসমৃদ্ধ হবে না।

পরিচ্ছন্ন পরিবেশ মানেই ঝুঁকিমুক্ত নয়

পুষ্টিসমৃদ্ধ দ্রবণে অনাকাঙ্ক্ষিত জীবাণুও বাড়তে পারে। তাই কোষের উৎস, সংরক্ষণ, পুষ্টিদ্রবণ, যন্ত্রপাতি এবং সংগ্রহের প্রতিটি ধাপে দূষণ প্রতিরোধ দরকার। উৎপাদনের উপাদান থেকে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অবশিষ্টাংশ থাকছে কি না, সেটিও মূল্যায়নের বিষয়।

পুষ্টিমানও পরীক্ষা করতে হয়। প্রাণীর কোষ ব্যবহার করলেই প্রচলিত মাংসের সমপরিমাণ লোহা, ভিটামিন বা অন্য পুষ্টি থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। চূড়ান্ত গঠন ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া ফলাফলকে প্রভাবিত করে।

একইভাবে সংশ্লিষ্ট প্রাণীজ আমিষে অ্যালার্জি থাকলে কোষচাষের পণ্য নিরাপদ ধরে নেওয়া উচিত নয়। নিরাপত্তা বিচার করতে হয় নির্দিষ্ট পণ্য ও তার উৎপাদনপদ্ধতি অনুযায়ী।

সম্ভাবনা বড় হলেও সীমাবদ্ধতা কেন রয়ে গেছে

এই প্রযুক্তি প্রাণীর সম্পূর্ণ শরীর বড় করার পরিবর্তে খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় কোষ উৎপাদনের সুযোগ দেয়। এতে প্রাণীর ব্যবহার এবং কিছু প্রচলিত উৎপাদনব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনাকে বাস্তব সুবিধায় পরিণত করতে অর্থনৈতিক ও কারিগরি বাধা পেরোতে হবে।

পুষ্টিদ্রবণ, বৃদ্ধিসংকেতের উপাদান, পরিচ্ছন্ন উৎপাদনব্যবস্থা এবং ধারাবাহিক মান পরীক্ষা ব্যয়বহুল হতে পারে। পরীক্ষাগারে ছোট পরিমাণে সফল হওয়া মানেই বড় কারখানায় সাশ্রয়ী দামে একই মান বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে—এমন নয়।

পরিবেশগত সুবিধাও শর্তসাপেক্ষ

কোষচাষে উৎপাদিত মাংসের পরিবেশগত প্রভাব নির্ভর করে বিদ্যুতের উৎস, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টিদ্রবণ তৈরির প্রক্রিয়া এবং কারখানার দক্ষতার ওপর। উৎপাদন শক্তিনির্ভর হতে পারে। তাই সব পরিস্থিতিতে সব ধরনের প্রচলিত মাংসের চেয়ে এটি পরিবেশবান্ধব—এমন সরল সিদ্ধান্ত যথাযথ নয়।

কৃত্রিম মাংসের মূল বিজ্ঞান হলো জীবন্ত কোষকে শরীরের বাইরে উপযুক্ত পরিবেশে বাড়িয়ে খাদ্যোপযোগী উপাদান তৈরি করা। ভবিষ্যতে এর গুরুত্ব নির্ধারিত হবে শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যে নয়; নিরাপত্তা, স্বাদ, পুষ্টিমান, উৎপাদনব্যয় এবং মানুষের গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয়ে।


আপনার পছন্দ হতে পারে