অতিরিক্ত লবণ খেলে শরীরে কী ঘটে? উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অতিরিক্ত লবণ খেলে শরীরে কী ঘটে? উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও হৃদ্‌যন্ত্রের ঝুঁকি

অতিরিক্ত লবণ খেলে শরীরে কী ঘটে? উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও হৃদ্‌যন্ত্রের ঝুঁকি
অতিরিক্ত লবণ খেলে শরীরে কী ঘটে?

লবণ ছাড়া খাবারের স্বাদ যেমন অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে, তেমনি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্যও লবণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সোডিয়াম প্রয়োজন। স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদান, পেশির সংকোচন এবং শরীরের পানি ও খনিজের ভারসাম্য রক্ষায় সোডিয়ামের ভূমিকা রয়েছে। সমস্যা শুরু হয় যখন শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় নিয়মিত অনেক বেশি লবণ খাওয়া হয়।

অতিরিক্ত লবণের ক্ষতি কেবল উচ্চ রক্তচাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন বেশি লবণ খাওয়ার অভ্যাস রক্তনালি, হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি, মস্তিষ্ক এবং শরীরের তরল ভারসাম্যের ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ক্ষতির অনেকটাই প্রথমদিকে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ সৃষ্টি না করেই ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে পারে।

লবণ খাওয়ার পর শরীরের ভেতরে কী ঘটে?

খাবারের লবণের প্রধান উপাদান সোডিয়াম ক্লোরাইড। পরিপাকতন্ত্র থেকে সোডিয়াম শোষিত হয়ে রক্তে প্রবেশ করার পর শরীর রক্তে সোডিয়ামের ঘনত্ব একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করে।

রক্তে সোডিয়াম বেড়ে গেলে শরীর পানি ধরে রাখতে শুরু করতে পারে। একই সঙ্গে তৃষ্ণা বাড়ে, ফলে মানুষ আরও পানি পান করে। অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করে দেওয়ার প্রধান দায়িত্ব পড়ে কিডনির ওপর।

স্বাস্থ্যবান মানুষের কিডনি একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত এই অতিরিক্ত সোডিয়াম সামলাতে পারে। কিন্তু নিয়মিত অত্যধিক লবণ গ্রহণ করলে শরীরের এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়তে থাকে।

ফলে রক্তপ্রবাহে তরলের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। রক্তনালির ভেতর বেশি তরল প্রবাহিত হলে রক্তনালির দেয়ালের ওপর চাপও বাড়তে পারে। এখান থেকেই অতিরিক্ত লবণ ও উচ্চ রক্তচাপের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়।

রক্তচাপ কেন বেড়ে যায়?

অতিরিক্ত লবণের সবচেয়ে পরিচিত ক্ষতিকর প্রভাব হলো রক্তচাপ বৃদ্ধি। তবে বিষয়টি শুধু শরীরে পানি জমার মতো সরল নয়।

দীর্ঘদিন বেশি সোডিয়াম গ্রহণ রক্তনালির স্বাভাবিক প্রসারণক্ষমতা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। কিছু মানুষের শরীর আবার লবণের প্রতি অন্যদের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল। একই পরিমাণ লবণ খেলেও তাদের রক্তচাপ তুলনামূলক বেশি বাড়তে পারে।

বিশেষ করে যাদের ইতিমধ্যে উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, বয়স বেশি অথবা কিডনির কার্যক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লবণের প্রভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপের বিপজ্জনক দিক হলো, অনেক সময় এটি বছরের পর বছর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই রক্তনালির ক্ষতি করতে থাকে।

হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে

রক্তচাপ দীর্ঘদিন বেশি থাকলে হৃদ্‌যন্ত্রকে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত পাঠাতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। অর্থাৎ প্রতিটি স্পন্দনের সময় হৃদ্‌যন্ত্রকে বাড়তি প্রতিরোধের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়।

দীর্ঘমেয়াদে এই বাড়তি কাজ হৃদ্‌যন্ত্রের পেশির গঠন পরিবর্তন করতে পারে। হৃদ্‌যন্ত্রের প্রধান পাম্পিং প্রকোষ্ঠের পেশি অস্বাভাবিকভাবে পুরু হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ রক্তনালির ক্ষতি ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাই অতিরিক্ত লবণকে শুধু খাবারের স্বাদের বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়; এটি হৃদ্‌স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসগত বিষয়।

কিডনির ওপর কী প্রভাব পড়ে?

কিডনি শরীরের সোডিয়াম ও পানির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীয় অঙ্গ। রক্ত ছেঁকে প্রয়োজনীয় উপাদান ধরে রাখা এবং অতিরিক্ত সোডিয়ামসহ বিভিন্ন বর্জ্য প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়া এর গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

নিয়মিত অতিরিক্ত লবণ খেলে কিডনিকে বেশি সোডিয়াম সামলাতে হয়। পাশাপাশি লবণজনিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এখানে একটি ক্ষতিকর চক্র তৈরি হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ক্ষতি করতে পারে, আবার কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীর থেকে সোডিয়াম ও পানি অপসারণ কঠিন হয়ে রক্তচাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।

যাদের আগে থেকেই কিডনির সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী সোডিয়াম নিয়ন্ত্রণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

শরীর ও মুখ ফুলে যেতে পারে কেন?

বেশি নোনতা খাবার খাওয়ার পর অনেকেই সকালে মুখ কিছুটা ফোলা, আঙুল ভারী অথবা পা ও গোড়ালিতে ফোলাভাব অনুভব করেন। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো শরীরে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা।

সোডিয়াম পানি আকর্ষণ করে। শরীর যখন অতিরিক্ত সোডিয়াম ধরে রাখে, তখন তরলের পরিমাণও বাড়তে পারে। ফলে সাময়িকভাবে শরীরের ওজন বৃদ্ধি, পেট ভার লাগা বা ফোলাভাব দেখা দিতে পারে।

তবে দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক ফোলাভাবকে শুধু লবণ খাওয়ার ফল ধরে নেওয়া উচিত নয়। হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি, যকৃৎসহ বিভিন্ন সমস্যাতেও এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

মস্তিষ্ক ও রক্তনালির ঝুঁকি

অতিরিক্ত লবণের সঙ্গে মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কটি আসে উচ্চ রক্তচাপের মাধ্যমে। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ মস্তিষ্কের রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

রক্তনালির সুস্থতা কেবল হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য নয়, মস্তিষ্কের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই খাবারে লবণ নিয়ন্ত্রণকে দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্ক ও রক্তনালির স্বাস্থ্যরক্ষার অংশ হিসেবেও দেখা দরকার।

আমরা আসলে কোথা থেকে এত লবণ খাই?

অনেকে মনে করেন, খাবারের ওপর আলাদা করে লবণ না ছড়ালেই লবণ গ্রহণ অনেক কমে যায়। বাস্তবে রান্নার সময় দেওয়া লবণের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রস্তুত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার—

  • আচার ও অতিরিক্ত নোনতা চাটনি
  • চানাচুর ও নোনতা ভাজা খাবার
  • চিপস ও নোনতা বিস্কুট
  • প্রক্রিয়াজাত মাংস
  • প্রস্তুত সস
  • তাৎক্ষণিক নুডলস
  • প্যাকেটজাত স্যুপ
  • লবণযুক্ত শুকনা খাবার
  • অতিরিক্ত লবণ দিয়ে সংরক্ষিত খাবার

একই দিনে এ ধরনের একাধিক খাবার খেলে আলাদা করে খুব বেশি লবণ না খেলেও মোট সোডিয়াম গ্রহণ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

দৈনিক কতটা লবণ যথেষ্ট?

সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সাধারণভাবে দিনে পাঁচ গ্রামের কম লবণ গ্রহণের লক্ষ্য রাখা ভালো। এটি প্রায় এক চা-চামচ লবণের সমান। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—এই পরিমাণ বলতে সারাদিনে খাওয়া সব খাবারে থাকা মোট লবণ বোঝায়, শুধু রান্নার সময় আলাদাভাবে যোগ করা লবণ নয়।

অর্থাৎ রান্নার লবণ, টেবিলে ছড়ানো লবণ, আচার, সস, বিস্কুট, চানাচুর, নুডলস এবং অন্যান্য প্রস্তুত খাবারের লবণ—সবই মোট হিসাবের অংশ।

লবণ কমানোর কার্যকর উপায়

হঠাৎ সব খাবার একেবারে লবণহীন করার প্রয়োজন নেই। বরং স্বাদের অভ্যাস ধীরে ধীরে পরিবর্তন করা বেশি বাস্তবসম্মত।

রান্নায় পর্যায়ক্রমে লবণের পরিমাণ কমান। কয়েক সপ্তাহ ধরে অল্প অল্প করে কমালে জিহ্বা তুলনামূলক কম নোনতা স্বাদেও অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে।

খাবারের টেবিলে আলাদা লবণের পাত্র রাখার অভ্যাস বাদ দেওয়া ভালো। স্বাদ বাড়াতে লেবু, ধনেপাতা, পুদিনা, মরিচ, আদা, রসুন ও বিভিন্ন মসলার ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।

প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় সম্ভব হলে খাদ্যগুণের বিবরণ দেখে সোডিয়ামের পরিমাণ তুলনা করা উপকারী। একই ধরনের দুটি খাবারের মধ্যে কম সোডিয়ামযুক্তটি বেছে নিলে দীর্ঘমেয়াদে মোট লবণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

শেষ কথা

লবণ শরীরের শত্রু নয়; অতিরিক্ত লবণই মূল সমস্যা। শরীরের স্বাভাবিক কাজের জন্য সোডিয়াম দরকার হলেও নিয়মিত প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গ্রহণ করলে পানি ধরে রাখা, রক্তচাপ বৃদ্ধি এবং হৃদ্‌যন্ত্র ও কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি অনেক সময় নীরবে তৈরি হয়। একজন মানুষ স্বাভাবিক বোধ করলেও তার রক্তচাপ বেশি থাকতে পারে এবং সেই চাপ ধীরে ধীরে রক্তনালি, হৃদ্‌যন্ত্র ও কিডনির ক্ষতি করতে পারে।

তাই খাবার থেকে লবণ পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়, বরং পরিমিত গ্রহণই মূল লক্ষ্য। রান্নায় লবণ কমানো, টেবিলে অতিরিক্ত লবণ না নেওয়া, নোনতা ও প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করা এবং নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা—এই কয়েকটি অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি ও রক্তনালির সুস্থতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।