মার্গারেট স্যাঙ্গার: জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের অগ্রদূত ও তাঁর বিতর্কিত উত্তরাধিকার
সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা
নারীর অধিকারের সংগ্রাম ও বৈষম্যমূলক চিন্তার দ্বন্দ্ব
১৯১৬ সালের অক্টোবরে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে একটি ছোট ক্লিনিকের দরজা খুলেছিল। সেখানে আসা নারীদের অনেকেই ছিলেন শ্রমজীবী অভিবাসী, যাঁদের সংসারে অভাব এবং বারবার গর্ভধারণের শারীরিক চাপ পাশাপাশি চলছিল। তাঁরা জানতে চাইছিলেন, সন্তান নেওয়ার সময় ও ব্যবধান নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় আছে কি না। অথচ এমন তথ্য দেওয়াও তখন আইনি বাধার মুখে পড়ত। এই পরিস্থিতিতে ক্লিনিক খুলেছিলেন মার্গারেট স্যাঙ্গার। তাঁর কাজ নারীর প্রজননস্বাধীনতার ইতিহাস বদলেছিল, কিন্তু তাঁর সব বিশ্বাস সেই স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
১৮৭৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের কর্নিংয়ে জন্ম নেওয়া স্যাঙ্গার বড় হয়েছিলেন একটি বড় পরিবারে। মায়ের অকালমৃত্যুকে তিনি বারবার গর্ভধারণ ও সন্তান জন্ম দেওয়ার শারীরিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করতেন। পরবর্তী জীবনে নার্স হিসেবে কাজ করতে গিয়ে দরিদ্র নারীদের অসুস্থতা, অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ এবং অনিরাপদ গর্ভপাতের পরিণতি দেখেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে জন্মনিয়ন্ত্রণকে নিছক পারিবারিক পছন্দের বিষয় রাখেনি; এটি হয়ে উঠেছিল নারীর স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন।
তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রে এই আলোচনা সহজ ছিল না। ১৮৭৩ সালের কমস্টক আইন ডাকযোগে পাঠানো তথাকথিত অশ্লীল সামগ্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল; জন্মনিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত তথ্য ও উপকরণও এর আওতায় পড়ত। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যেও বিধিনিষেধ ছিল। ফলে যাঁদের ব্যক্তিগত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না, তাঁদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া বিশেষভাবে কঠিন হয়ে উঠেছিল। গর্ভধারণ এড়ানোর জ্ঞান তখন শুধু চিকিৎসার বিষয় ছিল না; শ্রেণি, নৈতিকতা ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।
১৯১৪ সালে স্যাঙ্গার দ্য ওম্যান রেবেল নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। এতে নারীর স্বাধীনতা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে কথা বলা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে কমস্টক আইন ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। বিচার এড়িয়ে তিনি কিছু সময়ের জন্য ইংল্যান্ডে চলে যান এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরেন। জন্মনিয়ন্ত্রণের তথ্য প্রচারকে তিনি জনসমক্ষে রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত করেন। তাঁর অবস্থান ছিল, সন্তান জন্ম দেওয়ার দায় যাঁর শরীরে পড়ে, সেই নারীকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান থেকে বঞ্চিত করা অন্যায়।
১৯১৬ সালের ১৬ অক্টোবর ব্রাউনসভিলে স্যাঙ্গার, তাঁর বোন এথেল বায়ার্ন এবং সহযোগী ফ্যানিয়া মিন্ডেল জন্মনিয়ন্ত্রণ ক্লিনিক চালু করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম জন্মনিয়ন্ত্রণ ক্লিনিক হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি মাত্র দশ দিন পর পুলিশের অভিযানে বন্ধ হয়ে যায়। স্যাঙ্গার গ্রেপ্তার হন এবং পরে ত্রিশ দিনের কারাদণ্ড ভোগ করেন। কিন্তু দমনমূলক ব্যবস্থাই ঘটনাটিকে সংবাদপত্রের আলোচনায় নিয়ে আসে। নারীদের বাস্তব চাহিদা এবং প্রচলিত আইনের সংঘাত জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়।
এরপর আন্দোলন শুধু প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯২১ সালে স্যাঙ্গার আমেরিকান বার্থ কন্ট্রোল লিগ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৩ সালে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে জন্মনিয়ন্ত্রণসেবা দেওয়ার আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। চিকিৎসাবিষয়ক ব্যতিক্রম ও আদালতের সিদ্ধান্তের সুযোগ ব্যবহার করে সেবার পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা চলে। পরবর্তী সাংগঠনিক একীভবন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ১৯৪২ সালে প্ল্যানড প্যারেন্টহুড ফেডারেশন অব আমেরিকা নামটি আসে। তবে এই দীর্ঘ পরিবর্তন বহু কর্মী, চিকিৎসক ও নারীর সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল ছিল।
স্যাঙ্গারের পরবর্তী বড় লক্ষ্য ছিল এমন গর্ভনিরোধক পদ্ধতি, যা নারীরা তুলনামূলকভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করতে পারবেন। পঞ্চাশের দশকে তিনি গবেষক গ্রেগরি পিনকাসের কাজকে উৎসাহিত করেন এবং অর্থদাতা ক্যাথারিন ম্যাককরমিকের সঙ্গে গবেষণার যোগসূত্র গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম গর্ভনিরোধক বড়ি অনুমোদিত হয়। স্যাঙ্গার বড়িটির আবিষ্কারক ছিলেন না; গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়ার সংগঠক ও প্রবক্তা ছিলেন। বৈজ্ঞানিক কাজ এবং অর্থায়নে অন্যদের অবদানও ছিল অপরিহার্য।
কিন্তু তাঁর ইতিহাসের আরেকটি দিক অত্যন্ত অস্বস্তিকর। স্যাঙ্গার সুপ্রজননবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নিজের লেখায় এর বিভিন্ন ধারণার সমর্থন করেছিলেন। এই মতবাদ দাবি করত, মানুষের প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করে জনসমষ্টির বংশগত ‘মান’ উন্নত করা সম্ভব। বাস্তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষকে তথাকথিত উপযুক্ত ও অনুপযুক্ত শ্রেণিতে ভাগ করা। প্রতিবন্ধী মানুষ, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং সামাজিকভাবে প্রান্তিক মানুষের বিরুদ্ধে এমন চিন্তা বৈষম্য ও অধিকারহরণের যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
স্যাঙ্গারের সম্পর্ককে কেবল প্রভাবশালী সমর্থক পাওয়ার কৌশল বলে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থাকে। তথাকথিত অযোগ্য বিবেচিত মানুষের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাকরণ এবং প্রজননে বিধিনিষেধের মতো ধারণাকেও তিনি সমর্থন করেছিলেন। তাঁর স্বেচ্ছামূলক মাতৃত্বের বক্তব্যের সঙ্গে এই অবস্থানের গভীর বিরোধ ছিল। কিছু নারীর নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্তের অধিকার দাবি করে অন্য মানুষের সেই অধিকার সংকুচিত করা সমতার নীতি হতে পারে না। তাঁর অবদান স্বীকার করার পাশাপাশি এই অসামঞ্জস্যও স্পষ্টভাবে বিচার করতে হয়।
বর্ণসম্পর্কিত বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৩৯ সালে পরিকল্পিত ‘নিগ্রো প্রজেক্ট’। ঐতিহাসিক নামটির এই উদ্যোগের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর কাছে জন্মনিয়ন্ত্রণের তথ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়া। কৃষ্ণাঙ্গ চিকিৎসক, নার্স ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনাও ছিল। তবে বর্ণবাদী চিকিৎসাব্যবস্থায় কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য বাইরে থেকে প্রজননসংক্রান্ত কর্মসূচি নির্ধারণ করা স্বাভাবিকভাবেই আস্থা ও ক্ষমতার প্রশ্ন তোলে। সেবা পাওয়ার সুযোগ এবং প্রজনন কমানোর চাপ এক বিষয় নয়।
এই প্রকল্প নিয়ে স্যাঙ্গারের একটি চিঠির অংশ প্রায়ই বিচ্ছিন্নভাবে প্রচার করা হয়। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্য আছে—এমন ধারণা যাতে না ছড়ায়, তা নিয়ে আলোচনা ছিল। ওই অংশকে সরাসরি গণনিধনের পরিকল্পনার স্বীকারোক্তি বলা যথাযথ নয়। কিন্তু সেই ভুল ব্যাখ্যা খণ্ডন করলেই তাঁর সুপ্রজননবাদী বিশ্বাস মুছে যায় না। ঐতিহাসিক বিচারে দুটো কাজই জরুরি: প্রমাণহীন অভিযোগ এড়ানো এবং নথিভুক্ত বৈষম্যমূলক অবস্থান আড়াল না করা।
স্যাঙ্গারের জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলনকে পরবর্তী গর্ভপাতের অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে পুরোপুরি এক করে দেখাও বিভ্রান্তিকর। তাঁর প্রচারের মূল লক্ষ্য ছিল গর্ভধারণ প্রতিরোধ; অনিরাপদ গর্ভপাতের প্রয়োজন কমানোর যুক্তিও তিনি দিতেন। একইভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ সহজলভ্য হওয়া আর প্রজননবিষয়ক পূর্ণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এক নয়। সেবা গ্রহণের স্বাধীনতার সঙ্গে সেবা প্রত্যাখ্যান, সন্তান নেওয়া এবং চাপমুক্তভাবে পরিবার গড়ার অধিকারও যুক্ত। তাঁর উত্তরাধিকার এই বিস্তৃত প্রশ্নগুলো সামনে আনে।
১৯৬৬ সালে স্যাঙ্গার মারা যান। তাঁর আন্দোলন জন্মনিয়ন্ত্রণকে নীরব ব্যক্তিগত সংকট থেকে প্রকাশ্য স্বাস্থ্য ও অধিকারের প্রশ্নে পরিণত করতে সাহায্য করেছিল। একই সঙ্গে তাঁর সুপ্রজননবাদ দেখায়, সংস্কারের আন্দোলনও বৈষম্যমূলক চিন্তা বহন করতে পারে। তাই তাঁকে বুঝতে প্রশংসা কিংবা নিন্দার একমাত্রিক ভাষা যথেষ্ট নয়। তাঁর ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, প্রজননস্বাধীনতা তখনই পূর্ণ হয়, যখন সেই স্বাধীনতা নির্বাচিত কিছু মানুষের জন্য নয়, প্রত্যেক মানুষের জন্য সমানভাবে স্বীকৃত হয়।
অ্যাপোম্যাটক্সে লির আত্মসমর্পণ ও লিংকন হত্যাকাণ্ড: ১৮৬৫
শেরম্যানের আটলান্টা অভিযান ও মার্চ টু দ্য সি: দক্ষিণের বিপর্যয়
গ্রান্ট বনাম লি: ওভারল্যান্ড অভিযান ও পিটার্সবার্গের অবরোধ
ব্যাবিলনের হাম্মুরাবি রাজবংশ: আইন, সাম্রাজ্য ও ক্ষমতার ইতিহাস
আক্কাদীয় রাজবংশ: সারগনের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও পতনের ইতিহাস
প্রাচীন মিশরের ফারাও রাজবংশ: নারমার থেকে ক্লিওপেট্রার উত্থান-পতন