অতিরিক্ত ওজন হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে?……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অতিরিক্ত ওজন হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে? ঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায়

অতিরিক্ত ওজন হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে? ঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায়
অতিরিক্ত মেদ কমান, হৃদ্‌যন্ত্রের যত্ন নিন।

অতিরিক্ত ওজন কেন হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে হাঁপিয়ে যাওয়া কিংবা অল্প হাঁটলেই ক্লান্ত হয়ে পড়াকে অনেকেই শুধু ওজন বাড়ার স্বাভাবিক ফল মনে করেন। কিন্তু শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমার প্রভাব বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়ে গভীর। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্তের চর্বি, শর্করার বিপাক এবং হৃদ্‌পেশির কাজ করার ধরন বদলে দিতে পারে। দীর্ঘদিন এসব পরিবর্তন চলতে থাকলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

তবে ওজন বেশি হলেই কারও হৃদ্‌রোগ আছে—এমন সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে মেদের পরিমাণ ও অবস্থান, বয়স, বংশগত বৈশিষ্ট্য, ধূমপান, শারীরিক সক্রিয়তা এবং আগে থেকে থাকা রোগের ওপর। একই ওজনের দুজন মানুষের হৃদ্‌স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।

স্থূলতা কেবল ইচ্ছাশক্তির অভাবের ফলও নয়। ঘুম, বংশগতি, কিছু ওষুধ, হরমোনের সমস্যা, খাদ্যপ্রাপ্যতা ও জীবনযাপনের পরিবেশ এতে ভূমিকা রাখে। তাই হৃদ্‌যন্ত্রের সুরক্ষায় প্রয়োজন দোষারোপের বদলে ব্যক্তির বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা।

পেটের মেদ কীভাবে রক্তনালির ক্ষতি করে

চামড়ার নিচে জমা মেদ এবং পেটের গভীরে অভ্যন্তরীণ অঙ্গের চারপাশে জমা মেদ একভাবে কাজ করে না। গভীরের মেদ বিপাকীয়ভাবে বেশি সক্রিয়। এটি এমন কিছু পদার্থ নিঃসরণ করে, যা শরীরে দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমাত্রার প্রদাহ এবং রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

শর্করা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা

অতিরিক্ত মেদের কারণে কোষে শর্করা প্রবেশে সহায়ক হরমোনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তখন রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে শরীরকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে দ্বিতীয় ধরনের বহুমূত্র রোগের ঝুঁকি বাড়ে। দীর্ঘদিন বেশি শর্করা রক্তনালির দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত করে হৃদ্‌রোগের আশঙ্কা আরও বাড়াতে পারে।

ধমনিতে আবরণ জমার প্রক্রিয়া

পেটের মেদের সঙ্গে রক্তে ক্ষতিকর চর্বিকণার অস্বাভাবিকতা প্রায়ই দেখা যায়। প্রদাহ ও এসব চর্বিকণা ধমনির দেয়ালে চর্বিসমৃদ্ধ আবরণ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এতে হৃদ্‌পেশিতে রক্ত সরবরাহকারী ধমনি সরু হতে পারে। কোনো আবরণ ফেটে তার ওপর রক্ত জমাট বাঁধলে রক্তপ্রবাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে হৃদ্‌পেশির অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এটি খাবারের তেল সরাসরি গিয়ে রক্তনালিতে আটকে যাওয়ার মতো সরল ঘটনা নয়; বরং বহুদিন ধরে চলা জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া।

রক্তচাপ ও হৃদ্‌পেশির ওপর বাড়তি চাপ

শরীরের আকার বাড়লে অধিক টিস্যুতে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছাতে সাধারণত বেশি রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়। হৃদ্‌যন্ত্রকে সেই চাহিদা মেটাতে বাড়তি কাজ করতে হয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত মেদ স্নায়ুতন্ত্র, হরমোন এবং বৃক্কের লবণ-পানি নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলে রক্তচাপ বাড়াতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হৃদ্‌যন্ত্রকে বেশি প্রতিরোধের বিপরীতে রক্ত পাঠাতে হয়। দীর্ঘদিন এমন চললে বিশেষ করে বাম নিলয়ের দেয়াল পুরু হয়ে যেতে পারে। প্রথম দিকে শরীর এভাবে বাড়তি কাজের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে হৃদ্‌পেশি শক্ত হয়ে স্বাভাবিকভাবে শিথিল হতে অসুবিধা হতে পারে।

ফলে হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত ভরা এবং শরীরের চাহিদামতো রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এই পরিস্থিতি হৃদ্‌যন্ত্রের অকার্যকারিতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এর অর্থ হৃদ্‌যন্ত্র থেমে যাওয়া নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করতে না পারা।

পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট, পা ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি কিংবা শুয়ে থাকলে শ্বাস নিতে সমস্যা এর লক্ষণ হতে পারে। এসব উপসর্গকে শুধু ওজনের কারণে হচ্ছে ধরে নেওয়া উচিত নয়।

অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন ও ঘুমের শ্বাসবাধার সম্পর্ক

অতিরিক্ত মেদ হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেত চলাচল ও গঠনেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপরের প্রকোষ্ঠে অনিয়মিত স্পন্দনের একটি ধরনের সঙ্গে স্থূলতার সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ, প্রকোষ্ঠ বড় হয়ে যাওয়া এবং হৃদ্‌যন্ত্রের আশপাশের মেদের প্রভাব এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এই অনিয়মিত স্পন্দনে কারও বুক ধড়ফড় করে, কারও দুর্বল লাগে, আবার কারও স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। কিছু ক্ষেত্রে প্রকোষ্ঠের ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ে। সেই জমাট মস্তিষ্কে পৌঁছালে মস্তিষ্কের রক্তনালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ঘুমের মধ্যেও হৃদ্‌যন্ত্র চাপে থাকতে পারে

ঘাড় ও গলার আশপাশে মেদ জমলে ঘুমের সময় শ্বাসপথ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। ফলে বারবার শ্বাস বন্ধ হওয়া ও আবার শুরু হওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে রক্তে অক্সিজেন কমে এবং শরীর বারবার সতর্ক অবস্থায় চলে যায়।

এই পুনরাবৃত্ত চাপ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কঠিন করতে পারে। জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে যাওয়া এবং দিনে অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া থাকলে মূল্যায়ন জরুরি। তবে নাক ডাকলেই যে এই রোগ আছে, তা নয়।

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বুঝতে শুধু ওজন মাপা যথেষ্ট নয়

উচ্চতার তুলনায় ওজন বোঝার জন্য দেহভর সূচক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই সূচক পেশি ও মেদের পার্থক্য কিংবা মেদ কোথায় জমেছে, তা সরাসরি জানায় না। পেশিবহুল ব্যক্তির সূচক বেশি হতে পারে; আবার মোট ওজন তুলনামূলক কম হলেও পেটে ক্ষতিকর মেদ জমে থাকতে পারে।

দক্ষিণ এশীয়দের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম দেহভর সূচকেও বিপাকীয় ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। তাই কোমরের মাপ, রক্তচাপ, রক্তের শর্করা ও চর্বির পরীক্ষা একসঙ্গে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসক পারিবারিক ইতিহাস, ধূমপান, ঘুমের সমস্যা এবং চলাফেরার অভ্যাসও মূল্যায়ন করেন। প্রয়োজন অনুসারে হৃদ্‌যন্ত্রের পরীক্ষা করা হয়; শুধু ওজন বেশি বলেই সবার সব পরীক্ষা দরকার হয় না।

আরেকটি বিষয় হলো, সব ওজন বৃদ্ধি মেদ বৃদ্ধির কারণে হয় না। কয়েক দিনের মধ্যে দ্রুত ওজন বাড়ার সঙ্গে পা ফোলা বা শ্বাসকষ্ট থাকলে শরীরে পানি জমার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে আগে থেকে হৃদ্‌রোগ থাকলে এমন পরিবর্তনে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

হৃদ্‌যন্ত্রের সুরক্ষায় কার্যকর পরিবর্তন

শুরুতেই অনেক ওজন কমানোর লক্ষ্য নেওয়ার প্রয়োজন নেই। অতিরিক্ত ওজন থাকা ব্যক্তির প্রাথমিক ওজনের প্রায় পাঁচ থেকে দশ শতাংশ কমলে অনেক ক্ষেত্রে রক্তচাপ, শর্করা ও রক্তের কিছু চর্বির মাত্রায় উপকার পাওয়া যায়। যেমন, নব্বই কিলোগ্রাম ওজনের কারও জন্য প্রাথমিকভাবে সাড়ে চার থেকে নয় কিলোগ্রাম কমানো অর্থবহ লক্ষ্য হতে পারে।

খাবারের পরিমাণ ও গুণমান

ভাত সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার বদলে পরিমাণ সামঞ্জস্য করে সঙ্গে শাকসবজি, ডাল, মাছ ও উপযুক্ত আমিষ বাড়ানো বাস্তবসম্মত। মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, ঘন ঘন মিষ্টি এবং অতিরিক্ত লবণ কমানো দরকার। বাদাম ও তেল পুষ্টিকর হলেও পরিমাণের দিকে নজর রাখতে হবে।

নিয়মিত চলাফেরা

সক্ষম প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত দেড়শ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক সক্রিয়তা একটি সাধারণ লক্ষ্য। দ্রুত হাঁটা এর সহজ উদাহরণ। নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন থেকে শুরু করলে অল্প সময় হাঁটুন এবং ধীরে বাড়ান। ওজন খুব বেশি না কমলেও নিয়মিত চলাফেরা হৃদ্‌স্বাস্থ্যের উপকার করে।

ঘুম, চিকিৎসা ও ধারাবাহিকতা

পর্যাপ্ত ঘুম, তামাক বর্জন এবং রক্তচাপ ও শর্করা নিয়ন্ত্রণ ওজন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি চলতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ওজন কমানোর ওষুধ বা অস্ত্রোপচার বিবেচিত হতে পারে। নিজে থেকে অজানা ওষুধ খাওয়া বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা নিরাপদ সমাধান নয়।

বুকে চাপ বা ব্যথার সঙ্গে ঘাম, শ্বাসকষ্ট, বমিভাব অথবা বাহু ও চোয়ালে ব্যথা হলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। হৃদ্‌যন্ত্রের যত্নের লক্ষ্য শুধু ওজনের সংখ্যায় পরিবর্তন নয়; বরং দৈনন্দিন সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে রোগের ঝুঁকি কমানো।

পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি সময়ের নিয়মও কেন জরুরি

কোনো দিন রাত এগারোটায়, কোনো দিন রাত তিনটায় ঘুমানো—আবার কাজের দিনে ভোরে এবং ছুটির দিনে দুপুরে ওঠা। এমন অভ্যাসে মোটামুটি পর্যাপ্ত সময় ঘুমিয়েও অনেকের সকালে মাথা ভার লাগে, দিনের বেলা ঝিমুনি আসে কিংবা রাতে ঠিক সময়ে ঘুম পায় না। এর একটি কারণ হতে পারে ঘুমের সময়সূচির সঙ্গে শরীরের নিজস্ব ছন্দের অসামঞ্জস্য।

সুস্থ ঘুমের জন্য কতক্ষণ ঘুমালেন, ঘুম কতটা নিরবচ্ছিন্ন হলো এবং কখন ঘুমালেন—সবকিছু গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের সাধারণত সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রতিদিন সেই ঘুমের সময় অনেকটা বদলে গেলে শরীরের পক্ষে বিশ্রাম ও সক্রিয়তার প্রস্তুতি নিয়মিত রাখা কঠিন হতে পারে।

একই সময়ে ঘুমানো ও জাগা বলতে মিনিটের হিসাবে কঠোর নিয়ম বোঝায় না। উদ্দেশ্য হলো প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমের সুযোগ তৈরি করা, যাতে শরীর একটি পূর্বানুমানযোগ্য দৈনিক ছন্দ পায়।

দেহঘড়ি কীভাবে ঘুম ও জাগরণ নিয়ন্ত্রণ করে

মানুষের মস্তিষ্কে এমন একটি সময়নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে, যা প্রায় চব্বিশ ঘণ্টার ছন্দে শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয় করে। শুধু ঘুম নয়, দেহের তাপমাত্রা, হরমোন নিঃসরণ, ক্ষুধা ও হজমের দৈনিক ওঠানামার সঙ্গেও এই দেহঘড়ির সম্পর্ক রয়েছে।

চোখ দিয়ে প্রবেশ করা আলো এই ব্যবস্থাকে বাইরের দিন-রাত সম্পর্কে সংকেত দেয়। সন্ধ্যার পর অন্ধকার বাড়লে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ঘুমের প্রস্তুতিতে সহায়ক হরমোন মেলাটোনিনের মাত্রা বাড়ে। অন্যদিকে রাতে উজ্জ্বল আলোয় থাকা এই সংকেতকে পিছিয়ে দিতে পারে।

ঘুমের চাপ ও দেহঘড়ির সমন্বয়

ঘুম নিয়ন্ত্রণে আরেকটি প্রক্রিয়া হলো জেগে থাকার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের প্রয়োজন বাড়তে থাকা। দীর্ঘক্ষণ জেগে থাকলে মস্তিষ্কে ঘুমের চাপ জমে; ঘুমের সময় তা কমে।

এই ঘুমের চাপ এবং দেহঘড়ি একসঙ্গে কাজ করলে উপযুক্ত সময়ে ঘুম আসা সহজ হয়। কিন্তু ছুটির দিনে দুপুর পর্যন্ত ঘুমালে রাতে নির্ধারিত সময়ে যথেষ্ট ঘুমের চাপ তৈরি নাও হতে পারে। তখন আবার দেরিতে ঘুমানো ও পরদিন উঠতে কষ্ট হওয়ার চক্র শুরু হয়।

নিয়মিত ঘুম মনোযোগ ও দৈনন্দিন সক্ষমতায় কী পরিবর্তন আনে

ঘুমের সময়সূচি স্থির থাকলে শরীর প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে বিশ্রামের প্রস্তুতি নিতে পারে। এতে অনেকের ঘুম আসা এবং সকালে ওঠা সহজ হয়। তবে এই সুবিধা পেতে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর সুযোগও রাখতে হবে।

মনোযোগ ও স্মৃতির সহায়তা

ঘুম নতুন শেখা তথ্যকে স্মৃতিতে সংরক্ষণ এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। অনিয়মিত সময়সূচির কারণে ঘুম কমে গেলে বা প্রয়োজনীয় সময়ে ঘুমাতে না পারলে পড়াশোনা, হিসাব করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কাজে মন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে, রাত জেগে কাজ শেষে অল্প ঘুমিয়ে সকালে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসলে শুধু ক্লান্তিই নয়, ভুল বোঝা ও ভুল সিদ্ধান্তের আশঙ্কাও বাড়ে। নিয়মিত সময়সূচি এমন ঘুমের ঘাটতি এড়ানোর একটি উপায়।

মেজাজ ও সতর্কতা

অপর্যাপ্ত বা ব্যাহত ঘুমে বিরক্তি বাড়তে পারে এবং আবেগ সামলানো কঠিন হতে পারে। দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুমভাব থাকলে গাড়ি চালানো বা যন্ত্র পরিচালনাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়। নিয়মিত ঘুম সহায়ক হলেও দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ বা বিষণ্নতার একমাত্র চিকিৎসা নয়।

অনিয়মিত ঘুমের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের সম্পর্ক

দেহঘড়ি খাবার গ্রহণ, শর্করা ব্যবস্থাপনা এবং হৃদ্‌রক্তনালির দৈনিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। ঘুম, আলো ও খাবারের সময় বারবার বদলে গেলে এসব ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বিঘ্নিত হতে পারে।

অনিয়মিত ঘুমের সঙ্গে বিপাকীয় সমস্যা ও হৃদ্‌রোগের বেশি ঝুঁকির সম্পর্ক গবেষণায় দেখা গেছে। কিছু গবেষণায় মোট ঘুমের সময় বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক ছিল। অর্থাৎ শুধু দৈনিক ঘুমের ঘণ্টা গণনা করেই ঘুমের স্বাস্থ্য পুরোপুরি বোঝা যায় না।

তবে এসব গবেষণার অনেকগুলো পর্যবেক্ষণমূলক। তাই অনিয়মিত ঘুমই সরাসরি সব রোগ সৃষ্টি করে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। কাজের চাপ, পালাক্রমে কর্মদায়িত্ব, খাদ্যাভ্যাস ও আগে থেকে থাকা অসুস্থতাও ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে।

ছুটির দিনে বেশি ঘুমানোর সীমাবদ্ধতা

সপ্তাহজুড়ে কম ঘুমিয়ে ছুটির দিনে অনেক দেরি পর্যন্ত ঘুমালে সাময়িক ক্লান্তি কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু এতে নিয়মিত ঘুমের ঘাটতির সব প্রভাব দূর হয় না। আবার জাগার সময় কয়েক ঘণ্টা পিছিয়ে গেলে পরের রাতে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।

তাই কাজের দিন ও ছুটির দিনের সময়সূচির পার্থক্য সম্ভব হলে প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে রাখা ভালো। এক রাতের অনিয়ম নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার চেয়ে সামগ্রিক অভ্যাসে নজর দেওয়া বেশি কার্যকর।

বাস্তবসম্মত ঘুমের সময়সূচি কীভাবে গড়বেন

প্রথমে কাজ, পরিবার ও যাতায়াতের সঙ্গে মানানসই একটি জাগার সময় নির্ধারণ করুন। তারপর নিজের প্রয়োজনীয় ঘুম এবং ঘুম আসার জন্য কিছু বাড়তি সময় ধরে রাতের প্রস্তুতি সাজান। সবার জন্য রাত দশটায় শোয়া বা ভোর পাঁচটায় ওঠাই আদর্শ—এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই।

ধীরে সময় এগিয়ে আনুন

অভ্যাস যদি রাত দুটায় ঘুমানোর হয়, একদিনেই রাত দশটায় ঘুমানোর চেষ্টা হতাশাজনক হতে পারে। কয়েক দিন পরপর পনেরো থেকে ত্রিশ মিনিট করে সময় এগিয়ে আনা অনেকের জন্য সহজ। জাগার সময়ও পরিকল্পিতভাবে সামঞ্জস্য করুন, যাতে দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের ঘাটতি তৈরি না হয়।

সকালের আলো ও রাতের প্রস্তুতি

ঘুম থেকে ওঠার পর সম্ভব হলে বাইরে প্রাকৃতিক আলোয় কিছু সময় কাটান। সূর্যের দিকে সরাসরি তাকানোর প্রয়োজন নেই। রাতে শোবার আগে আলো কমিয়ে শান্ত কাজ বেছে নিন। মুঠোফোনে উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা, কাজের বার্তা কিংবা অবিরাম দৃশ্য দেখা ঘুমের প্রস্তুতি পিছিয়ে দিতে পারে।

চা-কফি ও দিনের ঘুম

চা-কফির উত্তেজক উপাদানের প্রভাব কয়েক ঘণ্টা থাকতে পারে। বিকেল বা সন্ধ্যার পানীয়ে রাতে ঘুমের সমস্যা হলে তা আরও আগে সীমিত করুন। দিনের বেলা দীর্ঘক্ষণ বা বিকেলের শেষভাগে ঘুমালে রাতের ঘুমের চাপ কমে যেতে পারে। প্রয়োজন হলে দিনের ঘুম সংক্ষিপ্ত রাখুন।

নিয়ম মানলেও ঘুম না এলে কখন সাহায্য দরকার

বিছানায় শোয়ার সময় নির্ধারণ করা যায়, কিন্তু ঘুমকে জোর করে আনা যায় না। তাই ঘড়ির নির্দিষ্ট সময় হয়ে গেছে বলে ঘুম না পেলেও দীর্ঘক্ষণ বিছানায় উদ্বিগ্ন হয়ে শুয়ে থাকা উপকারী নয়। ঘুম না এলে মৃদু আলোয় শান্ত কিছু করুন এবং ঘুমভাব এলে বিছানায় ফিরুন।

কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘুমের সমস্যা চললে, দিনের কাজ ব্যাহত হলে কিংবা নিয়মিত পর্যাপ্ত সুযোগ রেখেও সতেজ না লাগলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে যাওয়া বা দিনে অনিয়ন্ত্রিত ঘুমভাব থাকলে আলাদা ঘুমের রোগের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।

রাতের পালায় কাজ করা ব্যক্তি ও ছোট শিশুর পরিচর্যাকারীদের জন্য একই সময়সূচি বজায় রাখা কঠিন। তাঁদের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মতভাবে সুরক্ষিত ঘুমের সময়, উপযুক্ত আলো এবং নিরবচ্ছিন্ন বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে।

নিয়মিত সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস শরীরকে একটি নির্ভরযোগ্য দৈনিক সংকেত দেয়। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম, উপযুক্ত পরিবেশ এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা যুক্ত হলে সুস্থ ঘুমের ভিত্তি আরও মজবুত হয়।