বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম: নিরাপদ নিয়ম, জরুরি সতর্কতা ও বিপদের লক্ষণ

গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম: নিরাপদ নিয়ম, জরুরি সতর্কতা ও বিপদের লক্ষণ
গর্ভাবস্থায় শরীরের সংকেত বুঝে পরিমিত ব্যায়াম করুন।

গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম কি নিরাপদ এবং কারা আগে পরামর্শ নেবেন?

জটিলতাহীন গর্ভাবস্থায় উপযুক্ত ব্যায়াম সাধারণত মা ও শিশুর জন্য নিরাপদ। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা সক্ষমতা ধরে রাখতে, ঘুম ও মন ভালো রাখতে এবং অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি ও গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। সুস্থ গর্ভাবস্থায় মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম গর্ভপাত ঘটায়—এমন ধারণার পক্ষে প্রমাণ নেই।

তবে সবার জন্য একই পরিকল্পনা উপযুক্ত নয়। প্রসবপূর্ব পরামর্শে নিজের আগের ব্যায়ামের অভ্যাস, রোগ এবং বর্তমান উপসর্গের কথা জানান। নতুন কোনো কঠিন কর্মসূচি শুরুর আগে ব্যক্তিগত ঝুঁকি মূল্যায়ন জরুরি।

কিছু অবস্থায় ব্যায়াম স্থগিত বা পরিবর্তন করতে হয়। যেমন, যোনিপথে স্থায়ী বা অজানা কারণে রক্তপাত, পানি ভেঙে যাওয়া, সময়ের আগে প্রসবব্যথা, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া, গুরুতর রক্তস্বল্পতা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের রোগ।

গর্ভফুল জরায়ুমুখ ঢেকে রাখলে, জরায়ুমুখের দুর্বলতা থাকলে বা একাধিক শিশুর গর্ভধারণে অকালপ্রসবের ঝুঁকি থাকলেও বিশেষ পরামর্শ প্রয়োজন। যমজ সন্তান আছে বলেই অবশ্য সবার সব ব্যায়াম বন্ধ করতে হয় না।

ব্যায়ামে বিধিনিষেধ থাকা এবং সম্পূর্ণ শয্যাবিশ্রাম এক বিষয় নয়। নিজের সিদ্ধান্তে সারাক্ষণ শুয়ে থাকার বদলে কোন ধরনের চলাফেরা নিরাপদ, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।

কতক্ষণ এবং কতটা জোরে ব্যায়াম করবেন?

জটিলতাহীন গর্ভাবস্থায় সাধারণ লক্ষ্য হলো সপ্তাহে অন্তত একশ পঞ্চাশ মিনিট মাঝারি মাত্রার বায়বীয় ব্যায়াম। এটি পাঁচ দিনে ত্রিশ মিনিট করে করা যায়, আবার প্রতিদিন কয়েকটি ছোট পর্বেও ভাগ করা যায়।

আগে ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকলে প্রথম দিনেই এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন না। পাঁচ থেকে দশ মিনিট আরামদায়ক হাঁটা দিয়ে শুরু করে সহনশীলতা অনুযায়ী সময় বাড়ান। ক্লান্তি বা বমিভাব বেশি থাকা দিনে সময় কমানো স্বাভাবিক।

কথা বলার সক্ষমতা দিয়ে তীব্রতা বোঝা যায়। মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামে শ্বাস কিছুটা দ্রুত হলেও বাক্য বলে কথা চালিয়ে যেতে পারা উচিত। কথা বলতে কষ্ট হলে গতি কমান বা বিশ্রাম নিন।

সবার জন্য একই সর্বোচ্চ হৃদ্‌স্পন্দনের সংখ্যা নির্ধারণ করা উপযুক্ত নয়। আগের সক্ষমতা, গর্ভকাল এবং শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া বদলায়।

আগে থেকে নিয়মিত দৌড়ানো বা তুলনামূলক জোরালো ব্যায়াম করা কেউ ব্যক্তিগত পরামর্শ অনুযায়ী তা চালিয়ে যেতে পারেন। তবে গর্ভাবস্থা নতুন করে কঠিন প্রশিক্ষণ শুরু বা নিজের সর্বোচ্চ রেকর্ড ভাঙার সময় নয়। লক্ষ্য থাকবে সুস্থতা ও সক্ষমতা বজায় রাখা।

কোন ব্যায়াম বেছে নেবেন এবং কোনগুলো এড়াবেন?

সমতল পথে হাঁটা, সাঁতার, স্থির সাইকেলে ব্যায়াম এবং গর্ভাবস্থার উপযোগী পরিবর্তিত যোগব্যায়াম অনেকের জন্য সুবিধাজনক। পানিতে ব্যায়াম করলে শরীরের ভারের কিছুটা সহায়তা পাওয়া যায়, ফলে পিঠ ও সন্ধিতে চাপ কম লাগতে পারে।

তবে সাঁতারের সব ভঙ্গি সবার জন্য আরামদায়ক নয়। শ্রোণির ব্যথা থাকলে পা বেশি ছড়ানোর ভঙ্গিতে অস্বস্তি বাড়তে পারে। ব্যথা বাড়লে ভঙ্গি বদলান এবং প্রয়োজনে ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নিন।

পড়ে যাওয়া বা পেটে আঘাতের ঝুঁকি আছে এমন কার্যক্রম এড়ান। সংঘর্ষপূর্ণ খেলাধুলা, ঘোড়ায় চড়া, ঝুঁকিপূর্ণ সাইকেল চালানো এবং ভারসাম্য হারানোর সম্ভাবনাযুক্ত কসরত অনুপযুক্ত হতে পারে। পানির নিচে শ্বাসযন্ত্র নিয়ে ডুব দেওয়াও এড়াতে হবে।

হালকা বা উপযুক্ত প্রতিরোধ ব্যবহার করে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করা যায়। এখানে সঠিক ভঙ্গি ও নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাস আটকে প্রবল চাপ দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো ভার তোলা এড়ান।

প্রশিক্ষককে গর্ভাবস্থা ও গর্ভকালের কথা জানান। তলপেট ভার লাগা, প্রস্রাব ঝরা বা শ্রোণিতে ব্যথা হলে শুধু আরও বেশি ব্যায়াম করার চেষ্টা না করে মূল্যায়ন করান।

গর্ভকাল বাড়লে ভঙ্গি ও ভারসাম্যে কী পরিবর্তন দরকার?

পেট বড় হওয়ার সঙ্গে শরীরের ভারকেন্দ্র বদলায়। একই নড়াচড়া আগের তুলনায় অস্বস্তিকর লাগতে পারে এবং ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই স্থিতিশীল জুতা, সমতল মেঝে এবং প্রয়োজনে চেয়ার বা দেয়ালের সহায়তা ব্যবহার করুন।

গর্ভাবস্থায় সন্ধির আশপাশের বন্ধনী তুলনামূলক শিথিল হয়। এজন্য শরীর যত দূর বাঁকানো যায় তত দূর টানার চেষ্টা নিরাপদ নাও হতে পারে। ধীরে, স্বাভাবিক সীমার মধ্যে নড়াচড়া করুন; ব্যথা সহ্য করে প্রসারণ নয়।

গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি থেকে দীর্ঘক্ষণ সমতলে চিৎ হয়ে ব্যায়াম এড়ানো ভালো। বিশেষ করে প্রায় বিশ সপ্তাহের পর বড় জরায়ু প্রধান রক্তনালিতে চাপ দিয়ে হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত ফেরার পরিমাণ কমাতে পারে। এতে মাথা ঘোরা, বমিভাব বা দুর্বলতা হতে পারে।

এ ধরনের ব্যায়ামের পরিবর্তে কাত হয়ে, বসে বা উপযুক্ত হেলান দিয়ে করার ব্যবস্থা নেওয়া যায়। চিৎ অবস্থায় অস্বস্তি হলে সঙ্গে সঙ্গে কাত হয়ে বিশ্রাম নিন।

বিছানা বা মেঝে থেকে ওঠার সময় ধীরে পাশ ফিরে উঠুন। গর্ভকাল বাড়লে আগের ব্যায়াম ছোট পর্বে ভাগ করা বা দৌড়ের বদলে হাঁটা বেছে নেওয়া স্বাভাবিক সমন্বয়।

গরম, পানিশূন্যতা ও খাবার নিয়ে কী সতর্কতা দরকার?

বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় খোলা রোদে ব্যায়াম করলে শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে। সকাল বা বিকেলের তুলনামূলক ঠান্ডা সময়, ছায়াযুক্ত পথ কিংবা বাতাস চলাচল করে এমন ঘর বেছে নিন।

গরম ঘরে যোগব্যায়ামসহ শরীর অতিরিক্ত উত্তপ্ত করে এমন কার্যক্রম এড়ান। হালকা, আরামদায়ক পোশাক পরুন এবং গরম লাগলে বিরতি নিন। প্রচুর ঘাম হওয়াকে ভালো ব্যায়ামের প্রমাণ ভাববেন না।

ব্যায়ামের আগে, মধ্যে ও পরে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করুন। তৃষ্ণা, মুখ শুকানো, মাথাব্যথা বা গাঢ় প্রস্রাব পানির ঘাটতির ইঙ্গিত হতে পারে। তবে রোগের কারণে তরল গ্রহণের সীমা থাকলে ব্যক্তিগত নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে কঠিন ব্যায়াম করবেন না। প্রয়োজনে আগে সহজপাচ্য হালকা খাবার খান; বড় খাবারের পর অস্বস্তি থাকলে কিছু সময় বিরতি দিন। ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার করলে ব্যায়ামের সঙ্গে খাবার ও শর্করা পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা দরকার।

শুরুতে কয়েক মিনিট ধীরে চলাফেরা করে শরীর প্রস্তুত করুন এবং শেষে ধীরে গতি কমান। অসুস্থতা, জ্বর বা অতিরিক্ত দুর্বলতা থাকলে বিশ্রাম নিন।

কোন লক্ষণে সঙ্গে সঙ্গে ব্যায়াম বন্ধ করবেন?

ব্যায়ামে সামান্য শ্বাস দ্রুত হওয়া স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু নতুন বা অস্বাভাবিক উপসর্গ উপেক্ষা করা যাবে না। নিচের লক্ষণ দেখা দিলে ব্যায়াম বন্ধ করে দ্রুত প্রসূতিসেবা প্রদানকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করুন:

  • যোনিপথে রক্তপাত বা পানি ঝরা।
  • নিয়মিত ব্যথাযুক্ত সংকোচন কিংবা তীব্র পেটব্যথা।
  • মাথা ঘোরা, অজ্ঞান লাগা বা ভারসাম্য নষ্ট হওয়া।
  • ব্যায়াম শুরুর আগেই শ্বাসকষ্ট অথবা বিশ্রামেও অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট।
  • বুকব্যথা বা অস্বাভাবিক হৃদ্‌কম্পনের সঙ্গে অসুস্থ লাগা।
  • এক পায়ের পিণ্ডলিতে ব্যথা, ফোলা বা লালচে ভাব।
  • তীব্র মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা অথবা হঠাৎ খুব অসুস্থ বোধ করা।

বুকব্যথা, তীব্র শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা প্রচুর রক্তপাত হলে জরুরি চিকিৎসা নিন। নিজে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করে সহায়তা নিন।

শিশুর স্বাভাবিক নড়াচড়ার ধরন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তা স্পষ্ট কমে গেলে বা বদলে গেলে দ্রুত প্রসূতিসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। ব্যায়াম করে শিশুকে নড়ানোর চেষ্টা বা পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়।

নিরাপদ ব্যায়ামের পরিকল্পনা গর্ভাবস্থার সঙ্গে বদলাবে। নিয়মিত প্রসবপূর্ব পরীক্ষা, আরামদায়ক নড়াচড়া এবং সতর্কসংকেতের দ্রুত মূল্যায়ন—এই সমন্বয়ই মা ও শিশুর সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেয়।