সুমেরীয় সভ্যতা: মানব ইতিহাসের প্রথম নগরসভ্যতার উত্থান ও হারিয়ে যাওয়ার গল্প
সিরিজ: হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন সভ্যতার রহস্য
সুমেরীয় সভ্যতা
আজ থেকে পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি আগে, বর্তমান ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর বিস্তীর্ণ সমভূমিতে এমন এক সমাজ গড়ে উঠেছিল, যা মানব ইতিহাসের গতিপথই পাল্টে দেয়। সেখানে মানুষ শুধু গ্রামে বসবাস করছিল না; তারা নির্মাণ করছিল বিশাল নগর, সংগঠিত করছিল প্রশাসন, খনন করছিল সেচখাল, দূরদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করছিল এবং মাটির ফলকে এমন চিহ্ন লিখছিল, যা একসময় বিশ্বের প্রাচীনতম পূর্ণাঙ্গ লিখনব্যবস্থাগুলোর একটিতে পরিণত হয়। এই সভ্যতাই সুমেরীয় সভ্যতা, আর দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার উরুক, উর, লাগাশ, এরিদু, নিপ্পুর ও কিশের মতো নগরগুলো মানব ইতিহাসের প্রথম বৃহৎ নগরজীবনের পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছিল।
সুমেরীয়দের ইতিহাসের শুরু কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজা বা যুদ্ধ দিয়ে হয়নি। দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায় দীর্ঘকাল ধরে কৃষিভিত্তিক বসতি বিকশিত হওয়ার পর খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দে নগরায়ণের গতি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে উরুক এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে হাজার হাজার মানুষের বসবাস, বিশেষায়িত শ্রম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, খাদ্যসংগ্রহ এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই সময়টিকে ইতিহাসবিদেরা সাধারণত উরুক যুগের সঙ্গে যুক্ত করেন। মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি শহর শুধু বড় বসতি নয়, বরং রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হতে শুরু করে।
দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার ভূগোল এই উন্নতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অঞ্চলটির মাটি ছিল নদীবাহিত পলিতে সমৃদ্ধ, কিন্তু বৃষ্টিপাত খুবই সীমিত। তাই কৃষি নির্ভর করত সেচব্যবস্থার ওপর। নদী থেকে খাল কেটে জমিতে পানি পৌঁছে দেওয়া, বাঁধ নির্মাণ, খালের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পরিষ্কার করার জন্য বহু মানুষের সমন্বিত শ্রম প্রয়োজন হতো। এই যৌথ ব্যবস্থাপনা ধীরে ধীরে প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান, শ্রম সংগঠন ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিকাশে সহায়তা করে।
কৃষি উৎপাদনের উদ্বৃত্তই নগরজীবনের ভিত্তি তৈরি করেছিল। কৃষকের উৎপাদিত অতিরিক্ত যব, গম, খেজুর ও অন্যান্য খাদ্য নগরের এমন মানুষদের জীবিকা সম্ভব করে, যারা নিজেরা সরাসরি কৃষিকাজ করত না। ফলে আবির্ভূত হয় লেখক, পুরোহিত, ধাতুশিল্পী, মৃৎশিল্পী, ব্যবসায়ী, নির্মাতা ও সৈনিকের মতো বিশেষায়িত পেশা। মানবসমাজ ক্রমে এমন একটি জটিল কাঠামোয় প্রবেশ করে, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি একই ধরনের কাজ করার পরিবর্তে পৃথক অর্থনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করতে শুরু করে।
এই জটিল অর্থনীতি পরিচালনার প্রয়োজন থেকেই সুমেরীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বিপ্লবী উদ্ভাবনগুলোর একটি বিকশিত হয়—কিউনিফর্ম বা কীলকাকার লিখনপদ্ধতি। প্রথমদিকে মাটির ফলকে বিভিন্ন পণ্য, শস্য, পশু কিংবা শ্রমের হিসাব রাখার জন্য প্রতীক ব্যবহার করা হতো। নরম কাদামাটির ওপর খাগড়ার তৈরি লেখনী চেপে বিভিন্ন আকৃতির দাগ তৈরি করা হতো। সময়ের সঙ্গে এই দাগগুলো আরও বিমূর্ত এবং নিয়মিত হয়ে ওঠে।
এর গুরুত্ব ছিল বিপুল। লিখন আর শুধু হিসাবরক্ষার মাধ্যম থাকেনি। সুমেরীয় ভাষায় প্রশাসনিক দলিল, ধর্মীয় স্তোত্র, রাজাদের শিলালিপি, আইনসংক্রান্ত নথি, চিঠিপত্র এবং সাহিত্য লেখা হতে থাকে। মানুষের স্মৃতি প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে মানুষের মস্তিষ্কের বাইরে সংরক্ষিত হতে শুরু করে। একটি রাজ্যের কর, জমি, কর্মী কিংবা শস্যের হিসাব কয়েক বছর পরেও দেখা সম্ভব হলো। রাষ্ট্র পরিচালনায় এর প্রভাব ছিল বৈপ্লবিক।
সুমেরীয়দের রাজনৈতিক জগৎ অবশ্য একটি ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য ছিল না। দক্ষিণ মেসোপটেমিয়া বিভক্ত ছিল একাধিক নগররাষ্ট্রে। উরুক, উর, লাগাশ, উম্মা, নিপ্পুর, এরিদু ও কিশ প্রত্যেকটির নিজস্ব শাসক, দেবতা, কৃষিজমি ও রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল। একটি নগর এবং তার আশপাশের গ্রাম ও কৃষিভূমি মিলে গড়ে উঠত একেকটি রাজনৈতিক একক। ফলে সুমেরীয় ইতিহাসে সহযোগিতার পাশাপাশি যুদ্ধও ছিল প্রায় নিয়মিত ঘটনা।
বিশেষ করে পানি ও কৃষিজমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষের প্রমাণ পাওয়া যায়। লাগাশ ও উম্মার মধ্যকার সীমান্তসংক্রান্ত যুদ্ধ তার বিখ্যাত উদাহরণ। সেচনির্ভর সমাজে একটি খালের অবস্থান পরিবর্তন কিংবা উর্বর জমির দখল শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্ন ছিল না; সেটি নগরের অস্তিত্বের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারত। প্রাচীন শিলালিপি ও স্মারক থেকে বোঝা যায়, সুমেরীয় নগররাষ্ট্রগুলোর রাজনীতি ছিল ধর্ম, কৃষি, সামরিক শক্তি ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণের জটিল সমন্বয়।
ধর্ম সুমেরীয় জীবনের কেন্দ্রস্থলে ছিল। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নগরের নিজস্ব প্রধান দেবতা বা দেবী ছিল। উরুকের সঙ্গে ইনান্না, উরের সঙ্গে নান্না এবং এরিদুর সঙ্গে এনকির সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সুমেরীয়রা দেবতাদের শুধু দূরবর্তী অতিপ্রাকৃত শক্তি হিসেবে ভাবত না; তাদের বিশ্বাসে নগর, কৃষি, নদী, ঝড় এবং মানুষের ভাগ্যের সঙ্গে দেবতাদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল।
এই বিশ্বাসের স্থাপত্যিক প্রকাশ ছিল মন্দিরকেন্দ্রিক বিশাল স্থাপনা এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়া জিগুরাত। এগুলো মিশরের পিরামিডের মতো সমাধি ছিল না। বরং স্তরবিন্যস্ত উঁচু কাঠামোর ওপর ধর্মীয় স্থান নির্মাণ করা হতো। মেসোপটেমিয়ার সমতল ভূমিতে এ ধরনের মন্দির দূর থেকে দৃশ্যমান হতো এবং নগরের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দাঁড়াত।
সুমেরীয়রা নিজেদের অঞ্চলে পর্যাপ্ত কাঠ, পাথর কিংবা ধাতু পেত না। ফলে তাদের সভ্যতার বিকাশে দূরপাল্লার বাণিজ্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে। মেসোপটেমিয়ার শস্য, বস্ত্র এবং অন্যান্য পণ্যের বিনিময়ে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে তামা, কাঠ, পাথর ও মূল্যবান সামগ্রী আনা হতো। পারস্য উপসাগর হয়ে দিলমুন, মাগান এবং আরও দূরের মেলুহহার সঙ্গে বাণিজ্যের উল্লেখ মেসোপটেমীয় দলিলে পাওয়া যায়। মেলুহহাকে সাধারণত সিন্ধু সভ্যতার অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা করা হয়।
এই বাণিজ্যিক যোগাযোগ দেখায় যে প্রাচীন পৃথিবী অনেকের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি আন্তঃসংযুক্ত ছিল। হাজার হাজার বছর আগে নদী, সমুদ্র ও স্থলপথে পণ্য এমন অঞ্চল অতিক্রম করত, যেগুলোর মধ্যে শত শত কিংবা হাজার কিলোমিটার দূরত্ব ছিল।
সুমেরীয়দের সাহিত্যও অসাধারণ গুরুত্ব বহন করে। গিলগামেশের কাহিনি যার পরবর্তী আক্কাদীয় সংস্করণ আজ বেশি পরিচিত, তার শিকড় সুমেরীয় গল্পে নিহিত। উরুকের রাজা গিলগামেশকে ঘিরে রচিত বিভিন্ন সুমেরীয় কবিতা পরবর্তী মেসোপটেমীয় সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মৃত্যু, বন্ধুত্ব, বীরত্ব এবং অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই কাহিনিগুলো প্রমাণ করে যে প্রাচীন মানুষের মৌলিক প্রশ্ন অনেকটাই আধুনিক মানুষের মতো ছিল।
সুমেরীয় গণনা ও সময়পরিমাপের ঐতিহ্যও পরবর্তী মেসোপটেমীয় সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। ষাটভিত্তিক গণনার ঐতিহ্য পরবর্তী ব্যাবিলনীয় গণিতের কেন্দ্রে পরিণত হয়। আজও এক ঘণ্টায় ষাট মিনিট এবং এক মিনিটে ষাট সেকেন্ড ব্যবহারের পেছনে সেই প্রাচীন মেসোপটেমীয় গাণিতিক ঐতিহ্যের দীর্ঘ ছায়া রয়েছে।
কিন্তু নগররাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অবিরাম প্রতিযোগিতা সুমেরীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে দুর্বলও করে তুলেছিল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে বিভিন্ন রাজা অল্প সময়ের জন্য বৃহত্তর অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করলেও স্থায়ী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন ছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেই উত্তর মেসোপটেমিয়ার সেমিটিকভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে উঠে আসেন আক্কাদের সারগন।
খ্রিস্টপূর্ব চব্বিশতম শতকের দিকে সারগন দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় নগররাষ্ট্রগুলো জয় করে একটি বৃহৎ কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের অধীনে সুমেরীয় নগরগুলোর রাজনৈতিক স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে কমে যায়। কিন্তু এর অর্থ সুমেরীয় সংস্কৃতির বিলুপ্তি ছিল না। বরং সুমেরীয় ও আক্কাদীয় ঐতিহ্য পরস্পরের সঙ্গে মিশতে থাকে। রাজনৈতিক পরাজয় সত্ত্বেও সুমেরীয় ভাষা, ধর্ম, প্রশাসন ও লিখনপদ্ধতির মর্যাদা বজায় থাকে।
আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের পতনের পরে মেসোপটেমিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। গুতীয়দের প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন নগর আবার স্বাধীনতার সুযোগ পায়। এরপর খ্রিস্টপূর্ব একবিংশ শতাব্দীর দিকে উরের তৃতীয় রাজবংশ দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায় নতুন শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলে। এই সময়কে কখনো কখনো সুমেরীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের শেষ মহান অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়।
উর-নাম্মু এবং তার উত্তরসূরিদের শাসনে প্রশাসন অত্যন্ত সংগঠিত হয়। বিপুলসংখ্যক মাটির ফলকে কর, শ্রম, পশু, খাদ্য এবং সরকারি কার্যক্রমের হিসাব রাখা হতো। উর-নাম্মুর আইনসংহিতা বিশ্বের প্রাচীনতম পরিচিত আইনসংকলনগুলোর অন্যতম। এটি হাম্মুরাবির বিখ্যাত আইনসংহিতার বহু শতাব্দী আগের।
কিন্তু উরের তৃতীয় রাজবংশও স্থায়ী হয়নি। বহিরাগত চাপ, রাজনৈতিক বিদ্রোহ, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং আমোরীয় জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি রাষ্ট্রটির ভিত্তি নড়বড়ে করে দেয়। একই সময়ে পূর্ব দিকের এলামীয় বাহিনী উর আক্রমণ করে। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০৪ সালের দিকে উরের পতন ঘটে এবং দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয়-নিয়ন্ত্রিত বৃহৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার কার্যত অবসান ঘটে।
তবে সুমেরীয়দের পতনের পেছনে শুধু যুদ্ধ ছিল না। দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার কৃষিতে দীর্ঘমেয়াদি মাটির লবণাক্ততা একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠেছিল। প্রচণ্ড গরমে সেচের পানি বাষ্পীভূত হলে মাটিতে লবণ থেকে যেত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেচের ফলে কিছু অঞ্চলের জমির উৎপাদনক্ষমতা কমে যায়। কৃষকেরা তুলনামূলক লবণসহিষ্ণু যবের দিকে বেশি নির্ভর করতে শুরু করে। এই পরিবেশগত চাপ অর্থনীতিকে দুর্বল করার একটি কারণ হয়ে থাকতে পারে।
নদীর গতিপথ পরিবর্তনও মেসোপটেমিয়ার নগরগুলোর ভাগ্য বদলে দিতে পারত। যে নগর একসময় গুরুত্বপূর্ণ নদীপথের পাশে ছিল, নদী সরে গেলে সেটি বাণিজ্য ও কৃষি—দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। ফলে সুমেরীয় পতনকে একটি একক বিপর্যয়ের ফল হিসেবে দেখা যায় না। যুদ্ধ, রাজনৈতিক বিভক্তি, পরিবেশগত চাপ, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং নতুন জনগোষ্ঠীর উত্থান মিলেই সুমেরীয় রাজনৈতিক পরিচয়কে ধীরে ধীরে ইতিহাসের আড়ালে সরিয়ে দেয়।
সুমেরীয় ভাষাও ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষা হিসেবে হারিয়ে যায়। আক্কাদীয় ভাষা মেসোপটেমিয়ায় প্রাধান্য লাভ করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মৃত কথ্য ভাষায় পরিণত হওয়ার পরও সুমেরীয় বহু শতাব্দী ধরে ধর্মীয়, শিক্ষামূলক ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মেসোপটেমিয়ার লেখকরা বিদ্যালয়ে সুমেরীয় পাঠ করত, প্রাচীন স্তোত্র নকল করত এবং সুমেরীয় শব্দতালিকা সংরক্ষণ করত।
এই কারণেই সুমেরীয় সভ্যতা হারিয়ে গিয়েও প্রকৃত অর্থে হারায়নি। পরবর্তী ব্যাবিলনীয় ও আসিরীয় সভ্যতা তাদের বহু ধর্মীয় ধারণা, দেবতা, সাহিত্য, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং কিউনিফর্ম লিখনঐতিহ্য গ্রহণ করে। এমনকি যে সমাজগুলো রাজনৈতিকভাবে সুমেরীয়দের উত্তরসূরি ছিল না, তারাও সুমেরীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করেছে।
হাজার হাজার বছর পরে উর, উরুক ও অন্যান্য নগরের ধ্বংসাবশেষ খনন করে যখন অসংখ্য মাটির ফলক উদ্ধার করা হয়, তখন আবার কথা বলতে শুরু করে দীর্ঘদিন নীরব হয়ে থাকা এই সভ্যতা। সেই ফলকে কখনো রাজাদের যুদ্ধ, কখনো শস্যের হিসাব, কখনো ছাত্রের অনুশীলন, কখনো ব্যবসায়ীর চুক্তি, আবার কখনো দেবতার উদ্দেশে লেখা প্রার্থনা পাওয়া যায়।
তাই সুমেরীয়দের গুরুত্ব শুধু এই নয় যে তারা বহু প্রাচীন নগর নির্মাণ করেছিল। তাদের প্রকৃত গুরুত্ব হলো, তাদের পৃথিবীতে আমরা প্রথমবারের মতো জটিল নগরসভ্যতার বহু মৌলিক উপাদানকে একসঙ্গে স্পষ্টভাবে দেখতে পাই—নগর, প্রশাসন, সংগঠিত ধর্ম, লিখন, আইন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।
শেষ পর্যন্ত সুমেরীয় রাজারা হারিয়ে গেছেন, তাদের নগরগুলোর বহু অংশ মরুভূমির ধুলোর নিচে চাপা পড়েছে এবং তাদের ভাষা মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তা থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু তারা যে ব্যবস্থা ও ধারণাগুলোর বিকাশে অবদান রেখেছিল, সেগুলো পরবর্তী মেসোপটেমীয় সভ্যতার মাধ্যমে বহু শতাব্দী টিকে ছিল। সুমেরের গল্প তাই শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার গল্প নয়; এটি নগরভিত্তিক মানবসভ্যতার প্রথম মহান অধ্যায়গুলোর একটি—যার ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী ইতিহাসের বিশাল অংশ নির্মিত হয়েছে।
কম্বোডিয়া ও লাওসে ভিয়েতনাম যুদ্ধ: গোপন বোমাবর্ষণ, হো চি মিন ট্রেইল ও লাম সন ৭১৯
নিক্সনের ভিয়েতনামাইজেশন: সেনা প্রত্যাহার, হ্যামবার্গার হিল ও দক্ষিণের যুদ্ধ
আমেরিকায় যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন: টেট, কেন্ট স্টেট ও পেন্টাগন পেপারসের প্রভাব
হুয়ে যুদ্ধ ও মাই লাই গণহত্যা: ভিয়েতনাম যুদ্ধের অন্ধকার অধ্যায়
হিরোশিমা-নাগাসাকি বিতর্ক ও উত্তরাধিকার: কীভাবে শুরু হয়েছিল পারমাণবিক অস্ত্রের যুগ?
হিরোশিমা ও নাগাসাকির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: তেজস্ক্রিয়তা, ক্যানসার ও পুনর্গঠনের ইতিহাস