১৯২৯ সালের ওয়াল স্ট্রিট ধস: ব্ল্যাক থার্সডে থেকে ব্ল্যাক টিউসডের ইতিহাস
সিরিজ: মহামন্দা (১৯২৯): বিশ্ব অর্থনীতির বিপর্যয়
ওয়াল স্ট্রিটে কয়েক দিনের আতঙ্কে ভেঙে পড়েছিল সীমাহীন সমৃদ্ধির বিশ্বাস।
সীমাহীন লাভের প্রত্যাশা যে বিক্রির আতঙ্কে বদলে যেতে পারে, ১৯২৯ সালের শরতে ওয়াল স্ট্রিট তার নির্মম উদাহরণ হয়ে উঠল। ঋণনির্ভর সমৃদ্ধির ওপর দাঁড়ানো বাজারে এত দিন দাম বাড়াকে স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু ক্রেতারা যখন সন্দেহ করতে শুরু করলেন, পরের মানুষটি আর বেশি দাম দেবেন কি না, তখন সেই আত্মবিশ্বাস দ্রুত দুর্বল হয়ে গেল। অক্টোবরের ধস কোনো এক দিনের দুর্ঘটনা ছিল না; কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতা তিনটি ভয়াবহ লেনদেনের দিনে বিস্ফোরিত হয়েছিল। ২৪ অক্টোবর ব্ল্যাক থার্সডে, ২৮ অক্টোবর ব্ল্যাক মানডে এবং ২৯ অক্টোবর ব্ল্যাক টিউসডে হয়ে ওঠে সেই বিপর্যয়ের স্থায়ী নাম।
এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৯ ডাও জোন্স শিল্পসূচক প্রায় ৩৮১.১৭ পয়েন্টে পৌঁছেছিল। এই সূচক নির্বাচিত বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর অনুসরণ করত; গোটা বাজারের প্রতিটি শেয়ারের অবস্থা বোঝাত না। তবু আমেরিকার ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ছিল এটি। সেপ্টেম্বর থেকে বাজারে ওঠানামা বাড়ে এবং সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে দর নামতে থাকে। অন্যদিকে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও দুর্বলতা দেখা দিচ্ছিল। অর্থনীতির মন্দাগতি শেয়ারবাজারের অক্টোবরের বিপর্যয়ের আগেই শুরু হয়েছিল, যদিও অনেক বিনিয়োগকারী তখনো দরপতনকে সাময়িক সংশোধন বলে ধরে নিয়েছিলেন।
বাজারকে বিশেষভাবে বিপজ্জনক করেছিল ধার করা অর্থে শেয়ার কেনার ব্যবস্থা। বিনিয়োগকারী নিজের পুঁজির সঙ্গে দালালের দেওয়া ঋণ যোগ করে শেয়ার কিনতেন। দাম বাড়লে লাভ বড় হতো, কিন্তু দাম কমলে জামানতের মূল্যও কমত। তখন দালাল অতিরিক্ত নগদ অর্থ বা জামানত চাইতেন—যাকে বলা হতো মার্জিন কল। বিনিয়োগকারী সেই অর্থ দিতে না পারলে তাঁর শেয়ার বিক্রি করা যেত। ফলে দরপতন শুরু হলে অনেকের সামনে অপেক্ষা করার সুযোগ থাকত না। ঋণের শর্ত পূরণ করতে বাধ্যতামূলক বিক্রি বাজারের পতনকে আরও ত্বরান্বিত করত।
অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ২৩ অক্টোবরের বড় দরপতন পরের দিনের জন্য বাজারকে অস্থির করে তোলে। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের কাছে অতিরিক্ত জামানতের দাবি পৌঁছাতে থাকে, আর দালালি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল বিক্রির নির্দেশ পেতে থাকে। কেউ লাভের অবশিষ্ট অংশ বাঁচাতে চাইছিলেন, কেউ ঋণ শোধ করতে বাধ্য হচ্ছিলেন, আবার কেউ অন্যদের বিক্রি দেখে ভয় পাচ্ছিলেন। এসব সিদ্ধান্ত একত্র হয়ে এমন চাপ তৈরি করে, যার বিপরীতে আগের দামে পর্যাপ্ত ক্রেতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
২৪ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, বাজার খোলার পরই বিপুল বিক্রির ঢেউ নামে। বহু শেয়ারের দর দ্রুত কমতে থাকে এবং লেনদেনের পরিমাণ স্বাভাবিক সক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়। সেদিন প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ শেয়ার হাতবদল হয়। তবে এই সংখ্যাকে একই পরিমাণ মানুষের বিক্রি বা সব লেনদেনের ক্ষতি হিসেবে বোঝা যাবে না; একই শেয়ার একাধিকবারও কেনাবেচা হতে পারত। মূল বিষয় ছিল বিক্রির তীব্র চাপ। ওয়াল স্ট্রিটের বাইরে ভিড় জমে, আর দেশের বিভিন্ন শহরের দালালি প্রতিষ্ঠানে মানুষ উদ্বিগ্নভাবে দর জানতে অপেক্ষা করতে থাকেন।
আতঙ্ক বাড়িয়েছিল তথ্য পৌঁছানোর বিলম্ব। তখন শেয়ারের সর্বশেষ দর জানানো হতো টিকার যন্ত্রের সরু কাগজের ফিতায়। বিপুল লেনদেনের সঙ্গে তাল রাখতে না পেরে সেই ব্যবস্থা পিছিয়ে পড়ে। বিনিয়োগকারী যে দর দেখছিলেন, বাস্তব বাজার ততক্ষণে তার অনেক নিচে নেমে যেতে পারত। টেলিফোনে যোগাযোগও চাপের মুখে পড়ে। ফলে অনেকে জানতেন না তাঁদের নির্দেশ কার্যকর হয়েছে কি না কিংবা শেয়ারের বর্তমান মূল্য কত। দামের অনিশ্চয়তার সঙ্গে তথ্যের অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে আতঙ্ককে আরও গভীর করে।
সেদিন বাজার স্থিতিশীল করতে প্রভাবশালী ব্যাংকাররা উদ্যোগ নেন। জে. পি. মরগান অ্যান্ড কোম্পানির কার্যালয়ে বৈঠকের পর বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সমর্থনমূলক কেনাকাটার ব্যবস্থা করেন। নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের সহসভাপতি রিচার্ড হুইটনি প্রকাশ্যে ইউএস স্টিলসহ গুরুত্বপূর্ণ শেয়ারে ক্রয়াদেশ দেন। উদ্দেশ্য ছিল বাজারকে দেখানো, শক্তিশালী ক্রেতারা এখনো উপস্থিত আছেন। এই পদক্ষেপে দিনের মধ্যে আস্থা কিছুটা ফেরে এবং সকালের বড় পতনের অনেকটা পুষিয়ে যায়। তাই ব্ল্যাক থার্সডের গুরুত্ব শুধু দিনের শেষ সূচকে নয়, দিনের ভেতরের আতঙ্ক ও নজিরবিহীন চাপেও নিহিত।
২৫ ও ২৬ অক্টোবর বাজারে তুলনামূলক স্থিরতা দেখা দিলেও বিপদ কাটেনি। তখন শনিবারও সংক্ষিপ্ত সময় শেয়ার লেনদেন হতো। ব্যাংকারদের উদ্যোগ সাময়িক আশ্বাস দিয়েছিল, কিন্তু ঋণগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর লোকসান বা অতিরিক্ত জামানতের প্রয়োজন মুছে দেয়নি। সপ্তাহান্তে অনেকে নিজেদের হিসাব পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন, আরও দরপতন সহ্য করার সামর্থ্য তাঁদের নেই। কেউ শেয়ার বিক্রি করে নগদে ফিরতে চান, আবার সম্ভাব্য ক্রেতারা আরও কম দামের অপেক্ষায় সরে দাঁড়ান। এই অবস্থায় সামান্য স্থিরতাও স্থায়ী পুনরুদ্ধারে পরিণত হতে পারেনি।
২৮ অক্টোবর, সোমবার, বিক্রির চাপ নতুন তীব্রতা নিয়ে ফিরে আসে। ডাও জোন্স শিল্পসূচক এক দিনে প্রায় ১২.৮ শতাংশ কমে ২৬০.৬৪ পয়েন্টে নেমে যায়। দিনটি পরিচিত হয় ব্ল্যাক মানডে নামে। বৃহস্পতিবারের উদ্ধার উদ্যোগ যে বাজারের আস্থা স্থায়ীভাবে ফিরিয়ে আনতে পারেনি, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্রেতারা দর কমার অপেক্ষা করতে থাকলে বিক্রেতাদের আরও নিচে নামতে হয়। অন্যদিকে জামানতের ঘাটতি পূরণের দাবি আরও বিক্রি ডেকে আনে। ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর যুক্তিসংগত আত্মরক্ষার চেষ্টা সামগ্রিকভাবে বাজারের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে দাঁড়ায়।
পরদিন ২৯ অক্টোবর, মঙ্গলবার, আতঙ্ক চূড়ায় পৌঁছে। নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ শেয়ার হাতবদল হয়—তৎকালীন রেকর্ড। ডাও আরও প্রায় ১১.৭ শতাংশ কমে ২৩০.০৭ পয়েন্টে নামে। এই ব্ল্যাক টিউসডেতে বহু শেয়ারের বিপরীতে প্রত্যাশিত দামে ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছিল না। পরপর দুই দিনে সূচকের সম্মিলিত পতন হয় প্রায় ২৩ শতাংশ। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির শেয়ারও বিক্রির চাপে পড়ে, কারণ বিনিয়োগকারীদের তখন ভালো সম্পদ ধরে রাখার চেয়ে নগদ অর্থ জোগাড় করা বেশি জরুরি হয়ে উঠেছিল।
ধসের ক্ষতি শুধু কাগজে লেখা দর কমার ঘটনা ছিল না। নিজস্ব সঞ্চয়ে শেয়ার কেনা মানুষ সম্পদ হারান; ঋণ নিয়ে কেনা মানুষের ক্ষেত্রে নিজের পুঁজি মুছে যাওয়ার পরও দেনা থেকে যেতে পারত। বিনিয়োগ তহবিল ও পরস্পরের সঙ্গে আর্থিকভাবে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান অন্যদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। তবে বাজারমূল্য কমার অর্থ সেই সমপরিমাণ নগদ অর্থ কোথাও গিয়ে জমা হওয়া নয়। সম্পদের সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ভেঙে পড়েছিল, যার প্রভাব পড়ে মানুষের ব্যয়, ঋণ নেওয়ার সামর্থ্য এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যাশায়।
আমেরিকার সব পরিবার সরাসরি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করত না, কিন্তু আস্থার এই ভাঙন তাদের জীবনেও পৌঁছাতে থাকে। সম্পদ হারানো পরিবার বড় কেনাকাটা পিছিয়ে দেয়। ব্যবসায়ীরা বিক্রি কমার আশঙ্কায় সম্প্রসারণ ও যন্ত্রপাতি কেনার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন। নতুন শেয়ার ছেড়ে পুঁজি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। শেয়ারের জামানতে দেওয়া ঋণও ঝুঁকিপূর্ণ হয়। তবে অক্টোবরেই আমেরিকার সব ব্যাংক ধসে পড়েনি; পরবর্তী বছরগুলোর ব্যাংক আতঙ্ক, ঋণসংকোচন ও মূল্যপতন ছিল সংকট গভীর হওয়ার পৃথক, গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।
ব্ল্যাক টিউসডেও বাজারের চূড়ান্ত তলানি ছিল না। সাময়িক উত্থান ও নতুন পতনের মধ্য দিয়ে ১৯৩২ সালের জুলাইয়ে ডাও প্রায় ৪১.২২ পয়েন্টে নামে—১৯২৯ সালের সর্বোচ্চ অবস্থানের প্রায় ৮৯ শতাংশ নিচে। তাই কয়েক দিনের নাটকীয় বিপর্যয় এবং বহু বছরের মহামন্দাকে এক ঘটনা হিসেবে দেখা ভুল। ওয়াল স্ট্রিটের ধস দুর্বল অর্থনীতিতে আঘাত করেছিল; পরবর্তী আর্থিক সংকট ও নীতিগত ব্যর্থতা সেই আঘাতকে দীর্ঘ বিপর্যয়ে রূপ দেয়। এখন প্রশ্ন ছিল, বাজারের দরপতন কীভাবে ব্যাংকের আমানত, কারখানার উৎপাদন ও মানুষের চাকরিকে গ্রাস করবে—এবং কেন সাধারণ একটি মন্দা ঠেকানোর বদলে সংকট আরও গভীর হবে।
বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও জেমস ওয়াট: কয়লা ও বাষ্পশক্তি কীভাবে শিল্পবিপ্লব বদলে দিয়েছিল?
বস্ত্রশিল্পে যন্ত্রের বিপ্লব: স্পিনিং জেনি, ওয়াটার ফ্রেম ও পাওয়ার লুমের ইতিহাস
কৃষিবিপ্লব থেকে শিল্পবিপ্লব: জমির ঘেরাও, কৃষি প্রযুক্তি ও জনসংখ্যায় ব্রিটেনের রূপান্তর
শিল্পবিপ্লবের সূচনা: অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটেন কেন প্রথম শিল্পায়িত হয়েছিল?
বোরাবোরার নীল লেগুন কীভাবে তৈরি হলো? আগ্নেয় দ্বীপ ও প্রবালপ্রাচীরের ইতিহাস
আল্পস পর্বতমালা কীভাবে তৈরি হয়েছিল? আট দেশের পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস