র‍্যাচেল কারসন ও সাইলেন্ট স্প্রিং: যে বই পরিবেশ… | এসো-জানি

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

র‍্যাচেল কারসন ও সাইলেন্ট স্প্রিং: যে বই পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাস বদলে দিল

সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

র‍্যাচেল কারসন ও সাইলেন্ট স্প্রিং: যে বই পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাস বদলে দিল
একটি বই, প্রকৃতির পক্ষে এক ঐতিহাসিক জাগরণ

বসন্ত এসেছে, কিন্তু পাখির গান নেই। গাছে নতুন পাতা, চারপাশে পরিচিত ঘরবাড়ি, অথচ বাতাসে অস্বাভাবিক নীরবতা। র‍্যাচেল কারসনের সাইলেন্ট স্প্রিং শুরু হয় এমন এক কাল্পনিক জনপদের ছবি দিয়ে। সেখানে বিপর্যয়ের কারণ কোনো যুদ্ধ কিংবা অজানা অভিশাপ নয়; মানুষের নিজের কাজ। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত বইটি পাঠককে এমন একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছিল, যা উন্নতির উচ্ছ্বাসে অনেকেই এড়িয়ে যাচ্ছিলেন: পোকা মারার জন্য ছড়ানো বিষ যদি পাখি, মাছ, মাটি এবং মানুষের জীবনেও পৌঁছায়, তবে সেই অগ্রগতির প্রকৃত মূল্য কত?

কারসনের আগে পরিবেশ রক্ষার চিন্তা ছিল না, এমন নয়। বন সংরক্ষণ, বন্য প্রাণী রক্ষা এবং শিল্পদূষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। তাঁর অসাধারণ অবদান ছিল বিচ্ছিন্ন উদ্বেগগুলোকে জীবজগতের পারস্পরিক সম্পর্কের আলোকে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করা। প্রকৃতি শুধু দূরের অরণ্য কিংবা বেড়ানোর জায়গা নয়; খাবার, পানীয় জল, কৃষিজমি এবং মানুষের শরীরও একই ব্যবস্থার অংশ। এই উপলব্ধিকে বৃহত্তর জনআলোচনায় নিয়ে এসে বইটি আধুনিক পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হয়ে ওঠে।

১৯০৭ সালের ২৭ মে পেনসিলভানিয়ার স্প্রিংডেলে জন্ম নেওয়া কারসনের শৈশব কেটেছিল গ্রামীণ প্রকৃতির মধ্যে। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি আকর্ষণ ছিল। কলেজে প্রথমে ইংরেজি নিয়ে পড়লেও পরে জীববিজ্ঞানে মন দেন। ১৯৩২ সালে জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর মধ্যে বিজ্ঞানী ও লেখক দুটি পরিচয় পাশাপাশি গড়ে উঠেছিল। ফলে তিনি গবেষণার জটিল বিষয় বুঝতে পারতেন, আবার সেই বিষয় এমনভাবে লিখতে পারতেন, যাতে বিশেষজ্ঞ নন এমন পাঠকও তার তাৎপর্য অনুভব করেন।

১৯৩৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব ফিশারিজে জীববিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দেওয়ার পর তাঁর কাজের বড় অংশ হয়ে ওঠে বৈজ্ঞানিক তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। পরবর্তী সময়ে তিনি মৎস্য ও বন্য প্রাণীবিষয়ক সরকারি সংস্থার প্রকাশনার প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৫১ সালে প্রকাশিত সমুদ্রবিষয়ক বই দ্য সি অ্যারাউন্ড আস তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এর সাফল্যে পরের বছর সরকারি চাকরি ছেড়ে পূর্ণসময়ের লেখালেখিতে মন দিতে পারেন। সুতরাং সাইলেন্ট স্প্রিং কোনো আকস্মিক আবেগের ফল ছিল না; এর পেছনে ছিল দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক ও লেখকজীবনের প্রস্তুতি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের পৃথিবীতে রাসায়নিক কীটনাশককে আধুনিকতার শক্তিশালী হাতিয়ার মনে করা হতো। ডিডিটি ম্যালেরিয়া ও টাইফাসের মতো রোগ বহনকারী পতঙ্গ দমনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। কৃষিক্ষেত্রেও ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ে। এই সাফল্যের কারণে বড় এলাকাজুড়ে রাসায়নিক ছড়ানোকে অনেক সময় সহজ সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু কোনো পদার্থ লক্ষ্য করা পোকাটিকে মারে কি না, সেই প্রশ্নের তুলনায় ছড়ানোর পরে সেটি কোথায় যায় এবং আর কী ক্ষতি করে, সেই প্রশ্ন অনেক কম গুরুত্ব পাচ্ছিল।

কারসন এই উপেক্ষিত পরিণতিগুলোর দিকে মনোযোগ দেন। তিনি বিভিন্ন গবেষণাপত্র, সরকারি প্রতিবেদন এবং বিশেষজ্ঞদের তথ্য সংগ্রহ করে দেখান, রাসায়নিকের প্রভাব ছড়ানোর স্থানেই শেষ হয় না। বৃষ্টির সঙ্গে তা জলাশয়ে যেতে পারে, মাটিতে থেকে যেতে পারে কিংবা জীবদেহে প্রবেশ করতে পারে। কোনো এলাকায় একটি বিশেষ পোকাকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হলেও সেখানকার উপকারী পতঙ্গ, মাছ ও পাখি একই রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতে পারে। প্রকৃতির জটিল সম্পর্কের মধ্যে একটি জীবকে সম্পূর্ণ আলাদা করে আঘাত করার ধারণাটিই তাই সমস্যাপূর্ণ।

ডিডিটির মতো কিছু দীর্ঘস্থায়ী পদার্থের ক্ষেত্রে উদ্বেগ আরও গভীর। এগুলো সহজে ভাঙে না এবং প্রাণীর চর্বিযুক্ত কলায় জমতে পারে। দূষিত খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে এক জীব থেকে অন্য জীবে পৌঁছানোর সুযোগ থাকে। খাদ্যসম্পর্কের বিভিন্ন ধাপে কিছু পদার্থের ঘনত্ব বাড়তেও পারে। এর অর্থ, সরাসরি স্প্রে না লাগলেও কোনো প্রাণী ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কারসন পাঠককে বুঝিয়েছিলেন, দূষণের ঠিকানা কেবল ক্ষেতের বেড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের তৈরি প্রশাসনিক সীমানা জীবজগতের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে না।

তাঁর যুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কীটনাশকের কার্যকারিতার সীমা। একই রাসায়নিক বারবার ব্যবহার করলে প্রতিরোধক্ষম পোকা টিকে থেকে নতুন প্রজন্ম তৈরি করতে পারে। ফলে আগের পদ্ধতি ক্রমে কম কার্যকর হয়ে ওঠে। পাশাপাশি নির্বিচার প্রয়োগে ক্ষতিকর পোকার প্রাকৃতিক শত্রুও মারা যেতে পারে। তখন সাময়িক সাফল্যের পরে নতুন সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রশ্নটি তাই শুধু বিষের ক্ষতি নিয়ে ছিল না; দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য কোন পদ্ধতি সত্যিই টেকসই, সেটিও ছিল আলোচনার কেন্দ্রে।

কারসন সব ধরনের কীটনাশক অবিলম্বে নিষিদ্ধ করার দাবি জানাননি। রোগবাহী পতঙ্গ কিংবা ফসলের ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন তিনি অস্বীকার করেননি। তাঁর আপত্তি ছিল পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ছাড়া, নির্বিচারে এবং পরিবেশগত পরিণতি উপেক্ষা করে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে। তিনি আরও গবেষণা, সতর্ক সিদ্ধান্ত এবং জীববৈজ্ঞানিক বিকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর অবস্থানকে শুধু ‘রাসায়নিকবিরোধিতা’ বললে বক্তব্যের মূল অংশ হারিয়ে যায়। তিনি চেয়েছিলেন কার্যকারিতার পাশাপাশি ক্ষতি, বিকল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলও সিদ্ধান্তে গুরুত্ব পাক।

১৯৬২ সালের জুনে বইটির অংশ দ্য নিউ ইয়র্কার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়; পরে বই আকারে বেরিয়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। রাসায়নিক শিল্পের একাংশ তাঁর যুক্তি এবং বিশ্বাসযোগ্যতাকে আক্রমণ করে। পোকা নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে খাদ্য উৎপাদন ও রোগ প্রতিরোধ বিপন্ন হবে—এমন আশঙ্কাও সামনে আনা হয়। বিতর্কের মধ্যে কারসনের শক্তি ছিল তাঁর তথ্যভিত্তিক উপস্থাপন। তিনি পাঠককে কেবল ভয় দেখাননি; বিশেষজ্ঞদের আলোচনার বাইরে থাকা মানুষকেও বুঝিয়েছিলেন, তাঁদের চারপাশে নেওয়া প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে।

এই প্রকাশ্য লড়াইয়ের সময় ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। স্তন ক্যানসার, অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা তাঁর কাজকে বাধাগ্রস্ত করছিল। তবু পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের পক্ষে কথা বলা থামাননি। ১৯৬৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের একটি কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেন। তাঁর দৃঢ়তা দেখায়, বৈজ্ঞানিক যোগাযোগ শুধু তথ্য সরবরাহ নয়; কখনো প্রতিষ্ঠিত স্বার্থের বিরুদ্ধেও সেই তথ্যের তাৎপর্য স্পষ্ট করে বলা। অসুস্থতার মধ্যেও তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৯৬৪ সালের ১৪ এপ্রিল কারসন মারা যান। তিনি ১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা প্রতিষ্ঠা কিংবা ১৯৭২ সালে ডিডিটির অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত দেখে যেতে পারেননি। এসব পরিবর্তন বহু গবেষক, নাগরিক আন্দোলন, শুনানি এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল; একটি বইয়ের সরাসরি নির্দেশে ঘটেনি। তবে সাইলেন্ট স্প্রিং যে জনসচেতনতা জাগিয়েছিল, তা পরিবর্তনের দাবিকে শক্তিশালী করেছিল। কারসনের স্থায়ী অবদান এখানেই: তিনি মানুষকে শিখিয়েছিলেন, প্রকৃতির ক্ষতি মানুষের বাইরের কোনো ঘটনা নয়—মানুষ নিজেও তার পরিণতির অংশ।