স্মার্টফোনের টাচস্ক্রিন আপনার আঙুলের স্পর্শ বুঝতে পারে কীভাবে? জানুন ক্যাপাসিটিভ প্রযুক্তির রহস্য
স্মার্টফোনের টাচস্ক্রিন আপনার আঙুলের স্পর্শ বুঝতে পারে কীভাবে?
আপনি স্মার্টফোনের পর্দায় একটি অক্ষর ছুঁয়ে দিলেন, আর মুহূর্তের মধ্যেই সেটি লেখা হয়ে গেল। দুটি আঙুল পরস্পর থেকে দূরে সরাতেই ছবি বড় হয়ে গেল। আঙুল ওপরের দিকে টানলে একটি ওয়েবপাতা নিচের অংশ দেখাতে শুরু করল। পুরো ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে মনে হতে পারে পর্দা যেন সত্যিই বুঝতে পারছে আপনি কোথায় এবং কীভাবে স্পর্শ করেছেন। বাস্তবে স্মার্টফোনের পর্দা মানুষের মতো কোনো স্পর্শ অনুভব করে না। এটি আপনার আঙুলের উপস্থিতির কারণে পর্দার অত্যন্ত ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক পরিবর্তন পরিমাপ করে এবং সেই তথ্য থেকে স্পর্শের অবস্থান নির্ণয় করে।
আধুনিক স্মার্টফোনে সাধারণত যে স্পর্শসংবেদী ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়, তার মূল ভিত্তি হলো বৈদ্যুতিক ধারকত্বের পরিবর্তন। মানুষের শরীর বিদ্যুৎ পরিবহনে সক্ষম হওয়ায় আঙুল পর্দার কাছে এলে পর্দার বৈদ্যুতিক অবস্থায় সামান্য পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন এত ক্ষুদ্র যে মানুষ তা অনুভব করতে পারে না, কিন্তু ফোনের অত্যন্ত সংবেদনশীল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা সেটি পরিমাপ করতে পারে। এরপর সেই পরিমাপকে গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করে ফোন নির্ধারণ করে আপনার আঙুল পর্দার ঠিক কোন স্থানে রয়েছে।
স্মার্টফোনের সামনের চকচকে কাচটিই পুরো স্পর্শ শনাক্তকারী ব্যবস্থা নয়। এর নিচে একাধিক সূক্ষ্ম স্তর থাকে। ওপরের শক্ত কাচ পর্দাকে আঁচড়, চাপ ও দৈনন্দিন আঘাত থেকে রক্ষা করে। এর নিচের দিকে থাকে স্বচ্ছ পরিবাহী পদার্থের অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিন্যাস। এই পরিবাহী অংশগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যে সেগুলো দৃশ্যমান আলোকে যথেষ্ট পরিমাণে পার হতে দেয়। ফলে ব্যবহারকারী নিচের প্রদর্শন স্তরের ছবি দেখতে পারেন, অথচ একই সঙ্গে তার ওপরে থাকা স্পর্শ শনাক্তকারী স্তর কাজ করতে পারে।
এই পরিবাহী স্তরকে কল্পনা করা যায় অদৃশ্য একটি জালের মতো। পর্দার ওপর অসংখ্য অনুভূমিক ও উল্লম্ব শনাক্তকারী অঞ্চল থাকে। এগুলো এত সূক্ষ্ম যে খালি চোখে সাধারণত আলাদা করে বোঝা যায় না। ফোন এই জালের বিভিন্ন অংশের বৈদ্যুতিক অবস্থা বারবার পরীক্ষা করতে থাকে। আপনি পর্দা স্পর্শ না করলেও এই পরীক্ষা চলতে থাকে। অর্থাৎ পর্দা কার্যত প্রতি মুহূর্তে খুঁজছে তার বৈদ্যুতিক অবস্থায় কোথাও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে কি না।
এখানে মানুষের আঙুলের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানবদেহে পানি ও বিভিন্ন দ্রবীভূত লবণ থাকায় শরীর কিছুটা বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে। আঙুল যখন স্পর্শসংবেদী পর্দার কাছে আসে এবং শেষ পর্যন্ত কাচের ওপর স্পর্শ করে, তখন আঙুল পর্দার বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়া শুরু করে। ফলে নির্দিষ্ট এলাকার ধারকত্ব পরিবর্তিত হয়। ফোনের স্পর্শ নিয়ন্ত্রক সেই অতি ক্ষুদ্র পরিবর্তন শনাক্ত করে।
ধারকত্বকে সহজভাবে বোঝার জন্য দুটি পরিবাহী অংশের মধ্যে বৈদ্যুতিক আধান ধরে রাখার ক্ষমতা হিসেবে ভাবা যেতে পারে। স্মার্টফোনের স্পর্শসংবেদী স্তরের বিভিন্ন পরিবাহী অংশের মধ্যে আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক সম্পর্ক থাকে। আঙুল কাছে এলে মানুষের শরীর সেই ব্যবস্থায় আরেকটি বৈদ্যুতিক প্রভাব যোগ করে। ফলে আগের ভারসাম্য সামান্য বদলে যায়। এই পরিবর্তন থেকেই ফোন বুঝতে পারে যে ওই স্থানে একটি পরিবাহী বস্তু, সাধারণত মানুষের আঙুল, উপস্থিত হয়েছে।
তবে শুধু স্পর্শ হয়েছে বুঝতে পারলেই যথেষ্ট নয়। ফোনকে জানতে হয় পর্দার ঠিক কোথায় স্পর্শ করা হয়েছে। এখানেই সূক্ষ্ম পরিবাহী জালের গুরুত্ব। ধরুন পর্দায় অনুভূমিক ও উল্লম্ব অসংখ্য শনাক্তকারী রেখা রয়েছে। আঙুল একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখলে সেই এলাকার কাছাকাছি কয়েকটি রেখার বৈদ্যুতিক মান পরিবর্তিত হয়। কোন অনুভূমিক এবং কোন উল্লম্ব অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে নিয়ন্ত্রক স্পর্শের স্থানাঙ্ক নির্ণয় করতে পারে।
বাস্তবে এই হিসাব শুধু একটি রেখার ছেদবিন্দু শনাক্ত করার মতো সরল নয়। আঙুলের ডগা একটি বিন্দু নয়; এটি পর্দার একটি ছোট এলাকা ঢেকে রাখে। ফলে একই সঙ্গে কাছাকাছি একাধিক শনাক্তকারী অঞ্চলের মান পরিবর্তিত হয়। নিয়ন্ত্রক সেই পরিবর্তনের বিস্তার ও তীব্রতা বিশ্লেষণ করে আঙুলের স্পর্শের আনুমানিক কেন্দ্র নির্ণয় করে। এই কারণেই আধুনিক ফোন খুব সূক্ষ্মভাবে বুঝতে পারে আপনি ছোট একটি বোতামের কোন অংশে স্পর্শ করেছেন।
এই পুরো প্রক্রিয়া অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বারবার ঘটে। আপনি আঙুল স্থির রাখলেও ফোন নিয়মিত নতুন পরিমাপ সংগ্রহ করে। আর আঙুল সরালে প্রতিটি নতুন পরিমাপে স্পর্শের স্থানাঙ্ক একটু একটু করে পরিবর্তিত হয়। ধরুন আপনি পর্দার নিচ থেকে ওপরের দিকে আঙুল টানলেন। প্রথম মুহূর্তে ফোন একটি স্থানাঙ্ক পেল, পরের মুহূর্তে তার চেয়ে সামান্য ওপরে আরেকটি, তারপর আরও ওপরে আরেকটি। এই ধারাবাহিক স্থান পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেই ফোন বুঝতে পারে আপনি শুধু স্পর্শ করেননি, বরং আঙুল ওপরের দিকে টেনেছেন।
এখানে স্পর্শ শনাক্তকারী যন্ত্রাংশ এবং ফোনের পরিচালনব্যবস্থার কাজ আলাদা। পর্দার বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা প্রথমে কেবল কোথায় স্পর্শ ঘটছে তার কাঁচা তথ্য সংগ্রহ করে। একটি বিশেষ নিয়ন্ত্রক সেই তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে ব্যবহারযোগ্য স্থানাঙ্ক তৈরি করে। এরপর পরিচালনব্যবস্থা সেই স্থানাঙ্ক, সময় এবং আঙুলের চলাচলের ধরন বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয় ঘটনাটি একটি সাধারণ চাপ, দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখা, টেনে নেওয়া, দ্রুত সরানো নাকি অন্য কোনো অঙ্গভঙ্গি।
ধরুন আপনি একটি প্রতীকের ওপর খুব দ্রুত আঙুল ছুঁয়ে তুলে নিলেন। ফোন প্রথমে আঙুলের উপস্থিতি শনাক্ত করবে, তারপর খুব অল্প সময়ের মধ্যে আঙুল সরে যাওয়ার তথ্য পাবে। পরিচালনব্যবস্থা সময়ের ব্যবধান ও অবস্থান বিশ্লেষণ করে এটিকে সাধারণ স্পর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু একই জায়গায় আঙুল কিছুক্ষণ ধরে রাখলে সেটি দীর্ঘ স্পর্শ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। আবার আঙুল রেখে একদিকে সরালে সেটি টেনে নেওয়ার নির্দেশে পরিণত হয়। অর্থাৎ পর্দা মূলত অবস্থান জানায়; সেই অবস্থানের ধারাবাহিক পরিবর্তনকে অর্থপূর্ণ নির্দেশে রূপ দেয় ফোনের সফটওয়্যার।
আধুনিক স্পর্শসংবেদী পর্দার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাগুলোর একটি হলো একসঙ্গে একাধিক আঙুল শনাক্ত করা। আপনি যখন দুটি আঙুল দিয়ে একটি ছবি বড় করেন, তখন পর্দার দুটি আলাদা স্থানে ধারকত্বের পরিবর্তন ঘটে। নিয়ন্ত্রক একই সময়ে দুটি স্পর্শবিন্দুর স্থানাঙ্ক নির্ণয় করতে পারে। এরপর ফোন লক্ষ্য করে বিন্দু দুটি একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পরিচালনব্যবস্থা এই বিন্যাসকে ছবি বড় করার অঙ্গভঙ্গি হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
একইভাবে দুটি আঙুল কাছাকাছি আনলে ফোন বুঝতে পারে যে ব্যবহারকারী ছবি ছোট করতে চাইছেন। কিছু যন্ত্র একসঙ্গে আরও অনেক স্পর্শবিন্দু শনাক্ত করতে পারে। এই ক্ষমতার কারণেই পর্দায় দুই আঙুলে ছবি ঘোরানো, একাধিক আঙুলে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া কিংবা জটিল খেলায় একই সময়ে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
এখানে একটি মজার প্রশ্ন আসে—সাধারণ দস্তানা পরে অনেক স্মার্টফোনের পর্দা ঠিকমতো কাজ করে না কেন? কারণ সাধারণ কাপড় বা নিরোধক পদার্থ আঙুল এবং পর্দার বৈদ্যুতিক পারস্পরিক ক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়। আপনার আঙুল কাচের ওপর সরাসরি বা পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক সংযোগ তৈরি করতে না পারলে পর্দার ধারকত্বে প্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটে না। ফলে ফোন মনে করতে পারে সেখানে কোনো স্পর্শই ঘটেনি।
এই সমস্যার জন্য বিশেষ স্পর্শসংবেদী দস্তানা তৈরি করা হয়। এসব দস্তানার আঙুলের অংশে এমন পরিবাহী উপাদান থাকে, যা মানুষের আঙুলের বৈদ্যুতিক প্রভাব পর্দার কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করে। ফলে দস্তানা পরেও স্পর্শসংবেদী পর্দা ব্যবহার করা যায়। একই কারণে সাধারণ প্লাস্টিকের কলম দিয়ে আধুনিক ফোনের পর্দা ছোঁয়া হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় না, কিন্তু বিশেষভাবে তৈরি পরিবাহী স্পর্শকলম কাজ করতে পারে।
পর্দায় পানি পড়লে কখনো কখনো অদ্ভুত আচরণ করার পেছনেও একই বৈদ্যুতিক নীতি রয়েছে। পানি, বিশেষ করে এতে লবণ বা অন্যান্য দ্রবীভূত পদার্থ থাকলে, বৈদ্যুতিক আচরণে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। পর্দার ওপর পানির ফোঁটা ছড়িয়ে থাকলে সেটি স্পর্শ শনাক্তকারী ব্যবস্থার বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে নিয়ন্ত্রকের জন্য আসল আঙুলের স্পর্শ এবং পানির কারণে তৈরি পরিবর্তনের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
আধুনিক স্মার্টফোনে অবশ্য এই সমস্যা কমাতে উন্নত সংকেত বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়। নিয়ন্ত্রক শুধু বৈদ্যুতিক পরিবর্তন ঘটেছে কি না তা দেখে না; পরিবর্তনের আকার, স্থায়িত্ব, বিস্তার ও চলাচলের ধরনও বিবেচনা করতে পারে। কোনো পরিবর্তন মানুষের আঙুলের স্বাভাবিক স্পর্শের মতো না হলে সেটিকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করা হয়। তবুও খুব ভেজা পর্দায় স্পর্শের নির্ভুলতা কমে যেতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনিচ্ছাকৃত স্পর্শ প্রত্যাখ্যান। ফোন হাতে ধরলে তালুর অংশ বা আঙুলের পাশ কখনো পর্দার কিনারায় লেগে যেতে পারে। ফোন যদি প্রতিটি বৈদ্যুতিক পরিবর্তনকে ইচ্ছাকৃত নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করত, তাহলে ব্যবহার করা অত্যন্ত বিরক্তিকর হয়ে উঠত। তাই আধুনিক ব্যবস্থা স্পর্শের আকার, অবস্থান, স্থায়িত্ব এবং চলাচলের ধরন দেখে অনুমান করার চেষ্টা করে কোনটি ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্যমূলক স্পর্শ এবং কোনটি দুর্ঘটনাবশত হয়েছে।
বিশেষ করে খুব সরু প্রান্তবিশিষ্ট ফোনে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহারকারী ফোন ধরার সময় হাতের অংশ পর্দার কিনারায় লেগে থাকলেও সফটওয়্যার সেটিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। অন্যদিকে একই জায়গায় সচেতনভাবে আঙুল দিয়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ স্পর্শ করলে সেটি গ্রহণ করা হয়। এর পেছনে বৈদ্যুতিক পরিমাপের পাশাপাশি জটিল গাণিতিক বিশ্লেষণও কাজ করে।
পর্দার ওপর যে সুরক্ষামূলক কাচ লাগানো হয়, সেটিও স্পর্শ শনাক্তকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। খুব মোটা বা নিম্নমানের সুরক্ষামূলক স্তর আঙুল ও স্পর্শসংবেদী অংশের মধ্যকার দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। দূরত্ব বাড়লে আঙুলের কারণে তৈরি বৈদ্যুতিক পরিবর্তন তুলনামূলক দুর্বল হতে পারে। ভালো মানের আধুনিক ফোন সাধারণ সুরক্ষামূলক কাচের মধ্য দিয়েও এই পরিবর্তন শনাক্ত করার মতো সংবেদনশীলভাবে তৈরি হয়। কিছু ফোনে অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক স্তর ব্যবহারের জন্য স্পর্শসংবেদনশীলতা বাড়ানোর ব্যবস্থাও থাকে।
অনেকের ধারণা, পর্দায় চাপ বেশি দিলে ফোন স্পর্শ আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে। সাধারণ ধারকত্বভিত্তিক স্মার্টফোন পর্দার ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক এমন নয়। এটি মূলত যান্ত্রিক চাপের পরিমাণ মেপে আঙুল শনাক্ত করে না; বরং বৈদ্যুতিক পরিবর্তন শনাক্ত করে। তাই খুব জোরে চাপ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আঙুলের যথেষ্ট কাছাকাছি উপস্থিতিই বৈদ্যুতিক পরিবর্তন তৈরির জন্য সাধারণত যথেষ্ট।
পুরোনো কিছু স্পর্শসংবেদী যন্ত্রে ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো। সেখানে পর্দার দুটি পরিবাহী স্তর চাপের কারণে একে অপরের সংস্পর্শে এলে স্পর্শ শনাক্ত করা হতো। সেই ব্যবস্থায় আঙুলের পরিবর্তে প্লাস্টিকের কলম কিংবা অন্য কোনো বস্তু দিয়েও চাপ দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু আধুনিক স্মার্টফোনে বহুল ব্যবহৃত ধারকত্বভিত্তিক ব্যবস্থা হালকা স্পর্শ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং একাধিক আঙুল শনাক্ত করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সুবিধাজনক।
তবে স্পর্শ শনাক্ত হওয়ার পরও কাজ শেষ হয় না। আপনার আঙুল পর্দায় স্পর্শ করার মুহূর্ত থেকে কোনো বোতাম সক্রিয় হওয়া পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ তথ্যপ্রবাহ ঘটে। প্রথমে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের পরিবর্তন তৈরি হয়। স্পর্শসংবেদী স্তর সেই পরিবর্তন ধরে। নিয়ন্ত্রক সেটিকে সংখ্যাগত তথ্যে রূপান্তর করে। এরপর সেই তথ্য পরিচালনব্যবস্থার কাছে যায়। পরিচালনব্যবস্থা নির্ধারণ করে কোন স্থানে স্পর্শ হয়েছে এবং সেই স্থানে বর্তমানে কোন বোতাম, অক্ষর, ছবি বা অন্য নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সবশেষে সংশ্লিষ্ট নির্দেশ কার্যকর হয়।
ধরুন আপনি পর্দার কীবোর্ডে ক অক্ষরটি স্পর্শ করলেন। স্পর্শসংবেদী স্তর জানে না আপনি বাংলা অক্ষর লিখতে চাইছেন। সেটি শুধু বলতে পারে পর্দার একটি নির্দিষ্ট স্থান স্পর্শ করা হয়েছে। পরিচালনব্যবস্থা বা কীবোর্ডের সফটওয়্যার জানে ওই স্থানাঙ্কের নিচে বর্তমানে ক অক্ষরের বোতাম রয়েছে। তাই সেই স্পর্শকে ক লেখার নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পর্দার বিন্যাস বদলে গেলে একই স্থানাঙ্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজ করতে পারে।
এ কারণেই টাচস্ক্রিনকে শুধু একটি পর্দা বলা পুরোপুরি যথার্থ নয়। এটি একই সঙ্গে ছবি দেখানোর মাধ্যম এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি দ্বিমাত্রিক স্পর্শসংবেদী ব্যবস্থা। প্রদর্শন অংশ আপনাকে তথ্য দেখায়, আর তার সঙ্গে সমন্বিত স্পর্শসংবেদী অংশ আপনার আঙুলের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে। এই দুই ব্যবস্থার দ্রুত সমন্বয়ের কারণেই মনে হয় আমরা পর্দায় দেখা বস্তুগুলোকে সরাসরি ছুঁয়ে নিয়ন্ত্রণ করছি।
এই প্রযুক্তির নির্ভুলতা এত বেশি যে আঙুলের কয়েক মিলিমিটার নড়াচড়াও ফোন ধরতে পারে। কিন্তু আঙুলের ডগা তুলনামূলক বড় হওয়ায় সফটওয়্যারকে অনেক সময় অনুমানও করতে হয় ব্যবহারকারী আসলে কোন ক্ষুদ্র বোতামটি চাপতে চেয়েছেন। তাই আধুনিক ব্যবহারকারী-অন্তর্মুখ নকশায় শুধু স্পর্শ শনাক্তকারী যন্ত্রাংশ নয়, সফটওয়্যারভিত্তিক সংশোধনও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কাছাকাছি দুটি বোতামের মধ্যে কোনটি ব্যবহারকারী সম্ভবত নির্বাচন করতে চেয়েছেন, তা নির্ধারণে অবস্থান ও ব্যবহারের প্রেক্ষাপট কাজে লাগানো হতে পারে।
স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গে ফোনে যে ক্ষুদ্র কম্পন অনুভূত হয়, সেটিকেও অনেকেই স্পর্শ শনাক্তকারী ব্যবস্থার অংশ মনে করেন। বাস্তবে এটি আলাদা প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা। ফোন প্রথমে আপনার স্পর্শ শনাক্ত করে এবং তারপর ছোট কম্পন সৃষ্টিকারী যন্ত্রাংশকে সক্রিয় করে। ফলে আপনার আঙুলে এমন অনুভূতি তৈরি হয় যেন পর্দার কোনো বাস্তব বোতাম চাপা হয়েছে। অর্থাৎ বৈদ্যুতিক স্পর্শ শনাক্তকরণের সঙ্গে যান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া যুক্ত করে ডিজিটাল পর্দাকে আরও স্বাভাবিক অনুভূতি দেওয়া হয়।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই সমস্ত ঘটনা মানুষের উপলব্ধির তুলনায় অত্যন্ত দ্রুত ঘটে। আঙুল স্পর্শ করা, বৈদ্যুতিক পরিবর্তন মাপা, স্থানাঙ্ক নির্ণয়, সফটওয়্যারে তথ্য পাঠানো, নির্দেশ চিহ্নিত করা এবং পর্দায় ফলাফল দেখানো—সবকিছু এত অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয় যে আমাদের কাছে প্রক্রিয়াটি প্রায় তাৎক্ষণিক বলে মনে হয়। যন্ত্রাংশ ও সফটওয়্যারের বিলম্ব যত কম হয়, ফোনের স্পর্শ তত বেশি দ্রুত ও স্বাভাবিক মনে হয়।
তাই স্মার্টফোন আসলে আপনার আঙুলকে দেখে না, আঙুলের চাপকে সাধারণ অর্থে অনুভবও করে না। এটি আপনার শরীরের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে পর্দার সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র ও ধারকত্বে যে পরিবর্তন ঘটে, সেটিই শনাক্ত করে। সেই ক্ষুদ্র পরিবর্তন থেকে নির্ণয় করা হয় আঙুলের অবস্থান। পরপর অসংখ্য অবস্থান বিশ্লেষণ করে বোঝা হয় আঙুল কোন দিকে যাচ্ছে। একাধিক স্পর্শবিন্দু বিশ্লেষণ করে বোঝা হয় দুই বা ততোধিক আঙুলের অঙ্গভঙ্গি। আর সবশেষে সফটওয়্যার সেই তথ্যকে আমাদের পরিচিত চাপ, টানা, ঘোরানো, বড় করা বা ছোট করার মতো নির্দেশে রূপান্তর করে।
প্রতিদিন আমরা হয়তো হাজারবার স্মার্টফোনের পর্দা স্পর্শ করি, কিন্তু প্রতিটি স্পর্শের পেছনে ঘটে অত্যন্ত সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক পরিমাপ, দ্রুত গাণিতিক হিসাব এবং যন্ত্রাংশ ও সফটওয়্যারের নিখুঁত সমন্বয়। আঙুলের একটি সাধারণ স্পর্শকে ডিজিটাল নির্দেশে রূপান্তর করার এই ক্ষমতাই আধুনিক স্মার্টফোনকে বোতামনির্ভর যন্ত্র থেকে সরাসরি স্পর্শে নিয়ন্ত্রিত শক্তিশালী ব্যক্তিগত যন্ত্রে পরিণত করেছে।
জিন থেরাপি কী? ত্রুটিপূর্ণ জিন সংশোধন করে রোগ চিকিৎসার সম্ভাবনা
কম্পিউটার ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়? ডিভাইসের ক্ষতি ও নিরাপদ থাকার উপায়
টেলিস্কোপ কীভাবে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের বস্তু দেখে? আলোর যাত্রা ও প্রযুক্তির বিজ্ঞান
নিউরাল নেটওয়ার্ক কীভাবে শেখে? মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে মিল ও পার্থক্য
রোবট কি ব্যথা অনুভব করতে পারবে? কৃত্রিম স্পর্শ ও ইলেকট্রনিক ত্বকের বিজ্ঞান
ব্লুটুথ কীভাবে কাজ করে? তার ছাড়া দুটি যন্ত্রে তথ্য পাঠানোর বিজ্ঞান