মহাকাশ প্রতিযোগিতার সমাপ্তি ও উত্তরাধিকার:… | এসো-জানি

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মহাকাশ প্রতিযোগিতার সমাপ্তি ও উত্তরাধিকার: স্যাটেলাইট, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

সিরিজ: মহাকাশ প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন

মহাকাশ প্রতিযোগিতার সমাপ্তি ও উত্তরাধিকার: স্যাটেলাইট, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতা থেকে পৃথিবীজুড়ে মহাকাশ প্রযুক্তির বিস্তার।

মহাকাশে মানুষের ভবিষ্যৎ তখন শুধু কে আগে পৌঁছাবে, তার ওপর নির্ভর করছিল না; সেখানে টিকে থাকতে কীভাবে কাজ করতে হবে এবং কাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ১৯৭৫ সালের অ্যাপোলো-সয়ুজ অভিযানে দুই পরাশক্তির মহাকাশচারীদের করমর্দন এই পরিবর্তনের প্রতীক হয়। কিন্তু একটি যৌথ অভিযানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ হয়ে যায়নি। মহাকাশ প্রতিযোগিতার সমাপ্তি ছিল ধীরে বদলে যাওয়া অগ্রাধিকার, ব্যয়, প্রযুক্তিগত লক্ষ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ফল। তার উত্তরাধিকার ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ থেকে যোগাযোগ, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান থেকে আন্তর্জাতিক গবেষণাগার পর্যন্ত।

এই প্রতিযোগিতার শেষ কোথায়, তার একটিমাত্র সর্বসম্মত উত্তর নেই। ১৯৬৯ সালের অ্যাপোলো ১১ যুক্তরাষ্ট্রকে মানুষ নামানোর চন্দ্রপ্রতিযোগিতায় বিজয় দেয়। ১৯৭২ সালে শেষ মানব চন্দ্রাভিযান এবং ১৯৭৫ সালে অ্যাপোলো-সয়ুজ একটি যুগের সীমারেখা নির্দেশ করে। কিন্তু সামরিক উপগ্রহ, রকেট ও কক্ষপথে উপস্থিতির প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি মূল দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্পর্ককেই বদলে দেয়। তাই চন্দ্রপ্রতিযোগিতার নিষ্পত্তি, প্রাথমিক মহাকাশ দৌড়ের সমাপ্তি এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসানকে একই ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না।

প্রথম যুগের গতি কমে যাওয়ার একটি কারণ ছিল রাজনৈতিক লাভ ও ব্যয়ের সম্পর্ক বদলে যাওয়া। চাঁদে প্রথম মানুষ নামানোর সাফল্য বারবার পুনরাবৃত্তি করে একই মর্যাদা অর্জন করা সম্ভব ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য সরকারি ব্যয়, ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারের মধ্যে নাসার বাজেটের ওপর চাপ বাড়ে। সোভিয়েতদের মানব চন্দ্রাভিযানও বিপুল বিনিয়োগের পর সফল হয়নি। দুই দেশ তাই অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার, মহাকাশ স্টেশন ও রোবোটিক অনুসন্ধানে গুরুত্ব বাড়ায়। রাজনৈতিকভাবে প্রতীকী সাফল্যের পাশাপাশি মহাকাশে ব্যয়ের ব্যবহারিক ফল দেখানো জরুরি হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে দৃশ্যমান উত্তরাধিকারগুলোর একটি হলো কৃত্রিম উপগ্রহের বিস্তার। স্পুটনিক দেখিয়েছিল, পৃথিবীর চারপাশে যন্ত্র স্থাপন করা সম্ভব; পরবর্তী কর্মসূচিগুলো প্রমাণ করে, সেই অবস্থান থেকে পৃথিবীর মানুষের কাজে তথ্য পাঠানো যায়। যোগাযোগ উপগ্রহ মহাসাগর ও দুর্গম অঞ্চল পেরিয়ে টেলিফোন, সম্প্রচার এবং তথ্য সংযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বাণিজ্যিক যোগাযোগব্যবস্থা শুধু মহাকাশ প্রতিযোগিতার সরাসরি ফল ছিল না। রকেটের নির্ভরযোগ্যতা, ইলেকট্রনিকস, স্থলকেন্দ্র, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে এর বিস্তার ঘটে।

আবহাওয়া পর্যবেক্ষণেও পরিবর্তন মৌলিক ছিল। ১৯৬০ সালে উৎক্ষেপিত মার্কিন টিরোস-১ উপগ্রহ মহাকাশ থেকে মেঘের ছবি ব্যবহার করার কার্যকারিতা দেখায়। পরবর্তী উপগ্রহগুলো এমন সমুদ্র ও অঞ্চল পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়, যেখানে স্থলভিত্তিক তথ্য অপ্রতুল। ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান, মেঘের বিস্তার, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সম্পর্কে তথ্য পূর্বাভাস উন্নত করতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের মতো ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দেশের জন্য এই সক্ষমতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। উপগ্রহ নিজে দুর্যোগ ঠেকায় না; তার তথ্যকে পূর্বাভাস, সতর্কবার্তা এবং মানুষের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত করলেই প্রাণরক্ষার সুযোগ তৈরি হয়।

অবস্থান নির্ণয়ব্যবস্থার পেছনেও ছিল সামরিক ও বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন। কক্ষপথে থাকা উপগ্রহের সংকেত থেকে পৃথিবীতে অবস্থান হিসাব করার গবেষণা ধীরে ধীরে আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থায় রূপ নেয়। মার্কিন জিপিএস এবং সোভিয়েত উদ্যোগে শুরু হওয়া গ্লোনাস এই ইতিহাসের অংশ। পরে বেসামরিক ব্যবহার বিস্তৃত হওয়ায় জাহাজ, বিমান, কৃষিযন্ত্র, জরিপ এবং দৈনন্দিন পথনির্দেশে এসব ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শুধু অবস্থান নয়, সুনির্দিষ্ট সময়ের সংকেতও যোগাযোগ ও অন্যান্য অবকাঠামো সমন্বয়ে কাজে লাগে। সামরিক উদ্দেশ্যে বিকশিত সক্ষমতা এভাবে বৃহত্তর অর্থনীতির অংশ হয়ে যায়।

পৃথিবী পর্যবেক্ষণের উত্তরাধিকার আরও বিস্তৃত। কক্ষপথ থেকে একই অঞ্চল বারবার দেখার ফলে বন উজাড়, নগরায়ণ, নদীর গতিপথ এবং কৃষিজমির পরিবর্তন তুলনা করা সম্ভব হয়। ১৯৭২ সালে শুরু হওয়া ল্যান্ডস্যাট কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। জলবায়ু গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের উপগ্রহ সমুদ্রপৃষ্ঠ, বরফ, বায়ুমণ্ডল ও পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্য সম্পর্কে তথ্য দেয়। তবে একটি ছবি থেকেই সব সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না। তথ্যের যথাযথ সংশোধন, স্থলপর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিল এবং দীর্ঘ সময়ের তুলনা দরকার। মহাকাশ প্রযুক্তি গবেষণার পরিধি বাড়ায়, বিশ্লেষণের প্রয়োজন দূর করে না।

বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানেও প্রতিযোগিতা স্থায়ী অবকাঠামো রেখে যায়। শক্তিশালী উৎক্ষেপণযান, দূরপাল্লার যোগাযোগ, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ভরযোগ্য যন্ত্র তৈরির অভিজ্ঞতা গ্রহ অনুসন্ধানে কাজে লাগে। সোভিয়েত ভেনেরা অভিযান শুক্রের পৃষ্ঠ সম্পর্কে তথ্য পাঠায়; মার্কিন মেরিনার ও পরবর্তী ভয়েজার অভিযান সৌরজগতের ধারণা বিস্তৃত করে। মহাকাশভিত্তিক পর্যবেক্ষণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আটকে যাওয়া বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যেও গবেষণার সুযোগ দেয়। মানুষ পাঠানোর প্রতিযোগিতা সংবাদে বেশি আলোচিত হলেও রোবোটিক যান ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্র মহাকাশ সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধির অপরিহার্য মাধ্যম হয়ে থাকে।

প্রযুক্তিগত উত্তরাধিকার মূল্যায়নে অতিরঞ্জন এড়ানো জরুরি। মহাকাশ কর্মসূচি সমন্বিত বর্তনী, ক্ষুদ্রায়িত যন্ত্র, সেন্সর, শক্তি ব্যবস্থাপনা এবং নির্ভরযোগ্য সফটওয়্যারের চাহিদা বাড়িয়েছিল। অ্যাপোলোর মতো প্রকল্প কঠিন পরিবেশে সীমিত ভর ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কাজ করার চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু আধুনিক কম্পিউটার বা সব দৈনন্দিন প্রযুক্তিকে নাসার আবিষ্কার বলা ভুল। অনেক প্রযুক্তি আগে থেকেই ছিল; মহাকাশ কর্মসূচি তার উন্নয়ন, উৎপাদন ও কঠোর পরীক্ষায় ভূমিকা রাখে। এই পার্থক্য বুঝলেই প্রকৃত অবদান আরও স্পষ্ট হয়।

আরেকটি উত্তরাধিকার হলো বৃহৎ প্রকল্প পরিচালনার পদ্ধতি। হাজারো সরবরাহকারী, ভিন্ন গবেষণাকেন্দ্র এবং বহু উপব্যবস্থাকে একই লক্ষ্যে কাজ করাতে নথিবদ্ধ পরীক্ষা, মান নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তনের হিসাব রাখা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ব্যর্থতার অনুসন্ধানও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। অ্যাপোলো-১ ও সয়ুজ-১১ মনে করিয়ে দেয়, সময়সীমা বা মর্যাদার চাপে নিরাপত্তার দুর্বলতা উপেক্ষা করলে ফল ভয়াবহ হতে পারে। মানুষের মহাকাশযাত্রার ইতিহাস তাই শুধু সাহসের ইতিহাস নয়; ভুল শনাক্ত করা, নকশা সংশোধন এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইতিহাসও।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথে অগ্রগতি একইভাবে ধাপে ধাপে ঘটেছে। অ্যাপোলো-সয়ুজের পর সঙ্গে সঙ্গে যৌথ স্থায়ী স্টেশন তৈরি হয়নি। শীতল সম্পর্ক ও পৃথক কর্মসূচি দীর্ঘদিন চলেছে। পরে শাটল-মির সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বিভিন্ন দেশের যান, প্রশিক্ষণ ও জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা সমন্বয়ের অভিজ্ঞতা বাড়ায়। এই স্টেশন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার উদ্যোগ নয়; ইউরোপ, জাপান ও কানাডাও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। যৌথ অবকাঠামো সহযোগিতাকে নিয়মিত কাজের সম্পর্কে পরিণত করে, যদিও পৃথিবীর রাজনৈতিক বিরোধ সম্পূর্ণ দূর করতে পারে না।

এই উত্তরাধিকারের সঙ্গে অমীমাংসিত সমস্যাও আছে। সামরিক নজরদারি, মহাকাশের আবর্জনা, সংঘর্ষের ঝুঁকি এবং উপগ্রহ ধ্বংসকারী অস্ত্র মহাকাশের ব্যবহারকে জটিল করে। ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি জাতীয় দখলদারি নিষিদ্ধ করা এবং কক্ষপথে গণবিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপন না করার মতো ভিত্তি দেয়, কিন্তু সব সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে না। ফলে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা পাশাপাশি থাকার বাস্তবতা থেকেই যায়। নিরাপদ কক্ষপথ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য বিনিময় এখন বহু দেশের অভিন্ন স্বার্থ।

স্পুটনিকের সংকেত দিয়ে শুরু হওয়া যুগ তাই চাঁদের পতাকা বা একটি করমর্দনে সীমাবদ্ধ নয়। তার উত্তরাধিকার রয়েছে ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তায়, কৃষিজমির মানচিত্রে, দূরবর্তী গ্রহের ছবিতে এবং কক্ষপথের যৌথ গবেষণাগারে। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেদের শক্তি প্রমাণ করতে গিয়ে এমন সক্ষমতা তৈরি করেছিল, যার ব্যবহার তাদের প্রাথমিক রাজনৈতিক লক্ষ্য ছাড়িয়ে যায়। মহাকাশ প্রতিযোগিতার সবচেয়ে স্থায়ী পরিবর্তন ছিল পৃথিবীর বাইরের জগতকে নাগালের মধ্যে আনার পাশাপাশি পৃথিবীকেই নতুনভাবে দেখার ক্ষমতা অর্জন।


আপনার পছন্দ হতে পারে