দাগু দুর্গ ধ্বংস ও অস্ত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা: বক্সার প্রোটোকলে চীনের সামরিক শক্তি কীভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল
Series: বক্সার প্রোটোকল: চীনের অপমান, বিদেশি শক্তি ও এক অসম চুক্তির ইতিহাস
- Author: Admin
- August 15, 2026
বক্সার প্রোটোকলে চীনের সামরিক শক্তি কীভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল
১৯০১ সালের বক্সার প্রোটোকলের শর্তগুলোর মধ্যে ৪৫০ মিলিয়ন হাইকওয়ান টেল ক্ষতিপূরণ সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও চীনের রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর আরও সরাসরি আঘাত এসেছিল সামরিক ক্ষেত্রে। পরাজিত চিং সরকারকে শুধু বিদেশি শক্তির কাছে বিপুল অর্থ দিতে হয়নি; তাকে এমন কিছু শর্তও মেনে নিতে হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে বেইজিংয়ের দিকে বিদেশি বাহিনীর অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার চীনা সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া। এর কেন্দ্রে ছিল দাগু দুর্গ ধ্বংস, অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং রাজধানী থেকে সমুদ্র পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথে বিদেশি সেনা রাখার অধিকার।
দাগু বা তাকু দুর্গগুলোর গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রথমে উত্তর চীনের ভূগোল বুঝতে হয়। দুর্গগুলো ছিল হাই নদীর মোহনার কাছে, বর্তমান তিয়ানজিন অঞ্চলের উপকূলীয় প্রবেশপথে। সমুদ্র থেকে তিয়ানজিন হয়ে বেইজিংয়ের দিকে যেতে চাইলে এই অঞ্চল ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দাগু দুর্গ শুধু কয়েকটি কামান বসানো প্রতিরক্ষা স্থাপনা ছিল না; এগুলো ছিল সমুদ্র থেকে চীনের রাজধানীর দিকে প্রবেশের অন্যতম প্রধান সামরিক দরজা।
উনিশ শতকের বিদেশি আক্রমণগুলোতেই দাগুর কৌশলগত গুরুত্ব বারবার প্রমাণিত হয়েছিল। দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সময়ও এই দুর্গগুলোকে ঘিরে বড় সংঘর্ষ ঘটে। চিং সরকার পরবর্তী সময়ে এগুলো পুনর্নির্মাণ ও শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। ফলে ১৯০০ সালে বক্সার সংকট শুরু হলে বিদেশি নৌবাহিনীর কাছে দাগু আবারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
বেইজিংয়ের পরিস্থিতি যখন দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছিল, তখন বিদেশি শক্তিগুলো উপকূল থেকে রাজধানীর দিকে সামরিক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে চাইছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, চীনা বাহিনী দাগু দুর্গ শক্তিশালী করলে এবং নদীপথে মাইন বসালে তিয়ানজিন ও বেইজিংয়ের দিকে বিদেশি সাহায্য পাঠানো কঠিন হয়ে যাবে।
১৯০০ সালের ১৭ জুন বিদেশি নৌবাহিনী দাগু দুর্গগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। কয়েক ঘণ্টার তীব্র সংঘর্ষের পর দুর্গগুলো দখল করা হয়। এই আক্রমণ বক্সার সংকটের গতিপথ বদলে দেওয়া ঘটনাগুলোর একটি ছিল। চিং দরবারের কাছে এটি প্রমাণ করে যে বিদেশি শক্তিগুলো এখন শুধু নিজেদের নাগরিক রক্ষা করছে না, চীনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় সরাসরি আক্রমণও করছে।
দাগু দুর্গের পতনের কয়েক দিনের মধ্যেই চিং সরকার বিদেশি শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে যে দুর্গগুলো রাজধানী রক্ষার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেগুলোই পরোক্ষভাবে চিং সরকার ও বিদেশি শক্তির মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সংঘর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
পরের বছর শান্তি আলোচনায় বিজয়ী শক্তিগুলো সিদ্ধান্ত নেয়, দাগুর মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আর আগের অবস্থায় রাখা যাবে না। বক্সার প্রোটোকলের অষ্টম ধারায় চীনা সরকার দাগু দুর্গ এবং বেইজিং ও সমুদ্রের মধ্যে অবাধ যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এমন অন্যান্য দুর্গ ধ্বংস করতে সম্মত হয়েছিল।
এই শর্তের ভাষার পেছনে বিদেশি শক্তিগুলোর কৌশলগত লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। ১৯০০ সালের মতো আবার যদি রাজধানীতে বিদেশি দূতাবাস হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে সমুদ্র থেকে পাঠানো বাহিনী যেন শক্তিশালী চীনা উপকূলীয় দুর্গে আটকে না যায়।
অর্থাৎ দাগু দুর্গ ধ্বংস ছিল অতীতের জন্য শুধু শাস্তি নয়; ভবিষ্যৎ সামরিক হস্তক্ষেপের পথ নিরাপদ করার ব্যবস্থাও।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এই শর্ত ছিল অত্যন্ত অপমানজনক। উপকূলীয় দুর্গ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার মৌলিক অধিকার। কোনো শত্রু নৌবহর নদীমুখ দিয়ে দেশের রাজনৈতিক কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে এলে তাকে প্রতিহত করার জন্যই এমন দুর্গ তৈরি করা হয়। অথচ চীনকে পরাজয়ের পর সেই প্রতিরক্ষা নিজ হাতেই সরিয়ে ফেলতে হয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, দুর্গ ধ্বংসের শর্তটি একা ছিল না। বক্সার প্রোটোকলের নবম ধারায় বিদেশি শক্তিগুলো বেইজিং থেকে সমুদ্র পর্যন্ত যোগাযোগ খোলা রাখার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনা মোতায়েনের অধিকার পায়।
এই সামরিক পোস্টগুলোর মধ্যে হুয়াংছুন, লাংফাং, ইয়াংছুন, তিয়ানজিন, তাংগু, লুতাই, তাংশান, ছাংলি, ছিনহুয়াংদাও এবং শানহাইগুয়ানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মাধ্যমে উপকূল থেকে রাজধানীর দিকে একটি কার্যকর বিদেশি সামরিক যোগাযোগশৃঙ্খল তৈরি করা সম্ভব হয়।
ফলে সামগ্রিক ব্যবস্থাটি ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। রাজধানীতে লেগেশন কোয়ার্টারে বিদেশি সৈন্য থাকবে; বেইজিং থেকে সমুদ্র পর্যন্ত পথে বিদেশি সামরিক পোস্ট থাকবে; আর সেই পথে চীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা দুর্গগুলো ধ্বংস করা হবে।
এই তিনটি ব্যবস্থা একত্রে দেখলে বক্সার প্রোটোকলের সামরিক যুক্তি পরিষ্কার হয়—বিদেশি শক্তিগুলো ভবিষ্যতে নিজেদের বেইজিং উপস্থিতি রক্ষার জন্য একটি নিরাপদ সামরিক করিডর তৈরি করেছিল।
কিন্তু চীনের সামরিক স্বাধীনতার ওপর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধিনিষেধ ছিল। বক্সার প্রোটোকলের পঞ্চম ধারায় অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং এগুলো তৈরির জন্য একান্তভাবে ব্যবহৃত উপকরণ চীনে আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়।
প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞার সময় ছিল দুই বছর। তবে বিদেশি শক্তিগুলো প্রয়োজন মনে করলে পরবর্তী দুই বছরের মেয়াদে নিষেধাজ্ঞা নবায়নের সুযোগ রেখেছিল। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে চীনের একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না।
১৯০১ সালের আগস্টে চিং সরকারকে এ বিষয়ে সাম্রাজ্যিক ফরমানও জারি করতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিষেধাজ্ঞা শুধু ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী বা বিদ্রোহীদের জন্য ছিল না। বিদেশি প্রতিনিধিরা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে চীনা সরকার এবং তার কর্মকর্তাদের অস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রেও এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য।
এর ফলে বক্সারদের অস্ত্র পাওয়া বন্ধ করার অজুহাতের বাইরে গিয়ে বিধিনিষেধটি সরাসরি রাষ্ট্রের সামরিক ক্রয়ক্ষমতাকেও স্পর্শ করে।
তখন চীনের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ চিং সাম্রাজ্য নিজস্ব আধুনিক সামরিক শিল্প গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও উন্নত অস্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশ থেকে সংগ্রহ করত। জার্মান রাইফেল, কামান, গোলাবারুদ এবং পশ্চিমা সামরিক প্রযুক্তির ওপর বিভিন্ন আধুনিকীকৃত চীনা ইউনিট নির্ভর করেছিল।
উনিশ শতকের শেষদিকে চীন কিছু আধুনিক অস্ত্রাগার ও কারখানা গড়ে তুলেছিল। জিয়াংনান আর্সেনাল, হানইয়াং আর্সেনালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের চেষ্টা চলছিল। কিন্তু প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, বিশেষ উপকরণ এবং নকশার ক্ষেত্রে বিদেশি উৎসের গুরুত্ব পুরোপুরি দূর হয়নি।
ফলে অস্ত্র আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা এমন সময়ে চাপানো হয়েছিল যখন ১৯০০ সালের বিপর্যয়ই প্রমাণ করেছিল যে চীনের আরও দ্রুত সামরিক আধুনিকায়ন দরকার।
এখানে বক্সার প্রোটোকলের একটি গভীর বৈপরীত্য দেখা যায়। বিদেশি শক্তিগুলো চিং সরকারের সামরিক অদক্ষতার সুযোগ নিয়ে তাকে পরাজিত করেছিল। এরপর সেই সরকার যখন আধুনিক সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার প্রয়োজন সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করছে, তখন তার বিদেশ থেকে অস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট সামগ্রী সংগ্রহের স্বাধীনতার ওপরই বিধিনিষেধ আরোপ করা হলো।
তবে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাকে চীনের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বক্সার প্রোটোকল চিং সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করেনি এবং দেশের সব অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দেয়নি। চীন নিজস্ব সামরিক বাহিনী রাখতে পারত এবং দেশীয় অস্ত্র উৎপাদনের কিছু সক্ষমতাও তার ছিল।
নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশ থেকে আধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং এগুলো তৈরির বিশেষ উপকরণ আমদানির পথ নিয়ন্ত্রণ করা। তাই এটি পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নয়, বরং সামরিক সক্ষমতার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সীমাবদ্ধতা।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চিং সরকার বক্সার বিপর্যয়ের পর দ্রুত নতুন সেনাবাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেয়। বিশেষ করে ইউয়ান শিকাইয়ের নেতৃত্বাধীন আধুনিক বাহিনী পরবর্তী সময়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। নতুন প্রশিক্ষণ, পশ্চিমা সামরিক সংগঠন এবং আধুনিক অফিসার তৈরির চেষ্টা অব্যাহত ছিল।
অর্থাৎ বিদেশি শক্তিগুলো চীনকে সামরিকভাবে চিরতরে অক্ষম করতে পারেনি। কিন্তু তারা পরাজয়ের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চীনের অস্ত্র সংগ্রহের স্বাধীনতা সীমিত করেছিল এবং রাজধানীর দিকে বিদেশি সামরিক প্রবেশের পথ নিজেদের অনুকূলে পুনর্গঠন করেছিল।
দাগু দুর্গ ধ্বংসের প্রতীকী গুরুত্বও ছিল বিশাল। দুর্গগুলো চীনের সামরিক ইতিহাসে শুধু ১৯০০ সালের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। আগের বিদেশি যুদ্ধেও এগুলো প্রতিরোধের প্রতীক ছিল। তাই এগুলো ভেঙে ফেলা মানে চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা রেখা বিলুপ্ত করা।
আর সেই ধ্বংসের নির্দেশ এসেছে বিদেশি শক্তির চাপিয়ে দেওয়া শান্তিচুক্তি থেকে। ফলে সাধারণ সামরিক প্রকৌশলের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অপমানের প্রতীকে পরিণত হয়।
চীনা জাতীয়তাবাদীদের চোখে পরিস্থিতিটি ছিল আরও তীব্র বৈপরীত্যপূর্ণ। বিদেশি শক্তিগুলো তাদের নিজস্ব আধুনিক রাইফেল, মেশিনগান ও কামান নিয়ে চীনের ভূখণ্ডে সৈন্য রাখতে পারবে, কিন্তু চীন নিজের প্রতিরক্ষার জন্য বিদেশ থেকে অস্ত্র কিনতে পারবে না এবং রাজধানীর প্রবেশপথে নিজের দুর্গও অক্ষত রাখতে পারবে না।
এই বাস্তবতা “অসম চুক্তি” ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ এখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাধারণ পারস্পরিকতার নীতি ছিল না। চীন বিদেশি রাজধানীতে সৈন্য রাখার সমান অধিকার পায়নি, বিদেশি দুর্গ ধ্বংস করার ক্ষমতাও তার ছিল না। বিধিনিষেধগুলো ছিল বিজয়ী পক্ষ থেকে পরাজিত রাষ্ট্রের ওপর একতরফাভাবে চাপানো।
বক্সার প্রোটোকলের সামরিক বিধানগুলো চীনের সার্বভৌমত্বকে তাই একাধিক স্তরে আঘাত করেছিল। প্রথমত, প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণের অধিকার সীমিত হয় দাগু দুর্গ ধ্বংসের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের অধিকার অস্ত্র আমদানি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সীমিত হয়। তৃতীয়ত, নিজের ভূখণ্ডে কোন বিদেশি বাহিনী কোথায় থাকবে সেই সিদ্ধান্তের অধিকার সীমিত হয় বিদেশি সামরিক পোস্টের মাধ্যমে।
এর সঙ্গে লেগেশন কোয়ার্টারের স্থায়ী বিদেশি প্রহরী যুক্ত করলে চিত্রটি আরও পরিষ্কার হয়। বেইজিংয়ের ভেতরে বিদেশি সৈন্য, রাজধানী ও সমুদ্রের পথে বিদেশি সৈন্য এবং সেই পথের চীনা দুর্গ ধ্বংস—সব মিলিয়ে উত্তর চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল বিদেশি শক্তির নিরাপত্তা পরিকল্পনার অধীনে চলে আসে।
বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকে অবশ্য এর একটি নিরাপত্তা যুক্তি ছিল। ১৯০০ সালে তাদের কূটনীতিকরা দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ ছিলেন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং উদ্ধারবাহিনীকে তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিল। তারা ভবিষ্যতে একই ঘটনা পুনরাবৃত্তি হতে দিতে চায়নি।
কিন্তু নিরাপত্তার সেই সমাধান তৈরি করা হয়েছিল চীনের সামরিক সার্বভৌমত্বের মূল্য দিয়ে। বিজয়ী শক্তির নিরাপত্তা বাড়ানো মানে পরাজিত রাষ্ট্রের নিজের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া—বক্সার প্রোটোকলের সামরিক ধারাগুলোর কেন্দ্রীয় বাস্তবতা ছিল এটিই।
এর প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। বক্সার বিপর্যয় চিং শাসকদের বুঝিয়ে দেয় যে পুরোনো সামরিক ব্যবস্থা দিয়ে আধুনিক শক্তির বিরুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভব নয়। ফলে ১৯০১ সালের পর নতুন সামরিক সংস্কার আরও দ্রুত শুরু হয়।
প্রাদেশিক পর্যায়ে আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নতুন সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়। আধুনিক সামরিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, অফিসার প্রশিক্ষণ, নতুন সংগঠন কাঠামো এবং পশ্চিমা ও জাপানি সামরিক মডেল অনুসরণের প্রবণতা বাড়ে। চিং সরকার শেষ পর্যন্ত একটি আধুনিক জাতীয় সেনাবাহিনী গড়ার পরিকল্পনা করে।
এখানে ইতিহাসের আরেকটি পরিহাস দেখা যায়। বক্সার প্রোটোকল চীনের সামরিক শক্তিকে সীমিত করতে চেয়েছিল, কিন্তু বক্সার বিপর্যয়ের অপমানই চীনের সামরিক আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জরুরি করে তোলে।
তবে এই নতুন সেনাবাহিনীর উত্থান শেষ পর্যন্ত চিং রাজবংশের জন্য পুরোপুরি সুফল বয়ে আনেনি। আধুনিক সামরিক অফিসার ও সৈন্যদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয়তাবাদ, সাংবিধানিক সংস্কার এবং বিপ্লবী মতাদর্শ সেনাবাহিনীর কিছু অংশেও প্রভাব বিস্তার করে।
১৯১১ সালের উচাং বিদ্রোহ শুরু হলে নতুন সেনাবাহিনীর সদস্যদের একটি অংশই বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়। ফলে যে সামরিক আধুনিকায়নের মাধ্যমে চিং সরকার বিদেশি শক্তির সামনে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিল, সেই প্রক্রিয়াই পরোক্ষভাবে রাজবংশের পতনের পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
দাগু দুর্গ ধ্বংস এবং অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অর্থ তাই শুধু সামরিক দুর্বলতা নয়। এগুলো চীনা সমাজকে দেখিয়েছিল যে বিদেশি শক্তির সঙ্গে অসম সম্পর্ক বজায় থাকলে একটি রাষ্ট্র নিজের প্রতিরক্ষার মৌলিক সিদ্ধান্তও স্বাধীনভাবে নিতে পারে না।
এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী চীনা জাতীয়তাবাদের একটি কেন্দ্রীয় লক্ষ্য তৈরি করে—শুধু বিদেশি ভূখণ্ডগত দখল নয়, সব ধরনের অসম সামরিক অধিকার বিলুপ্ত করে পূর্ণ রাষ্ট্রিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করতে হবে।
দাগু দুর্গের ঘটনা সেই বৃহত্তর স্মৃতির শক্তিশালী প্রতীক। একসময় যেসব কামান সমুদ্র থেকে রাজধানীর পথ পাহারা দিত, ১৯০১ সালের পর সেগুলোর প্রতিরক্ষা কাঠামোই বিদেশি দাবিতে সরিয়ে দেওয়া হলো। আর একই সময়ে বিদেশি বাহিনী সেই পথের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে অবস্থানের অধিকার পেল।
বক্সার প্রোটোকলের সামরিক যুক্তি তাই নির্মমভাবে সহজ ছিল: ১৯০০ সালে যে প্রতিরোধ বিদেশি বাহিনীকে বেইজিং পৌঁছাতে বাধা দিয়েছিল, ভবিষ্যতে সেই বাধাগুলো যতটা সম্ভব সরিয়ে দিতে হবে।
এই কারণেই দাগু দুর্গ ধ্বংস ও অস্ত্র আমদানির নিষেধাজ্ঞাকে আলাদা দুটি শর্ত হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এগুলো ছিল একই বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ—চীনের সামরিক প্রতিরোধের সক্ষমতা সীমিত করা, বিদেশি দূতাবাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমুদ্র থেকে বেইজিং পর্যন্ত বিদেশি সামরিক প্রবেশাধিকার খোলা রাখা।
১৯০১ সালের পর চীন তার সেনাবাহিনী হারায়নি, কিন্তু নিজের প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা হারিয়েছিল। দুর্গ ধ্বংস, অস্ত্র আমদানিতে বাধা, কৌশলগত পথে বিদেশি সৈন্য এবং রাজধানীতে স্থায়ী বিদেশি প্রহরী—সব মিলিয়ে বক্সার প্রোটোকল দেখিয়ে দিয়েছিল সামরিক পরাজয় কীভাবে একটি দেশের সার্বভৌম প্রতিরক্ষা অধিকারকেও চুক্তির ধারায় সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে।
সিপাহী বিদ্রোহ নাকি ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ? ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পরিণতি: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতন ও ব্রিটিশ রাজের সূচনা
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ: নেতৃত্ব, ঐক্য, অস্ত্র ও কৌশলে কোথায় পিছিয়ে ছিল বিদ্রোহীরা?
বক্সার বিদ্রোহের পর শান্তি আলোচনা: পরাজিত চীনের ওপর কী কী শর্ত চাপিয়েছিল বিদেশি শক্তিগুলো
বেইজিংয়ের পতন ১৯০০: বিদেশি সেনাদের দখল, লুটপাট ও চিং সাম্রাজ্যের অপমান
আট জাতির জোট কারা ছিল? চীন আক্রমণে ব্রিটেন, জাপান, রাশিয়া ও অন্যান্য বিশ্বশক্তির ভূমিকা