হেনরিয়েটা ল্যাকস: অজান্তে নেওয়া যে কোষ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দিল
সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা
হিলা কোষের পেছনে এক নারীর বিস্মৃত জীবন
১৯৫১ সালে বাল্টিমোরের জনস হপকিনস হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন পাঁচ সন্তানের মা হেনরিয়েটা ল্যাকস। তাঁর অস্বাভাবিক রক্তপাত হচ্ছিল। পরীক্ষায় ধরা পড়ল জরায়ুমুখের ক্যানসার। তিনি চেয়েছিলেন সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরতে। কিন্তু চিকিৎসার সময় তাঁর শরীর থেকে নেওয়া কিছু কোষ এমন এক যাত্রা শুরু করল, যার কথা তিনি কোনো দিন জানতে পারেননি। হেনরিয়েটা মারা গেলেও তাঁর ক্যানসার কোষের বংশধারা গবেষণাগারে বেঁচে রইল। সেই কোষই পরবর্তী কয়েক দশকে রোগ, ওষুধ ও মানবদেহ সম্পর্কে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করেছে।
হেনরিয়েটার পরিচয় অবশ্য একটি পরীক্ষাগারের নমুনার চেয়ে অনেক বড়। তিনি ছিলেন আফ্রিকান-আমেরিকান নারী, স্ত্রী এবং মা; তাঁর জীবনের কেন্দ্র ছিল সন্তান ও সংসার। তিনি যে যুক্তরাষ্ট্রে বাস করতেন, সেখানে বর্ণবৈষম্য হাসপাতালের ব্যবস্থাপনাতেও গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসার সুযোগ সীমিত ছিল। জনস হপকিনস তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া অল্প কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের একটি হলেও, সেই সুযোগ রোগী ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার অসমতা দূর করেনি।
তাঁর জরায়ুমুখের টিউমার থেকে সংগৃহীত কোষ পৌঁছেছিল গবেষক জর্জ গের পরীক্ষাগারে। চিকিৎসার প্রয়োজনের পাশাপাশি গবেষণার জন্যও নমুনা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেই গবেষণার বিষয়ে হেনরিয়েটার অনুমতি নেওয়া হয়নি। তাঁকে জানানোও হয়নি, শরীরের বাইরে তাঁর কোষ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। চিকিৎসা গ্রহণের সম্মতি এবং গবেষণায় অংশগ্রহণের সম্মতি এক বিষয় নয়। অথচ তৎকালীন চিকিৎসাব্যবস্থায় এই পার্থক্যকে আজকের মতো গুরুত্ব দেওয়া হতো না।
মানবকোষ শরীরের বাইরে দীর্ঘদিন জীবিত রাখা তখন গবেষকদের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। উপযুক্ত পুষ্টি ও পরিবেশ দেওয়ার পরও অধিকাংশ নমুনা দ্রুত মারা যেত। হেনরিয়েটার টিউমার কোষ অন্য রকম আচরণ করল। সেগুলো শুধু টিকে থাকল না, দ্রুত সংখ্যায় বাড়তে লাগল। অনুকূল পরিবেশে প্রায় বিশ থেকে চব্বিশ ঘণ্টায় কোষের সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারত। তাঁর ইংরেজি নামের দুই অংশের প্রথম দুটি অক্ষর মিলিয়ে কোষধারাটির নাম রাখা হলো হিলা।
হিলা পরিচিত হয় প্রথম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত, অবিরাম বংশবিস্তারক্ষম মানবকোষধারা হিসেবে। এখানে ‘অমর’ শব্দটির অর্থ বোঝা জরুরি। কোনো একটি কোষ চিরকাল অক্ষত থাকে না; বরং কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম তৈরি হতে থাকে। পর্যাপ্ত খাদ্য, উপযুক্ত তাপমাত্রা এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ পেলে এই ধারাকে দীর্ঘদিন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। হেনরিয়েটার ব্যক্তিসত্তা গবেষণাগারে বেঁচে নেই; বেঁচে আছে তাঁর টিউমার থেকে উদ্ভূত কোষের ধারাবাহিক প্রজন্ম।
এই বৈশিষ্ট্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সুযোগ এনে দেয়। আগে একটি পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই কোষ মারা যেতে পারত; এখন একই উৎসের কোষ দিয়ে বারবার পরীক্ষা করা সম্ভব হলো। এক গবেষণাগারের ফলাফল অন্য গবেষণাগারে যাচাই করার সুযোগও বাড়ল। গবেষকেরা কোষ ভাগ করে সহকর্মীদের দিতে পারলেন, সংরক্ষণ করতে পারলেন এবং বড় পরিসরে উৎপাদন করতে পারলেন। ফলে মানুষের শরীরে সরাসরি পরীক্ষা চালানোর আগে জীবন্ত মানবকোষে কোনো পদার্থ বা সংক্রমণের প্রাথমিক প্রভাব পর্যবেক্ষণের পথ অনেক সহজ হলো।
পোলিও গবেষণায় হিলা কোষের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পোলিও শিশুদের পঙ্গুত্ব ও মৃত্যুর বড় কারণ ছিল। ভাইরাসের আচরণ বুঝতে এবং টিকা-সংক্রান্ত পরীক্ষায় প্রচুর জীবন্ত কোষের প্রয়োজন হতো। হিলা কোষে পোলিও ভাইরাস বংশবিস্তার করতে পারায় গবেষকেরা একটি কার্যকর পরীক্ষামাধ্যম পান। তবে হেনরিয়েটার কোষ থেকেই পোলিও টিকা তৈরি হয়েছিল—এমন বক্তব্য সঠিক নয়। হিলা ছিল টিকা উন্নয়ন ও মূল্যায়নের বৃহত্তর গবেষণাপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক, বহু বিজ্ঞানীর কাজের বিকল্প নয়।
ক্যানসার গবেষণাতেও এই কোষ নতুন দরজা খুলে দেয়। কোষ কীভাবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ে, বিকিরণ তার ওপর কী প্রভাব ফেলে এবং কোনো রাসায়নিক পদার্থ বিভাজনের গতি কমায় কি না—এসব প্রশ্ন পরীক্ষা করা সহজ হয়। জরায়ুমুখের ক্যানসারের সঙ্গে মানব প্যাপিলোমা ভাইরাসের সম্পর্ক বোঝার গবেষণাতেও হিলা ব্যবহৃত হয়েছে। যে রোগ হেনরিয়েটার জীবন কেড়ে নিয়েছিল, সেই রোগের জীববিজ্ঞান বোঝার কাজে তাঁর কোষের অংশগ্রহণ ইতিহাসের এক গভীর বেদনাময় বৈপরীত্য।
কোষের বার্ধক্য বোঝার ক্ষেত্রেও হিলা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামাধ্যম হয়েছে। আমাদের বংশগত উপাদান বহনকারী ক্রোমোজোমের প্রান্তে থাকে সুরক্ষামূলক অংশ, যাকে টেলোমিয়ার বলা হয়। সাধারণ কোষের পুনঃপুন বিভাজনের সঙ্গে এই অংশের পরিবর্তন জড়িত। টেলোমারেজ নামের একটি উৎসেচক সেই প্রান্ত রক্ষণাবেক্ষণে সাহায্য করে। হিলাসহ বিভিন্ন গবেষণামাধ্যম ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান বাড়িয়েছেন। এর ফলে কোষের বিভাজনক্ষমতা, বার্ধক্য এবং ক্যানসারের মধ্যে সম্পর্ক অনুসন্ধানের ভিত্তি আরও শক্ত হয়েছে।
তবে হিলা কোষ মানবদেহের সম্পূর্ণ প্রতিরূপ নয়। এগুলো ক্যানসার কোষ; স্বাভাবিক সুস্থ কোষের সঙ্গে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। শরীরের ভেতরে রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা, বিভিন্ন অঙ্গ এবং অসংখ্য সংকেত একসঙ্গে কাজ করে, যা পরীক্ষাপাত্রে অনুপস্থিত। তাই হিলায় কোনো পদার্থ কার্যকর হলেই মানুষের চিকিৎসায় সেটি নিরাপদ বা কার্যকর হবে না। একটি শক্তিশালী গবেষণামাধ্যমের মূল্য বুঝতে হলে তার সীমাবদ্ধতাও বুঝতে হয়। হিলা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথ খুলেছে, চূড়ান্ত উত্তর একাই দেয়নি।
অথচ এই বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার শুরুতে হেনরিয়েটা নিজেই ছিলেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। ক্যানসারের চিকিৎসা সফল হয়নি; ১৯৫১ সালের ৪ অক্টোবর মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাঁর কোষ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও পরিবার দীর্ঘদিন তার গুরুত্ব জানত না। গবেষণার উপকরণ হিসেবে কোষের সহজলভ্যতা এবং সেই কোষের উৎস মানুষের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব পাশাপাশি চলেছে। এখানেই তাঁর ইতিহাস শুধু আবিষ্কারের গল্প থেকে অধিকার ও জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত হয়।
হেনরিয়েটার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে গবেষণার অনুমতি, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং লাভের ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্ন আলাদা করে দেখা দরকার। জনস হপকিনসের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি হিলা কোষ বিক্রি করেনি এবং কোষধারাটির মালিকানাও দাবি করে না। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি লাভ করেনি বললেই সম্মতিহীন ব্যবহারের নৈতিক সমস্যা মিটে যায় না। একজন মানুষ তাঁর শরীরের নমুনা কোথায় যাবে এবং কী কাজে ব্যবহৃত হবে, তা জানার সুযোগ পাবেন কি না—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
২০১৩ সালে হিলার পূর্ণাঙ্গ বংশগত তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও ল্যাকস পরিবারের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট তথ্য ব্যবহারের আবেদন মূল্যায়নে পরিবারের প্রতিনিধিত্ব যুক্ত হয়। এটি বিশ্বের সব হিলা গবেষণার ওপর পরিবারের সার্বিক অনুমতির ব্যবস্থা নয়; মূল বিষয় ছিল বংশগত তথ্যের প্রবেশাধিকার ও গোপনীয়তা। হেনরিয়েটার উত্তরাধিকার তাই দ্বিমুখী: তাঁর কোষ চিকিৎসাবিজ্ঞানকে এগিয়েছে, আর তাঁর জীবন মনে করিয়েছে, গবেষণার প্রতিটি নমুনার পেছনে একজন মানুষ আছেন—যাঁর মর্যাদা বৈজ্ঞানিক সাফল্যের অংশ হওয়া উচিত।
অ্যাপোম্যাটক্সে লির আত্মসমর্পণ ও লিংকন হত্যাকাণ্ড: ১৮৬৫
শেরম্যানের আটলান্টা অভিযান ও মার্চ টু দ্য সি: দক্ষিণের বিপর্যয়
গ্রান্ট বনাম লি: ওভারল্যান্ড অভিযান ও পিটার্সবার্গের অবরোধ
ব্যাবিলনের হাম্মুরাবি রাজবংশ: আইন, সাম্রাজ্য ও ক্ষমতার ইতিহাস
আক্কাদীয় রাজবংশ: সারগনের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও পতনের ইতিহাস
প্রাচীন মিশরের ফারাও রাজবংশ: নারমার থেকে ক্লিওপেট্রার উত্থান-পতন