মহামন্দার রাজনৈতিক প্রভাব: নাৎসিদের উত্থান ও ইউরোপে চরমপন্থার বিস্তার
সিরিজ: মহামন্দা (১৯২৯): বিশ্ব অর্থনীতির বিপর্যয়
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যখন সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাকে দুর্বল করেছিল।
বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য, ঋণ ও উৎপাদনের পতন যখন মানুষের জীবিকা ধ্বংস করছিল, তখন অর্থনৈতিক সংকট ক্রমেই রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হয়। বেকার শ্রমিক জানতে চাইছিলেন, নির্বাচিত সরকার কেন কাজ দিতে পারছে না; সঞ্চয় হারানো পরিবার ভাবছিল, প্রচলিত প্রতিষ্ঠান তাদের নিরাপত্তা দিতে সক্ষম কি না। এই হতাশাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি ভিন্নভাবে ব্যবহার করে। মহামন্দা সর্বত্র স্বৈরতন্ত্র সৃষ্টি করেনি, কিন্তু বহু দেশে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা দুর্বল করে চরমপন্থীদের সুযোগ বাড়িয়েছিল। কোথাও সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান টিকে যায়, কোথাও ক্ষমতাসীন অভিজাতদের সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক সহিংসতা গণতন্ত্রকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
জার্মানির পরিস্থিতি বুঝতে হলে মহামন্দার আগের ইতিহাসও মনে রাখতে হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়, ভার্সাই চুক্তির বিরুদ্ধে ক্ষোভ, বিপ্লব ও পাল্টা বিপ্লবের অভিজ্ঞতা এবং ১৯২৩ সালের অতিমুদ্রাস্ফীতি ওয়াইমার প্রজাতন্ত্রকে আগেই দুর্বল করেছিল। তবু বিশের দশকের মাঝামাঝি কিছু স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। নাৎসিরা তখনো প্রান্তিক শক্তি ছিল; ১৯২৮ সালের রাইখস্টাগ নির্বাচনে তারা প্রায় ২.৬ শতাংশ ভোট পায়। অর্থাৎ হিটলারের পরবর্তী সাফল্য পূর্বনির্ধারিত ছিল না। মহামন্দা সেই রাজনৈতিক পরিবেশকে নাটকীয়ভাবে বদলে দেয়, যেখানে একটি ছোট দল ব্যাপক সমর্থন সংগ্রহের সুযোগ পায়।
আমেরিকান ঋণপ্রবাহ দুর্বল হওয়া, আন্তর্জাতিক চাহিদা কমা এবং ব্যাংকিং সংকটে জার্মানির উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ভেঙে পড়ে। ১৯৩২ সালের শীতকালে নিবন্ধিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ষাট লাখে পৌঁছায়। এর বাইরে স্বল্প কর্মঘণ্টা ও কম আয়ের মানুষও ছিলেন। কৃষক ঋণের চাপে পড়েন, ছোট ব্যবসায়ী ক্রেতা হারান, চাকরিজীবীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন। শুধু বর্তমান দারিদ্র্য নয়, সামাজিক অবস্থান হারানোর আশঙ্কাও রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি করেছিল। বহু মানুষের কাছে সংসদীয় দলগুলোর দরকষাকষি তখন কার্যকর শাসনের বদলে অক্ষমতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
সংকট সামলানোর পদ্ধতিও গণতন্ত্রের দুর্বলতা বাড়ায়। ১৯৩০ সালে জোট সরকার ভেঙে যাওয়ার পর চ্যান্সেলর হাইনরিখ ব্র্যুনিং সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বদলে প্রেসিডেন্ট পল ফন হিন্ডেনবুর্গের জরুরি ক্ষমতার ওপর ক্রমশ নির্ভর করেন। সংবিধানের ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে শাসনের প্রবণতা বাড়ে। ব্যয়সংকোচন, কর বৃদ্ধি ও আয় কমানোর নীতি অর্থনৈতিক দুর্দশাকে আরও তীব্র করে। এসব সিদ্ধান্তের পেছনে আর্থিক ও আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও রাজনৈতিক ফল ছিল গুরুতর। গণতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বহাল থেকেও সংসদের কার্যকর ভূমিকা সংকুচিত হচ্ছিল।
নাৎসিরা এই পরিস্থিতিতে নিজেদের জাতীয় পুনর্জাগরণের শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। তারা কাজ, শৃঙ্খলা, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং ভার্সাই ব্যবস্থার অবসানের প্রতিশ্রুতি দেয়। বিভিন্ন শ্রোতার সামনে ভিন্ন দাবি তুলে ধরে প্রচারণা চালানো হতো। একই সঙ্গে ইহুদি, কমিউনিস্ট ও অন্যান্য গোষ্ঠীকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সংকটের জন্য দায়ী করা হয়। এই বিদ্বেষমূলক অভিযোগ অর্থনৈতিক সমস্যার সত্য ব্যাখ্যা ছিল না; তা ছিল মানুষের ক্ষোভকে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালনার কৌশল। সভা, পোস্টার, স্থানীয় সংগঠন ও নেতার ব্যক্তিপূজা মিলিয়ে দলটি বিপুল প্রচারযন্ত্র গড়ে তোলে।
তবে নাৎসিদের উত্থানকে শুধু বেকার শ্রমিকের সমর্থন দিয়ে ব্যাখ্যা করা ভুল। তাদের ভোট আসে কৃষক, স্বনিযুক্ত মানুষ, মধ্যবিত্ত, কিছু শ্রমিক এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী থেকে। অঞ্চল ও ধর্মীয় পরিচয়ভেদেও সমর্থনের পার্থক্য ছিল। অনেক বেকার শ্রমিক কমিউনিস্টদের দিকে ঝুঁকেছিলেন; ক্যাথলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোও কিছু এলাকায় নাৎসি বিস্তার ঠেকিয়ে রাখে। ১৯৩০ সালের নির্বাচনে নাৎসিদের ভোট প্রায় ১৮.৩ শতাংশ এবং ১৯৩২ সালের জুলাইয়ে প্রায় ৩৭.৩ শতাংশে ওঠে। তারা বৃহত্তম দল হয়েছিল, কিন্তু স্বাধীন জাতীয় নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেনি।
১৯৩২ সালের নভেম্বরে নাৎসিদের ভোট বরং প্রায় ৩৩.১ শতাংশে নেমে যায়। তারপরও রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও রক্ষণশীল অভিজাতদের হিসাব হিটলারের জন্য ক্ষমতার পথ খুলে দেয়। ফ্রানৎস ফন পাপেনসহ কিছু নেতা মনে করেছিলেন, তাঁকে চ্যান্সেলর করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হিন্ডেনবুর্গ হিটলারকে চ্যান্সেলর নিয়োগ করেন। মহামন্দা নাৎসিদের শক্তি বাড়ালেও হিটলারের ক্ষমতায় আসার জন্য অভিজাতদের সিদ্ধান্ত, সাংবিধানিক অবক্ষয় ও রাজনৈতিক সমঝোতা অপরিহার্য ছিল। অর্থনৈতিক পতন থেকে স্বৈরতন্ত্রে যাওয়ার মধ্যে মানুষের সচেতন সিদ্ধান্তও কাজ করেছে।
ক্ষমতায় এসে নাৎসিরা সংকটকে বিরোধীদের দমনের অজুহাত বানায়। রাইখস্টাগে অগ্নিকাণ্ডের পর জরুরি আদেশে মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়। গ্রেপ্তার, ভীতি ও বিরোধীদের ওপর আক্রমণের পরিবেশে মার্চের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরে ক্ষমতায়ন আইন সরকারকে সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে আইন তৈরির সুযোগ দেয়। স্বাধীন শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো ধ্বংস করা হয়। ফলে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে নাগরিক স্বাধীনতার বিলোপ যুক্ত হয়। নাৎসি শাসনে পরবর্তী কর্মসংস্থান বৃদ্ধি মূল্যায়ন করতেও পুনরায় অস্ত্রসজ্জা, বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ এবং নিপীড়নকে আড়াল করা চলে না।
ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও সংকট বিদ্যমান কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা শক্তিশালী করে। ইতালিতে মুসোলিনি অবশ্য ১৯২২ সালেই ক্ষমতায় এসেছিলেন; তাই মহামন্দাকে সেখানে ফ্যাসিবাদের জন্মের কারণ বলা যায় না। তবে সংকট রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ফ্যাসিবাদী প্রচারণার পরিসর বাড়ায়। অস্ট্রিয়ায় রাজনৈতিক সংঘাত ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতিষ্ঠায়ও অর্থনৈতিক দুর্দশা ভূমিকা রাখে। স্পেনের ক্ষেত্রে ভূমি, ধর্ম, শ্রেণি ও সামরিক রাজনীতির পুরোনো বিরোধের সঙ্গে মন্দার চাপ যুক্ত হয়। চরমপন্থার বিস্তার সর্বত্র একই পথে ঘটেনি, আর প্রতিটি সংঘাতের শিকড়ও ১৯২৯ সালে ছিল না।
কমিউনিস্ট আন্দোলনও পুঁজিবাদের সংকটকে নিজেদের যুক্তির পক্ষে ব্যবহার করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিকল্পিত শিল্পায়ন কিছু বিদেশি পর্যবেক্ষকের কাছে বিকল্প পথ বলে মনে হয়েছিল, যদিও তার পেছনের দমননীতি, দুর্ভিক্ষ ও মানবিক বিপর্যয় ছিল ভয়াবহ। জার্মানিতে কমিউনিস্ট ও সামাজিক গণতন্ত্রীদের তীব্র বিরোধ নাৎসিবিরোধী ঐক্যকে দুর্বল করে। অন্যদিকে ফ্রান্সে দশকের মাঝামাঝি ফ্যাসিবাদবিরোধী উদ্বেগ বামপন্থী সহযোগিতা ও পপুলার ফ্রন্টের পথ তৈরি করে। অর্থনৈতিক সংকট তাই শুধু ডানপন্থী উগ্রতা নয়, বামপন্থী সংগঠন ও রাজনৈতিক জোটের ধরনও বদলে দেয়।
তবু গণতন্ত্রের পতন অনিবার্য ছিল না। ব্রিটেনে তীব্র বেকারত্ব ও রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেও সংসদীয় ব্যবস্থা টিকে থাকে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কিছু দেশে কৃষক ও শ্রমিকস্বার্থের মধ্যে সমঝোতা, সামাজিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক সংস্কার গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে শক্তিশালী করে। যুক্তরাষ্ট্রে রুজভেল্টের নিউ ডিল বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তনের পথ দেখায়। এই পার্থক্যগুলোর পেছনে প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামাজিক সংগঠন ও আপসের সক্ষমতা কাজ করেছে। মানুষের অনিরাপত্তার কার্যকর উত্তর দেওয়া গেলে চরমপন্থীদের একমাত্র সমাধানদাতা হওয়ার দাবি দুর্বল হতে পারত।
ইউরোপের বাইরেও অর্থনৈতিক সংকট বিশ্বরাজনীতি বদলে দেয়। জাপানে রপ্তানির পতন ও গ্রামীণ দুর্দশা দলীয় সরকারের প্রতি অসন্তোষ বাড়ায়; সামরিক প্রভাব বিস্তারের পেছনে তা একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তবে ১৯৩১ সালের মাঞ্চুরিয়া দখলের ব্যাখ্যায় সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য ও সেনাবাহিনীর স্বতন্ত্র কর্মকাণ্ডও জরুরি। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি আয়ের পতন সরকারবিরোধী ক্ষোভ ও ক্ষমতার পরিবর্তন ত্বরান্বিত করে। ঔপনিবেশিক সমাজে কৃষকের দুর্দশা কর, শাসন ও অর্থনৈতিক অধিকার নিয়ে অসন্তোষ বাড়ায়, যদিও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের শিকড় ছিল আরও পুরোনো।
মহামন্দার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাই একমুখী নয়। এটি কোথাও গণতান্ত্রিক সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে, কোথাও বিদ্বেষ, সহিংসতা ও স্বৈরতন্ত্রের সুযোগ বাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক বিপর্যয় যুদ্ধ বা একনায়কতন্ত্রকে অবধারিত করেনি; কিন্তু দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও বিপজ্জনক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের সম্ভাবনা বাড়িয়েছিল। জার্মানির অভিজ্ঞতা সেই পরিণতির সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ। একই সময়ে আমেরিকায় ভিন্ন একটি পরীক্ষা চলছিল—গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়িয়ে কাজ, আস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। সেই পরীক্ষার কেন্দ্রে ছিলেন ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এবং তাঁর নিউ ডিল।
মহামন্দায় আমেরিকার জনজীবন: বেকারত্ব, হুভারভিল ও ডাস্ট বোলের বিপর্যয়
ব্যাংক দেউলিয়া ও মহামন্দা: ১৯৩০–১৯৩৩ সালে সঞ্চয়, ঋণ ও জীবিকার বিপর্যয়
১৯২৯ সালের ওয়াল স্ট্রিট ধস: ব্ল্যাক থার্সডে থেকে ব্ল্যাক টিউসডের ইতিহাস
মহামন্দার পটভূমি: আমেরিকার উত্থান, শেয়ারবাজারে জল্পনা ও ঋণনির্ভর সমৃদ্ধি
বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও জেমস ওয়াট: কয়লা ও বাষ্পশক্তি কীভাবে শিল্পবিপ্লব বদলে দিয়েছিল?
বস্ত্রশিল্পে যন্ত্রের বিপ্লব: স্পিনিং জেনি, ওয়াটার ফ্রেম ও পাওয়ার লুমের ইতিহাস