ব্যাবিলনের হাম্মুরাবি রাজবংশ: আইন, সাম্রাজ্য ও ক্ষমতার ইতিহাস
সিরিজ: রাজবংশের উত্থান-পতন: ক্ষমতা, গৌরব ও পতনের ইতিহাস
হাম্মুরাবির ব্যাবিলন—আইন, রাজনীতি ও সাম্রাজ্য নির্মাণের ইতিহাস।
হাম্মুরাবির নাম শুনলেই সাধারণত একটি কালো পাথরের স্তম্ভ এবং ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতির কথা মনে পড়ে। কিন্তু তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব শুধু শাস্তির বিধানে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন এক শাসক, যিনি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ্যে বিভক্ত মেসোপটেমিয়ায় যুদ্ধ, জোট ও প্রশাসনের সাহায্যে ব্যাবিলনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর আইনসংহিতাও সেই ক্ষমতার বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ। হাম্মুরাবি ব্যাবিলনের প্রথম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এর ষষ্ঠ রাজা এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী শাসক। তাঁর সাফল্য একটি তুলনামূলক ছোট রাজ্যকে অঞ্চলের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে।
ব্যাবিলনের প্রথম রাজবংশের সূচনা প্রচলিত মধ্য কালপঞ্জি অনুযায়ী আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৮৯৪ সালে সুমু-আবুমের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে প্রাথমিক শাসকদের সঙ্গে ব্যাবিলন নগরের সম্পর্ক এবং রাজবংশের গঠনের কিছু দিক নিয়ে গবেষণাগত আলোচনা রয়েছে। রাজপরিবারটি আমোরীয় উৎসের ছিল। আমোরীয় পরিচয় পশ্চিমের সেমিটিক ভাষাভাষী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত; তাদের সবাইকে একক যাযাবর জাতি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। মেসোপটেমিয়ায় আমোরীয় শাসকেরা স্থানীয় নগরজীবন, আক্কাদীয় ভাষা, মন্দির ও প্রশাসনিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে যান। ব্যাবিলনের রাজশক্তিও এই অভিযোজনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়।
হাম্মুরাবি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৭৯২ সালে পিতা সিন-মুবাল্লিতের পর সিংহাসনে বসেন এবং ১৭৫০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। এই তারিখগুলো মধ্য কালপঞ্জিনির্ভর; বিকল্প কালপঞ্জিতে পার্থক্য রয়েছে। তাঁর রাজত্বের শুরুতে ব্যাবিলন সর্বশক্তিমান ছিল না। দক্ষিণে লারসার রিম-সিন, পূর্বদিকে এশনুন্না, ইউফ্রেটিসের উজানে মারি এবং আরও দূরে এলাম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল। উত্তরেও শামশি-আদাদের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রভাব ছিল। ফলে হাম্মুরাবিকে প্রথমে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়েছে। তাঁর পরবর্তী বিজয়গুলো বুঝতে এই দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্ব গুরুত্বপূর্ণ।
রাজত্বের প্রথম দিকে হাম্মুরাবি নগরপ্রাচীর, মন্দির ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নে মনোযোগ দেন। মেসোপটেমিয়ায় খাল শুধু কৃষির অবকাঠামো ছিল না; খাদ্য, রাজস্ব ও জনবসতি নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিও ছিল। জমিতে পানি পৌঁছানো, খালের পলি সরানো এবং বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণে সংগঠিত শ্রম দরকার হতো। রাজা এসব কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করে নিজের কর্তৃত্বকে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতেন। কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং সেনাবাহিনী চালানোর সামর্থ্য একই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই হাম্মুরাবির সাম্রাজ্য নির্মাণের ভিত্তি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও, সেচখাল ও শস্যভান্ডারে তৈরি হয়েছিল।
তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল পরিস্থিতিনির্ভর। মারির রাজা জিমরি-লিমের সঙ্গে তিনি সহযোগিতা করেন; মারির সংরক্ষিত পত্রাবলি থেকে জোট, দূতাবাস ও পারস্পরিক সন্দেহের জটিল চিত্র পাওয়া যায়। এলামীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পর হাম্মুরাবি নিজের অবস্থান শক্ত করেন। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৭৬৩ সালে তিনি লারসার রিম-সিনকে পরাজিত করেন। এর ফলে দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার সমৃদ্ধ কৃষিভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ নগর তাঁর নিয়ন্ত্রণে আসে। এই বিজয় ছিল মোড় ঘোরানো ঘটনা: ব্যাবিলন তখন আঞ্চলিক প্রতিযোগী থেকে বৃহত্তর সাম্রাজ্যিক শক্তিতে পরিণত হয়।
এরপর এশনুন্না ও মারির বিরুদ্ধে অভিযান তাঁর আধিপত্য আরও বিস্তৃত করে। একসময়ের সহযোগী জিমরি-লিমের রাজ্যও ব্যাবিলনের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি; মারি দখলের পর এর প্রাসাদ ধ্বংস করা হয়। এই পরিবর্তন দেখায়, প্রাচীন কূটনৈতিক জোট স্থায়ী বন্ধুত্বের নিশ্চয়তা ছিল না। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পরাজিত হলে আগের মিত্র নতুন বাধা হয়ে উঠতে পারত। তবে হাম্মুরাবির রাজকীয় দাবিকে আধুনিক মানচিত্রে সর্বত্র সমান নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখানো উচিত নয়। কোনো অঞ্চলে সরাসরি প্রশাসন, কোথাও আনুগত্য এবং কোথাও সাময়িক সামরিক প্রাধান্য—কর্তৃত্বের ধরন ভিন্ন হতে পারত।
এই বিস্তৃত রাজ্য পরিচালনায় কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসক, বিচারক ও লিপিকরদের ভূমিকা অপরিহার্য ছিল। রাজকীয় চিঠিতে জমি, শ্রম, সেচ এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্ব নিয়ে হাম্মুরাবির হস্তক্ষেপ দেখা যায়। লিখিত চুক্তি ও হিসাব প্রশাসনকে সহায়তা করত। কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ নতুন আমলাতন্ত্র সৃষ্টি করেননি; আগের সুমেরীয় ও আক্কাদীয় শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছিলেন। স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বজায় রেখেই রাজকীয় তদারকি বাড়ানো হয়। এর ফলে বিজিত অঞ্চলের সম্পদ কেন্দ্রে আনা সম্ভব হলেও কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, বিরোধ ও স্থানীয় প্রতিরোধ সামলানোর প্রয়োজন থেকেই যায়।
হাম্মুরাবির আইনসংহিতা তাঁর রাজত্বের শেষভাগের সবচেয়ে বিখ্যাত স্মারক। আধুনিক গণনায় এতে ২৮২টি বিধান চিহ্নিত করা হয়, যদিও স্তম্ভের কিছু অংশ মুছে যাওয়ায় অন্য অনুলিপি থেকে পাঠ উদ্ধার করতে হয়েছে। প্রস্তাবনা ও উপসংহারে রাজাকে দেবতাদের অনুমোদিত ন্যায়রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওপরের খোদাইয়ে তিনি শামাশের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তবে এটি পৃথিবীর প্রথম আইনসংহিতা নয়; উর-নাম্মু ও লিপিত-ইশতারের মতো শাসকদের সঙ্গে যুক্ত আগের আইনসংকলন রয়েছে। হাম্মুরাবির সংকলনের বিশেষত্ব তার বিস্তৃতি, সংরক্ষণ এবং রাজকীয় ন্যায়বিচারের সুস্পষ্ট আদর্শে।
বিধানগুলোতে হত্যা বা আঘাতের পাশাপাশি ঋণ, সুদ, জমি ইজারা, বাণিজ্য, মজুরি, বিবাহ, উত্তরাধিকার ও দাসত্বের বিষয় রয়েছে। খাল রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলার কারণে অন্যের জমি প্লাবিত হলে ক্ষতিপূরণের বিধান কৃষিনির্ভর সমাজের বাস্তব উদ্বেগ দেখায়। নির্মাতার ত্রুটিতে বাড়ি ধসে মৃত্যুর ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি পেশাগত দায়বদ্ধতার ধারণা প্রকাশ করে। মিথ্যা অভিযোগ ও সাক্ষ্যের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা ছিল। তবু একে আধুনিক রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীণ বিধিবদ্ধ আইনবই ভাবা ঠিক নয়। আদালতে সংকলনটি ঠিক কীভাবে ব্যবহৃত হতো, তা নিয়ে বিতর্ক আছে; বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রথা, দলিল ও সাক্ষ্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আইনসংহিতার ন্যায়বিচার সামাজিক সমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। আওয়িলুম, মুশকেনুম ও দাস পরিচয়ের মানুষের ক্ষেত্রে অধিকার এবং শাস্তির পার্থক্য দেখা যায়; প্রথম দুটি শ্রেণির সুনির্দিষ্ট সামাজিক অর্থ সব ক্ষেত্রে সহজ নয়। একই আঘাতের জন্য কখনো প্রতিশোধমূলক শাস্তি, কখনো অর্থদণ্ড নির্ধারিত ছিল। নারীর সম্পত্তি ও বিবাহসংক্রান্ত কিছু সুরক্ষা থাকলেও সমাজ ছিল পিতৃতান্ত্রিক। ‘চোখের বদলে চোখ’ সমগ্র সংকলনের একমাত্র নীতি ছিল না, এবং সেটিও সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য ছিল না। আইনগুলো ন্যায়রক্ষার পাশাপাশি বিদ্যমান সামাজিক স্তরবিন্যাসও সংরক্ষণ করত।
হাম্মুরাবির মৃত্যুর পর পুত্র সামসু-ইলুনা বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার পান, কিন্তু দ্রুত গুরুতর বিদ্রোহের মুখোমুখি হন। দক্ষিণের বহু নগর ব্যাবিলনের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে ওঠে; রিম-সিন দ্বিতীয়ের মতো দাবিদারও আবির্ভূত হন। বিদ্রোহ দমন সত্ত্বেও দক্ষিণের বড় অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয় এবং সমুদ্রভূমি বা সিল্যান্ডের স্বাধীন শক্তি গড়ে ওঠে। যুদ্ধ, সেচব্যবস্থার সমস্যা ও বসতির পরিবর্তন কিছু অঞ্চলের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে। এখানেই রাজবংশ ও সাম্রাজ্যের পার্থক্য স্পষ্ট: হাম্মুরাবির বিস্তৃত সাম্রাজ্য দ্রুত সংকুচিত হলেও তাঁর রাজবংশ সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায়নি।
পরবর্তী রাজারা ছোট ভূখণ্ড নিয়ে আরও প্রায় দেড় শতাব্দী শাসন করেন। শেষ রাজা সামসু-দিতানার সময় হিত্তিতি রাজা প্রথম মুরশিলি ব্যাবিলনে অভিযান চালিয়ে নগর লুণ্ঠন করেন। মধ্য কালপঞ্জিতে ঘটনাটি খ্রিস্টপূর্ব ১৫৯৫ সালে স্থাপিত, যদিও বিকল্প তারিখও আছে। প্রথম রাজবংশের অবসানের পর শেষ পর্যন্ত কাসসীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু হাম্মুরাবির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার টিকে থাকে। তাঁর আইনস্তম্ভ বহু পরে এলামীয়রা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে সুসায় নিয়ে যায়, যেখানে আধুনিক যুগে সেটি আবিষ্কৃত হয়। সামরিক বিজয়ের সীমানা মুছে গেলেও লিখিত ন্যায়, রাজকীয় কর্তৃত্ব ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর রেখে যাওয়া দলিল প্রাচীন রাষ্ট্রকে বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জানালা হয়ে আছে।
ব্ল্যাক ডেথের বিস্তার: ১৩৪৭–১৩৫৩ সালে ইউরোপে কোটি মানুষের মৃত্যু
কাফা অবরোধ ও ব্ল্যাক ডেথ: ১৩৪৭ সালে জাহাজে ইউরোপে প্লেগের প্রবেশ
ব্ল্যাক ডেথের উৎপত্তি: এশিয়া থেকে ইউরোপে প্লেগ ছড়ানোর ইতিহাস
আমেরিকার গৃহযুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য, নারী ও সাধারণ মানুষের ভূমিকা
ভিকসবার্গ অবরোধ: গ্রান্ট কীভাবে কনফেডারেসিকে দুই ভাগ করেছিলেন?
গেটিসবার্গের যুদ্ধ: তিন দিনের লড়াইয়ে রবার্ট ই. লি কেন পরাজিত হন?