বিশ্বজুড়ে মহামন্দার বিস্তার: বাণিজ্যের পতন… | এসো-জানি

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বিশ্বজুড়ে মহামন্দার বিস্তার: বাণিজ্যের পতন, স্বর্ণমান ও স্মুট-হলি শুল্ক আইন

সিরিজ: মহামন্দা (১৯২৯): বিশ্ব অর্থনীতির বিপর্যয়

বিশ্বজুড়ে মহামন্দার বিস্তার: বাণিজ্যের পতন, স্বর্ণমান ও স্মুট-হলি শুল্ক আইন
ঋণ, স্বর্ণ ও বাণিজ্যের যোগসূত্রে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়।

আমেরিকার ক্ষুধার সারি, হুভারভিলের অস্থায়ী ঘর এবং ধুলিঝড়ে বিপর্যস্ত খামারের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই সংকটের সীমানা যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে শেষ হয়নি। আমেরিকার ক্রেতা কেনাকাটা কমালে দূরদেশের রপ্তানিকারক ক্ষতিগ্রস্ত হতেন; আমেরিকান ঋণ বন্ধ হলে ইউরোপের ব্যাংক ও ব্যবসা চাপে পড়ত। মহামন্দা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েছিল বাণিজ্য, ঋণ ও মুদ্রাব্যবস্থার পারস্পরিক যোগসূত্র দিয়ে। সব অঞ্চলে একই সময়ে বা সমান তীব্রতায় বিপর্যয় আসেনি, কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থনীতির দুর্বল সম্পর্কগুলো স্থানীয় সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে গড়ে ওঠা ঋণব্যবস্থা ছিল এই সংক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ পথ। জার্মানি বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করছিল; ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ওপর ছিল আমেরিকাকে যুদ্ধঋণ পরিশোধের দায়। বিশের দশকে আমেরিকান পুঁজি ইউরোপের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সাহায্য করেছিল। কিন্তু সেই অর্থায়নের একটি অংশ ছিল স্বল্পমেয়াদি, অথচ তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাজ চলত। ঋণদাতারা নতুন ঋণ না দিলে কিংবা পুরোনো অর্থ ফেরত চাইলে ঋণগ্রহীতার হাতে দ্রুত বিকল্প থাকত না। ১৯২৯ সালের আগেই আমেরিকান বিদেশি ঋণপ্রবাহ দুর্বল হতে শুরু করেছিল; পরবর্তী ধস সেই চাপ বাড়ায়।

জার্মানির ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা বিশেষ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বিদেশি পুঁজির প্রবাহ কমার সঙ্গে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রপ্তানির বাজার দুর্বল হলে আয় কমে এবং বেকারত্ব বাড়ে। ১৯৩১ সালে অস্ট্রিয়ার ক্রেডিট-আনস্টাল্টের সংকট ইউরোপীয় ব্যাংকব্যবস্থায় উদ্বেগ ছড়ায়; জার্মানিতেও আমানত প্রত্যাহার ও আর্থিক অস্থিরতা তীব্র হয়। সীমান্ত পেরিয়ে পুঁজি চলাচল সমৃদ্ধির সময় অর্থায়ন দিয়েছিল, কিন্তু আতঙ্কের সময় দ্রুত অর্থ প্রত্যাহারের পথও খুলে রেখেছিল। ফলে ব্যাংকের ক্ষতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও উৎপাদনের পতন একসঙ্গে দেখা দেয়।

এই পরিস্থিতিকে কঠোর করে রেখেছিল স্বর্ণমান ব্যবস্থা। এতে অংশগ্রহণকারী দেশের মুদ্রার মূল্য নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণের সঙ্গে যুক্ত থাকত। মুদ্রার সেই নির্ধারিত মূল্য রক্ষার জন্য সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বর্ণের মজুত এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের দিকে নজর রাখতে হতো। কোনো দেশ থেকে স্বর্ণ বেরিয়ে গেলে সুদ বাড়ানো, ঋণ সীমিত করা কিংবা অভ্যন্তরীণ ব্যয় কমানোর চাপ তৈরি হতো। কিন্তু মন্দার মধ্যে এসব পদক্ষেপ উৎপাদন ও কর্মসংস্থান আরও কমাতে পারত। মুদ্রার মূল্য রক্ষার নীতি অনেক সময় মানুষের আয় ও চাকরি রক্ষার প্রয়োজনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

স্বর্ণমানের সমস্যা শুধু স্বর্ণের ঘাটতি ছিল না; আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের অভাবও ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সে বিপুল স্বর্ণ জমা হলেও সেই মজুতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্বব্যাপী চাহিদা ও ঋণ বাড়েনি। ঘাটতিতে থাকা দেশগুলো সংকোচনের চাপ বহন করছিল, অথচ উদ্বৃত্ত দেশগুলোর ওপর সমপরিমাণ সম্প্রসারণের বাধ্যবাধকতা ছিল না। এভাবে মূল্যপতন ও অর্থসংকোচনের প্রবণতা ছড়ায়। ব্রিটেন ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বরে স্বর্ণমান ছাড়ে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও তুলনামূলক সহজ আর্থিক নীতির সুযোগ তার পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে। তবে স্বর্ণমান ছাড়লেই সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হয়নি।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পতন ছিল আরেকটি প্রধান আঘাত। বেকার আমেরিকান পরিবার কম পোশাক কিনলে বিদেশি কাঁচামালের চাহিদা কমতে পারত; ইউরোপের কারখানা উৎপাদন কমালে আমদানিকৃত তামা, রাবার ও খাদ্যের বাজার সংকুচিত হতো। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে বিশ্ববাণিজ্যের অর্থমূল্য প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে যায়। তবে বাণিজ্যের অর্থমূল্য ও পণ্যের বাস্তব পরিমাণ এক নয়। এই পতনের বড় অংশ এসেছিল দাম কমা থেকে; পণ্যের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। রপ্তানিকারকের জন্য উভয় পরিবর্তনই বিপজ্জনক—কম পণ্য বিক্রি হচ্ছিল, আর বিক্রি হওয়া পণ্যেও কম আয় মিলছিল।

এই সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৩০ সালের জুনে স্মুট-হলি শুল্ক আইন কার্যকর করে। সেনেটর রিড স্মুট ও প্রতিনিধি উইলিস হলির নামযুক্ত আইনটি বহু আমদানিপণ্যের শুল্ক বাড়ায়। কৃষকদের সুরক্ষার উদ্যোগ হিসেবে শুরু হলেও আইন তৈরির প্রক্রিয়ায় বহু শিল্পখাত নিজেদের জন্য সুরক্ষা আদায় করে। সমর্থকেরা আশা করেছিলেন, বিদেশি প্রতিযোগিতা কমলে দেশীয় উৎপাদক উপকৃত হবেন। কিন্তু স্মুট-হলি মহামন্দার সূচনা ঘটায়নি—মন্দা আগেই শুরু হয়েছিল। আইনটি সংকটের মধ্যে বাণিজ্য বাধা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও রপ্তানির পরিবেশ আরও খারাপ করে।

কানাডাসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক অংশীদার পাল্টা শুল্ক আরোপ করে বা অন্য বাজারের দিকে ঝোঁকে। তবে সব দেশের সব বিধিনিষেধকে শুধু স্মুট-হলির প্রতিক্রিয়া বলা ঠিক নয়। নিজস্ব রাজনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার অভাব ও দেশীয় উৎপাদক রক্ষার চেষ্টাও শুল্ক, আমদানি কোটা এবং মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়। দাম কমার সময় নির্দিষ্ট অঙ্কের শুল্ক পণ্যমূল্যের তুলনায় আরও ভারী হয়ে উঠত। এক দেশ আমদানি কমিয়ে নিজের বাজার বাঁচাতে চাইলে অন্য দেশের রপ্তানি ও আয় কমত। সেই দেশও একই পথ নিলে সবার বাজার সংকুচিত হতো।

ইউরোপের অভিজ্ঞতা তাই একরকম ছিল না। জার্মানির বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা ও কঠোর সংকোচন গভীর বেকারত্ব তৈরি করে। ব্রিটেনের পুরোনো শিল্পাঞ্চল—কয়লা, জাহাজ নির্মাণ ও কিছু ভারী শিল্প—বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যদিও অন্য অঞ্চলে পরে নতুন শিল্প ও বাড়ি নির্মাণ পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখে। ফ্রান্স তুলনামূলক দেরিতে গভীর সংকটে পড়ে এবং দীর্ঘদিন স্বর্ণমান ধরে রাখে। একই বিশ্বমন্দার মধ্যে নীতি, শিল্পকাঠামো ও মুদ্রাব্যবস্থার পার্থক্য দেশগুলোর পতন ও পুনরুদ্ধারের গতিকে বদলে দিয়েছিল।

এশিয়ায় সংকটের একটি প্রধান পথ ছিল কৃষি ও কাঁচামালের দাম। ঔপনিবেশিক ভারতের কৃষক কম দামে ফসল বিক্রি করলেও খাজনা, কর ও ঋণের দায় একই অনুপাতে কমেনি। বাংলার পাটচাষি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করতেন; পাটের দাম কমলে তাঁর নগদ আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এতে শুধু কৃষকের ক্রয়ক্ষমতা নয়, গ্রামের দোকানদার, কারিগর ও পরিবহনকর্মীর আয়ও কমত। দূরের শিল্পবাজারে চাহিদা কমার ফল গ্রামের ঋণ ও সংসারের হিসাবেও পৌঁছে যাচ্ছিল।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাবার ও টিন উৎপাদক অঞ্চলগুলোও বিশ্বচাহিদার পতনে আঘাত পায়। জাপানের কাঁচা রেশমের গুরুত্বপূর্ণ বাজার ছিল যুক্তরাষ্ট্র; সেখানে চাহিদা ও দাম কমায় রেশমচাষী পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাপান ১৯৩১ সালের শেষ দিকে স্বর্ণমান ত্যাগ করার পরে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও সম্প্রসারণমূলক নীতির মাধ্যমে তুলনামূলক দ্রুত পুনরুদ্ধারের পথে যায়। চীন তখন প্রধানত রৌপ্যভিত্তিক মুদ্রাব্যবস্থায় থাকায় প্রথম দিকে কিছু ভিন্ন সুবিধা পেয়েছিল। ফলে এশিয়াকেও এক ধরনের অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে ফেলা যায় না।

লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বহু অঞ্চলে কয়েকটি রপ্তানিপণ্যের ওপর নির্ভরতা বিপর্যয় বাড়ায়। ব্রাজিলের কফি, চিলির তামা ও নাইট্রেট, কিংবা আফ্রিকার খনিজ ও কৃষিপণ্যের দাম কমলে বৈদেশিক আয় এবং সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমদানি কেনা ও বিদেশি ঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও ঋণ পরিশোধ স্থগিত হয়, কোথাও আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় শিল্প গড়ার উদ্যোগ বাড়ে। ঔপনিবেশিক অঞ্চলে উৎপাদন ও বাণিজ্যনীতির সিদ্ধান্তে স্থানীয় মানুষের সীমিত ক্ষমতা থাকায় দুর্দশা সামলানোর সুযোগও সংকীর্ণ ছিল।

বিশ্বজুড়ে এই বিপর্যয় দেখায়, কোনো দেশের আমদানি অন্য দেশের আয়, আর কোনো দেশের ঋণদাতার নিরাপত্তা অন্য দেশের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। স্বর্ণমানের কঠোরতা, বাণিজ্য বাধা ও ঋণ প্রত্যাহার সেই সম্পর্কগুলোকে সংকট ছড়ানোর মাধ্যমে পরিণত করেছিল। মহামন্দা বিশ্বায়িত অর্থনীতির যোগসূত্র ভাঙেনি; দেখিয়েছিল সহযোগিতা ব্যর্থ হলে সেই যোগসূত্র দিয়েই বিপর্যয় ছড়ায়। তার প্রতিক্রিয়ায় কোথাও সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষার দাবি শক্তিশালী হয়, কোথাও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও চরমপন্থা মাথা তোলে। অর্থনৈতিক সংকট ক্রমেই বিশ্বরাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের শক্তিতে পরিণত হচ্ছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে