অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরি: যেভাবে এক কিশোরী হলোকাস্টের……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরি: যেভাবে এক কিশোরী হলোকাস্টের বিশ্বজনীন প্রতীক হয়ে উঠল

সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরি: যেভাবে এক কিশোরী হলোকাস্টের বিশ্বজনীন প্রতীক হয়ে উঠল
থেমে যাওয়া জীবনের অমলিন কণ্ঠস্বর

একটি কিশোরী ঘরের মধ্যে বসে লিখছে। বাইরে দিনের আলো, মানুষের চলাচল, পরিচিত শহরের জীবন। অথচ তার জন্য বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ—কোনো অপরাধের কারণে নয়, ইহুদি হওয়ার কারণে। ঘরের মেঝেতে জোরে পা ফেলাও বিপজ্জনক; নিচের তলায় কেউ শব্দ শুনে ফেলতে পারে। এই বন্দিজীবনের মধ্যে অ্যান ফ্রাঙ্ক লিখেছিল নিজের ভয়, বিরক্তি, ভালো লাগা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। নাৎসিরা তার জীবন শেষ করে দিয়েছিল, কিন্তু তার লেখা কণ্ঠস্বর মুছে দিতে পারেনি। সেই কণ্ঠস্বরই হলোকাস্টকে বোঝার অন্যতম পরিচিত মানবিক দরজা হয়ে উঠেছে।

১৯২৯ সালের ১২ জুন জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে অ্যানের জন্ম। তার বাবা অটো ফ্রাঙ্ক, মা এডিথ এবং বড় বোন মার্গটকে নিয়ে ছিল পরিবার। ১৯৩৩ সালে নাৎসিরা ক্ষমতায় আসার পর ইহুদিবিদ্বেষ ও অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকলে পরিবারটি নেদারল্যান্ডসে চলে যায়। আমস্টারডামে অ্যান নতুন ভাষা শেখে, স্কুলে যায় এবং বন্ধু তৈরি করে। কিন্তু নিরাপদ জীবনের আশা স্থায়ী হয়নি। ১৯৪০ সালের মে মাসে জার্মানি নেদারল্যান্ডস দখল করলে পালিয়ে আসা পরিবারটিও আবার নাৎসি শাসনের অধীনে পড়ে।

দখলদারির পর ইহুদিদের জীবন ধাপে ধাপে সংকুচিত করা হয়। স্কুল, ব্যবসা, চলাচল এবং জনসমাগমের স্থানে প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ আসে। পোশাকে পরিচয়সূচক হলুদ তারা পরতে বাধ্য করা হয়। অ্যানের মতো একটি শিশুর কাছে এসবের অর্থ ছিল পরিচিত জগৎ থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। গণহত্যার ইতিহাস শুধু হত্যাকাণ্ড দিয়ে শুরু হয় না; মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং তাকে সমাজের বাইরে ঠেলে দেওয়ার মধ্যেও তার প্রস্তুতি থাকে। অ্যানের জীবন সেই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ উদাহরণ।

১৯৪২ সালের ১২ জুন তেরোতম জন্মদিনে অ্যান একটি লাল-সাদা খোপকাটা ডায়েরি উপহার পায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার জীবন আমূল বদলে যায়। ৫ জুলাই মার্গটের নামে জার্মানির তথাকথিত শ্রমশিবিরে হাজির হওয়ার নির্দেশ আসে। পরদিন পরিবারটি আত্মগোপনে চলে যায়। আমস্টারডামের প্রিনসেনগ্রাখটের ২৬৩ নম্বরে অটোর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পেছনের অংশে আগে থেকেই আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে সেখানে মোট আটজন ইহুদি মানুষ লুকিয়ে থাকেন।

এই গোপন আবাস কোনো নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছিল না। দিনের বেলা নিচে কর্মীরা থাকায় শব্দ কমাতে হতো, স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা যেত না। খাবার, খবর এবং প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য বাইরের সাহায্যকারীদের ওপর নির্ভর করতে হতো। মিপ গিস, বেপ ফস্কাউল এবং অন্য সহায়কেরা নিজেদের ঝুঁকির মধ্যে রেখে তাঁদের সাহায্য করেছিলেন। সীমিত জায়গায় আটজন মানুষের সহাবস্থানে মনোমালিন্যও হতো। অনিশ্চয়তা, খাদ্যসংকট এবং ধরা পড়ার আশঙ্কা প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনাকেও মানসিকভাবে ভারী করে তুলেছিল।

অ্যানের ডায়েরির বিশেষত্ব হলো, সেখানে শুধু ভয়ের বিবরণ নেই। মায়ের সঙ্গে দূরত্ব, বাবার প্রতি টান, বড়দের আচরণ নিয়ে বিরক্তি, নিজের শরীর ও মন সম্পর্কে কৌতূহল—সবই আছে। পিটার ভান পেলসের প্রতি আকর্ষণ এবং ঘনিষ্ঠতার আকাঙ্ক্ষাও এসেছে। অনেক লেখা সে ‘কিটি’ নামের কল্পিত বন্ধুকে উদ্দেশ করে চিঠির আকারে লিখেছিল। এই ব্যক্তিগত স্বরই অ্যানকে নিছক নিপীড়নের শিকার একটি নাম থেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত করে। পাঠক তার মধ্যে নিজের কৈশোরের পরিচিত অনুভূতি খুঁজে পান।

অ্যান শুধু দিনলিপি লেখেনি; লেখক হওয়ার স্বপ্নও দেখেছিল। গল্প লিখত, বই থেকে পছন্দের বাক্য সংগ্রহ করত এবং নিজের লেখার মান নিয়ে ভাবত। ১৯৪৪ সালের ২৮ মার্চ লন্ডনে অবস্থানরত নেদারল্যান্ডসের নির্বাসিত সরকারের একটি বেতার আহ্বান তাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার দলিল হিসেবে ডায়েরি ও চিঠি সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। মে মাসে অ্যান নিজের লেখাগুলো নতুনভাবে সাজাতে শুরু করে। ব্যক্তিগত নথিকে ভবিষ্যৎ পাঠকের জন্য প্রকাশযোগ্য রচনায় রূপ দেওয়ার সচেতন চেষ্টা ছিল এটি।

এই পুনর্লিখনের ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। অ্যান কোথাও বর্ণনা বিস্তৃত করেছে, কোথাও বাদ দিয়েছে, কোথাও নিজের আগের অনুভূতিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে। বইটির জন্য সে নামও ভেবেছিল—হেট আখটারহাউস, অর্থাৎ বাড়ির পেছনের অংশ বা গোপন আবাস। ফলে ডায়েরিকে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত লেখার সংগ্রহ ভাবলে তার সাহিত্যিক উদ্যোগ আড়াল হয়। অ্যান শুধু ইতিহাসের সাক্ষী ছিল না; নিজের অভিজ্ঞতাকে কীভাবে বলা হবে, সে বিষয়েও চিন্তা করা একজন উদীয়মান লেখক ছিল।

কিন্তু কাজ শেষ করার সুযোগ সে পায়নি। ১৯৪৪ সালের ১ আগস্ট ডায়েরির শেষ লেখা লিখেছিল। ৪ আগস্ট পুলিশ গোপন আবাসে অভিযান চালিয়ে আটজনকেই গ্রেপ্তার করে। অভিযানটি ঠিক কীভাবে ঘটেছিল, তার চূড়ান্ত ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত নয়; নির্দিষ্ট কাউকে নিশ্চিত বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করা যথাযথ হবে না। গ্রেপ্তারের পর তাঁদের ওয়েস্টারবর্ক হয়ে আউশভিৎসে পাঠানো হয়। পরে অ্যান ও মার্গটকে বার্গেন-বেলজেন বন্দিশিবিরে স্থানান্তর করা হয়।

অমানবিক পরিবেশ, খাদ্যের অভাব এবং রোগে সেখানে দুই বোনের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর নির্দিষ্ট দিন জানা যায় না; অ্যান ফ্রাঙ্ক হাউসের গবেষণা ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫-এর দিকে নির্দেশ করে। অ্যানের বয়স তখন পনেরো। তার মা এডিথও আউশভিৎসে মারা যান। গোপন আবাসের আটজনের মধ্যে শুধু অটো ফ্রাঙ্ক যুদ্ধের শেষে বেঁচে ফেরেন। ডায়েরিতে বন্দিশিবিরের এই অভিজ্ঞতা নেই; অ্যানের লেখা যেখানে থেমেছে, তার জীবনের শেষ অধ্যায় জানতে অন্য ঐতিহাসিক প্রমাণের প্রয়োজন হয়।

গ্রেপ্তারের পর মিপ গিস ও বেপ ফস্কাউল অ্যানের খাতা ও আলগা পাণ্ডুলিপির পাতা উদ্ধার করেছিলেন। মিপ সেগুলো সংরক্ষণ করেন এবং পরে অটোর হাতে তুলে দেন। মেয়ের লেখা পড়ে অটো তার চিন্তার গভীরতা নতুনভাবে উপলব্ধি করেন। অ্যানের মূল দিনলিপি, পুনর্লিখিত অংশ এবং কিছু অন্য লেখা মিলিয়ে প্রকাশের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করেন। কিছু ব্যক্তিগত অংশ বাদও দেওয়া হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের জুনে ডাচ ভাষায় বইটি প্রকাশিত হয়; পরবর্তী সংস্করণে পাঠক আরও বিস্তৃত লেখা পড়ার সুযোগ পান।

অনুবাদ, মঞ্চনাটক, চলচ্চিত্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠের মাধ্যমে ডায়েরি বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে পৌঁছায়। ১৯৬০ সালে গোপন আবাসটি জাদুঘর হিসেবে খুলে দেওয়া হয়। বইটির শক্তি ছিল বৃহৎ ঐতিহাসিক বিপর্যয়কে একটি মানুষের দৈনন্দিন অনুভূতির মাধ্যমে উপলব্ধি করানো। প্রায় ষাট লাখ ইহুদিকে হত্যার পরিসংখ্যানের সামনে পাঠক কখনো অসহায় বোধ করতে পারেন; অ্যানের লেখায় তিনি বুঝতে পারেন, সেই সংখ্যার প্রতিটি মানুষেরও আলাদা সম্পর্ক, অভ্যাস এবং অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ ছিল।

তবে অ্যানকে বিশ্বজনীন প্রতীক করতে গিয়ে তার ইহুদি পরিচয় ও নাৎসি গণহত্যার নির্দিষ্ট ইতিহাস মুছে দেওয়া উচিত নয়। শুধু আশাবাদের কয়েকটি বাক্যে তার জীবনকে সীমিত করাও অসম্পূর্ণ পাঠ। তার ডায়েরিতে আশা আছে, কিন্তু আতঙ্ক, ক্ষোভ এবং গভীর অনিশ্চয়তাও আছে। অ্যানের লেখার বেঁচে থাকা মানবিক স্মৃতির শক্তি; অ্যানের নিজের বাঁচতে না পারা সভ্যতার ভয়াবহ ব্যর্থতা। এই দুটো সত্য একসঙ্গে মনে রাখলেই তার ডায়েরি যথার্থ অর্থে ঘৃণা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে।