বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ডায়াটলভ পাস ঘটনা: বরফের পাহাড়ে নয় অভিযাত্রীর রহস্যময় মৃত্যুর রাতে কী ঘটেছিল?

  • Author: Admin
  • August 15, 2026
ডায়াটলভ পাস ঘটনা: বরফের পাহাড়ে নয় অভিযাত্রীর রহস্যময় মৃত্যুর রাতে কী ঘটেছিল?
ডায়াটলভ পাস ঘটনা

১৯৫৯ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তর উরাল পর্বতমালায় এমন একটি ঘটনা ঘটে, যা কয়েক দশক ধরে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত রহস্যময় মৃত্যুর ঘটনাগুলোর একটি হয়ে আছে। দশজন তরুণ ও অভিজ্ঞ অভিযাত্রী একটি কঠিন শীতকালীন অভিযানে বেরিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন অসুস্থতার কারণে মাঝপথে ফিরে আসেন। বাকি নয়জন আর জীবিত ফিরে আসেননি। কয়েক সপ্তাহ পর অনুসন্ধানকারীরা যখন তাঁদের তাঁবু খুঁজে পান, তখন রহস্য আরও গভীর হয়। তাঁবুতে তাঁদের জুতা, গরম পোশাক, খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অনেক কিছুই পড়ে ছিল, অথচ অভিযাত্রীরা তীব্র শীতের রাতে সেখান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁবুর কাপড়ের কিছু অংশ ভেতর থেকে কাটা হয়েছিল বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়। বরফের ওপর পাওয়া পায়ের ছাপ ইঙ্গিত করছিল, তাঁরা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচের বনভূমির দিকে গিয়েছিলেন। প্রশ্নটি তখন থেকেই রয়ে গেছে—কী এমন ঘটেছিল যে অভিজ্ঞ অভিযাত্রীরা মৃত্যুঝুঁকি জেনেও নিরাপদ তাঁবু ছেড়ে বরফের অন্ধকারে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন?

অভিযানটির নেতৃত্বে ছিলেন ইগর আলেক্সেয়েভিচ ডায়াটলভ। তাঁর নাম থেকেই পরবর্তী সময়ে ঘটনাটি ডায়াটলভ পাস ঘটনা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। দলের সদস্যদের অধিকাংশই ছিলেন উরাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী বা সাবেক শিক্ষার্থী। তাঁরা সাধারণ পর্যটক ছিলেন না। কঠিন শীতকালীন পরিবেশে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা, স্কি ব্যবহার, শিবির স্থাপন এবং দুর্গম অঞ্চলে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা তাঁদের ছিল। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল উত্তর উরালের দুর্গম অঞ্চল অতিক্রম করে ওতোরতেন পাহাড়ের দিকে যাওয়া। সে সময়ের মানদণ্ডে অভিযানটি ছিল অত্যন্ত কঠিন।

দলটি ১৯৫৯ সালের ২৩ জানুয়ারি স্ভের্দলোভস্ক থেকে যাত্রা শুরু করে। কয়েকটি পর্যায় পেরিয়ে তারা দুর্গম এলাকার দিকে এগিয়ে যায়। অভিযানের শুরুতে মোট দশজন থাকলেও ইউরি ইউদিন নামে এক সদস্য শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২৮ জানুয়ারি ফিরে যান। সেই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবন বাঁচিয়ে দেয়। বাকি নয়জন সামনে এগিয়ে যান—ইগর ডায়াটলভ, জিনাইদা কোলমোগোরোভা, রুস্তেম স্লোবোদিন, ইউরি দোরোশেঙ্কো, ইউরি ক্রিভোনিশেঙ্কো, লিউদমিলা দুবিনিনা, সেমিয়ন জোলোতারিওভ, আলেকজান্ডার কোলেভাতভ এবং নিকোলাই থিবো-ব্রিনিওল।

দলের রেখে যাওয়া দিনলিপি, আলোকচিত্র ও অন্যান্য নথি থেকে বোঝা যায়, অভিযানের প্রথম অংশ মোটামুটি স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। তাঁরা প্রচণ্ড ঠান্ডা, গভীর তুষার এবং কঠিন পথের সঙ্গে লড়াই করলেও পরিস্থিতি তখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। সদস্যরা ছবি তুলছিলেন, দিনলিপি লিখছিলেন এবং নিজেদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টাও করছিলেন। অর্থাৎ এমন কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ পাওয়া যায় না যে অভিযানের মধ্যে আগে থেকেই গুরুতর দ্বন্দ্ব, আতঙ্ক অথবা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা ঘটছিল।

১ ফেব্রুয়ারি দলটি এমন একটি অঞ্চলে পৌঁছায়, যা পরবর্তী রহস্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। খারাপ আবহাওয়া ও সীমিত দৃশ্যমানতার মধ্যে তারা পথ হারিয়ে খোলাত সিয়াখল নামের পাহাড়ের ঢালের দিকে চলে যায়। স্থানীয় মানসি জনগোষ্ঠীর ভাষায় নামটির অর্থ নিয়ে নানা জনপ্রিয় ব্যাখ্যা ছড়ালেও পরবর্তী রহস্যকাহিনিতে যে ভয়ংকর অর্থ আরোপ করা হয়েছে, তার অনেকটাই অতিরঞ্জিত।

ডায়াটলভ ও তাঁর সঙ্গীরা পাহাড়ের ঢালেই তাঁবু স্থাপন করেন। তাঁরা চাইলে নিচের বনাঞ্চলের দিকে নেমে অপেক্ষাকৃত আশ্রয়যুক্ত স্থানে শিবির করতে পারতেন। কেন ঢালে তাঁবু স্থাপন করা হয়েছিল, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। একটি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো, দলটি উচ্চতা হারাতে চায়নি এবং পরদিন সেখান থেকেই নির্ধারিত পথে যাত্রা চালিয়ে যেতে চেয়েছিল। দক্ষ অভিযাত্রীদের কাছে এমন সিদ্ধান্ত একেবারে অস্বাভাবিক ছিল না।

সেই রাতেই বিপর্যয় ঘটে।

অভিযান শেষ করে ফিরে আসার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডায়াটলভের একটি বার্তা পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু কোনো খবর না আসায় প্রথমে খুব বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়নি, কারণ দুর্গম অভিযানে কয়েক দিনের বিলম্ব অস্বাভাবিক ছিল না। সময় আরও গড়িয়ে গেলে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন এবং অনুসন্ধানের দাবি জানান। শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়।

২৬ ফেব্রুয়ারি অনুসন্ধানকারীরা পাহাড়ের ঢালে অভিযাত্রীদের তাঁবু খুঁজে পান। তাঁবুটি ক্ষতিগ্রস্ত এবং আংশিকভাবে তুষারে ঢাকা ছিল। ভেতরে অভিযাত্রীদের বহু জিনিসপত্র রয়ে গিয়েছিল। জুতা, পোশাক, খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তাঁরা স্বাভাবিকভাবে শিবির গুটিয়ে চলে যাননি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তাঁবুর কাপড়ে কাটা অংশ। তদন্তে এমন চিহ্ন পাওয়া যায়, যা থেকে ধারণা করা হয় তাঁবুর কিছু অংশ ভেতর থেকে কাটা হয়েছিল। অর্থাৎ তাঁবুর স্বাভাবিক প্রবেশপথ ব্যবহার করার পরিবর্তে অন্তত কয়েকজন দ্রুত অন্য পথ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

বরফের ওপর পাওয়া পায়ের ছাপ আরও অদ্ভুত চিত্র তুলে ধরে। তাঁবু থেকে নিচের বনভূমির দিকে একাধিক মানুষের পদচিহ্ন পাওয়া যায়। কেউ মোজা পরে, কেউ এক পায়ে জুতা পরে, আবার কেউ প্রায় খালি পায়ে বেরিয়েছিলেন বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানের বিবরণে উঠে আসে। প্রচণ্ড শীতের মধ্যে এমনভাবে বেরিয়ে যাওয়া ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। কিন্তু পদচিহ্নের ধরন থেকে এমন ধারণাও তৈরি হয় যে তাঁরা সবাই সম্পূর্ণ উন্মত্তভাবে ছুটছিলেন—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বরং অন্তত কিছু সময় তাঁরা সংগঠিতভাবে ঢাল বেয়ে নিচে নেমে থাকতে পারেন।

তাঁবু থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার নিচে বনাঞ্চলের কাছে একটি বড় দেবদারু গাছের নিচে প্রথম দুটি মরদেহ পাওয়া যায়। তাঁরা ছিলেন ইউরি ক্রিভোনিশেঙ্কো ও ইউরি দোরোশেঙ্কো। তাঁদের শরীরে পর্যাপ্ত গরম পোশাক ছিল না। কাছেই ছোট একটি আগুন জ্বালানোর চিহ্ন পাওয়া যায়। দেবদারু গাছটির কিছু ডালও ভাঙা ছিল। ধারণা করা হয়, তাঁরা হয়তো আগুন জ্বালিয়ে নিজেদের উষ্ণ রাখার চেষ্টা করেছিলেন এবং কেউ গাছে উঠে তাঁবু বা আশপাশের পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করে থাকতে পারেন।

এরপর তাঁবু ও দেবদারু গাছের মধ্যবর্তী পথে আরও তিনজনের মরদেহ পাওয়া যায়—ইগর ডায়াটলভ, জিনাইদা কোলমোগোরোভা এবং রুস্তেম স্লোবোদিন। তাঁদের অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে। তাঁরা হয়তো বনাঞ্চল থেকে আবার তাঁবুর দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে বোঝা যায় যে প্রথম আতঙ্ক বা বিপদ কেটে যাওয়ার পর দলের অন্তত কিছু সদস্য বুঝেছিলেন, তাঁবুতে ফিরে গরম পোশাক ও সরঞ্জাম উদ্ধার করা ছাড়া বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব কম।

প্রথম পাঁচজনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রবল ঠান্ডা ছিল প্রধান কারণগুলোর একটি। কিন্তু বাকি চারজনকে তখনও পাওয়া যায়নি। কয়েক মাস অনুসন্ধানের পর মে মাসে তুষারের নিচে একটি গিরিখাত বা গভীর খাদসদৃশ স্থানে তাঁদের মরদেহ পাওয়া যায়। এখান থেকেই ডায়াটলভ পাস রহস্য আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে।

শেষ চারজনের কয়েকজনের শরীরে গুরুতর আঘাত ছিল। লিউদমিলা দুবিনিনার বুকের অংশে গুরুতর ক্ষতি এবং সেমিয়ন জোলোতারিওভের পাঁজরে মারাত্মক আঘাত পাওয়া যায়। নিকোলাই থিবো-ব্রিনিওলের মাথার খুলিতেও গুরুতর আঘাত ছিল। এই আঘাতগুলোর প্রকৃতি নিয়ে পরবর্তী দশকগুলোতে অসংখ্য অনুমান তৈরি হয়েছে। কেউ দাবি করেছেন, এমন আঘাত মানুষের আক্রমণ ছাড়া সম্ভব নয়; কেউ আবার সামরিক বিস্ফোরণ বা অজানা শক্তির কথা বলেছেন।

কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই জনপ্রিয় রহস্যকাহিনিতে হারিয়ে যায়। গুরুতর আঘাত মানেই অন্য মানুষের হামলা নয়। বরফের নিচে গভীর খাদে পড়ে যাওয়া, ভারী তুষার বা বরফের চাপ এবং অসমতল পাথুরে ভূমির ওপর পতনের ফলেও প্রচণ্ড আঘাত সৃষ্টি হতে পারে। শেষ চারজন যে স্থানে পাওয়া গিয়েছিলেন, সেই পরিবেশ বিবেচনা করলে প্রাকৃতিক আঘাতের সম্ভাবনাকে বাদ দেওয়া যায় না।

লিউদমিলা দুবিনিনার জিহ্বা ও মুখের কিছু নরম কলা অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি রহস্যকে আরও আলোচিত করেছে। জনপ্রিয় গল্পে এটি প্রায়ই ভয়ংকর আক্রমণের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু মরদেহ দীর্ঘ সময় তুষার, পানি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ছিল। পচন, প্রবাহিত পানি এবং প্রাকৃতিক ক্ষয়ের ফলে উন্মুক্ত নরম কলা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে এই বিষয়টি একা কোনো রহস্যময় হত্যাকারীর উপস্থিতি প্রমাণ করে না।

আরেকটি বহুল আলোচিত বিষয় হলো কিছু পোশাকে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা শনাক্ত হওয়া। এখান থেকেই গোপন সোভিয়েত সামরিক পরীক্ষা, পারমাণবিক অস্ত্র, গোপন ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা পরীক্ষামূলক প্রযুক্তির তত্ত্ব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু পাওয়া মাত্রা এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যদের পূর্ববর্তী কর্মপরিবেশ বিবেচনা না করে এটিকে সরাসরি পারমাণবিক বিপর্যয়ের প্রমাণ বলা যায় না। দলের অন্তত একজন সদস্য আগে এমন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছিলেন যেখানে তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংস্পর্শের সম্ভাবনা ছিল। তাই পোশাকের তেজস্ক্রিয়তা আকর্ষণীয় তথ্য হলেও রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান নয়।

ঘটনাটিকে ঘিরে আকাশে অদ্ভুত আলোর কথাও পরবর্তী সময়ে উঠে আসে। উত্তর উরালের আকাশে উজ্জ্বল গোলক বা আলোকিত বস্তু দেখার বিভিন্ন বিবরণ থেকে কেউ কেউ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, সামরিক অভিযান অথবা অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তুর তত্ত্ব দাঁড় করান। কিন্তু এই পর্যবেক্ষণগুলোর সময়, অবস্থান এবং ডায়াটলভ দলের মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায়নি। রহস্য যত জনপ্রিয় হয়েছে, পরবর্তী স্মৃতি, গুজব ও বিচ্ছিন্ন ঘটনার সঙ্গে মূল ঘটনাকে যুক্ত করার প্রবণতাও তত বেড়েছে।

মানসি জনগোষ্ঠীর আক্রমণের তত্ত্বও একসময় বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁবু ও আশপাশে বহিরাগত আক্রমণকারীর নির্ভরযোগ্য পদচিহ্ন পাওয়া যায়নি। অভিযাত্রীদের মূল্যবান জিনিসপত্রও লুট করা হয়নি। তাছাড়া স্থানীয় মানসি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অভিযাত্রীদের সংঘাতের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছিল না। ফলে তদন্তকারীরা এই ধারণা থেকে সরে আসেন।

দলের সদস্যদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল—এমন তত্ত্বও দুর্বল। নয়জনের মধ্যে হঠাৎ এমন ভয়াবহ দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে সবাইকে প্রায় পোশাকহীন অবস্থায় তাঁবু ছেড়ে দেড় কিলোমিটার দূরে চলে যেতে বাধ্য করবে, অথচ ঘটনাস্থলে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকবে না—এটি ব্যাখ্যা করা কঠিন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই তাঁবুতেই ফিরে আসে। কেন তাঁরা তাঁবু কেটে বাইরে বেরিয়েছিলেন?

আধুনিক বিশ্লেষণে তুষারধস বা ছোট আকারের তুষারস্তর সরে যাওয়ার ব্যাখ্যা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রচলিত বিশাল তুষারধসের ছবির সঙ্গে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি পুরোপুরি মেলে না বলে বহু বছর এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। উদ্ধারকারীরা তাঁবুর ওপর বিশাল ধ্বংসস্তূপও দেখেননি। কিন্তু তুষারধস মানেই পাহাড়ের সম্পূর্ণ ঢাল ভেঙে বিশাল বরফের স্রোত নেমে আসা নয়। ঢালের ওপরের একটি শক্ত তুষারস্তর বিচ্ছিন্ন হয়ে সীমিত এলাকায় সরে আসতে পারে।

তাঁবু স্থাপনের জন্য অভিযাত্রীরা ঢালের তুষার কেটে সমতল জায়গা তৈরি করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এতে ওপরের তুষারস্তরের স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে থাকতে পারে। এর সঙ্গে প্রবল বাতাস ওপরের অংশে ক্রমাগত তুষার জমিয়ে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কয়েক ঘণ্টা পরে সেই তুষারের একটি শক্ত স্তর সরে এসে তাঁবুর ওপর চাপ সৃষ্টি করলে অভিযাত্রীরা মনে করতে পারেন যে আরও বড় ধস আসন্ন।

এই পরিস্থিতিতে তাঁবুর স্বাভাবিক দরজা ব্যবহার করার পরিবর্তে কাপড় কেটে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়া যুক্তিসঙ্গত হয়ে ওঠে। বাইরে তখন অন্ধকার, প্রবল বাতাস এবং প্রচণ্ড ঠান্ডা। তাঁরা হয়তো মনে করেছিলেন সাময়িকভাবে নিচের বনাঞ্চলে আশ্রয় নেবেন এবং বিপদ কেটে গেলে তাঁবুতে ফিরে আসবেন। তাই সবাই পুরো পোশাক পরার জন্য সময় নেননি।

এই ব্যাখ্যা ঘটনাটির পরবর্তী পর্যায়ের সঙ্গেও আশ্চর্যজনকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দলটি নিচের বনাঞ্চলে পৌঁছে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করে। দুজন দেবদারু গাছের কাছে থেকে যায়। কয়েকজন সম্ভবত তাঁবুতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অন্যরা আরও ভালো আশ্রয়ের সন্ধানে গভীর তুষারের মধ্যে একটি খাদ বা গিরিখাতের দিকে যায়। সেখানে তাঁরা তুষার ব্যবহার করে আশ্রয় তৈরির চেষ্টাও করে থাকতে পারেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শেষ চারজনের শরীরে অন্যদের তুলনায় বেশি পোশাক পাওয়া গিয়েছিল। এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা অত্যন্ত নির্মম কিন্তু বাস্তবসম্মত। দলের যাঁরা আগে মারা গিয়েছিলেন, তাঁদের পোশাক জীবিতরা খুলে নিজেদের শরীরে ব্যবহার করেছিলেন। চরম শীতে এটি অস্বাভাবিক নয়; বরং বেঁচে থাকার মরিয়া প্রচেষ্টার অংশ। ফলে পোশাকের অদ্ভুত বণ্টনকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা জরুরি নয়।

তাহলে গুরুতর আঘাতগুলো কীভাবে এল? সম্ভাব্য দৃশ্যপটে একাধিক ঘটনা ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁবুর ওপর সরে আসা ভারী তুষারস্তর কয়েকজনকে শুরুতেই আহত করে থাকতে পারে। আবার নিচের খাদে আশ্রয় নেওয়া সদস্যরা তুষারের স্তর ভেঙে নিচে পড়ে যেতে পারেন অথবা পরে তাঁদের ওপর বিপুল তুষার জমে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পাথুরে ভূমি, কয়েক মিটার তুষার এবং ভারী চাপের সমন্বয়ে গুরুতর অভ্যন্তরীণ আঘাত সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব নয়।

২০২০ সালে রুশ কর্তৃপক্ষের নতুন তদন্তের ফল প্রকাশিত হলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ব্যাখ্যাই আবার সামনে আসে। তদন্তে তুষারধসজাতীয় ঘটনা, দিক হারানো এবং তীব্র ঠান্ডাকে মৃত্যুর প্রধান ধারাবাহিক কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও বিশেষ ধরনের তুষারস্তর সরে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে গাণিতিক ও ভৌত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব গবেষণা রহস্যের প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয় না, কিন্তু দেখায় যে ঘটনাটি ব্যাখ্যা করতে অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রয়োজন নাও হতে পারে।

তবে এখানেই ডায়াটলভ পাস ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি বোঝা দরকার—একটি শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকা আর ঘটনাটির প্রতিটি মুহূর্ত নিশ্চিতভাবে জানা এক বিষয় নয়। সেই রাতে কোনো জীবিত প্রত্যক্ষদর্শী ফিরে আসেননি। ফলে তাঁবু ছাড়ার ঠিক আগে কী ঘটেছিল, কে প্রথম বিপদ বুঝেছিলেন, তাঁরা কী আলোচনা করেছিলেন, কোন সদস্য কখন আহত হয়েছিলেন এবং ঠিক কোন ক্রমে নয়জনের মৃত্যু ঘটে—এসব প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর আর কখনোই পাওয়া নাও যেতে পারে।

ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছিল সোভিয়েত যুগের গোপনীয়তা। ১৯৫৯ সালের তদন্তের চূড়ান্ত ভাষাও ছিল অস্পষ্ট। তদন্তে মৃত্যুর পেছনে এমন এক প্রবল প্রাকৃতিক শক্তির কথা বলা হয়েছিল, যা অভিযাত্রীরা অতিক্রম করতে পারেননি। স্পষ্ট কারণের বদলে এমন অস্পষ্ট সিদ্ধান্ত পরবর্তী দশকগুলোতে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। সোভিয়েত রাষ্ট্রের সামরিক গোপনীয়তার ইতিহাসের কারণে মানুষের সন্দেহ আরও বেড়ে যায়।

এরপর গল্পের সঙ্গে একের পর এক উপাদান যুক্ত হতে থাকে—গোপন অস্ত্র পরীক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র, তেজস্ক্রিয়তা, অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু, গুপ্তচর, মানসি আক্রমণ, রহস্যময় শব্দ, অদৃশ্য শক্তি এমনকি অজানা প্রাণী। সমস্যা হলো, এসব তত্ত্বের অধিকাংশই ঘটনাস্থলের সব প্রমাণকে একই সঙ্গে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কোনো তত্ত্ব তাঁবু কাটার ব্যাখ্যা দেয় কিন্তু পায়ের ছাপের নয়; কোনোটি আঘাতের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু কেন মূল্যবান জিনিস অক্ষত ছিল তা বোঝাতে পারে না; আবার কোনোটি আকাশের আলোকে গুরুত্ব দেয় কিন্তু তার সঙ্গে অভিযাত্রীদের মৃত্যুর সরাসরি যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ধারাবাহিক ব্যাখ্যার শক্তি এখানেই। এর জন্য অদৃশ্য আক্রমণকারী বা গোপন অস্ত্র ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি বিপজ্জনক তুষারস্তর, প্রবল বাতাস, রাতের অন্ধকার, দ্রুত তাঁবু ত্যাগ, নিচের বনভূমিতে আশ্রয় নেওয়া, দল বিভক্ত হয়ে যাওয়া, কয়েকজনের তাঁবুতে ফেরার ব্যর্থ চেষ্টা, খাদে দুর্ঘটনা এবং শেষ পর্যন্ত হিমশীতল পরিবেশ—এই ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করলে নয়জনের করুণ পরিণতির একটি বাস্তবসম্মত চিত্র তৈরি হয়।

তবু রহস্য পুরোপুরি মুছে যায় না। কারণ প্রকৃতি কী করতে পারে তা ব্যাখ্যা করা সম্ভব হলেও সেই নির্দিষ্ট রাতে প্রকৃতি ঠিক কী করেছিল, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ সীমিত। উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছিল ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পরে। ততদিনে বাতাস, নতুন তুষারপাত এবং আবহাওয়া ঘটনাস্থলের অনেক চিহ্ন পরিবর্তন করে দিয়েছিল। শেষ চারটি মরদেহ পাওয়া যায় আরও কয়েক মাস পরে। ফলে তদন্তকারীরা যে দৃশ্য দেখেছিলেন, সেটি ১ ও ২ ফেব্রুয়ারির রাতের অপরিবর্তিত ঘটনাস্থল ছিল না।

ডায়াটলভ পাসের রহস্য তাই সম্ভবত কোনো একক অবিশ্বাস্য ঘটনার গল্প নয়; বরং ছোট ছোট বিপদের একটি প্রাণঘাতী শৃঙ্খল। পাহাড়ে এমন পরিস্থিতিতে একটি ভুল সিদ্ধান্ত পরের সিদ্ধান্তকে আরও কঠিন করে তোলে। তাঁবু ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়তো প্রথম মুহূর্তে সঠিক ছিল। কিন্তু তাঁবু থেকে দূরে যাওয়ার পর অন্ধকার ও তুষারঝড়ে সেটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। তাঁবুতে ফিরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, শরীর দ্রুত তাপ হারাতে থাকে, আহত সদস্যদের চলাচল সীমিত হয় এবং দলের সক্ষমতা ক্রমশ ভেঙে পড়ে।

এই দৃষ্টিতে দেখলে ঘটনাটি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কারণ তখন রহস্যের জন্য কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির দরকার হয় না। নয়জন দক্ষ ও অভিজ্ঞ মানুষ হয়তো সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই এমন পরিস্থিতিতে আটকে গিয়েছিলেন, যেখানে প্রতিটি পরবর্তী বিকল্প আগেরটির চেয়ে খারাপ ছিল।

আজ যে পাহাড়ি গিরিপথটি ডায়াটলভের নাম বহন করে, সেটি শুধু একটি রহস্যময় মৃত্যুর স্থান নয়; এটি চরম পরিবেশে মানুষের সীমাবদ্ধতারও প্রতীক। আধুনিক গবেষণা তুষারস্তর সরে যাওয়া, প্রবল বাতাস, ভূপ্রকৃতি, আঘাত এবং হাইপোথার্মিয়ার সমন্বয়ে ঘটনার একটি বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত সম্ভাব্য ব্যাখ্যা পাওয়ার পরও সেই রাতের প্রতিটি মিনিট পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়নি।

আর সম্ভবত এ কারণেই ডায়াটলভ পাস ঘটনা এত দীর্ঘ সময় ধরে মানুষকে আকর্ষণ করে চলেছে। আমরা জানি তাঁরা কোথায় তাঁবু স্থাপন করেছিলেন। জানি তাঁরা তাঁবু ছেড়েছিলেন। জানি তাঁরা বনভূমিতে পৌঁছেছিলেন, আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং কেউ কেউ আবার তাঁবুর দিকে ফিরতে চেয়েছিলেন। আমরা জানি শেষ পর্যন্ত নয়জনই মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু যে মুহূর্তে তাঁরা উষ্ণ পোশাক, জুতা ও নিরাপদ আশ্রয় পেছনে ফেলে বরফঢাকা অন্ধকারের দিকে বেরিয়ে গেলেন, সেই মুহূর্তটির সম্পূর্ণ গল্প তাঁদের সঙ্গেই হারিয়ে গেছে।

ডায়াটলভ পাসের সবচেয়ে বড় রহস্য তাই হয়তো নয়জন মানুষ কীভাবে মারা গিয়েছিলেন, সেটি নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সেই হিমশীতল রাতে তাঁরা কী দেখেছিলেন, শুনেছিলেন বা অনুভব করেছিলেন, যার কারণে তাঁবুর ভেতরে থাকার চেয়ে জুতা ছাড়াই বরফের অন্ধকারে বেরিয়ে যাওয়াকে বেশি নিরাপদ বলে মনে হয়েছিল?