১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে ভারতীয় রাজা, শিখ ও গুর্খাদের ভূমিকা: কারা বিদ্রোহ করেছিল, কারা ব্রিটিশদের পাশে ছিল?
Series: সিপাহী বিদ্রোহ ১৮৫৭: ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের মহাবিদ্রোহ
- Author: Admin
- August 15, 2026
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে ভারতীয় রাজা, শিখ ও গুর্খাদের ভূমিকা
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে যদি শুধু “ভারতীয় বনাম ব্রিটিশ” যুদ্ধ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাগুলোর একটি হারিয়ে যায়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে মিরাট, দিল্লি, কানপুর, লক্ষ্ণৌ, ঝাঁসি, বিহার ও মধ্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে উঠলেও সমস্ত ভারতীয় রাজা, সৈন্য বা জনগোষ্ঠী বিদ্রোহীদের পক্ষে দাঁড়ায়নি। বরং বহু দেশীয় রাজ্য নিরপেক্ষ থাকে, কেউ ব্রিটিশদের সক্রিয় সাহায্য করে এবং শিখ ও গুর্খা সৈন্যদের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্রিটিশ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বিভক্ত আনুগত্যই শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশদের অন্যতম বড় সুবিধা হয়ে ওঠে।
১৮৫৭ সালের ভারত তখন একটি একক রাজনৈতিক রাষ্ট্র ছিল না। ব্রিটিশ অধিকৃত অঞ্চলগুলোর পাশাপাশি শত শত দেশীয় রাজ্য ছিল, যাদের শাসকেরা ব্রিটিশদের সঙ্গে পৃথক চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের সিংহাসন ও আংশিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতেন। ফলে দিল্লিতে বাহাদুর শাহ জাফরকে বিদ্রোহীরা প্রতীকী সম্রাট হিসেবে গ্রহণ করলেও সব রাজা তাঁর কর্তৃত্ব মেনে নেননি। অনেক দেশীয় শাসকের কাছে প্রধান প্রশ্ন ছিল—বিদ্রোহে যোগ দিলে তাঁদের রাজ্য রক্ষা পাবে, নাকি ব্রিটিশদের পাশে থাকাই রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ?
ব্রিটিশবিরোধী শিবিরে সবচেয়ে পরিচিত দেশীয় শক্তিগুলোর মধ্যে ছিলেন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই, নানা সাহেব, আওধের বেগম হযরত মহল এবং বিহারের কুনওয়ার সিং। তাঁদের প্রত্যেকের ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আলাদা রাজনৈতিক অভিযোগ ছিল। লক্ষ্মীবাইয়ের দত্তকপুত্রকে উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে ঝাঁসি দখল করা হয়েছিল। নানা সাহেব তাঁর দত্তকপিতা বাজিরাও দ্বিতীয়ের পেনশন উত্তরাধিকারসূত্রে না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ ছিলেন। আওধের রাজপরিবার ১৮৫৬ সালের ব্রিটিশ সংযুক্তিতে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল। কুনওয়ার সিংয়ের ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ প্রশাসন ও জমিদারি অর্থনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সমস্যা ছিল।
কিন্তু অনেক প্রভাবশালী রাজা সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেন। হায়দরাবাদের নিজাম ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যোগ দেননি। হায়দরাবাদ ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় দেশীয় রাজ্যগুলোর একটি, এবং সেখানে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লে ব্রিটিশদের অবস্থান অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারত। নিজামের সরকার ব্রিটিশদের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক বজায় রাখে এবং দক্ষিণ ভারতে বৃহৎ বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে এই আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মধ্য ভারতের গোয়ালিয়রের মহারাজা জয়াজিরাও সিন্ধিয়াও আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশদের অনুগত ছিলেন। যদিও তাঁর সেনাবাহিনীর একটি অংশ পরবর্তীকালে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয় এবং রানি লক্ষ্মীবাই ও তাতিয়া টোপে সাময়িকভাবে গোয়ালিয়র দখল করতে সক্ষম হন, সিন্ধিয়া নিজে ব্রিটিশ মিত্র হিসেবেই অবস্থান করেন। তাঁর এই অবস্থান দেখায় যে একজন দেশীয় শাসক এবং তাঁর নিজস্ব সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক আনুগত্যও সবসময় একই ছিল না।
রাজপুতানার বহু দেশীয় রাজ্যও বৃহৎ বিদ্রোহে যোগ দেয়নি। জয়পুর, যোধপুরসহ বিভিন্ন রাজ্যের শাসকেরা ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন, যদিও তাদের অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন অসন্তোষ ও সামরিক বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। একইভাবে কাশ্মীরের ডোগরা শাসক এবং আরও কিছু দেশীয় শক্তি ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করে। এই দেশীয় রাজ্যগুলো ব্রিটিশদের জন্য শুধু সামরিক সহায়তা নয়, যোগাযোগপথ, রসদ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করেছিল।
পাঞ্জাবে পরিস্থিতি ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশরা মাত্র কয়েক বছর আগে দ্বিতীয় অ্যাংলো-শিখ যুদ্ধের পর ১৮৪৯ সালে পাঞ্জাব দখল করেছিল। তাই সহজ অনুমান হতে পারত যে শিখরা ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেবে। বাস্তবে বড় অংশে তার বিপরীত ঘটে। পাঞ্জাবের বহু শিখ সৈন্য এবং স্থানীয় প্রধান ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করেন।
এটি কেন ঘটেছিল, তার উত্তর একক নয়। প্রথমত, শিখ সাম্রাজ্যের পতনের পর পাঞ্জাবের রাজনৈতিক কাঠামো বদলে গেলেও ব্রিটিশ প্রশাসন দ্রুত সেনাবাহিনীতে পাঞ্জাবি ও শিখদের নিয়োগ বাড়াতে শুরু করেছিল। অনেক সাবেক সৈন্য নতুন সামরিক কর্মসংস্থান পায়। দ্বিতীয়ত, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের কেন্দ্র ছিল মূলত বেঙ্গল আর্মির পূর্বাঞ্চলীয় হিন্দু ও মুসলিম সিপাহীদের মধ্যে, যাদের সঙ্গে পাঞ্জাবি ও শিখ সৈন্যদের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ছিল।
আরও গভীরে ছিল মুঘল ও শিখ ইতিহাসের স্মৃতি। দিল্লিতে বিদ্রোহীরা বাহাদুর শাহ জাফরকে সম্রাট হিসেবে সামনে আনার ফলে কিছু শিখের কাছে আন্দোলনটি মুঘল কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। শিখ ধর্মীয় ইতিহাসে মুঘল শাসকদের সঙ্গে সংঘাতের স্মৃতি তখনও শক্তিশালী ছিল। তবে শিখদের ব্রিটিশপন্থী অবস্থানকে শুধু ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক শত্রুতার ফল বলা অতিরিক্ত সরলীকরণ হবে; চাকরি, স্থানীয় রাজনীতি, সাম্প্রতিক যুদ্ধ, সামাজিক বিভাজন এবং বাস্তব রাজনৈতিক স্বার্থ সবই ভূমিকা রেখেছিল।
পাঞ্জাবের দেশীয় শিখ রাজ্যগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাতিয়ালা, জিন্দ ও নাভার শাসকেরা ব্রিটিশদের সমর্থন করেন। তাঁরা সৈন্য, পরিবহন, রসদ এবং যোগাযোগপথ রক্ষায় সাহায্য করেন। দিল্লির দিকে ব্রিটিশ বাহিনী ও সরঞ্জাম পাঠানোর ক্ষেত্রে পাঞ্জাব নিরাপদ থাকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই অঞ্চল ব্যাপকভাবে বিদ্রোহ করত, তাহলে দিল্লি পুনর্দখলের অভিযান অনেক কঠিন হয়ে যেত।
ব্রিটিশরা পাঞ্জাব থেকে দ্রুত নতুন সৈন্য সংগ্রহ করে। শিখদের পাশাপাশি পাঠান, পাঞ্জাবি মুসলমান এবং অন্যান্য স্থানীয় গোষ্ঠীর সৈন্যও ব্রিটিশ বাহিনীতে যুক্ত হয়। এদের একটি অংশ দিল্লির অবরোধ ও সেপ্টেম্বর ১৮৫৭ সালের চূড়ান্ত আক্রমণে অংশ নেয়। ফলে একদিকে ভারতীয় সিপাহীরা দিল্লিকে ব্রিটিশদের কাছ থেকে রক্ষা করছিল, অন্যদিকে অন্য ভারতীয় সৈন্যরাই ব্রিটিশ বাহিনীর অংশ হিসেবে দিল্লি পুনর্দখলের জন্য যুদ্ধ করছিল।
গুর্খাদের ভূমিকাও একইভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুর্খা সৈন্যদের সঙ্গে ব্রিটিশদের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল ১৮১৪–১৬ সালের অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধের পর। যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা গুর্খাদের সামরিক দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তাদের নিজেদের বাহিনীতে নিয়োগ শুরু করে। ১৮৫৭ সালের মধ্যে গুর্খা রেজিমেন্টগুলো ব্রিটিশ ভারতীয় সামরিক ব্যবস্থার একটি প্রতিষ্ঠিত অংশ হয়ে উঠেছিল।
বিদ্রোহের সময় গুর্খা সৈন্যদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্রিটিশদের পক্ষে থাকে। বিশেষ করে সিরমুর গুর্খা ব্যাটালিয়ন দিল্লির রিজ অঞ্চলে যুদ্ধ করে এবং দীর্ঘ অবরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা বিদ্রোহী বাহিনীর আক্রমণের মুখে অবস্থান ধরে রাখে এবং দিল্লি পুনর্দখলের ব্রিটিশ প্রচেষ্টায় অংশ নেয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল নেপালের শাসক জং বাহাদুর রানার সিদ্ধান্ত। তিনি নেপালের নিজস্ব বাহিনী নিয়ে ব্রিটিশদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন এবং আওধ অঞ্চলে বিদ্রোহ দমনের অভিযানে অংশ নেন। ১৮৫৮ সালে লক্ষ্ণৌ পুনর্দখলসহ বিভিন্ন সামরিক অভিযানে নেপালি বাহিনী ব্রিটিশদের সহায়তা করে। এটি শুধুমাত্র সামরিক সহযোগিতা ছিল না; এর পেছনে নেপালের নিজস্ব কূটনৈতিক স্বার্থও ছিল।
জং বাহাদুর ব্রিটিশদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে নেপালের স্বাধীন অবস্থানকে নিরাপদ করতে চেয়েছিলেন। শক্তিশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার পরিবর্তে বিদ্রোহের সময় তাদের সহযোগিতা করা নেপালের জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক বলে তিনি মনে করেছিলেন। গুর্খাদের ভূমিকা তাই “ভারতীয়দের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ আনুগত্য” হিসেবে নয়, বরং নেপালের রাষ্ট্রনৈতিক স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বোঝা উচিত।
১৮৫৭ সালে ব্রিটিশদের আরেকটি বড় সুবিধা ছিল যে অনেক দেশীয় শাসক বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। বিদ্রোহীরা ব্রিটিশদের পরাজিত করলে এরপর ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কী হবে—এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট সর্বসম্মত পরিকল্পনা ছিল না। বাহাদুর শাহ জাফরকে সামনে আনা হলেও মারাঠা নেতা, আওধের রাজপরিবার, জমিদার ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির নিজস্ব লক্ষ্য ছিল। ফলে কোনো দেশীয় রাজা সহজেই প্রশ্ন করতে পারতেন—ব্রিটিশদের পতনের পর আমার রাজ্যের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে?
এছাড়া বিভিন্ন ভারতীয় শক্তির মধ্যে পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা তখনও সক্রিয় ছিল। মারাঠা, শিখ, রাজপুত, মুঘল উত্তরাধিকারী এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজবংশ এক শতাব্দী ধরেই একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ ও প্রতিযোগিতায় যুক্ত ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্থান এই পুরোনো বিভাজনগুলোকে মুছে দেয়নি। বরং ব্রিটিশরা বহু ক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে এসব প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিজেদের সুবিধায় ব্যবহার করে।
ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্যের আরেকটি কারণ ছিল দেশীয় রাজাদের সিংহাসন রক্ষার স্বার্থ। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার নিজেও এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে। ১৮৫৮ সালের রানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণায় দেশীয় রাজাদের অধিকার ও চুক্তি সম্মান করার আশ্বাস দেওয়া হয় এবং ডালহৌসির আগ্রাসী রাজ্য সংযুক্তিকরণের ধারা কার্যত পরিত্যাগ করা হয়। ব্রিটিশরা বুঝেছিল, দেশীয় রাজ্যগুলোকে শত্রু বানানোর চেয়ে সাম্রাজ্যের সহযোগী হিসেবে রাখা অনেক নিরাপদ।
অন্যদিকে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুক্ত বহু শাসক ও নেতা ব্রিটিশ বিজয়ের পর কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হন। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই যুদ্ধে নিহত হন, বাহাদুর শাহ জাফর নির্বাসিত হন, তাতিয়া টোপেকে ফাঁসি দেওয়া হয়, আওধের বেগম হযরত মহল নেপালে আশ্রয় নেন এবং নানা সাহেব অদৃশ্য হয়ে যান। ফলে ১৮৫৭ সালের পর রাজনৈতিক ভারসাম্য আরও স্পষ্টভাবে ব্রিটিশপন্থী দেশীয় রাজাদের পক্ষে চলে যায়।
এই বিভক্ত আনুগত্য ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পরাজয়ের অন্যতম মৌলিক কারণ। বিদ্রোহীরা যদি পাঞ্জাবের বৃহৎ সামরিক সম্পদ, অধিকাংশ দেশীয় রাজ্য, হায়দরাবাদ এবং নেপালের মতো শক্তির সমর্থন পেত, তাহলে ব্রিটিশদের পক্ষে দিল্লি, লক্ষ্ণৌ এবং মধ্য ভারতের বিদ্রোহী কেন্দ্রগুলো পুনর্দখল করা অনেক বেশি কঠিন হতো। পরিবর্তে ব্রিটিশরা একদল ভারতীয় সৈন্যকে আরেকদল ভারতীয় বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিল।
এই বাস্তবতা ১৮৫৭ সালের আন্দোলনের চরিত্র সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। এটি নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক বিশাল বিদ্রোহ ছিল, কিন্তু তখনও একটি সমন্বিত সর্বভারতীয় জাতীয় রাজনৈতিক পরিচয় এত শক্তিশালী হয়নি যে সমস্ত দেশীয় রাজা, সৈন্য ও জনগোষ্ঠী নিজেদের একটি অভিন্ন পক্ষ হিসেবে দেখবে। স্থানীয় স্বার্থ, রাজবংশীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামরিক চাকরি, ধর্মীয় স্মৃতি এবং রাজনৈতিক নিরাপত্তা—সবকিছুই মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল।
তাই ১৮৫৭ সালের ইতিহাসে শিখ, গুর্খা বা ব্রিটিশপন্থী দেশীয় রাজাদের “বিশ্বাসঘাতক” বলে সহজে ব্যাখ্যা করলে তৎকালীন বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝা যায় না। একইভাবে যারা বিদ্রোহ করেছিল, তাদের সবার উদ্দেশ্যও আধুনিক অর্থে একই জাতীয় স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল না। প্রত্যেকে নিজের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি ছিল এই বিভক্ত ভারতীয় রাজনৈতিক মানচিত্র। দিল্লির বিদ্রোহীরা বাহাদুর শাহ জাফরের পতাকার নিচে যুদ্ধ করছিল, ঝাঁসিতে লক্ষ্মীবাই নিজের হারানো রাজ্যের জন্য লড়ছিলেন, আওধে বেগম হযরত মহল ব্রিটিশ সংযুক্তি প্রত্যাখ্যান করছিলেন—অন্যদিকে পাতিয়ালা, জিন্দ, হায়দরাবাদসহ বহু দেশীয় শক্তি নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য ব্রিটিশদের পাশে থাকছিল।
শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বিজয় শুধু তাদের ইউরোপীয় সৈন্য, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা বা অস্ত্রের ফল ছিল না। ভারতের ভেতর থেকেই পাওয়া বিপুল সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা তাদের বিজয়ের অন্যতম ভিত্তি ছিল। শিখ ও গুর্খা সৈন্য, পাঞ্জাবের অনুগত শক্তি এবং বহু দেশীয় রাজা যদি বিদ্রোহীদের সঙ্গে একযোগে দাঁড়াতেন, তাহলে ১৮৫৭ সালের ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে ভারত তখন এতটাই রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ছিল যে ব্রিটিশরা সেই বিভাজনকে ব্যবহার করে একে একে বিদ্রোহের প্রধান কেন্দ্রগুলো দমন করতে সক্ষম হয়।
বক্সার প্রোটোকল ১৯০১: কারা স্বাক্ষর করেছিল এবং চুক্তির প্রধান শর্তগুলো কী ছিল?
সিপাহী বিদ্রোহ নাকি ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ? ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পরিণতি: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতন ও ব্রিটিশ রাজের সূচনা
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ: নেতৃত্ব, ঐক্য, অস্ত্র ও কৌশলে কোথায় পিছিয়ে ছিল বিদ্রোহীরা?
বক্সার বিদ্রোহের পর শান্তি আলোচনা: পরাজিত চীনের ওপর কী কী শর্ত চাপিয়েছিল বিদেশি শক্তিগুলো
বেইজিংয়ের পতন ১৯০০: বিদেশি সেনাদের দখল, লুটপাট ও চিং সাম্রাজ্যের অপমান