চাঁদ না থাকলে পৃথিবী কেমন হতো? জোয়ারভাটা, দিনরাত ও জীবনের বদলে যাওয়া গল্প
চাঁদের অনুপস্থিতিতে বদলে যেত পৃথিবীর বহু পরিচিত ছন্দ।
রাতের আকাশে চাঁদ না থাকলে পৃথিবী শুধু পূর্ণিমার সৌন্দর্য হারাত না; বদলে যেত সমুদ্রের ছন্দ, অনেক প্রাণীর আচরণ এবং আমাদের গ্রহের দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাস। পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহটি নিজের আলো তৈরি করে না, তবু সূর্যের প্রতিফলিত আলো ও মহাকর্ষের মাধ্যমে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু চাঁদহীন পৃথিবী কি সম্পূর্ণ অন্ধকার, বিপর্যস্ত কিংবা প্রাণহীন হয়ে যেত? উত্তরটি এত সরল নয়। কিছু পরিবর্তন নিশ্চিতভাবে অনুমান করা যায়, আবার কিছু বিষয় নির্ভর করে পৃথিবীর অতীত ও দীর্ঘমেয়াদি গতিবিদ্যার ওপর।
প্রথমেই দুটি পরিস্থিতি আলাদা করা জরুরি। পৃথিবীর জন্মের পর কখনো চাঁদ তৈরি না হওয়া এবং আজকের চাঁদ হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া এক ঘটনা নয়। প্রথম ক্ষেত্রে শতকোটি বছর ধরে পৃথিবীর বিকাশ অন্য পথে চলত। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বর্তমান পৃথিবীর কিছু বৈশিষ্ট্য দ্রুত বদলালেও অন্যগুলো দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তিত হতো। এখানে হঠাৎ অদৃশ্য হওয়ার কথাটি একটি কল্পিত পরিস্থিতি, যেখানে চাঁদের ধ্বংসাবশেষের কোনো প্রভাব নেই। চাঁদ ভেঙে পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন।
সবচেয়ে প্রত্যক্ষ পরিবর্তন ঘটত জোয়ারভাটায়। চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর কাছের অংশ, কেন্দ্র এবং দূরের অংশকে সমানভাবে টানে না। এই আকর্ষণের পার্থক্য জোয়ার সৃষ্টিকারী বল তৈরি করে। পৃথিবীর ঘূর্ণন, সমুদ্রের গভীরতা ও উপকূলের আকৃতির সঙ্গে মিলিত হয়ে তা জলের নিয়মিত ওঠানামা ঘটায়। চাঁদ হারিয়ে গেলে এই ব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি বাদ পড়ত। তবে কোনো উপকূলে পরিবর্তন কতটা হবে, তা শুধু চাঁদের আকর্ষণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না; স্থানীয় সমুদ্রখাত ও উপসাগরের গঠনও গুরুত্বপূর্ণ।
চাঁদ না থাকলেও জোয়ারভাটা পুরোপুরি বন্ধ হতো না, কারণ সূর্যও জোয়ার সৃষ্টিকারী বল প্রয়োগ করে। সূর্যের ভর বিপুল হলেও দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় তার এই প্রভাব চাঁদের তুলনায় দুর্বল। ফলে সৌর জোয়ারভাটা থেকে যেত, কিন্তু বর্তমানের পরিচিত চন্দ্রনির্ভর ছন্দ হারিয়ে যেত। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় সূর্য ও চাঁদের সম্মিলিত প্রভাবে জোয়ারভাটার পার্থক্য বাড়ার ঘটনাও থাকত না। তবে সব বন্দরের জোয়ার একই অনুপাতে কমে যাবে—এমন হিসাব সঠিক নয়।
এর প্রভাব পড়ত উপকূলীয় জীবনে। জোয়ারের জল ম্যানগ্রোভ বন, মোহনা ও কাদাময় চরে পলি, পুষ্টি এবং লবণ বহন করে। ভাটায় উন্মুক্ত মাটিতে খাবার খোঁজে কাঁকড়া ও নানা প্রাণী; তাদের ওপর নির্ভর করে পাখি ও মাছ। জোয়ারভাটা দুর্বল হলে এসব পরিবেশের জলাবদ্ধতার সময় ও লবণাক্ততা বদলাতে পারত। তবে সুন্দরবনের মতো বন সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যেত বলা যায় না। নদীর প্রবাহ, বৃষ্টি, ভূমির উচ্চতা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের অবস্থানও তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করত।
গভীর সমুদ্রেও পরিবর্তন আসত। অসমতল তলদেশের ওপর দিয়ে জোয়ারজনিত স্রোত চললে সমুদ্রের ভেতরে ঢেউ সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন স্তরের জলের মিশ্রণে শক্তি জোগায়। চাঁদ না থাকলে এই শক্তির সরবরাহ কমত, ফলে তাপ ও পুষ্টির পরিবহন বদলাতে পারত। কিন্তু সমুদ্রের সব স্রোত থেমে যেত না। বাতাস, তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পার্থক্য এবং পৃথিবীর ঘূর্ণন তখনো কাজ করত। সমুদ্রের পরিবর্তিত আচরণ জলবায়ুকে প্রভাবিত করতে পারত, তবে তার সুনির্দিষ্ট চিত্র জানতে জটিল গণনাভিত্তিক বিশ্লেষণ দরকার।
দিনের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে চাঁদের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবী অতীতে বর্তমানের তুলনায় দ্রুত ঘুরত। দীর্ঘ সময় ধরে চাঁদজনিত জোয়ার ও সংশ্লিষ্ট শক্তিক্ষয় পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর করতে সাহায্য করেছে। এই প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর ঘূর্ণন থেকে কৌণিক ভরবেগ চাঁদের কক্ষপথে স্থানান্তরিত হয় এবং চাঁদ ধীরে দূরে সরে যায়। চাঁদ কখনো না থাকলে এই ইতিহাস ভিন্ন হতো; আজকের দিন সম্ভবত ছোট হতে পারত। কিন্তু দিন অবশ্যই ছয় বা আট ঘণ্টার হতো বলা যায় না, কারণ প্রাথমিক ঘূর্ণন ও অন্যান্য প্রভাবও বিবেচ্য।
অন্যদিকে, আজ চাঁদ অদৃশ্য হয়ে গেলে আগামীকালই দিন ছোট হয়ে যেত না। পৃথিবী তার বর্তমান ঘূর্ণন বজায় রাখত; কেবল চাঁদজনিত দীর্ঘমেয়াদি ধীর হওয়ার প্রধান প্রভাবটি থাকত না। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরাও বন্ধ করত না। সূর্যের মহাকর্ষ ও পৃথিবীর গতিই সেই কক্ষপথের প্রধান নিয়ামক। একইভাবে চাঁদ না থাকলে মানুষের ওজন নাটকীয়ভাবে বদলে যাওয়া বা বায়ুমণ্ডল উড়ে যাওয়ার কারণ নেই। পৃথিবীর নিজস্ব ভরই পৃষ্ঠের মাধ্যাকর্ষণের প্রধান উৎস।
ঋতুর প্রশ্নটি কিছুটা জটিল। পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ কক্ষপথের লম্ব দিক থেকে প্রায় সাড়ে তেইশ ডিগ্রি হেলে আছে। এই হেলনের কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে দুই গোলার্ধে সূর্যালোকের বণ্টন বদলায়। চাঁদ অক্ষের দীর্ঘমেয়াদি আচরণকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। তার অনুপস্থিতিতে হেলনের পরিবর্তন বেশি হতে পারত, যা ঋতুর তীব্রতা, বরফের বিস্তার ও বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করত। তবে চাঁদ হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ঋতু বন্ধ হতো না; বর্তমান হেলন থাকলে ঋতুও চলত।
চাঁদ ছাড়া পৃথিবীর অক্ষ অবধারিতভাবে উল্টে যেত—এমন বক্তব্যও অতিরঞ্জিত। গবেষণায় দেখা যায়, চাঁদহীন পৃথিবীর হেলনের পরিবর্তন নির্ভর করে প্রাথমিক অবস্থা, ঘূর্ণনের গতি এবং অন্য গ্রহের প্রভাবের ওপর। কিছু পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় পরিবর্তন তুলনামূলক সীমিত থাকতে পারে। তাই চাঁদ পৃথিবীর স্থিতিশীলতায় সাহায্য করে বলা যথার্থ, কিন্তু চাঁদ ছাড়া বাসযোগ্য পরিবেশ অসম্ভব বলা যায় না। সম্ভাব্য বড় পরিবর্তনগুলোও দৈনন্দিন সময়ে নয়, অনেক দীর্ঘ সময়ের পরিসরে বিবেচনা করতে হয়।
রাতের পরিবর্তন অবশ্য দ্রুত বোঝা যেত। থাকত না পূর্ণিমার আলো কিংবা চাঁদের কলার সঙ্গে রাতের উজ্জ্বলতার ওঠানামা। আলোকদূষণহীন অঞ্চলে ক্ষীণ নক্ষত্র ও আকাশগঙ্গা দেখা সহজ হতো। নিশাচর প্রাণীর জন্যও পরিবেশ বদলাত। কোনো শিকারি আলোতে সুবিধা পায়, আবার কোনো শিকার অন্ধকারে নিরাপদ থাকে। কিছু সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজনন চন্দ্রচক্র ও জোয়ারের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাদের পরিচিত সংকেত হারিয়ে গেলে আচরণে বিঘ্ন ঘটতে পারত, যদিও সব প্রজাতির প্রতিক্রিয়া এক হতো না।
মানুষের সংস্কৃতিতেও চাঁদের অনুপস্থিতি গভীর ছাপ ফেলত। চাঁদের কলাভিত্তিক মাস গণনা, বহু উৎসব এবং সাহিত্যিক কল্পনা অন্যভাবে গড়ে উঠত। থাকত না চন্দ্রগ্রহণ কিংবা চাঁদের কারণে সূর্যগ্রহণ। তবে জীবন আদৌ জন্মাত কি না, তার নিশ্চিত উত্তর নেই। চাঁদ পৃথিবীর পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে, কিন্তু জীবনের একমাত্র অপরিহার্য শর্ত হিসেবে তার উপস্থিতি প্রমাণিত নয়। চাঁদহীন পৃথিবী তাই অবধারিত মৃত গ্রহ নয়; বরং ভিন্ন সমুদ্র, অন্ধকার রাত ও অন্যরকম প্রাকৃতিক ইতিহাসের একটি সম্ভাব্য পৃথিবী।
মহাবিশ্ব কোথায় প্রসারিত হচ্ছে? স্থান, সীমানা ও মহাবিস্ফোরণের সহজ ব্যাখ্যা
ধূমকেতুর লেজ সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে কেন? ধুলো ও গ্যাসের লেজের বিজ্ঞান
গ্রহগুলো কেন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে? মহাকর্ষ ও কক্ষপথের সহজ বিজ্ঞান
মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখতে কেমন? নীল গ্রহের রং, আলো ও বিস্ময়
মঙ্গল গ্রহকে লাল গ্রহ বলা হয় কেন? লাল ধুলো ও লোহার খনিজের রহস্য
অ্যাপোলো ১১-এর প্রত্যাবর্তন: চাঁদ থেকে পৃথিবীতে ফেরার ইতিহাস