খাবারের লেবেল পড়ে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেবেন… | এসো-জানি

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

খাবারের লেবেল পড়ে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেবেন কীভাবে? পুষ্টিতথ্য বোঝার সহজ উপায়

খাবারের লেবেল পড়ে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেবেন কীভাবে? পুষ্টিতথ্য বোঝার সহজ উপায়
মোড়কের দাবি নয়, পুষ্টিতথ্য বুঝে খাবার বাছুন।

মোড়কের সামনের কথার চেয়ে পেছনের তথ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিস্কুটের প্যাকেটে লেখা “আঁশসমৃদ্ধ”, পানীয়ের বোতলে “বাড়তি চিনি নেই”, আবার সকালের খাবারে “পূর্ণশস্য দিয়ে তৈরি”। এসব কথা দেখে কোনো খাবারকে স্বাস্থ্যকর মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একটি বিশেষ গুণ থাকলেই পুরো খাবারটি আপনার জন্য উপযুক্ত হয়ে যায় না। আঁশযুক্ত বিস্কুটেও যথেষ্ট চিনি থাকতে পারে; বাড়তি চিনি না মেশানো পানীয়েও মোট চিনির পরিমাণ বেশি হতে পারে।

খাবারের লেবেল পড়ার উদ্দেশ্য প্রতিটি উপাদান মুখস্থ করা নয়। বরং আপনি কতটা খাবেন, তাতে কী পরিমাণ পুষ্টি পাবেন এবং একই ধরনের অন্য খাবারের তুলনায় কোনটি ভালো—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা।

বাংলাদেশের বাজারে দেশীয় ও আমদানি করা পণ্যের লেবেলের বিন্যাস এক রকম নয়। কোথাও প্রতি পরিবেশনের হিসাব, কোথাও প্রতি একশ গ্রাম বা একশ মিলিলিটারের তথ্য দেওয়া থাকে। তাই শুধু বড় অক্ষরে লেখা দাবি না দেখে পুষ্টিতথ্য ও উপাদান তালিকা একসঙ্গে পড়তে হবে।

প্রথমে দেখুন হিসাবটি কতটুকু খাবারের জন্য

প্যাকেটের মোট ওজন এবং পুষ্টিতথ্যে উল্লেখ করা পরিবেশনের পরিমাণ এক বিষয় নয়। একটি ছোট প্যাকেটেও একাধিক পরিবেশনের হিসাব থাকতে পারে। প্রস্তুতকারকের নির্ধারিত পরিবেশন আবার আপনার খাওয়া উচিত এমন পরিমাণের নির্দেশনাও নয়।

ধরা যাক, নব্বই গ্রাম ওজনের একটি নাশতার প্যাকেটে প্রতি ত্রিশ গ্রামের তথ্য দেওয়া আছে। প্রতি পরিবেশনে শক্তি একশ পঞ্চাশ কিলোক্যালরি এবং লবণ শূন্য দশমিক চার গ্রাম। পুরো প্যাকেট খেলে আপনি তিন পরিবেশন খাবেন। অর্থাৎ শক্তি হবে চারশ পঞ্চাশ কিলোক্যালরি এবং লবণ এক দশমিক দুই গ্রাম।

একই ভিত্তিতে তুলনা করুন

দুটি পণ্যের পরিবেশনের আকার আলাদা হলে সরাসরি সংখ্যার তুলনা বিভ্রান্তিকর। একটি বিস্কুটের তথ্য পঁচিশ গ্রাম এবং অন্যটির পঞ্চাশ গ্রামের হিসাবে দেওয়া থাকলে দ্বিতীয়টির সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই বড় দেখাবে।

তুলনার জন্য প্রতি একশ গ্রাম বা একশ মিলিলিটারের তথ্য সুবিধাজনক। তবে শেষ সিদ্ধান্তে নিজের খাওয়ার পরিমাণও ধরতে হবে। তেল ও দইয়ের মতো আলাদা শ্রেণির খাবারকে শুধু একই ওজনের শক্তির হিসাবে বিচার করা অর্থপূর্ণ নয়।

গুঁড়া পানীয়, স্যুপ বা দুধের ক্ষেত্রেও দেখুন তথ্যটি শুকনা অবস্থার, নাকি নির্দেশনা অনুযায়ী তৈরি করার পরের। দুধ বা চিনি যোগ করলে আপনার খাওয়া খাবারের পুষ্টিমান বদলে যাবে।

চিনি, লবণ ও চর্বির ঘরগুলো কীভাবে বুঝবেন

পুষ্টিতথ্যে শুধু শক্তির পরিমাণ দেখলে খাবারের পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না। একই শক্তির দুটি খাবারে আঁশ, আমিষ, চিনি ও চর্বির ধরন ভিন্ন হতে পারে।

মোট চিনি ও যোগ করা চিনি

মোট চিনির মধ্যে খাবারে স্বাভাবিকভাবে থাকা এবং তৈরির সময় যোগ করা—দুই ধরনের চিনিই থাকতে পারে। যেমন, সাধারণ দুধে স্বাভাবিক শর্করা থাকে; মিষ্টি দইয়ে তার সঙ্গে বাড়তি চিনি যোগ হতে পারে।

লেবেলে যোগ করা চিনির আলাদা ঘর থাকলে মনে রাখুন, সেটি মোট চিনির অংশ। দুটো সংখ্যা আবার যোগ করবেন না। আলাদা তথ্য না থাকলে উপাদান তালিকায় চিনি, মধু, গুড় বা চিনির সিরা আছে কি না দেখুন। “বাড়তি চিনি নেই” কথাটিও মোট চিনি নেই—এমন অর্থ দেয় না।

লবণ ও সোডিয়াম

কিছু লেবেলে লবণের বদলে সোডিয়ামের পরিমাণ লেখা থাকে। একই এককে সোডিয়ামের পরিমাণকে প্রায় আড়াই দিয়ে গুণ করলে লবণের সমতুল্য পরিমাণ পাওয়া যায়। যেমন, চারশ মিলিগ্রাম সোডিয়াম প্রায় এক গ্রাম লবণের সমতুল্য।

তবে লবণ ও সোডিয়ামের মান একসঙ্গে যোগ করবেন না। তুলনা করার সময় গ্রাম ও মিলিগ্রামের পার্থক্যও খেয়াল করুন।

চর্বির ধরন

মোট চর্বির পাশাপাশি সম্পৃক্ত চর্বি দেখুন। একই ধরনের খাবারে তুলনামূলক কম সম্পৃক্ত চর্বি থাকা একটি বিবেচ্য গুণ। কিন্তু চর্বি কম বলেই খাবারটি সামগ্রিকভাবে ভালো হবে না; তাতে চিনি বা লবণ বেশি থাকতে পারে।

উপাদান তালিকা খাবারের প্রকৃত গঠন বোঝায়

উপাদান সাধারণত তৈরির সময় ব্যবহৃত ওজনের বড় থেকে ছোট ক্রমে লেখা হয়। ফলে তালিকার শুরুর উপাদানগুলো খাবারের মূল গঠন সম্পর্কে ধারণা দেয়।

পূর্ণশস্যের রুটি কিনতে চাইলে শুধু বাদামি রং দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। তালিকায় পূর্ণশস্যের আটা কোথায় আছে এবং তার শতকরা পরিমাণ দেওয়া আছে কি না দেখুন। পূর্ণশস্যের দাবি থাকলেও পরিশোধিত ময়দা প্রধান উপাদান হতে পারে।

একইভাবে ফলের ছবি থাকা পানীয়ে ফল বা ফলের রসের পরিমাণ কত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ছবির আকার দিয়ে ভেতরের উপাদানের পরিমাণ বোঝা যায় না।

আঁশ ও আমিষের হিসাব

একই ধরনের সকালের খাবার বা রুটির মধ্যে তুলনা করলে বেশি খাদ্যআঁশ একটি সুবিধা হতে পারে। দই বা নাশতার ক্ষেত্রেও আমিষের পরিমাণ দেখুন। তবে শুধু একটি পুষ্টি বেশি বলে অতিরিক্ত চিনি বা লবণের বিষয়টি উপেক্ষা করবেন না।

উপাদানের তালিকা দীর্ঘ হলেই খাবার ক্ষতিকর, কিংবা কোনো নাম অপরিচিত হলেই সেটি বিষাক্ত—এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। উপাদানের কাজ, পরিমাণ এবং পুরো খাবারের পুষ্টিমান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রচারমূলক দাবি ও শতকরা হিসাবের সীমা বুঝুন

“প্রাকৃতিক”, “পুষ্টিকর” কিংবা “স্বাস্থ্যসচেতনদের জন্য”—এ ধরনের কথায় খাবারের সামগ্রিক পুষ্টিমান নির্ধারিত হয় না। কোনো দাবি নির্দিষ্ট একটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সত্য হলেও অন্য সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।

চর্বি কমানো খাবারে স্বাদ বজায় রাখতে চিনি যোগ করা হতে পারে। আবার আমিষ বাড়ানো নাশতায় শক্তি ও লবণও বেশি থাকতে পারে। তাই দাবির সঙ্গে পেছনের তথ্য মিলিয়ে দেখুন।

দৈনিক মানের শতকরা হিসাব

কিছু আমদানি করা পণ্যে একটি পরিবেশন দৈনিক নির্ধারিত মানের কত শতাংশ দেয়, তা লেখা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত লেবেল ব্যবস্থায় পাঁচ শতাংশ বা কমকে কম এবং বিশ শতাংশ বা বেশিকে বেশি ধরা হয়।

তবে “বেশি” সব সময় খারাপ নয়। খাদ্যআঁশ বেশি থাকা উপকারী হতে পারে, আর সোডিয়াম বেশি থাকা সীমিত করার বিষয়। এই হিসাবও ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপত্র নয়; শিশু, গর্ভবতী ব্যক্তি বা বিশেষ রোগে আক্রান্ত মানুষের চাহিদা আলাদা হতে পারে।

অ্যালার্জি, সংরক্ষণ ও দৈনন্দিন কেনাকাটায় শেষ যাচাই

খাবার পুষ্টিকর হলেও কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে। দুধ, ডিম, বাদাম, সয়া বা গমে অ্যালার্জি থাকলে প্রতিবার উপাদান ও সতর্কবার্তা পড়তে হবে। আগে খেয়েছেন বলেই পরের প্যাকেটের উপাদান অপরিবর্তিত থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

“থাকতে পারে” ধরনের সতর্কবার্তা উৎপাদনের সময় অনিচ্ছাকৃত সংস্পর্শের সম্ভাবনা বোঝাতে পারে। গুরুতর অ্যালার্জির ক্ষেত্রে এ তথ্যকে গুরুত্ব দিন।

তারিখের সঙ্গে সংরক্ষণবিধিও পড়ুন

নিরাপদে ব্যবহারের শেষ তারিখ এবং সর্বোত্তম গুণমান বজায় থাকার তারিখের উদ্দেশ্য আলাদা। প্রথমটি নিরাপত্তার সঙ্গে, দ্বিতীয়টি মূলত গুণমানের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে মোড়কের ভাষা ও স্থানীয় নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

খোলার পর কত দিন রাখা যাবে, ঠান্ডায় রাখতে হবে কি না এবং প্যাকেট অক্ষত আছে কি না—এসবও দেখুন। তারিখ ঠিক থাকলেও ভুলভাবে সংরক্ষিত খাবার নিরাপদ নাও থাকতে পারে।

কেনাকাটার সময় অভ্যাস করুন: আগে পরিমাণ, তারপর একই ভিত্তিতে পুষ্টিতথ্য, এরপর উপাদান, অ্যালার্জি ও সংরক্ষণের নির্দেশনা। লেবেল পড়া মানে নিখুঁত একটি খাবার খোঁজা নয়; নিজের প্রয়োজন ও সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানানসই ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া।