মহামন্দায় আমেরিকার জনজীবন: বেকারত্ব, হুভারভিল ও ডাস্ট বোলের বিপর্যয়
সিরিজ: মহামন্দা (১৯২৯): বিশ্ব অর্থনীতির বিপর্যয়
কাজহীন শহর থেকে ধুলিঝড়ে বিধ্বস্ত খামার—মহামন্দায় বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
ব্যাংক বন্ধ হওয়া, সঞ্চয় আটকে যাওয়া এবং ঋণের পথ সংকুচিত হওয়ার পরে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তার সবচেয়ে তীব্র প্রকাশ দেখা যায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। অর্থনৈতিক পতন তখন আর শুধু শেয়ারসূচক বা ব্যাংকের হিসাব ছিল না। তা হয়ে উঠেছিল সকালে কাজ খুঁজতে বেরিয়ে খালি হাতে ফেরা, বাড়িভাড়া দিতে না পারা এবং সন্তানের খাবার কমিয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা। মহামন্দা মানুষের আয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তা, আত্মসম্মান ও ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাসকেও আঘাত করেছিল। শহরের শিল্পশ্রমিক, গ্রামের কৃষক কিংবা ছোট দোকানদার—ভিন্ন পথে বিপদে পড়লেও তাঁদের সংকট পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
১৯৩৩ সালে প্রচলিত হিসাবে আমেরিকার শ্রমশক্তির প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেকার ছিল। কিন্তু এই সংখ্যাও দুর্দশার পুরো চিত্র দেয় না। যাঁদের চাকরি টিকে ছিল, তাঁদের অনেকের কর্মঘণ্টা ও মজুরি কমে যায়। পূর্ণ সপ্তাহের পরিবর্তে কয়েক দিনের কাজ পাওয়া পরিবার চালানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। মোটরগাড়ি, ইস্পাত, নির্মাণ ও অন্যান্য শিল্পে উৎপাদন কমায় শ্রমিক ছাঁটাই হয়। কাজ করার ইচ্ছা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কাজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ব্যক্তিগত ব্যর্থতার ধারণা দিয়ে এই ব্যাপক বেকারত্ব ব্যাখ্যা করা সম্ভব ছিল না।
চাকরি হারানোর পরে সঞ্চয় শেষ হতে খুব বেশি সময় লাগত না। প্রথমে পরিবার নতুন পোশাক, বিনোদন ও বড় কেনাকাটা বন্ধ করত। এরপর চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া, কম দামের খাবার কেনা এবং আত্মীয়ের কাছে সাহায্য চাওয়ার পালা আসত। কিস্তিতে কেনা জিনিস ফেরত নেওয়া হতে পারত; ভাড়া বাকি পড়লে উচ্ছেদের আশঙ্কা তৈরি হতো। অনেক পরিবার আলাদা বাসা ছেড়ে আত্মীয়ের সঙ্গে থাকতে শুরু করে। একই ঘরে বেশি মানুষ থাকা খরচ কমালেও গোপনীয়তা, স্বাস্থ্য ও সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়াত। অর্থনৈতিক বিপর্যয় এভাবেই ঘরের ভেতরের জীবন বদলে দেয়।
খাদ্যসংকটের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য ছিল দাতব্য রান্নাঘর ও রুটি বিতরণের দীর্ঘ সারি। গির্জা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিনা মূল্যে খাবার দিত। সেখানে দাঁড়ানো অনেকেই আগে নিয়মিত উপার্জন করতেন এবং অন্যকে সাহায্য করতেন। এখন তাঁদের নিজের জন্য সাহায্য চাইতে হচ্ছিল। দেশে খাদ্য উৎপাদনের সামর্থ্য থাকা এবং প্রত্যেকের খাবার কেনার সামর্থ্য থাকা এক বিষয় নয়। কৃষিপণ্যের দাম কমলেও বেকার মানুষের কাছে সেই কম দামও নাগালের বাইরে থাকতে পারত। অপুষ্টি বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য গুরুতর উদ্বেগ হয়ে ওঠে।
প্রথম দিকে ত্রাণের বড় দায় ছিল স্থানীয় সরকার ও বেসরকারি দানের ওপর। কিন্তু বেকারত্ব বাড়ার সঙ্গে সাহায্যের চাহিদা বেড়ে যায়, অথচ কর আদায় ও দানের সামর্থ্য কমে। কোথাও ত্রাণ পেতে বসবাসের প্রমাণ বা কঠোর যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে হতো। সাহায্য পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাই সব শহর বা জনগোষ্ঠীর জন্য সমান ছিল না। ১৯৩৩ সালের পরে ফেডারেল ত্রাণ ও কর্মসংস্থান কর্মসূচি পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করলেও অভাব সঙ্গে সঙ্গে দূর হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারগুলো আনুষ্ঠানিক সাহায্য, আত্মীয়তা ও প্রতিবেশীর সহযোগিতা মিলিয়ে টিকে ছিল।
বাসস্থান হারানো মানুষের কেউ কেউ শহরের খালি জমি, নদীর পাড় বা আবর্জনা ফেলার জায়গায় অস্থায়ী ঘর বানান। কাঠের বাক্স, পুরোনো টিন, পিচবোর্ড ও পরিত্যক্ত উপকরণে তৈরি এসব বসতির অনেকগুলোকে বলা হতো হুভারভিল। প্রেসিডেন্ট হারবার্ট হুভারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই নামটির প্রচলন হয়। তবে সব বসতি একই আকারের বা একই ধরনের ছিল না। কিছু জায়গায় দীর্ঘস্থায়ী সম্প্রদায় গড়ে ওঠে, অন্যগুলো দ্রুত উচ্ছেদ হয়। নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন ও শীতের সুরক্ষা প্রায়ই অপর্যাপ্ত ছিল। তবু বাসিন্দারা নিজেদের মধ্যে নিয়ম, সাহায্য ও সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করতেন।
পরিবারের ভেতরেও ভূমিকা বদলাতে থাকে। উপার্জনকারী পুরুষের চাকরি হারানো তখনকার সামাজিক প্রত্যাশায় আত্মসম্মানের বড় আঘাত হয়ে দাঁড়াত। কেউ কাজের সন্ধানে অন্য শহরে যান, ফলে পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়। নারীরা ঘরের সীমিত সম্পদ সামলানোর পাশাপাশি গৃহকর্ম, সেলাই বা অন্য কাজে আয়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু বিবাহিত নারীর চাকরির বিরুদ্ধে বৈষম্যও ছিল; তাঁদের বিরুদ্ধে পুরুষের কাজ কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠত। শিশু ও কিশোরেরা কখনো পড়াশোনা ছেড়ে আয় করতে বাধ্য হয়। মহামন্দার বোঝা শুধু চাকরিহারা ব্যক্তির নয়, পুরো পরিবারের ওপর পড়েছিল।
এই দুর্দশা সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকেরা আগে থেকেই বৈষম্যের শিকার ছিলেন; মন্দায় তাঁদের চাকরি হারানোর ঝুঁকি আরও বাড়ে। ত্রাণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগেও বৈষম্য দেখা যায়। মেক্সিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের ওপর দেশত্যাগের চাপ, বহিষ্কার এবং তথাকথিত প্রত্যাবাসনের অভিযান চলে; এতে কিছু মার্কিন নাগরিকও ক্ষতিগ্রস্ত হন। অভিবাসী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঘুরিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক সংকটের একটি নিষ্ঠুর সামাজিক প্রতিক্রিয়া ছিল। কাজের সংকট পুরোনো বর্ণবাদ ও বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তোলে।
শহরের এই বিপর্যয়ের পাশাপাশি গ্রেট প্লেইনসের কৃষিজীবনে দেখা দেয় ডাস্ট বোল। তিরিশের দশকের খরা ও ধুলিঝড় বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলীয় সমভূমির কিছু অংশে মারাত্মক ক্ষতি করে। টেক্সাস ও ওকলাহোমার প্যানহ্যান্ডল, পশ্চিম কানসাস, পূর্ব কলোরাডো এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো গভীরভাবে আক্রান্ত হয়। তবে পুরো আমেরিকা ধুলোর মরুভূমিতে পরিণত হয়নি। মহামন্দা ও ডাস্ট বোলও একই ঘটনা ছিল না। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পরিবেশগত দুর্যোগ যুক্ত হওয়ায় নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ একসঙ্গে আয়, জমি ও বাসস্থানের নিরাপত্তা হারাতে থাকেন।
এই বিপর্যয় শুধু বৃষ্টি না হওয়ার ফল ছিল না। আগের দশকগুলোতে প্রাকৃতিক তৃণভূমির বিস্তীর্ণ অংশ চাষের জমিতে বদলে দেওয়া হয়েছিল। গভীর শিকড়ওয়ালা ঘাস সরিয়ে ফেলায় মাটি ধরে রাখার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়। শস্যের দাম ও উৎপাদনের প্রত্যাশা নিবিড় চাষকে উৎসাহ দিয়েছিল; কিছু অঞ্চলে অতিরিক্ত পশুচারণও ক্ষতি বাড়ায়। দীর্ঘ খরায় ফসলের আচ্ছাদন হারিয়ে গেলে শুকনো উপরিভাগ প্রবল বাতাসে উড়তে থাকে। প্রাকৃতিক খরা ও অনুপযুক্ত ভূমি ব্যবহারের সম্মিলিত প্রভাব ডাস্ট বোলকে ভয়াবহ করে তুলেছিল।
ধুলিঝড় দিনের আলো ঢেকে দিত, ঘরের ফাঁক দিয়ে ঢুকে খাবার ও বিছানায় জমত এবং শ্বাসকষ্ট বাড়াত। জমির উর্বর উপরিভাগ হারিয়ে গেলে পরের মৌসুমের সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতো। ১৯৩৫ সালের ১৪ এপ্রিলের প্রবল ঝড় ব্ল্যাক সানডে নামে স্মরণীয় হয়ে আছে। কৃষক পরিবারের জন্য ক্ষতি ছিল বহুমাত্রিক: ফসল নেই, বিক্রির আয় নেই, অথচ ঋণ ও দৈনন্দিন খরচ আছে। জমির মালিকের পাশাপাশি ভাগচাষি ও কৃষিশ্রমিকেরাও বিপদে পড়েন। অনেকের পক্ষে পুরোনো জীবনে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠে।
পশ্চিমে, বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়ায় কাজের আশায় বহু পরিবার রওনা দেয়। তবে সব অভিবাসী সরাসরি ধুলিঝড় থেকে পালিয়ে যাননি; কৃষির মন্দা, উচ্ছেদ ও কর্মসংস্থানের অভাবও তাঁদের যাত্রার কারণ ছিল। পুরোনো গাড়িতে সামান্য আসবাব ও সন্তানদের নিয়ে পৌঁছেও অনেকেই স্থায়ী কাজ পাননি। মৌসুমি ফল সংগ্রহের কাজে শ্রমিকের ভিড় মজুরি কমিয়ে রাখত। অস্বাস্থ্যকর শিবির, অনিশ্চিত আয় এবং স্থানীয় বিরূপতা তাঁদের নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। বাড়ি ছেড়ে যাওয়া বিপর্যয়ের শেষ নয়; অনেকের জন্য তা ছিল সংগ্রামের আরেক অধ্যায়।
তবু এই সময়ের মানুষকে কেবল অসহায় ভুক্তভোগী হিসেবে দেখলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকে। প্রতিবেশীরা খাবার ভাগ করেছেন, শ্রমিকেরা সংগঠিত হয়েছেন, কৃষকেরা উচ্ছেদ ও নিলামের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। সরকারি কর্মসংস্থান, ত্রাণ এবং পরবর্তী মাটি সংরক্ষণ উদ্যোগ নতুন সহায়তার পথ খুলেছে। কিন্তু ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা ও স্থানচ্যুতির অভিজ্ঞতা বহু বছর থেকে যায়। মহামন্দা আমেরিকাকে দেখিয়েছিল, ব্যক্তিগত পরিশ্রমের নিরাপত্তাও বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। সেই উপলব্ধিই কাজ, সামাজিক সুরক্ষা ও রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করল—যার রাজনৈতিক উত্তর খোঁজা হচ্ছিল রুজভেল্টের নিউ ডিলে।
বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও জেমস ওয়াট: কয়লা ও বাষ্পশক্তি কীভাবে শিল্পবিপ্লব বদলে দিয়েছিল?
বস্ত্রশিল্পে যন্ত্রের বিপ্লব: স্পিনিং জেনি, ওয়াটার ফ্রেম ও পাওয়ার লুমের ইতিহাস
কৃষিবিপ্লব থেকে শিল্পবিপ্লব: জমির ঘেরাও, কৃষি প্রযুক্তি ও জনসংখ্যায় ব্রিটেনের রূপান্তর
শিল্পবিপ্লবের সূচনা: অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটেন কেন প্রথম শিল্পায়িত হয়েছিল?
বোরাবোরার নীল লেগুন কীভাবে তৈরি হলো? আগ্নেয় দ্বীপ ও প্রবালপ্রাচীরের ইতিহাস
আল্পস পর্বতমালা কীভাবে তৈরি হয়েছিল? আট দেশের পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস