আমেরিকার গৃহযুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য, নারী ও সাধারণ মানুষের ভূমিকা
সিরিজ: আমেরিকার গৃহযুদ্ধ
যুদ্ধক্ষেত্র ও তার বাইরে স্বাধীনতার সংগ্রাম
ভিকসবার্গের পতন গ্রান্টের সামরিক নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, কিন্তু সেই বিজয়ের চারপাশে আরেকটি সংগ্রাম চলছিল। ইউনিয়ন বাহিনীর অগ্রযাত্রার সঙ্গে দাসত্বে আবদ্ধ মানুষ বাগান ও খামার ছেড়ে বেরিয়ে আসছিলেন। কেউ সৈন্য হচ্ছিলেন, কেউ পথ দেখাচ্ছিলেন, কেউ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। গৃহযুদ্ধের ইতিহাস তাই শুধু সেনাপতিদের পরিকল্পনা ও দুর্গ দখলের ইতিহাস নয়; স্বাধীনতা অর্জন এবং ধ্বংসের মধ্যে বেঁচে থাকার ইতিহাসও।
যুদ্ধ শুরু হলে বহু মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ ইউনিয়ন বাহিনীতে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ জনমতের বিরোধিতা ও সরকারি দ্বিধার কারণে সেনাবাহিনীতে তাঁদের গ্রহণ শুরুতে সীমিত ছিল। নৌবাহিনীতে কৃষ্ণাঙ্গ নাবিকের পূর্ববর্তী উপস্থিতি থাকলেও স্থলবাহিনীর নিয়োগনীতি বদলাতে সময় লাগে। ফ্রেডেরিক ডগলাসের মতো নেতারা যুক্তি দেন, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে দেশের জন্য যুদ্ধ করার অধিকার দিতে হবে; সামরিক সেবা নাগরিকত্বের দাবিকেও শক্তিশালী করবে।
১৮৬২ সালে কিছু কৃষ্ণাঙ্গ ইউনিট গঠন শুরু হয়। ১ জানুয়ারি ১৮৬৩-এর মুক্তির ঘোষণা নিয়োগ সম্প্রসারণের সরকারি ভিত্তি আরও স্পষ্ট করে। একই বছরের ২২ মে যুদ্ধ মন্ত্রণালয় কৃষ্ণাঙ্গ সেনা ইউনিটগুলোর সংগঠন তদারকির জন্য বিশেষ ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করে। এসব রেজিমেন্টের বড় অংশ পরিচিত হয় ইউনাইটেড স্টেটস কালার্ড ট্রুপস, সংক্ষেপে ইউএসসিটি নামে। কিছু রাজ্যভিত্তিক রেজিমেন্ট অবশ্য নিজেদের পুরোনো পরিচয় ধরে রাখে।
যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত ইউনিয়ন স্থলবাহিনীতে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ সেবা দেন; নৌবাহিনীতেও প্রায় ১৯ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ নাবিক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উত্তরে জন্ম নেওয়া মুক্ত মানুষ, সীমান্তরাজ্যের বাসিন্দা এবং দক্ষিণ থেকে দাসত্ব ছেড়ে আসা মানুষ ছিলেন। সবার অভিজ্ঞতা এক ছিল না। কারও উদ্দেশ্য পরিবারকে মুক্ত করা, কারও নিজের স্বাধীনতা রক্ষা, আবার কারও কাছে যুদ্ধ ছিল সমান নাগরিক মর্যাদা আদায়ের পথ।
সামরিক পোশাক পরলেও বৈষম্য শেষ হয়নি। কৃষ্ণাঙ্গ রেজিমেন্টের অধিকাংশ কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন শ্বেতাঙ্গ। কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যদের প্রায়ই দুর্গ নির্মাণ, মালপত্র বহন ও অন্যান্য শ্রমসাধ্য কাজে বেশি ব্যবহার করা হতো। শুরুতে তাঁদের মাসিক বেতন নির্ধারিত ছিল ১০ ডলার, যার মধ্যে পোশাক বাবদ ৩ ডলার কাটা হতো; শ্বেতাঙ্গ সাধারণ সৈন্য পেতেন ১৩ ডলার এবং পৃথক পোশাকভাতা। একই ঝুঁকি নিয়েও সমান পারিশ্রমিক মিলছিল না।
এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সৈন্যরা প্রতিবাদ করেন। ৫৪তম ম্যাসাচুসেটস রেজিমেন্টের সদস্যরা অসম বেতন গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন, যদিও এতে তাঁদের পরিবার আর্থিক কষ্টে পড়ে। ১৮৬৪ সালে কংগ্রেস সমবেতনের ব্যবস্থা করে; পূর্ববর্তী সময়ের বকেয়া পাওয়ার শর্ত ও বাস্তবায়ন নিয়ে আরও জটিলতা ছিল। তাঁদের সংগ্রাম দেখায়, ইউনিয়নের হয়ে যুদ্ধ করা এবং ইউনিয়নের ভেতরে ন্যায্য অধিকার দাবি করা পাশাপাশি চলছিল।
কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে বর্ণবাদী সন্দেহ যুদ্ধক্ষেত্রে বারবার ভুল প্রমাণিত হয়। পোর্ট হাডসন ও মিলিকেনস বেন্ডে তাঁরা কঠিন লড়াই করেন। ১৮ জুলাই ১৮৬৩ ফোর্ট ওয়াগনারে ৫৪তম ম্যাসাচুসেটসের আক্রমণ বিশেষভাবে আলোচিত হয়। দুর্গ দখল সম্ভব হয়নি এবং কর্নেল রবার্ট গুল্ড শসহ বহু সৈন্য হতাহত হন। কিন্তু তাঁদের দৃঢ়তা কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যদের ভূমিকা সম্পর্কে উত্তরের জনমত বদলাতে সাহায্য করে।
বন্দি হওয়ার ঝুঁকিও তাঁদের জন্য আলাদা ছিল। কনফেডারেট কর্তৃপক্ষ কৃষ্ণাঙ্গ ইউনিয়ন সৈন্যদের সবসময় স্বীকৃত যুদ্ধবন্দি হিসেবে মানতে প্রস্তুত ছিল না। তাঁদের হত্যা কিংবা আবার দাসত্বে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা থাকত। ১৮৬৪ সালের ফোর্ট পিলো হত্যাকাণ্ডে বিপুলসংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য নিহত হওয়া এই বিপদকে প্রকট করে। তাই তাঁদের কাছে পরাজয়ের অর্থ শুধু বন্দিত্ব নয়; অর্জিত স্বাধীনতা ও জীবন দুটিই হারানো।
অস্ত্র না ধরেও কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ যুদ্ধের গতিপথে ভূমিকা রাখেন। তাঁরা নদীর নাবিক, পথপ্রদর্শক, রাঁধুনি, কামার, গাড়িচালক ও গোয়েন্দা তথ্যের উৎস হিসেবে কাজ করেন। রবার্ট স্মলস ১৮৬২ সালে চার্লস্টন থেকে কনফেডারেট পরিবহনজাহাজ প্ল্যান্টার নিয়ে ইউনিয়ন নৌবহরের কাছে পৌঁছান, সঙ্গে নিজের ও অন্যদের পরিবারকে নিরাপদে আনেন। স্থানীয় জ্ঞান ও সাহস কীভাবে সামরিক সম্পদে পরিণত হয়েছিল, এটি তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
দাসত্ব থেকে পালিয়ে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ইউনিয়ন ঘাঁটির কাছে আশ্রয়শিবির গড়ে ওঠে। তাঁদের অনেককে তৎকালীন সামরিক ভাষায় কনট্রাব্যান্ড বলা হতো। এই শ্রেণিবিভাগ কিছু মানুষের মালিকের কাছে প্রত্যর্পণ ঠেকালেও পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেনি। শিবিরে পৌঁছানো মানেই নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ জীবন পাওয়া ছিল না। কাজের অনিশ্চয়তা, বেতন না পাওয়া, অপ্রতুল খাদ্য এবং বর্ণবাদী আচরণ নতুন দুর্ভোগ সৃষ্টি করত।
অতিরিক্ত ভিড়, দূষিত পানি, অপর্যাপ্ত আশ্রয় ও চিকিৎসার অভাবে এসব শিবিরে রোগ ছড়াত। শিশু ও বৃদ্ধদের অবস্থা বিশেষভাবে দুর্বল ছিল। কেউ পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে একা পৌঁছাতেন, কেউ জানতেন না স্বামী, স্ত্রী বা সন্তান বেঁচে আছেন কি না। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাই জমি, বাসস্থান, মজুরি ও পরিবার পুনর্মিলনের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আইনগত পরিবর্তনের পাশাপাশি দৈনন্দিন বেঁচে থাকার ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
নারীরা এই সংকটে শুধু পরিচর্যাকারী ছিলেন না; তাঁরা তথ্য সংগ্রহ, আশ্রয় সংগঠন, শিক্ষা ও মুক্তির অভিযানেও সক্রিয় ছিলেন। হ্যারিয়েট টাবম্যান ইউনিয়নের জন্য গোয়েন্দা ও পথপ্রদর্শকের কাজ করেন। ১৮৬৩ সালের জুনে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার কম্বাহি নদী অভিযানে তাঁর তথ্য ও দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অভিযানে সাত শতাধিক দাসত্বে আবদ্ধ মানুষ মুক্তির সুযোগ পান। স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ তথ্যদাতাদের সহযোগিতাও এই সাফল্যের অংশ ছিল।
হ্যারিয়েট জ্যাকবস শরণার্থীদের ত্রাণ ও শিক্ষার কাজে যুক্ত হন। সুজি কিং টেলর কৃষ্ণাঙ্গ ইউনিয়ন সৈন্যদের সঙ্গে থেকে পরিচর্যা ও শিক্ষাদানে ভূমিকা রাখেন। কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা কাপড় ধোয়া, রান্না ও সেবার পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনা এবং পরিবারের আয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করতেন। তাঁদের অনেক কাজ আনুষ্ঠানিক সামরিক পদ বা নিয়মিত পারিশ্রমিকের স্বীকৃতি পায়নি, ফলে পরবর্তী স্মৃতিচর্চায় অবদানও সহজে আড়াল হয়েছে।
শ্বেতাঙ্গ নারীদের মধ্যেও যুদ্ধকালীন সংগঠনের বিস্তার ঘটে। ডরোথিয়া ডিক্স ইউনিয়নের নারী নার্স নিয়োগ তদারক করেন। ক্লারা বার্টন আহতদের কাছে চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানো ও সেবায় পরিচিত হন। স্থানীয় সহায়তা সমিতিগুলো পোশাক, ব্যান্ডেজ, খাবার ও অর্থ সংগ্রহ করত। ইউএস স্যানিটারি কমিশনের মতো সংগঠন হাসপাতাল ও শিবিরের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত করার চেষ্টা করে। এসব কাজে নারীদের সংগঠন ও জনপরিসরে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ে।
দক্ষিণের নারীরাও হাসপাতাল, খামার, ব্যবসা এবং পরিবারের দায়িত্ব সামলান। কিন্তু তাঁদের অভিজ্ঞতা শ্রেণি ও দাসপ্রথার অবস্থানের ওপর নির্ভর করত। বাগানমালিক পরিবারের নারী ও দরিদ্র কৃষকের স্ত্রীর সমস্যা এক ছিল না। খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি ও সরবরাহসংকট দরিদ্র পরিবারকে বিপন্ন করে। ১৮৬৩ সালের রিচমন্ডের রুটি দাঙ্গায় নারীদের অংশগ্রহণ দেখায়, দক্ষিণের জনসমাজে কনফেডারেট যুদ্ধনীতির প্রতি সমর্থন সর্বসম্মত বা সীমাহীন ছিল না।
যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয় সৈন্যদের ক্ষেত্রেও শুধু গুলিবিদ্ধ হওয়ায় সীমাবদ্ধ ছিল না। আমাশয়, টাইফয়েড ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ বিপুল মৃত্যু ঘটায়। অস্বাস্থ্যকর শিবির, পুষ্টির ঘাটতি এবং চিকিৎসাজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতি খারাপ করত। অঙ্গচ্ছেদ অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচানোর প্রচেষ্টা হলেও বেঁচে যাওয়া সৈন্যদের দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা নিয়ে ফিরতে হতো। পরিবারগুলোকে সেই পরিচর্যা ও হারানো উপার্জনের বোঝা বহন করতে হয়।
যুদ্ধবন্দি শিবিরে ভিড়, খাদ্যসংকট ও অব্যবস্থাপনাও বিপর্যয় ডেকে আনে। দক্ষিণের অ্যান্ডারসনভিল এবং উত্তরের এলমিরা শিবিরের মৃত্যুহার এই অন্ধকার অধ্যায়ের উদাহরণ। বেসামরিক অঞ্চলে ফসল ও পশু বাজেয়াপ্ত, বাড়িঘর ধ্বংস এবং বাস্তুচ্যুতি দুর্ভোগ বাড়ায়। উত্তরে ১৮৬৩ সালের নিউইয়র্কের সেনা নিয়োগবিরোধী দাঙ্গা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের ওপর বর্ণবাদী সহিংসতায় রূপ নেয়। ইউনিয়নের ভূখণ্ডেও কৃষ্ণাঙ্গ পরিবার নিরাপত্তাহীন ছিল।
এই মানুষদের অভিজ্ঞতা গৃহযুদ্ধের অর্থ বদলে দেয়। কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যরা স্বাধীনতার দাবি হাতে অস্ত্র নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন; নারীরা সামরিক ও সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা সচল রাখেন; শরণার্থীরা নিজেদের মুক্তির জন্য ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে যান। তাঁরা ইতিহাসের নিষ্ক্রিয় দর্শক ছিলেন না। কিন্তু যুদ্ধ যত দক্ষিণের অভ্যন্তরে অগ্রসর হচ্ছিল, সামরিক লক্ষ্য ও বেসামরিক জীবনের ব্যবধান তত সংকুচিত হচ্ছিল—গ্রান্টের অবিরাম অভিযান এবং শেরম্যানের অগ্রযাত্রা সেই বাস্তবতাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলনের সূচনা: কোয়েকার, আলোকায়ন ও মানবাধিকারের লড়াই
আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের ইতিহাস: আফ্রিকার বন্দি মানুষ ও আমেরিকার দাসশ্রমের অর্থনীতি
দাসপ্রথার উৎপত্তি ও বিস্তার: প্রাচীন মিশর, গ্রিস ও রোম থেকে আধুনিক যুগ
আলোকায়ন যুগের উত্তরাধিকার: আমেরিকার স্বাধীনতা, ফরাসি বিপ্লব ও আধুনিক গণতন্ত্র
আলোকিত স্বৈরতন্ত্র: ফ্রেডেরিক, ক্যাথরিন, জোসেফ ও অধিকার নিয়ে আলোকায়নের বিতর্ক
অ্যাডাম স্মিথ ও ইমানুয়েল কান্ট: মুক্তবাজার, নৈতিকতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার দর্শন