বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বক্সার বিদ্রোহের পর শান্তি আলোচনা: পরাজিত চীনের ওপর কী কী শর্ত চাপিয়েছিল বিদেশি শক্তিগুলো

Series: বক্সার প্রোটোকল: চীনের অপমান, বিদেশি শক্তি ও এক অসম চুক্তির ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 15, 2026
বক্সার বিদ্রোহের পর শান্তি আলোচনা: পরাজিত চীনের ওপর কী কী শর্ত চাপিয়েছিল বিদেশি শক্তিগুলো
বক্সার বিদ্রোহের পর শান্তি আলোচনা

১৯০০ সালের আগস্টে আট জাতির জোট বেইজিং দখল করার পর বক্সার সংকটের সামরিক পর্যায় কার্যত শেষ হয়ে গেলেও চীনের দুর্দশা শেষ হয়নি। বরং এরপর শুরু হয় আরও দীর্ঘ এবং অপমানজনক একটি অধ্যায়—শান্তি আলোচনা। রাজধানী বিদেশি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে, সম্রাজ্ঞী বিধবা সিশি ও গুয়াংশু সম্রাট পশ্চিমে পালিয়ে গেছেন, চিং সামরিক বাহিনী পরাজিত এবং উত্তর চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদেশি বাহিনী অবস্থান করছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনের সামনে প্রকৃত অর্থে সমান মর্যাদায় দরকষাকষির সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। শান্তি আলোচনা তাই বিজয়ী ও পরাজিত দুই সমান পক্ষের সমঝোতা ছিল না; এটি ছিল সামরিকভাবে বিপর্যস্ত চিং সরকারের ওপর বিজয়ী শক্তিগুলোর শর্ত নির্ধারণের প্রক্রিয়া।

বেইজিং পতনের পর চিং সরকারের প্রথম কাজ ছিল বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করা এবং এমন প্রতিনিধিদের সামনে আনা, যাদের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এই কঠিন দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রিন্স চিং এবং প্রবীণ রাষ্ট্রনায়ক লি হংঝাংকে। লি হংঝাং এর আগেও বিদেশি শক্তির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন এবং ১৮৯৫ সালে জাপানের সঙ্গে শিমোনোসেকি চুক্তির আলোচনায় চীনের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি আরও কঠিন ছিল। চীন একটি রাষ্ট্রের কাছে নয়, একই সঙ্গে একাধিক বিদেশি শক্তির কাছে পরাজিত। ব্রিটেন, জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সামরিক জোটের সদস্য হলেও শান্তি প্রক্রিয়ায় আরও কয়েকটি রাষ্ট্রের স্বার্থও যুক্ত ছিল। প্রত্যেকের ক্ষতিপূরণ, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক দাবিও এক ছিল না।

অন্যদিকে বিদেশি শক্তিগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য ছিল। কেউ চীনের ওপর অত্যন্ত কঠোর শাস্তি চাপাতে চাইছিল, আবার কেউ আশঙ্কা করছিল অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ ও রাজনৈতিক চাপ চিং সরকারকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বিশেষভাবে চীনের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং উন্মুক্ত বাণিজ্যের নীতি বজায় রাখতে আগ্রহী ছিল। ব্রিটেনও চীন সম্পূর্ণ ভেঙে বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভাগ হয়ে যাক—এমন পরিস্থিতির সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে সতর্ক ছিল।

কিন্তু জার্মানির অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে কঠোর। বেইজিংয়ে জার্মান রাষ্ট্রদূত ক্লেমেন্স ফন কেটেলার নিহত হওয়ার ঘটনা জার্মান সরকারকে ক্ষুব্ধ করেছিল। জার্মানি শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ নয়, এমন আনুষ্ঠানিক ক্ষমা ও শাস্তি চাইছিল যা চিং সরকারের দায় স্বীকারকে প্রকাশ্যে দৃশ্যমান করবে।

১৯০০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বিদেশি শক্তিগুলো তাদের প্রধান দাবিগুলো সমন্বিত করে চীনের সামনে উপস্থাপন করে। এরপর মাসের পর মাস ধরে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ, শাস্তি, সামরিক ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা চলে। কিন্তু আলোচনার মৌলিক বাস্তবতা কখনো বদলায়নি—বিদেশি সৈন্যরা তখনও চীনের রাজধানীতে ছিল।

শান্তি আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি ছিল বক্সার আন্দোলনকে সমর্থনকারী চিং কর্মকর্তাদের শাস্তি। বিদেশি শক্তিগুলো মনে করত শুধু বক্সার যোদ্ধাদের দোষী করলে চলবে না; দরবারের যেসব রাজপুত্র ও কর্মকর্তা তাদের উৎসাহ দিয়েছিলেন বা বিদেশিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদেরও শাস্তি দিতে হবে।

এই দাবির ফলে চিং দরবার অত্যন্ত বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। কারণ বক্সারদের সমর্থনকারী অনেক ব্যক্তি ছিলেন রাজপরিবার বা রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের সদস্য। বিদেশিদের সন্তুষ্ট করতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া মানে কার্যত নিজের সরকারের দায় স্বীকার করা। শেষ পর্যন্ত প্রিন্স দুয়ানসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নির্বাসন, পদচ্যুতি, আত্মহত্যার নির্দেশ বা অন্যান্য কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।

বিদেশি শক্তিগুলো শুধু অতীতের অপরাধীদের শাস্তি দিয়েই সন্তুষ্ট ছিল না। ভবিষ্যতে বিদেশিবিরোধী সংগঠন গড়ে ওঠা ঠেকানোর দায়ও চিং সরকারের ওপর চাপানো হয়। যেসব এলাকায় বিদেশিদের হত্যা বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে সাম্রাজ্যিক সরকারি পরীক্ষা পাঁচ বছরের জন্য স্থগিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এই শাস্তির গুরুত্ব ছিল গভীর। সাম্রাজ্যিক পরীক্ষা ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চীনের প্রশাসনিক অভিজাত শ্রেণিতে প্রবেশের প্রধান পথ। কোনো শহরের পরীক্ষার সুযোগ বন্ধ করা মানে সেই এলাকার উচ্চাকাঙ্ক্ষী শিক্ষিত তরুণদের সরকারি কর্মজীবনের পথ সাময়িকভাবে আটকে দেওয়া। ফলে এটি ছিল শুধু প্রশাসনিক শাস্তি নয়, সামাজিক ও প্রতীকী শাস্তিও।

আরও অপমানজনক ছিল আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার দাবি। কেটেলার হত্যার জন্য চীনকে জার্মান সম্রাটের কাছে বিশেষ দূত পাঠিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে হয়। হত্যাস্থলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ব্যবস্থাও করা হয়। জাপানি দূতাবাসের কর্মকর্তা সুগিয়ামা আকিরা নিহত হওয়ার ঘটনাতেও চীনা সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুশোচনা প্রকাশ করতে হয়।

এই ব্যবস্থাগুলোর উদ্দেশ্য ছিল শুধু নিহতদের সম্মান জানানো নয়। এর মধ্যে একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা ছিল—চিং সরকারকে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হবে যে বিদেশি প্রতিনিধিদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য রাষ্ট্রের দায় রয়েছে।

তবে শান্তি আলোচনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল অর্থ।

বিদেশি সরকার, সামরিক অভিযান, কোম্পানি, মিশনারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন পক্ষের দাবি একত্র করে চীনের ওপর ৪৫০ মিলিয়ন হাইকওয়ান তায়েল রৌপ্য ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়। ১৯০১ সালের মে মাসেই চিং সরকার শেষ পর্যন্ত এই পরিমাণ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

৪৫০ মিলিয়ন তায়েল ছিল শুধু মূলধন। এর ওপর বার্ষিক ৪ শতাংশ সুদ ধার্য করা হয় এবং অর্থ পরিশোধের জন্য ৩৯ বছরের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ চীনের ওপর এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা চাপানো হয়, যার প্রভাব একাধিক প্রজন্ম ধরে রাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর থাকার কথা ছিল।

চীনা প্রতিনিধিরা আলোচনার সময় স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে রাষ্ট্রের কোষাগারের অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। তারা অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি নিয়ে দরকষাকষি করার চেষ্টা করেন। এমনকি বিদেশি প্রতিনিধিদের মধ্যেও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ চীনের আর্থিক সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৪৫০ মিলিয়ন তায়েল এবং ৪ শতাংশ সুদের কাঠামোই গৃহীত হয়।

ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করতে চীনের বিভিন্ন রাজস্ব উৎসকে নিরাপত্তা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সামুদ্রিক শুল্কসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজস্বের ওপর বিদেশি দাবির প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়। এর অর্থ ছিল সামরিক পরাজয়ের মূল্য শুধু রাজদরবার নয়, দীর্ঘমেয়াদে চীনের অর্থনীতি ও সাধারণ জনগণকেও বহন করতে হবে।

বিদেশি শক্তিগুলোর পরবর্তী উদ্বেগ ছিল নিরাপত্তা। বেইজিংয়ের লেগেশন অবরোধ তাদের দেখিয়ে দিয়েছিল যে চীনা রাজধানীতে বিদেশি কূটনীতিকেরা আবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। তাই ভবিষ্যতে চিং সরকার যাতে একইভাবে বিদেশি দূতাবাসগুলোকে ঘিরে ফেলতে না পারে, সে জন্য রাজধানীর ভেতরেই নতুন সামরিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়।

বেইজিংয়ের লেগেশন কোয়ার্টারকে কার্যত বিশেষ বিদেশি-নিয়ন্ত্রিত সুরক্ষিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়। বিদেশি শক্তিগুলো সেখানে স্থায়ী প্রহরী রাখার অধিকার লাভ করে এবং চীনা নাগরিকদের সেখানে বসবাসের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

এটি চীনের সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক ছিল। একটি স্বাধীন সাম্রাজ্যের রাজধানীর মধ্যেই এমন অঞ্চল তৈরি হলো, যার প্রতিরক্ষা বিদেশি সেনাদের হাতে এবং যেখানে চীনা সরকারের স্বাভাবিক কর্তৃত্ব সীমিত।

বিদেশি শক্তিগুলো আরও নিশ্চিত করতে চেয়েছিল যে ভবিষ্যতে বেইজিংয়ের সঙ্গে সমুদ্রের যোগাযোগ চীনা বাহিনী বন্ধ করতে পারবে না। এ কারণে রাজধানী থেকে উপকূল পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে বিদেশি সেনা মোতায়েনের অধিকার দেওয়া হয়।

তিয়ানজিন, তাংগু, শানহাইগুয়ানসহ রাজধানী ও সমুদ্রের মধ্যবর্তী একাধিক কৌশলগত পয়েন্টে বিদেশি সামরিক উপস্থিতির ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে কোনো নতুন সংকট দেখা দিলে বিদেশি বাহিনী দ্রুত উপকূল থেকে বেইজিংয়ের দিকে অগ্রসর হতে পারত।

একই উদ্দেশ্যে চীনকে দাগু দুর্গগুলো ধ্বংস করতে বাধ্য করা হয়। এই দুর্গগুলো সমুদ্র থেকে তিয়ানজিন ও বেইজিংয়ের দিকে প্রবেশপথ রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯০০ সালের সংঘর্ষে এগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

দুর্গগুলো ধ্বংসের অর্থ ছিল ভবিষ্যতে বিদেশি নৌ ও স্থলবাহিনীর রাজধানীর দিকে প্রবেশ প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে চীনের সামরিক সক্ষমতা ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করে দেওয়া। পরাজিত রাষ্ট্রকে শুধু শাস্তি দেওয়া হয়নি; ভবিষ্যতে একই পথে প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও সীমিত করা হয়েছিল।

চীনের সামরিক পুনরায় সজ্জিত হওয়ার ক্ষমতার ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট সামগ্রী আমদানি প্রাথমিকভাবে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। প্রয়োজনে এই নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়ানোর সুযোগ বিদেশি শক্তিগুলোর হাতে রাখা হয়।

এটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শর্ত। একদিকে বিদেশি শক্তিগুলো দাবি করছিল চীনকে আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিয়ম মানতে হবে, অন্যদিকে সামরিক পরাজয়ের পর রাষ্ট্রটির আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহের ক্ষমতাই সীমিত করে দেওয়া হচ্ছিল।

শান্তি আলোচনায় চীনের পররাষ্ট্র প্রশাসনও পরিবর্তনের মুখে পড়ে। পুরোনো জংলি ইয়ামেন, যা বিদেশি সম্পর্ক পরিচালনা করত, বিলুপ্ত করে নতুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়। নতুন প্রতিষ্ঠানটি ছিল ওয়াইউ পু, এবং সরকারি প্রশাসনিক ক্রমে এটিকে উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়।

এই পরিবর্তনের পেছনে বিদেশি শক্তির একটি স্পষ্ট দাবি ছিল—চীনকে ইউরোপীয় ধাঁচের রাষ্ট্র-রাষ্ট্র কূটনীতির কাঠামোর সঙ্গে আরও সরাসরি মানিয়ে নিতে হবে। বিদেশি প্রতিনিধিদের গ্রহণের দরবারি আনুষ্ঠানিকতাও পরিবর্তিত হয়।

বিদেশি শক্তিগুলো চিং প্রশাসনের ওপর আরও একটি কঠোর দায়িত্ব চাপায়। ভবিষ্যতে বিদেশিবিরোধী সংগঠন ও সহিংসতা দমন করতে ব্যর্থ হলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা হবে। অর্থাৎ কোনো অঞ্চলে বিদেশিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ঘটলে শুধু অপরাধীদের নয়, সেই এলাকার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কর্মজীবনও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

এই ব্যবস্থা চিং সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের ওপর বিদেশি চাপকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। একটি দেশের স্থানীয় কর্মকর্তা নিজের জনগণের প্রতি যেমন দায়বদ্ধ, তেমনি এখন তাকে বিদেশি শক্তির নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রত্যাশাও বিবেচনা করতে হচ্ছে।

দীর্ঘ আলোচনার পর এসব শর্ত একত্রিত হয়ে ১৯০১ সালের ফাইনাল প্রোটোকল, যা ইতিহাসে বক্সার প্রোটোকল নামে পরিচিত, তৈরি হয়। ৭ সেপ্টেম্বর ১৯০১ সালে এটি স্বাক্ষরিত হয়। চীনের পক্ষে প্রিন্স চিং ও লি হংঝাং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিদেশি পক্ষের প্রতিনিধিরা শুধু আট জাতির সামরিক জোটের দেশগুলো থেকেই ছিলেন না; চুক্তির ব্যবস্থায় আরও কয়েকটি রাষ্ট্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। “আট জাতির জোট” ছিল মূল সামরিক জোট, কিন্তু বক্সার প্রোটোকলের কূটনৈতিক পক্ষ তার চেয়ে বিস্তৃত ছিল। ফলে শান্তি আলোচনা ছিল শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নেওয়া আট রাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে সাধারণ সামরিক সন্ধি নয়।

লি হংঝাংয়ের জন্য আলোচনাটি ছিল তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষ বড় দায়িত্বগুলোর একটি। তিনি জানতেন চীন এমন অবস্থানে নেই যে বিদেশি দাবিগুলো সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে পারে। তাই তার কাজ ছিল অসম পরিস্থিতির মধ্যেও যতটা সম্ভব ক্ষতি সীমিত করা।

এই বাস্তবতা বক্সার-পরবর্তী শান্তি আলোচনার প্রকৃতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীনা প্রতিনিধিরা কিছু বিষয় নিয়ে দরকষাকষি করেছিলেন, ক্ষতিপূরণ পরিশোধের সক্ষমতার প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং শর্তের বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু চুক্তির মৌলিক কাঠামো নির্ধারণ করেছিল বিজয়ী বিদেশি শক্তিগুলো।

শান্তি আলোচনার পরিণতি চীনের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। বিপুল ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে, বিদেশি সৈন্যের উপস্থিতি জাতীয় অপমানের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং চিং সরকারের অক্ষমতা আরও প্রকাশ্য হয়।

একই সঙ্গে রাজদরবার উপলব্ধি করে যে পুরোনো ব্যবস্থায় রাষ্ট্রকে আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বক্সার বিপর্যয়ের পর সেনাবাহিনী, শিক্ষা, প্রশাসন ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে নতুন নীতি বা শিনঝেং সংস্কার শুরু হয়, তার পেছনে এই পরাজয়ের ধাক্কা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

কিন্তু সংস্কার শুরু করার সময়ই চিং সরকারের সবচেয়ে মূল্যবান রাজনৈতিক সম্পদ—জনগণের আস্থা—গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। জাতীয়তাবাদী ও বিপ্লবী মহলে প্রশ্ন উঠতে থাকে, যে রাজবংশ বিদেশিদের কাছে রাজধানী হারিয়েছে এবং পরে এত কঠোর শর্ত মেনে নিয়েছে, সে কি সত্যিই চীনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সক্ষম?

বক্সার-পরবর্তী শান্তি আলোচনা তাই যুদ্ধ শেষ করার সাধারণ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ছিল না। ক্ষতিপূরণ, বিদেশি সেনা, দুর্গ ধ্বংস, অস্ত্র আমদানির নিষেধাজ্ঞা, কর্মকর্তাদের শাস্তি এবং রাজধানীর মধ্যে বিশেষ বিদেশি অঞ্চল—সব মিলিয়ে এটি চীনের সার্বভৌম ক্ষমতার ওপর গভীর হস্তক্ষেপ প্রতিষ্ঠা করেছিল।

সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, বক্সাররা বিদেশি প্রভাব দূর করার উদ্দেশ্যে যে আন্দোলন শুরু করেছিল, তার পরাজয়ের পর বিদেশি শক্তিগুলো চীনের ওপর আগের চেয়েও বেশি সামরিক ও রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে সক্ষম হয়। ১৯০০ সালের সামরিক পরাজয় তাই ১৯০১ সালে একটি লিখিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়—আর সেই ব্যবস্থার নামই বক্সার প্রোটোকল।

চীনের ইতিহাসে এই শান্তি আলোচনা তাই শুধু একটি যুদ্ধের পরিসমাপ্তি নয়; এটি এমন একটি মুহূর্ত, যখন সামরিক পরাজয়কে অর্থনৈতিক ঋণ, রাজনৈতিক অপমান এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি সামরিক অধিকারে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। বক্সার প্রোটোকলের প্রতিটি বড় শর্ত যেন চিং সাম্রাজ্যকে একই বার্তা দিচ্ছিল—নিজের রাজধানীতে পরাজিত হওয়ার মূল্য চীনকে শুধু তখন নয়, পরবর্তী বহু বছর ধরে বহন করতে হবে।