দিল্লি পুনর্দখল থেকে ঝাঁসি ও গোয়ালিয়র: ব্রিটিশরা কীভাবে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ দমন করেছিল
Series: সিপাহী বিদ্রোহ ১৮৫৭: ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের মহাবিদ্রোহ
- Author: Admin
- August 15, 2026
দিল্লি পুনর্দখল থেকে ঝাঁসি ও গোয়ালিয়র
১৮৫৭ সালের মে মাসে মিরাট থেকে শুরু হওয়া বিদ্রোহ যখন দিল্লি, কানপুর, লক্ষ্ণৌ, ঝাঁসি, বিহার ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন সত্যিকারের অস্তিত্বসংকটে পড়েছিল। দিল্লিতে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বিদ্রোহের প্রতীকী নেতা ঘোষণা করা হয়, আওধে ব্রিটিশ প্রশাসন প্রায় ভেঙে পড়ে এবং কানপুর ও ঝাঁসির মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বিদ্রোহীদের হাতে চলে যায়। কিন্তু ১৮৫৭ সালের শেষভাগ থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করে। ব্রিটিশরা একটি মাত্র निर्णায়ক যুদ্ধে বিদ্রোহ দমন করেনি; বরং দিল্লি পুনর্দখল, যোগাযোগপথ নিয়ন্ত্রণ, পাঞ্জাব থেকে নতুন বাহিনী আনা এবং একের পর এক বিদ্রোহী কেন্দ্র বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে সামরিক বিজয় অর্জন করেছিল।
বিদ্রোহের প্রথম পর্যায়ে ব্রিটিশদের সবচেয়ে বড় বিপদ ছিল দিল্লি। ১১ মে বিদ্রোহীরা শহর দখল করার পর বাহাদুর শাহ জাফরের নাম উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধের রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে ব্রিটিশদের কাছে দিল্লি পুনর্দখল শুধু সামরিক প্রয়োজন ছিল না; এটি ছিল বিদ্রোহের প্রতীকী কেন্দ্র ধ্বংস করার কৌশলগত লক্ষ্য।
এই অভিযানে পাঞ্জাবের গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। পাঞ্জাব যদি ব্যাপকভাবে বিদ্রোহ করত, তাহলে ব্রিটিশদের পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারত। কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন সেখানে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয় এবং শিখ, পাঞ্জাবি মুসলমান, পাঠান ও অন্যান্য বাহিনী থেকে নতুন সৈন্য সংগ্রহ করে। পাতিয়ালা, জিন্দ ও নাভার মতো দেশীয় রাজ্যও ব্রিটিশদের সাহায্য করে। ফলে পাঞ্জাব থেকে দিল্লির দিকে সৈন্য, গোলাবারুদ ও রসদ পাঠানোর পথ খোলা থাকে।
জুন ১৮৫৭ নাগাদ ব্রিটিশ বাহিনী দিল্লির উত্তরের রিজ অঞ্চলে অবস্থান নেয়। শুরু হয় দীর্ঘ অবরোধ। বিদ্রোহীরা বারবার ব্রিটিশ অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালালেও তাদের দিল্লি থেকে সরাতে পারেনি। অন্যদিকে ব্রিটিশরাও পর্যাপ্ত ভারী কামান ও সৈন্য না পাওয়া পর্যন্ত শহরের ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ চালাতে পারেনি।
সেপ্টেম্বর নাগাদ নতুন অবরোধকারী কামান ও শক্তিবৃদ্ধি এসে পৌঁছায়। দিল্লির প্রাচীরের ওপর ব্যাপক গোলাবর্ষণ শুরু হয় এবং কয়েকটি স্থানে প্রতিরক্ষা দুর্বল করা হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর ১৮৫৭ ব্রিটিশ বাহিনী দিল্লির ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু করে। কাশ্মীরি গেটসহ বিভিন্ন অংশে তীব্র যুদ্ধ হয়। ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে শিখ, পাঞ্জাবি ও গুর্খা সৈন্যরাও অংশ নেয়।
শহরের ভেতরে কয়েক দিন ধরে রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলে। শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে এবং ব্রিটিশরা দিল্লির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বাহাদুর শাহ জাফর হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় নিলেও পরে বন্দি হন। তাঁর কয়েকজন পুত্রকে হত্যা করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়। দিল্লির পতন বিদ্রোহীদের জন্য বিশাল সামরিক ক্ষতির পাশাপাশি আরও বড় রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক আঘাত ছিল।
ব্রিটিশ পুনর্দখলের পর দিল্লির সাধারণ মানুষও ভয়াবহ প্রতিশোধের শিকার হয়। সন্দেহভাজন বিদ্রোহীদের মৃত্যুদণ্ড, লুটপাট, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং বহু বাসিন্দাকে শহর থেকে বহিষ্কারের ঘটনা ঘটে। ফলে বিদ্রোহ দমনের ইতিহাস শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের সামরিক বিজয়ের ইতিহাস নয়; ব্রিটিশ প্রতিশোধমূলক অভিযানও ছিল অত্যন্ত কঠোর ও বহু ক্ষেত্রে নির্বিচার।
দিল্লি পতনের আগেই ব্রিটিশরা কানপুর পুনর্দখলের চেষ্টা শুরু করেছিল। হেনরি হ্যাভলকের বাহিনী এলাহাবাদ থেকে অগ্রসর হয়ে জুলাই ১৮৫৭-তে কানপুরে পৌঁছায়। নানা সাহেবের বাহিনী পরাজিত হয় এবং ব্রিটিশরা শহর পুনর্দখল করে। তবে কানপুরের যুদ্ধ এখানেই শেষ হয়নি। তাতিয়া টোপে পরবর্তীকালে নতুন বাহিনী নিয়ে আবার আক্রমণ করেন। শেষ পর্যন্ত স্যার কলিন ক্যাম্পবেলের বাহিনী বিদ্রোহীদের পরাজিত করে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র হিসেবে কানপুরকে নিরাপদ করে।
এরপর ব্রিটিশদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে লক্ষ্ণৌ ও আওধ। লক্ষ্ণৌ রেসিডেন্সিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ সৈন্য ও বেসামরিক মানুষ অবরুদ্ধ ছিল। সেপ্টেম্বর মাসে হ্যাভলক ও জেমস আউটরামের বাহিনী রেসিডেন্সিতে পৌঁছালেও তারা পুরোপুরি অবরোধ শেষ করতে পারেনি। নভেম্বর মাসে কলিন ক্যাম্পবেল আরও শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে এসে অবরুদ্ধদের নিরাপদে সরিয়ে নেন।
কিন্তু লক্ষ্ণৌ তখনও বিদ্রোহীদের হাতে। তাই ১৮৫৮ সালের মার্চে ব্রিটিশরা পরিকল্পিত বৃহৎ অভিযান শুরু করে। ভারী কামান, সংগঠিত পদাতিক বাহিনী এবং নেপালের জং বাহাদুরের পাঠানো গুর্খা বাহিনীর সহায়তায় তারা একটির পর একটি বিদ্রোহী অবস্থান দখল করে। মার্চ ১৮৫৮-তে লক্ষ্ণৌ পুনর্দখল ব্রিটিশদের জন্য আরেকটি निर्णায়ক সাফল্য হয়ে ওঠে।
লক্ষ্ণৌ হারানোর পরও আওধের গ্রামাঞ্চলে যুদ্ধ দীর্ঘদিন চলেছিল। তালুকদার, সাবেক সিপাহী এবং স্থানীয় যোদ্ধারা বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ চালিয়ে যায়। ব্রিটিশরা তাই শুধু সামরিক অভিযান নয়, রাজনৈতিক কৌশলও ব্যবহার করে। কিছু তালুকদারের জমি ও মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়ে তাদের বিদ্রোহী জোট থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হয়। দমন এবং সমঝোতা—দুটি কৌশল একসঙ্গে ব্যবহার করেই আওধকে পুনরায় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
উত্তর ভারতের প্রধান কেন্দ্রগুলো দুর্বল হওয়ার পর ব্রিটিশরা মধ্য ভারতের দিকে মনোযোগ দেয়। এখানে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই এবং অন্যান্য বিদ্রোহী নেতা তখনও শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ব্রিটিশ অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন স্যার হিউ রোজ, যিনি সেন্ট্রাল ইন্ডিয়া ফিল্ড ফোর্স নিয়ে পরিকল্পিতভাবে একের পর এক বিদ্রোহী অবস্থান দখল করতে থাকেন।
১৮৫৮ সালের মার্চে হিউ রোজ ঝাঁসি অবরোধ করেন। ঝাঁসির দুর্গ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং লক্ষ্মীবাইয়ের বাহিনী প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাতিয়া টোপে একটি বড় বাহিনী নিয়ে ঝাঁসিকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেও বেতোয়ার যুদ্ধে ব্রিটিশরা তাঁকে পরাজিত করে। ফলে ঝাঁসি বাইরের সাহায্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ভারী কামানের গোলাবর্ষণের পর এপ্রিলের শুরুতে ব্রিটিশ বাহিনী ঝাঁসির প্রতিরক্ষা ভেদ করে। শহরের ভেতরে তীব্র সংঘর্ষ হয়। লক্ষ্মীবাই অবশ্য বন্দি হননি; তিনি দুর্গ থেকে বেরিয়ে কালপির দিকে চলে যেতে সক্ষম হন। ঝাঁসি দখলের পর ব্রিটিশ বাহিনী থেমে থাকেনি। তাদের কৌশল ছিল পরাজিত বিদ্রোহীদের পুনর্গঠনের সুযোগ না দিয়ে দ্রুত অনুসরণ করা।
কালপিতে লক্ষ্মীবাই, তাতিয়া টোপে, রাও সাহেব ও অন্যান্য বিদ্রোহী নেতা নতুন করে বাহিনী সংগঠিত করেন। কিন্তু ১৮৫৮ সালের মে মাসে হিউ রোজের বাহিনী কালপিতেও তাদের পরাজিত করে। তবু বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করেনি। তারা এবার গোয়ালিয়রের দিকে অগ্রসর হয়।
গোয়ালিয়রের শাসক জয়াজিরাও সিন্ধিয়া ব্রিটিশদের অনুগত ছিলেন, কিন্তু তাঁর সেনাবাহিনীর একটি অংশ বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয়। জুন ১৮৫৮-তে লক্ষ্মীবাই, তাতিয়া টোপে ও রাও সাহেবের বাহিনী গোয়ালিয়র দখল করতে সক্ষম হয়। বিশাল দুর্গ, অস্ত্রাগার এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে এটি বিদ্রোহীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল।
কিন্তু ব্রিটিশরা বিদ্রোহীদের সেখানে শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরির সময় দেয়নি। হিউ রোজ দ্রুত পাল্টা অভিযান শুরু করেন। ১৮ জুন ১৮৫৮ কোটা-কি-সেরাইয়ের যুদ্ধে রানি লক্ষ্মীবাই নিহত হন। কয়েক দিনের মধ্যেই ব্রিটিশ বাহিনী গোয়ালিয়র পুনর্দখল করে এবং সিন্ধিয়াকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনে। গোয়ালিয়রের পতনের মাধ্যমে মধ্য ভারতে বিদ্রোহীদের অন্যতম শেষ বড় সংগঠিত সামরিক কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যায়।
তবু ১৮৫৮ সালের জুনেই পুরো বিদ্রোহ শেষ হয়ে যায়নি। তাতিয়া টোপে বড় শহর বা দুর্গ ধরে রাখার কৌশল ত্যাগ করে রাজপুতানা ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দ্রুতগতির গেরিলা অভিযান চালাতে থাকেন। তাঁর বাহিনী এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সরে যেত এবং ব্রিটিশদের বারবার নতুন অভিযান পরিচালনা করতে হতো। অবশেষে ১৮৫৯ সালে মান সিংয়ের সহযোগিতায় তাতিয়া টোপে বন্দি হন এবং সামরিক বিচারের পর তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
বিহারেও একই ধরনের দীর্ঘ প্রতিরোধ দেখা যায়। কুনওয়ার সিং ১৮৫৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন এবং মৃত্যুর আগে জগদীশপুরে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সাফল্য অর্জন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই অমর সিং প্রতিরোধ চালিয়ে যান। আওধেও বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহী বাহিনী দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিল। ফলে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ দমন আসলে ১৮৫৮ ও ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি দীর্ঘ সামরিক প্রক্রিয়া।
ব্রিটিশ বিজয়ের পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত সুবিধা ছিল। প্রথমত, তারা ভারতের সব অঞ্চল হারায়নি। পাঞ্জাব, বাংলা প্রেসিডেন্সির বৃহৎ অংশ, বোম্বে ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফলে সেখান থেকে সৈন্য ও সম্পদ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। সমুদ্রপথেও ব্রিটেন ও সাম্রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চল থেকে নতুন বাহিনী ভারতে আনা হয়।
দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশরা টেলিগ্রাফ ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে দ্রুত সংবাদ ও সামরিক নির্দেশ পাঠাতে পেরেছিল। রেলপথ তখন সীমিত হলেও যেখানে ছিল, সেখানে সৈন্য পরিবহনে তা সহায়ক হয়। নদীপথ, গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড এবং সংগঠিত সরবরাহব্যবস্থাও ব্রিটিশ বাহিনীর গতিশীলতা বাড়ায়।
তৃতীয়ত, বিদ্রোহীদের কোনো একক কেন্দ্রীয় কমান্ড ছিল না। দিল্লিতে বাহাদুর শাহ জাফর, কানপুরে নানা সাহেব, আওধে বেগম হযরত মহল, ঝাঁসিতে লক্ষ্মীবাই, বিহারে কুনওয়ার সিং এবং বিভিন্ন অঞ্চলে অন্য নেতারা লড়লেও তাদের মধ্যে সমন্বিত সর্বভারতীয় সামরিক পরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি। একটি অঞ্চল বিপদে পড়লে অন্য অঞ্চলের বাহিনী সবসময় কার্যকরভাবে সাহায্য করতে পারেনি।
চতুর্থত, বহু ভারতীয় শক্তি ব্রিটিশদের পাশে ছিল। শিখ, পাঞ্জাবি, গুর্খা এবং অন্যান্য ভারতীয় সৈন্যের বড় অংশ ব্রিটিশ বাহিনীতে যুদ্ধ করে। হায়দরাবাদ, পাতিয়ালা, জিন্দ এবং বহু দেশীয় রাজ্য বিদ্রোহে যোগ দেয়নি। গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শাসকও ব্রিটিশপন্থী ছিলেন। ভারতীয় সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা ছাড়া ব্রিটিশদের পক্ষে এত দ্রুত শক্তি পুনর্গঠন করা অনেক কঠিন হতো।
পঞ্চমত, ব্রিটিশরা বিদ্রোহীদের প্রধান শহরগুলো একসঙ্গে আক্রমণ করার পরিবর্তে ক্রমান্বয়ে বিচ্ছিন্ন করে। দিল্লি পতনের পর সেখানে আটকে থাকা ব্রিটিশ বাহিনী অন্য অঞ্চলে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। কানপুর নিরাপদ হলে লক্ষ্ণৌ অভিযান সহজ হয়। লক্ষ্ণৌ পুনর্দখলের পর মধ্য ভারতের বিরুদ্ধে আরও সম্পদ ব্যবহার করা যায়। এটি ছিল বিদ্রোহী কেন্দ্রগুলোকে একে একে ধ্বংস করার কার্যকর সামরিক কৌশল।
তবে এই বিজয়ের সঙ্গে ব্যাপক নিষ্ঠুরতাও যুক্ত ছিল। ব্রিটিশ বাহিনী বহু অঞ্চলে সন্দেহভাজন বিদ্রোহীদের দ্রুত মৃত্যুদণ্ড দেয়, গ্রাম ধ্বংস করে এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। কামানের মুখে বেঁধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো ভয়াবহ শাস্তিও ব্যবহৃত হয়। কানপুরে ব্রিটিশ নারী ও শিশু হত্যার সংবাদ বিশেষভাবে প্রতিশোধের আবেগকে তীব্র করেছিল। বিদ্রোহীদের সহিংসতার জবাবে ব্রিটিশ প্রতিশোধও বহু ক্ষেত্রে নির্বিচার ও নির্মম হয়ে ওঠে।
সামরিক বিজয়ের পর ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে যে পুরোনো ব্যবস্থায় ভারত শাসন চালিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। ১৮৫৮ সালের Government of India Act-এর মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারত সরাসরি ব্রিটিশ ক্রাউনের অধীনে চলে যায়। দেশীয় রাজ্য দখলের আগ্রাসী নীতি শিথিল করা হয় এবং রাজাদের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
ভারতীয় সেনাবাহিনীও ব্যাপকভাবে পুনর্গঠন করা হয়। ইউরোপীয় সৈন্যের অনুপাত বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ কামানবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের হাতে রাখা এবং বিভিন্ন অঞ্চল ও সম্প্রদায় থেকে সৈন্য নিয়োগের মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা হয় যাতে ভবিষ্যতে একটি বৃহৎ অংশ একযোগে বিদ্রোহ করার সম্ভাবনা কমে যায়।
অতএব ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পরাজয় কোনো একটি যুদ্ধের ফল ছিল না। দিল্লির পতন বিদ্রোহের রাজনৈতিক কেন্দ্র ভেঙে দেয়, কানপুর ও লক্ষ্ণৌ পুনর্দখল উত্তর ভারতের যোগাযোগ ও সামরিক ভারসাম্য ব্রিটিশদের পক্ষে ফিরিয়ে আনে, আর ঝাঁসি, কালপি ও গোয়ালিয়রের পতন মধ্য ভারতের সংগঠিত প্রতিরোধের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। এরপর বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ ও গেরিলা যুদ্ধকে ধীরে ধীরে দমন করা হয়।
ব্রিটিশরা ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ দমন করেছিল সামরিক শক্তি, ভারী কামান, উন্নত যোগাযোগ, নিরাপদ সরবরাহপথ, ভারতীয় মিত্র, দেশীয় রাজাদের সহযোগিতা এবং বিদ্রোহীদের পারস্পরিক সমন্বয়ের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে। কিন্তু তাদের বিজয়ের মূল্যও ছিল বিশাল। অসংখ্য মানুষ নিহত হয়, দিল্লি ও লক্ষ্ণৌসহ বহু অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুই শতাব্দীব্যাপী রাজনৈতিক উত্থানেরও অবসান ঘটে। বিদ্রোহীরা সামরিকভাবে পরাজিত হয়েছিল, কিন্তু তাদের বিদ্রোহ ব্রিটিশদের এমনভাবে ভারতীয় শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে বাধ্য করেছিল যে ১৮৫৭ সাল ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক ইতিহাসে এক স্থায়ী বিভাজনরেখা হয়ে থাকে।
বক্সার প্রোটোকল ১৯০১: কারা স্বাক্ষর করেছিল এবং চুক্তির প্রধান শর্তগুলো কী ছিল?
সিপাহী বিদ্রোহ নাকি ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ? ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পরিণতি: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতন ও ব্রিটিশ রাজের সূচনা
বক্সার বিদ্রোহের পর শান্তি আলোচনা: পরাজিত চীনের ওপর কী কী শর্ত চাপিয়েছিল বিদেশি শক্তিগুলো
বেইজিংয়ের পতন ১৯০০: বিদেশি সেনাদের দখল, লুটপাট ও চিং সাম্রাজ্যের অপমান