মহামন্দার অবসান ও উত্তরাধিকার: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কেইনসীয় অর্থনীতি ও ব্যাংকিং সংস্কার
সিরিজ: মহামন্দা (১৯২৯): বিশ্ব অর্থনীতির বিপর্যয়
মহামন্দার অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছিল কর্মসংস্থান, রাষ্ট্র ও ব্যাংকিং সম্পর্কে ধারণা।
নিউ ডিল ব্যাংকে আস্থা ফিরিয়েছিল, কাজের সুযোগ তৈরি করেছিল এবং সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তি গড়েছিল। তবু মহামন্দা কীভাবে শেষ হলো, তার উত্তর শুধু এসব সংস্কারে সীমাবদ্ধ নয়। পুনরুদ্ধারের অসম গতি, মুদ্রানীতির পরিবর্তন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপুল সরকারি চাহিদাকে একসঙ্গে দেখতে হয়। মহামন্দার অবসান কোনো এক দিনের ঘটনা ছিল না; উৎপাদন বৃদ্ধি, বেকারত্ব হ্রাস এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরেছিল ভিন্ন গতিতে। এই অভিজ্ঞতা অর্থনৈতিক চিন্তা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় এমন পরিবর্তন আনে, যার প্রভাব যুদ্ধের পরেও বহু দশক ধরে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩৩ সালের পর অর্থনীতি দ্রুত বাড়তে শুরু করলেও বিপর্যয়ের গভীরতা এত বেশি ছিল যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা কঠিন হয়। উৎপাদন আগের উচ্চতা অতিক্রম করলেও বহু মানুষ কাজহীন ছিলেন। সরকারি প্রকল্পে কর্মরত মানুষকে বেকার হিসেবে গণনা করা হবে কি না, তার ওপর ঐতিহাসিক বেকারত্বের হিসাবেও পার্থক্য দেখা যায়। ১৯৩৭–১৯৩৮ সালের নতুন মন্দা দেখিয়ে দেয়, পুনরুদ্ধার তখনো ভঙ্গুর। উৎপাদন পুরোনো মাত্রায় ফিরলেই সম্ভাব্য পূর্ণ উৎপাদন বা পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান অর্জিত হয় না। এর মধ্যে জনসংখ্যা ও শ্রমশক্তিও বেড়েছিল।
দেশভেদে পুনরুদ্ধারের সময় আলাদা ছিল। স্বর্ণমান থেকে আগে বেরিয়ে তুলনামূলক সহজ মুদ্রানীতি গ্রহণ করা অনেক দেশ আগে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। ব্রিটেনে বাড়ি নির্মাণ ও কিছু নতুন শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; যুক্তরাষ্ট্রে অর্থের জোগান বৃদ্ধি ও স্বর্ণপ্রবাহ পুনরুদ্ধারকে সহায়তা করে। জার্মানিতে সরকারি ব্যয় ও পুনরায় অস্ত্রসজ্জা কর্মসংস্থান বাড়ালেও তা স্বৈরতন্ত্র, নিপীড়ন ও যুদ্ধপ্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতিকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের সমার্থক ধরা যায় না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা উৎপাদনের পরিবেশ বদলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশের আগেই মিত্রদেশগুলোর আদেশ এবং নিজের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির জন্য উৎপাদন বাড়ায়। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর সরকারি ব্যয় ও সামরিক সমাবেশ বিপুল আকার নেয়। বিমান, জাহাজ, যানবাহন, অস্ত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জাম তৈরিতে নতুন কারখানা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত শ্রম ও উৎপাদনক্ষমতা সরকারি ক্রয়াদেশের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হয়। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীতে বিপুল মানুষ যোগ দেওয়ায় বেসামরিক শ্রমবাজারও বদলে যায়।
যুদ্ধকালীন উৎপাদনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ে এবং কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকসহ আগে সীমিত সুযোগ পাওয়া জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু নতুন দরজা খোলে। তবে বৈষম্য ও পেশাগত বাধা দূর হয়নি। সামরিক চাহিদা মেটাতে বেসামরিক পণ্যের উৎপাদন সীমিত করা হয়, রেশনিং ও মূল্যনিয়ন্ত্রণ চালু থাকে। তাই মোট উৎপাদনের বৃদ্ধি মানেই পরিবারের অবাধ ভোগের বৃদ্ধি ছিল না। যুদ্ধ বেকারত্ব দূর করার মতো চাহিদা সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু তার মানবিক মূল্য ও সম্পদধ্বংস ছিল অসীম। এই ইতিহাস যুদ্ধকে সমৃদ্ধির কাম্য উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে না।
বরং যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা দেখিয়েছিল, পর্যাপ্ত ব্যয় ও সংগঠনের মাধ্যমে অর্থনীতির অব্যবহৃত সামর্থ্য সক্রিয় করা সম্ভব। যুদ্ধ শেষে সামরিক ব্যয় কমলে আবার মহামন্দা ফিরবে কি না, সেই আশঙ্কা ছিল। কিন্তু পরিবারের জমা সঞ্চয়, দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা কেনাকাটা, বাড়ির চাহিদা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ শান্তিকালীন অর্থনীতিতে রূপান্তরকে সহায়তা করে। রূপান্তর মসৃণ ছিল না; মূল্যস্ফীতি, ধর্মঘট ও উৎপাদনের সমন্বয়সংকট দেখা দেয়। তবু তিরিশের দশকের মতো দীর্ঘ গণবেকারত্ব ফিরে আসেনি। যুদ্ধোত্তর স্থিতিশীলতার জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান ও নীতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই পরিবর্তনের বৌদ্ধিক কেন্দ্রে ছিলেন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে তিনি ব্যাখ্যা করেন, সামগ্রিক চাহিদা অপর্যাপ্ত হলে অর্থনীতি দীর্ঘদিন উচ্চ বেকারত্বে আটকে থাকতে পারে। মজুরি বা সুদ কমলেই সব শ্রমিকের কাজ নিশ্চিত হবে—এমন স্বয়ংক্রিয় সমাধানের ওপর তিনি আস্থা রাখেননি। ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ বিক্রি নিয়ে হতাশ হলে কম সুদেও বিনিয়োগ করতে অনিচ্ছুক হতে পারেন। তাই সমস্যা শুধু উৎপাদনের সামর্থ্যে নয়; উৎপাদিত পণ্য ও সেবা কেনার কার্যকর চাহিদাতেও থাকতে পারে।
কেইনসীয় বিশ্লেষণে একজনের ব্যয় অন্যজনের আয়। মন্দার সময় সবাই একসঙ্গে ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয় বাড়াতে চাইলে ব্যবসার বিক্রি ও মানুষের আয় কমতে পারে। ফলে ব্যক্তিগতভাবে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত সম্মিলিতভাবে সংকট বাড়ায়—এটি সঞ্চয়ের বৈপরীত্য হিসেবে পরিচিত। এই পরিস্থিতিতে সরকার কাজ, অবকাঠামো বা অন্যান্য প্রয়োজনে ব্যয় বাড়িয়ে চাহিদাকে সহায়তা করতে পারে। তবে কেইনসীয় নীতির অর্থ সব সময় সীমাহীন ঋণ ও ব্যয় নয়; অর্থনীতির অবস্থার সঙ্গে নীতি বদলানো। পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি অতিরিক্ত চাহিদা মূল্যস্ফীতির চাপও সৃষ্টি করতে পারে।
নিউ ডিলের সব উদ্যোগকে সরাসরি কেইনসের তত্ত্বের প্রয়োগ বলা ঠিক নয়। অনেক কর্মসূচি তাঁর প্রধান গ্রন্থ প্রকাশের আগেই শুরু হয়েছিল; রুজভেল্টও বিভিন্ন সময় বাজেটের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তবু মহামন্দা ও যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা সরকারি চাহিদা ব্যবস্থাপনার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। যুদ্ধের পরে বহু দেশে কর্মসংস্থানকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৪৬ সালের কর্মসংস্থান আইন এই পরিবর্তনের একটি প্রকাশ। অর্থনৈতিক ওঠানামা সামলাতে বাজেট ও মুদ্রানীতির ব্যবহার ক্রমে রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মিত আলোচনায় স্থান পায়।
সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অংশ। বেকারত্ব ভাতা বা অন্যান্য সহায়তা মন্দায় পরিবারের আয় পুরোপুরি ভেঙে পড়া ঠেকাতে সাহায্য করে। আয় কমলে করের বোঝা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে এবং যোগ্য মানুষের সহায়তা বাড়ে—এ ধরনের ব্যবস্থা অর্থনীতির পতন কিছুটা নরম করতে পারে। মানুষের সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, এই ধারণা শক্তিশালী হয়। যদিও সুবিধার পরিসর, অর্থায়ন ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থেকে যায় এবং সব জনগোষ্ঠী সমান সুরক্ষা পায়নি।
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সবচেয়ে স্থায়ী শিক্ষা ছিল আমানতকারীর আস্থা রক্ষা। আমানত বীমা মানুষকে আতঙ্কে একযোগে অর্থ তুলে নেওয়ার প্রয়োজন কমাতে সাহায্য করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি ঋণদাতা হিসেবে ভূমিকা এবং ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা তদারকির গুরুত্বও স্পষ্ট হয়। সাময়িক নগদসংকটে থাকা ব্যাংক ও প্রকৃতপক্ষে অক্ষম ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি হয়ে ওঠে। তবে বীমা থাকলে ব্যাংক অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে পারে; তাই আমানত সুরক্ষার সঙ্গে পর্যাপ্ত নিজস্ব পুঁজি, তদারকি ও ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান সামলানোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু নিশ্চয়তা দিলেই নিরাপদ ব্যাংকিং তৈরি হয় না।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলন যুদ্ধোত্তর ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের কাঠামো তৈরি হয়; বিনিময় হারকে স্থিতিশীল কিন্তু প্রয়োজনে সমন্বয়যোগ্য রাখার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ডলার স্বর্ণের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এটি যুদ্ধের আগের স্বর্ণমানের হুবহু প্রত্যাবর্তন ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক লেনদেনের সমস্যা সামলাতে সহযোগিতা বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতামূলক সংকোচন এড়ানো। বাণিজ্যেও পরবর্তী বহুপক্ষীয় চুক্তি শুল্ক কমানোর পথ তৈরি করে। মহামন্দা শিখিয়েছিল, প্রত্যেক দেশ একা নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে সবার সংকট বাড়িয়ে তুলতে পারে।
তবে মহামন্দা থেকে শেখা নীতিগুলো ইতিহাসের শেষ কথা ছিল না। পরবর্তী মূল্যস্ফীতি, আর্থিক উদ্ভাবন ও নতুন সংকট দেখিয়েছে, প্রতিটি পরিস্থিতিতে একই সমাধান চলে না। মুদ্রানীতি, সরকারি ব্যয় ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কও বহাল থাকে। তবু ১৯২৯ সালের বিপর্যয়ের মৌলিক শিক্ষা স্পষ্ট: ব্যাংকে আস্থা, পর্যাপ্ত চাহিদা, সামাজিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া উৎপাদনের শক্ত ভিত্তিও ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারে। ওয়াল স্ট্রিটের উচ্ছ্বাস থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিকের শেষে মহামন্দাকে তাই শুধু একটি ধস নয়, রাষ্ট্র, বাজার ও মানুষের নিরাপত্তার সম্পর্ক বদলে দেওয়া ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে দেখতে হয়।
মহামন্দায় আমেরিকার জনজীবন: বেকারত্ব, হুভারভিল ও ডাস্ট বোলের বিপর্যয়
ব্যাংক দেউলিয়া ও মহামন্দা: ১৯৩০–১৯৩৩ সালে সঞ্চয়, ঋণ ও জীবিকার বিপর্যয়
১৯২৯ সালের ওয়াল স্ট্রিট ধস: ব্ল্যাক থার্সডে থেকে ব্ল্যাক টিউসডের ইতিহাস
মহামন্দার পটভূমি: আমেরিকার উত্থান, শেয়ারবাজারে জল্পনা ও ঋণনির্ভর সমৃদ্ধি
বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও জেমস ওয়াট: কয়লা ও বাষ্পশক্তি কীভাবে শিল্পবিপ্লব বদলে দিয়েছিল?
বস্ত্রশিল্পে যন্ত্রের বিপ্লব: স্পিনিং জেনি, ওয়াটার ফ্রেম ও পাওয়ার লুমের ইতিহাস