বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কুনওয়ার সিং, তাতিয়া টোপে ও অন্যান্য নেতা: ১৮৫৭ সালে উত্তর ও মধ্য ভারতের প্রতিরোধ

Series: সিপাহী বিদ্রোহ ১৮৫৭: ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের মহাবিদ্রোহ

  • Author: Admin
  • August 15, 2026
কুনওয়ার সিং, তাতিয়া টোপে ও অন্যান্য নেতা: ১৮৫৭ সালে উত্তর ও মধ্য ভারতের প্রতিরোধ
কুনওয়ার সিং, তাতিয়া টোপে ও অন্যান্য নেতা

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ইতিহাস শুধু দিল্লির বাহাদুর শাহ জাফর, কানপুরের নানা সাহেব, লক্ষ্ণৌর বেগম হযরত মহল কিংবা ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইকে ঘিরে সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যত ছড়িয়ে পড়ে, ততই বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় নেতা, জমিদার, সাবেক সৈনিক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও মারাঠা সেনানায়কেরা নিজেদের মতো করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁদের মধ্যে বিহারের কুনওয়ার সিং এবং মধ্য ভারতের তাতিয়া টোপে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রায় আশি বছর বয়সে যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন, অন্যজন প্রধান বিদ্রোহী কেন্দ্রগুলো পতনের পরও দ্রুতগতির সামরিক অভিযান ও গেরিলা কৌশলে ব্রিটিশদের দীর্ঘদিন ব্যস্ত রেখেছেন। তাঁদের কর্মকাণ্ড দেখায়, ১৮৫৭ সালের প্রতিরোধ কোনো একক রাজধানী বা একক সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল ছিল না।

কুনওয়ার সিং ছিলেন বিহারের শাহাবাদ অঞ্চলের জগদীশপুরের একজন প্রভাবশালী জমিদার ও রাজপুত নেতা। ১৮৫৭ সালে তাঁর বয়স ছিল প্রায় আশি বছর। অর্থনৈতিক সমস্যা এবং ব্রিটিশ রাজস্ব ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আগে থেকেই জটিল ছিল। এমন একজন বৃদ্ধ জমিদার যে দ্রুত একটি বড় সশস্ত্র বিদ্রোহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হবেন, তা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সম্ভবত প্রথমে অনুমান করতে পারেনি।

বিহারে বিদ্রোহের কেন্দ্র গড়ে ওঠে দানাপুর সেনানিবাসের সিপাহীদের বিদ্রোহের পর। ১৮৫৭ সালের জুলাইয়ে সেখানকার ভারতীয় সৈন্যদের একটি অংশ বিদ্রোহ করে এবং শাহাবাদ অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়। তারা কুনওয়ার সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিরোধ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। খুব দ্রুত আড়া বা আরাহ গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

আরাহতে অল্পসংখ্যক ব্রিটিশ ও অনুগত সৈন্য একটি সুরক্ষিত ভবনে আশ্রয় নিয়ে বিদ্রোহীদের অবরোধের মুখে পড়ে। প্রথমদিকে তাদের উদ্ধারের জন্য পাঠানো একটি ব্রিটিশ বাহিনীও বিপর্যস্ত হয়। কুনওয়ার সিংয়ের বাহিনী এলাকার ভূপ্রকৃতি ও স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কার্যকর আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল। পরে শক্তিশালী ব্রিটিশ বাহিনী এসে পরিস্থিতি পাল্টে দেয় এবং কুনওয়ার সিংকে জগদীশপুর ছাড়তে হয়।

কিন্তু এখানেই তাঁর প্রতিরোধ শেষ হয়নি। জগদীশপুর হারিয়েও কুনওয়ার সিং যুদ্ধ চালিয়ে যান, যা তাঁকে ১৮৫৭ সালের অন্য অনেক আঞ্চলিক নেতার থেকে আলাদা করে। তিনি উত্তর ভারতের অন্যান্য বিদ্রোহী অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন এবং বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তাঁর অভিযান তাঁকে আজমগড়সহ পূর্ব উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যায়।

১৮৫৮ সালের প্রথমদিকে যখন ব্রিটিশরা দিল্লি ও কানপুরের মতো বড় কেন্দ্রগুলো পুনর্দখল করে বিদ্রোহীদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল, তখনও কুনওয়ার সিং সক্রিয় ছিলেন। আজমগড় অঞ্চলে তিনি ব্রিটিশ বাহিনীর জন্য উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি করেন। বার্ধক্য সত্ত্বেও তাঁর দ্রুত স্থান পরিবর্তন এবং স্থানীয় সমর্থনের ওপর নির্ভর করা ব্রিটিশদের পক্ষে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে ঘিরে ফেলা কঠিন করে তোলে।

কুনওয়ার সিংকে ঘিরে সবচেয়ে বিখ্যাত কিংবদন্তির একটি তাঁর গঙ্গা পার হওয়ার সময় হাতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা। জনপ্রিয় কাহিনি অনুযায়ী, ব্রিটিশ গুলিতে তাঁর হাত মারাত্মকভাবে আহত হলে তিনি নিজেই সেই অংশ কেটে গঙ্গায় বিসর্জন দিয়েছিলেন। ঘটনাটির নাটকীয় বিবরণ পরবর্তী জাতীয়তাবাদী স্মৃতিতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে, যদিও এর সব খুঁটিনাটি নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন। কিন্তু তিনি আহত অবস্থায়ও জগদীশপুরের দিকে ফিরে গিয়েছিলেন—এটি তাঁর শেষ অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

১৮৫৮ সালের এপ্রিল মাসে কুনওয়ার সিং আবার নিজের অঞ্চলে ফিরে আসেন। ২৩ এপ্রিল জগদীশপুরের কাছে তাঁর বাহিনী ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। নিজের পুরোনো কেন্দ্র ফিরে পাওয়ার অল্প সময় পরেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। এই কারণে কুনওয়ার সিংয়ের শেষ অধ্যায়টি বিশেষ প্রতীকী—তিনি রাজ্য হারিয়ে পালিয়েছিলেন, বহু অঞ্চল ঘুরে যুদ্ধ করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর আগে আবার জগদীশপুরে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন।

কুনওয়ার সিংয়ের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই অমর সিং প্রতিরোধ চালিয়ে যান। এতে বোঝা যায় যে বিহারের বিদ্রোহ শুধু একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ছিল না। স্থানীয় জমিদারি নেটওয়ার্ক, সশস্ত্র অনুসারী এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সেখানে দীর্ঘ প্রতিরোধের ভিত্তি তৈরি করেছিল।

অন্যদিকে তাতিয়া টোপে বা তান্তিয়া টোপের সামরিক জীবন ছিল আরও বিস্তৃত ও গতিশীল। তাঁর প্রকৃত নাম সাধারণভাবে রামচন্দ্র পাণ্ডুরঙ্গ টোপে হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তিনি মারাঠা পেশোয়া পরিবারের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নানা সাহেবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে সামনে আসেন। কানপুরের বিদ্রোহে নানা সাহেবের নেতৃত্বের সঙ্গে তাতিয়া টোপের নাম দ্রুত যুক্ত হয়ে যায়।

কানপুরে ব্রিটিশরা পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পরও তাতিয়া টোপে আত্মসমর্পণ করেননি। বরং তিনি বিদ্রোহী সৈন্যদের পুনর্গঠন করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করেন। ১৮৫৭ সালের শেষদিকে তিনি আবার কানপুরের দিকে বড় বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন এবং কিছু সময়ের জন্য ব্রিটিশ বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু স্যার কলিন ক্যাম্পবেলের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কাছে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন।

এরপর তাতিয়া টোপের অভিযান মধ্য ভারতের দিকে সরে যায়। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই যখন ১৮৫৮ সালে হিউ রোজের বাহিনীর অবরোধের মুখে পড়েন, তাতিয়া টোপে তাঁকে সাহায্য করার জন্য একটি বৃহৎ বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যান। কিন্তু বেতোয়ার যুদ্ধে তাঁর বাহিনী পরাজিত হয়, ফলে ঝাঁসির অবরোধ ভাঙা সম্ভব হয়নি।

ঝাঁসি পতনের পরও লক্ষ্মীবাই এবং তাতিয়া টোপে লড়াই ছাড়েননি। তারা কালপিতে অন্যান্য বিদ্রোহী নেতার সঙ্গে পুনরায় সংগঠিত হন। কালপিও ব্রিটিশদের হাতে চলে গেলে বিদ্রোহী নেতৃত্ব একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়—গোয়ালিয়র দখল করা। গোয়ালিয়রের শিন্ডিয়া শাসক ব্রিটিশদের মিত্র হলেও তাঁর সেনাবাহিনীর একটি অংশ বিদ্রোহীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। ফলে ১৮৫৮ সালের জুনে বিদ্রোহীরা শহর ও দুর্গের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

এই অভিযানে তাতিয়া টোপে, রানি লক্ষ্মীবাই এবং রাও সাহেব—নানা সাহেবের আত্মীয় ও সহযোগী—একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু ব্রিটিশ পাল্টা আক্রমণ দ্রুত আসে। গোয়ালিয়রের কাছে লক্ষ্মীবাই নিহত হন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই শহর পুনরায় ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়।

এ পর্যায়ে ১৮৫৭ সালের প্রধান শহরভিত্তিক বিদ্রোহী কেন্দ্রগুলো প্রায় সবই পতিত। কিন্তু তাতিয়া টোপের যুদ্ধ এখান থেকে নতুন রূপ নেয়। বড় শহর বা দুর্গ ধরে রাখার পরিবর্তে তিনি দ্রুতগতির বাহিনী নিয়ে রাজস্থান ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় চলাচল করতে থাকেন। কখনও কয়েক হাজার সৈন্য তাঁর সঙ্গে থাকত, আবার পরাজয়ের পর বাহিনী ভেঙে গিয়ে অন্যত্র পুনর্গঠিত হতো।

এই পর্যায়ে তাঁর কৌশলের মূল শক্তি ছিল গতিশীলতা। ব্রিটিশ বাহিনী একটি অঞ্চলে পৌঁছানোর আগেই তিনি অন্যদিকে সরে যেতেন। চম্বল অঞ্চল, রাজপুতানা, মালওয়া এবং মধ্য ভারতের বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের সীমান্ত ব্যবহার করে তিনি এক ধরনের চলমান গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তাঁর পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ ঘাঁটি বা স্থায়ী সরবরাহব্যবস্থা ছিল না, তবু তিনি মাসের পর মাস ব্রিটিশ বাহিনীকে তাঁর পেছনে ছুটতে বাধ্য করেন।

তাতিয়া টোপের এই অভিযান ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা দেখায়। দিল্লি, লক্ষ্ণৌ বা ঝাঁসির মতো বড় কেন্দ্র দখল করে রাখা সম্ভব না হলেও প্রতিরোধ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ছোট ও দ্রুত বাহিনী, স্থানীয় রাজনীতি এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতি ব্যবহার করে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা সম্ভব ছিল।

কুনওয়ার সিং ও তাতিয়া টোপের পাশাপাশি আরও বহু আঞ্চলিক নেতা ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে বিস্তৃত করেছিলেন। রোহিলখণ্ডের খান বাহাদুর খান বেরেলিতে ব্রিটিশবিরোধী প্রশাসন গড়ে তোলেন। তিনি রোহিলা শাসক পরিবারের উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিদ্রোহের সময় নিজেকে আঞ্চলিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশরা বেরেলি পুনর্দখল করার পর তাঁর ক্ষমতার কেন্দ্র ভেঙে পড়লেও প্রতিরোধ সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়নি।

আওধে মৌলভি আহমদুল্লাহ শাহ ছিলেন বিদ্রোহের অন্যতম প্রভাবশালী ধর্মীয় ও সামরিক নেতা। ফৈজাবাদের সঙ্গে যুক্ত এই ব্যক্তিত্ব ব্রিটিশবিরোধী প্রচার এবং সশস্ত্র অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তিনি শুধু ধর্মীয় বক্তা ছিলেন না; বিভিন্ন যুদ্ধে তাঁর সামরিক দক্ষতার কথাও ব্রিটিশ বিবরণে স্বীকৃত হয়েছে। লক্ষ্ণৌ ও আওধের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি প্রতিরোধ চালিয়ে যান এবং ১৮৫৮ সালে নিহত হন।

দিল্লিতে বখত খান-এর ভূমিকা ছিল অন্য ধরনের। বেরেলি থেকে বিদ্রোহী সৈন্য নিয়ে তিনি দিল্লিতে পৌঁছে বাহাদুর শাহ জাফরের অধীনে বিদ্রোহী বাহিনীকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন। বিভিন্ন রেজিমেন্ট ও মুঘল দরবারের মধ্যে বিভক্তি কাটিয়ে একটি কেন্দ্রীয় সামরিক কাঠামো তৈরির তাঁর প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি, কিন্তু তাঁর উদ্যোগ দেখায় যে বিদ্রোহীরা নেতৃত্ব ও প্রশাসনের সংকট সম্পর্কে সচেতন ছিল।

এই নেতাদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক লক্ষ্যও এক ছিল না। কুনওয়ার সিং নিজের জমিদারি ক্ষমতা ও আঞ্চলিক কর্তৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; তাতিয়া টোপে মারাঠা-পেশোয়া রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের অংশ; খান বাহাদুর খান রোহিলখণ্ডে নিজস্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন; বখত খান মুঘল সম্রাটের অধীনে সংগঠিত সামরিক প্রশাসনের চেষ্টা করেন। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের শক্তি যেমন এই বহুমাত্রিকতায় ছিল, তেমনি তার দুর্বলতাও এখানেই।

একটি অভিন্ন সর্বভারতীয় কমান্ড ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। দিল্লি, আওধ, কানপুর, বিহার ও মধ্য ভারতের নেতাদের মধ্যে ধারাবাহিক কৌশলগত সমন্বয় ছিল সীমিত। ব্রিটিশরা টেলিগ্রাফ, সুসংগঠিত সামরিক সরবরাহব্যবস্থা, পাঞ্জাব থেকে সৈন্য এবং অনুগত দেশীয় রাজ্যগুলোর সহযোগিতা ব্যবহার করতে পেরেছিল। বিদ্রোহীদের পক্ষে একই ধরনের কেন্দ্রীয় কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

তবু তাতিয়া টোপে দেখিয়েছিলেন যে প্রধান বিদ্রোহী ঘাঁটি হারানোর পরও প্রতিরোধ কত দীর্ঘ হতে পারে। শেষ পর্যন্ত তাঁর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৮৫৯ সালে নারওয়ারের রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত মান সিংয়ের সহযোগিতায় ব্রিটিশরা তাঁকে আটক করতে সক্ষম হয়। সামরিক বিচারের পর ১৮৫৯ সালের এপ্রিল মাসে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ১৮৫৭ থেকে চলতে থাকা অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র প্রতিরোধের অবসান ঘটে।

কুনওয়ার সিং ও তাতিয়া টোপের জীবন তাই ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের দুটি ভিন্ন রূপ তুলে ধরে। কুনওয়ার সিং ছিলেন গভীর আঞ্চলিক শিকড়সম্পন্ন প্রবীণ নেতা, যিনি নিজের ভূখণ্ড হারিয়ে আবার তা পুনর্দখল করেছিলেন। তাতিয়া টোপে ছিলেন চলমান সামরিক প্রতিরোধের প্রতীক, যিনি একটি ঘাঁটি হারালে অন্য অঞ্চলে নতুন যুদ্ধ শুরু করতেন।

তাঁদের সঙ্গে বখত খান, খান বাহাদুর খান, আহমদুল্লাহ শাহ, অমর সিং, রাও সাহেব এবং অসংখ্য কম পরিচিত নেতা যুক্ত হওয়ায় বিদ্রোহ উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। ব্রিটিশরা একটি রাজধানী দখল করলেই পুরো আন্দোলন শেষ হয়ে যায়নি; প্রতিটি অঞ্চলে তাদের নতুন বাহিনী পাঠাতে, নতুন যুদ্ধ করতে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক জোট পুনর্গঠন করতে হয়েছে।

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের প্রকৃত বিস্তার বোঝার জন্য তাই শুধু দিল্লি, কানপুর, লক্ষ্ণৌ ও ঝাঁসির দিকে তাকালে যথেষ্ট নয়। বিহারের জগদীশপুর থেকে রোহিলখণ্ডের বেরেলি, আওধের গ্রামাঞ্চল থেকে রাজপুতানা ও মধ্য ভারতের মরু-অরণ্য পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা প্রতিরোধই ব্রিটিশদের জন্য সংকটকে এত দীর্ঘ ও কঠিন করে তুলেছিল। কুনওয়ার সিংয়ের শেষ জগদীশপুর অভিযান এবং তাতিয়া টোপের মাসের পর মাস চলা গেরিলা যুদ্ধ এই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যগুলোর একটি মনে করিয়ে দেয়—১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দুর্বল ছিল, কিন্তু তার প্রতিরোধের আগুন ছিল বহু কেন্দ্রবিশিষ্ট এবং সহজে নিভিয়ে ফেলা যায়নি।