বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

জোডিয়াক কিলার: সাংকেতিক বার্তা পাঠানো রহস্যময় খুনির আসল পরিচয় কী ছিল?

  • Author: Admin
  • August 27, 2026
জোডিয়াক কিলার: সাংকেতিক বার্তা পাঠানো রহস্যময় খুনির আসল পরিচয় কী ছিল?
জোডিয়াক কিলার

১৯৬৮ সালের ২০ ডিসেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার বেনিসিয়া শহরের কাছে লেক হারম্যান রোডের একটি নির্জন জায়গায় গাড়ি থামিয়ে সময় কাটাচ্ছিলেন সতেরো বছর বয়সী ডেভিড ফ্যারাডে এবং ষোলো বছর বয়সী বেটি লু জেনসেন। রাতের নির্জনতা ভেঙে সেখানে আরেকটি গাড়ি এসে থামে। এরপর যা ঘটে, তা পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটির সূচনা করে। তরুণ যুগলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তখন কেউ জানত না, কয়েক মাসের মধ্যেই আরেকটি আক্রমণ ঘটবে এবং এক অজ্ঞাত ব্যক্তি সংবাদপত্রে সাংকেতিক বার্তা পাঠিয়ে নিজেকে এমন একটি নামে পরিচিত করবে, যা পরবর্তী অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অপরাধ গবেষক, পুলিশ, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে রাখবে—জোডিয়াক

জোডিয়াক কিলারকে ঘিরে রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তার সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা জনপ্রিয় কল্পকাহিনিতে প্রচলিত সংখ্যার তুলনায় অনেক কম। সাধারণভাবে পাঁচজন নিহত এবং দুজন জীবিত বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিকে নিয়ে চারটি আক্রমণকে জোডিয়াকের সঙ্গে সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করা হয়। তবে নিজের চিঠিতে সে অনেক বেশি মানুষ হত্যার দাবি করেছিল। সেই দাবিগুলোর সবগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে জোডিয়াককে বোঝার ক্ষেত্রে প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার—সে যা দাবি করেছিল এবং তদন্তকারীরা যা প্রমাণ করতে পেরেছিলেন, তা এক বিষয় নয়।

লেক হারম্যান রোডের হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাড়ে ছয় মাস পর, ১৯৬৯ সালের ৪ জুলাই রাতে ভ্যালেহোর ব্লু রক স্প্রিংস পার্কের কাছে গাড়ির মধ্যে ছিলেন বাইশ বছর বয়সী ডার্লিন ফেরিন এবং উনিশ বছর বয়সী মাইকেল মাজো। একটি গাড়ি তাদের কাছে আসে, চলে যায়, পরে আবার ফিরে আসে। আক্রমণকারী গাড়ির কাছে গিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে দুজনকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি চালায়। ফেরিন মারা যান, কিন্তু মাজো গুরুতর আহত হয়েও বেঁচে যান। এর কিছুক্ষণ পর একজন পুরুষ ভ্যালেহো পুলিশকে টেলিফোন করে আক্রমণের দায় স্বীকার করে এবং আগের লেক হারম্যান রোডের হত্যাকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করে। এই ফোনকল তদন্তকারীদের কাছে দুটি ঘটনার মধ্যে সম্ভাব্য সরাসরি সংযোগ তৈরি করে।

কিন্তু জোডিয়াককে অন্য ধারাবাহিক খুনিদের থেকে আলাদা করে দেয় তার পরবর্তী পদক্ষেপ। ১৯৬৯ সালের ৩১ জুলাই তিনটি ক্যালিফোর্নিয়ার সংবাদপত্রের কাছে প্রায় একই ধরনের তিনটি চিঠি পৌঁছায়। প্রতিটি চিঠির সঙ্গে একটি বৃহৎ সাংকেতিক বার্তার এক-তৃতীয়াংশ অংশ পাঠানো হয়েছিল। প্রেরক দাবি করেছিল, ওই সংকেতের মধ্যে তার পরিচয় রয়েছে এবং সংবাদপত্রগুলোকে বার্তাগুলো প্রথম পাতায় প্রকাশ করতে হবে। নির্দেশ না মানলে আরও মানুষকে হত্যা করার হুমকিও দেওয়া হয়।

তিনটি অংশ একত্র করার পর সাংকেতিক বার্তাটি মোট ৪০৮টি চিহ্নের একটি সংকেতে পরিণত হয়, যা পরে জোডিয়াকের অন্যতম বিখ্যাত বার্তা হিসেবে পরিচিত হয়। পুলিশ, সামরিক সংকেতবিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষ এটি সমাধানের চেষ্টা করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ার শিক্ষক ডোনাল্ড হার্ডেন এবং তার স্ত্রী বেটি হার্ডেন বার্তাটির অধিকাংশ পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হন। কিন্তু সেখানে প্রত্যাশিতভাবে খুনির নাম পাওয়া যায়নি। বরং লেখক মানুষ হত্যা করতে তার আনন্দ লাগে—এমন বিকৃত মানসিকতার কথা লিখেছিল এবং মৃত্যুর পর নিহত ব্যক্তিরা তার দাসে পরিণত হবে—এমন অদ্ভুত বিশ্বাসের উল্লেখ করেছিল।

এখানেই জোডিয়াকের আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। সে শুধু হত্যা করতে চায়নি; নিজের চারপাশে একটি রহস্যময় পরিচয় নির্মাণ করতে চেয়েছিল। সংবাদমাধ্যম, পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের মনোযোগ যেন তার অপরাধের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। চিঠি, হুমকি, সাংকেতিক বার্তা এবং নিজের জন্য তৈরি প্রতীক—সব মিলিয়ে সে যেন বাস্তব অপরাধী হওয়ার পাশাপাশি নিজের একটি ভীতিকর জনপরিচয়ও তৈরি করছিল।

১৯৬৯ সালের আগস্টে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে প্রথমবারের মতো বিখ্যাত বাক্যটি দেখা যায়—“দিস ইজ দ্য জোডিয়াক স্পিকিং” অর্থাৎ, “জোডিয়াক কথা বলছে।” এর সঙ্গে ব্যবহৃত বৃত্তের মাঝখানে ক্রসের মতো চিহ্নটি দ্রুত তার পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়। এই নামটি পুলিশ তাকে দেয়নি; অপরাধী নিজেই নিজের জন্য এটি বেছে নিয়েছিল।

একই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর লেক বেরিয়েসায় জোডিয়াকের সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে অস্বাভাবিক আক্রমণটি ঘটে। কলেজশিক্ষার্থী ব্রায়ান হার্টনেল এবং সিসিলিয়া শেফার্ড হ্রদের পাশে অবস্থান করছিলেন। একজন ব্যক্তি তাদের কাছে আসে। হার্টনেলের বর্ণনা অনুযায়ী, আক্রমণকারীর মাথায় ছিল একটি অদ্ভুত কালো আবরণ এবং বুকের অংশে জোডিয়াকের ক্রসহেয়ার প্রতীক। আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে সে প্রথমে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, এরপর দড়ি দিয়ে বেঁধে ছুরি দিয়ে আক্রমণ করে। হার্টনেল গুরুতর আহত হয়েও বেঁচে যান, কিন্তু শেফার্ড পরে মারা যান।

আক্রমণের পর অপরাধী হার্টনেলের গাড়ির দরজায় আগের হামলাগুলোর তারিখ এবং লেক বেরিয়েসার ঘটনার তারিখ লিখে রেখে যায়। পরে নাপা কাউন্টির কর্তৃপক্ষের কাছে করা একটি ফোনকলেও আক্রমণের কথা জানানো হয়। এই ঘটনায় আগের গুলিবর্ষণের ধরন বদলে ছুরি ব্যবহার করা হয়েছিল, যা দেখায় যে জোডিয়াক কোনো একটি নির্দিষ্ট হত্যাপদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল ছিল না।

মাত্র দুই সপ্তাহ পর ১৯৬৯ সালের ১১ অক্টোবর সান ফ্রান্সিসকোতে ট্যাক্সিচালক পল স্টাইন একজন যাত্রীকে বহন করছিলেন। প্রেসিডিও হাইটস এলাকায় যাত্রীটি তাকে গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ড প্রথমে সাধারণ ডাকাতি বলে মনে হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু কয়েক দিন পর একটি সংবাদপত্রে পৌঁছানো চিঠির সঙ্গে স্টাইনের রক্তমাখা জামার একটি কাটা অংশ পাঠানো হয়। এটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী প্রমাণ যে চিঠির লেখক অন্তত স্টাইনের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তি অথবা হত্যাকারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কেউ।

এই ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে। কয়েকজন কিশোর প্রত্যক্ষদর্শী কাছাকাছি একটি বাড়ি থেকে অপরাধীকে দেখতে পেয়েছিলেন এবং পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন। তাদের বর্ণনার ভিত্তিতে একটি মুখাবয়বের নকশা তৈরি করা হয়। কিন্তু প্রাথমিক পুলিশি যোগাযোগে সন্দেহভাজনের বর্ণনা নিয়ে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা যায়। একজন পুলিশ কর্মকর্তা পরে এমন একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষকে এলাকায় দেখেছিলেন বলেও বর্ণনা করেন, যিনি সম্ভাব্য অপরাধীর সঙ্গে মিলে যেতে পারেন। যদি সেই ব্যক্তি সত্যিই জোডিয়াক হয়ে থাকে, তাহলে পুলিশ তার অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছেও তাকে আটক করতে পারেনি।

স্টাইন হত্যার পর জোডিয়াকের চিঠি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। সে স্কুলবাসে হামলার হুমকি দেয়, পুলিশকে ব্যঙ্গ করে এবং নিজের অপরাধের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে দাবি করতে থাকে। কিন্তু তার প্রতিটি দাবিকে সত্য বলে গ্রহণ করা যায় না। তদন্তের অন্যতম জটিলতা এখানেই—জোডিয়াক সম্ভবত বাস্তব হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি এমন অপরাধের কৃতিত্বও নিজের নামে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যেগুলোর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না।

১৯৬৯ সালের নভেম্বরে সে একটি নতুন সাংকেতিক বার্তা পাঠায়। ৩৪০টি চিহ্নের এই সংকেত, যা সাধারণভাবে জেড-৩৪০ নামে পরিচিত, কয়েক দশক ধরে অপাঠ্য থেকে যায়। অবশেষে ২০২০ সালে ডেভিড ওরানচাক, স্যাম ব্লেক এবং ইয়ারল ফান ডার আইকের প্রচেষ্টায় বার্তাটি সমাধান করা সম্ভব হয়। পাঠোদ্ধার করা লেখাতেও খুনির প্রকৃত নাম ছিল না। বরং সে দাবি করেছিল যে তাকে ধরতে না পারায় মানুষ আনন্দ পাচ্ছে, মৃত্যুকে সে ভয় পায় না এবং মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে আগের মতোই অদ্ভুত ধারণা প্রকাশ করেছিল।

জোডিয়াক আরও কয়েকটি ছোট সাংকেতিক বার্তা পাঠিয়েছিল, যার মধ্যে মাত্র ১৩টি চিহ্নের একটি বার্তা বিশেষভাবে আলোচিত। এর আগে সে লিখেছিল যে এই সংকেতে তার নাম রয়েছে। কিন্তু বার্তাটি এত ছোট যে নির্ভরযোগ্যভাবে একটি মাত্র সমাধান নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। অসংখ্য গবেষক বিভিন্ন নাম বের করার দাবি করেছেন, কিন্তু কোনো ব্যাখ্যাই সর্বজনস্বীকৃত প্রমাণে পরিণত হয়নি। ফলে জোডিয়াক সত্যিই নিজের নাম সেখানে লুকিয়েছিল, নাকি তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করার জন্য আরেকটি খেলা খেলেছিল—তা আজও অজানা।

এই রহস্যের কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত সন্দেহভাজন ছিলেন আর্থার লি অ্যালেন। অ্যালেন উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা ছিলেন এবং বিভিন্ন কারণে তদন্তকারীদের নজরে আসেন। তার পরিচিত একজনের দেওয়া তথ্য, অপরাধের এলাকাগুলোর সঙ্গে কিছু ভৌগোলিক সম্পর্ক, তার কাছে জোডিয়াক নামের ঘড়ি থাকার মতো বিভিন্ন পরিস্থিতিগত মিল তাকে দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রে রাখে। পুলিশ তার সম্পত্তিতেও তল্লাশি চালিয়েছিল।

কিন্তু অ্যালেনের বিরুদ্ধে সমস্যা ছিল অত্যন্ত মৌলিক—সন্দেহ সৃষ্টি করার মতো পরিস্থিতিগত মিল থাকা আর অপরাধ প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। তার হাতের লেখা জোডিয়াকের চিঠির লেখার সঙ্গে নিশ্চিতভাবে মেলেনি। আঙুলের ছাপের ক্ষেত্রেও নির্ণায়ক মিল পাওয়া যায়নি। জীবিত ভুক্তভোগীদের বর্ণনাও সব ক্ষেত্রে তার সঙ্গে পরিষ্কারভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। পরবর্তী সময়ে চিঠি থেকে সংগৃহীত বলে বিবেচিত কিছু জৈবিক নমুনা নিয়েও অ্যালেনের সঙ্গে নিশ্চিত সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অবশ্য পুরোনো প্রমাণের নমুনার উৎস ও মান নিয়ে প্রশ্ন থাকায় এসব পরীক্ষাকে এককভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবেও দেখা কঠিন।

অ্যালেন ছাড়াও বছরের পর বছর ধরে আরও বহু ব্যক্তির নাম সামনে এসেছে। রিচার্ড গাইকোস্কি, লরেন্স কেইন, রস সুলিভানসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে গবেষক, লেখক বা স্বাধীন অনুসন্ধানকারীরা সম্ভাব্য জোডিয়াক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কখনো হাতের লেখা, কখনো বসবাসের স্থান, কখনো আচরণ, কখনো কোনো ভুক্তভোগীর সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগকে ভিত্তি করে এসব তত্ত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু কারও ক্ষেত্রেই এমন শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা সন্দেহের ঊর্ধ্বে পরিচয় নিশ্চিত করে।

জোডিয়াক রহস্যে আরও একটি বড় সমস্যা হলো পরবর্তী কয়েক দশকে তৈরি হওয়া বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তত্ত্ব। কেউ সাংকেতিক বার্তার মধ্যে নির্দিষ্ট নাম খুঁজেছেন, কেউ মানচিত্রের রেখা মিলিয়েছেন, কেউ পুরোনো ছবির মুখাবয়বের সঙ্গে পুলিশের নকশা তুলনা করেছেন। কিন্তু এ ধরনের মিলের অনেকগুলোই নিশ্চিতকরণ পক্ষপাতের শিকার হতে পারে—প্রথমে কাউকে সন্দেহভাজন ধরে নিয়ে পরে তার জীবনের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন তথ্যকে জোডিয়াকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।

২০২১ সালে একটি বেসরকারি অনুসন্ধানকারী দল গ্যারি ফ্রান্সিস পোস্ট নামের এক ব্যক্তিকে জোডিয়াক বলে দাবি করার পর নতুন করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তারা বিভিন্ন পরিস্থিতিগত সূত্র এবং ছবির বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছিল। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পক্ষ থেকে তাকে জোডিয়াক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেলেও এই দাবিকে মামলার সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে জোডিয়াক মামলার ভবিষ্যৎ সমাধানের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পথ হতে পারে জৈবিক প্রমাণ ও বংশানুসন্ধানভিত্তিক বিশ্লেষণ। কয়েক দশক পুরোনো অমীমাংসিত অপরাধে অপরাধস্থলের জৈবিক নমুনা থেকে বংশগত তথ্য বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনের আত্মীয়স্বজন শনাক্ত করার পদ্ধতি ইতিমধ্যে অন্য কিছু মামলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু জোডিয়াক মামলায় বড় প্রশ্ন হলো সংরক্ষিত চিঠি বা ডাকটিকিট থেকে পাওয়া জৈবিক উপাদান সত্যিই খুনির কি না। চিঠিগুলো বহু মানুষের হাতে গিয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষিত হয়েছে। ফলে দূষণের সম্ভাবনাও রয়েছে।

আরও একটি প্রশ্ন হলো, জোডিয়াক কেন হঠাৎ হত্যা বন্ধ করেছিল। ১৯৬৯ সালের শেষভাগের পর তার সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত নতুন হত্যাকাণ্ড নেই, যদিও পরবর্তী কয়েক বছর বিভিন্ন চিঠি জোডিয়াকের নামে এসেছে। সম্ভাবনা অনেক। সে হয়তো মারা গিয়েছিল, কারাগারে গিয়েছিল, অন্যত্র চলে গিয়েছিল, অপরাধের ধরন পরিবর্তন করেছিল অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা বন্ধ করে শুধু নিজের তৈরি কিংবদন্তিকে চিঠির মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল। আবার এটাও সম্ভব যে পরবর্তী কিছু হত্যাকাণ্ড তার হলেও সেগুলোকে কখনো নির্ভরযোগ্যভাবে তার সঙ্গে যুক্ত করা যায়নি।

তার আচরণ থেকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে কিছু বৈশিষ্ট্য অনুমান করা গেলেও সেগুলো দিয়ে নির্দিষ্ট পরিচয় বের করা সম্ভব নয়। চিঠিগুলোতে আত্মমুগ্ধতা, নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা, সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ পাওয়ার তীব্র বাসনা এবং পুলিশকে বুদ্ধির খেলায় হারানোর চেষ্টা স্পষ্ট। সে নিজের অপরাধকে শুধু হত্যাকাণ্ড হিসেবে নয়, একটি জনসম্মুখের নাটক হিসেবে পরিচালনা করেছিল। প্রতিটি নতুন চিঠির মাধ্যমে সে সংবাদপত্রকে নিজের প্রচারের মাধ্যম বানিয়েছিল এবং পুরো অঞ্চলের মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছিল।

জোডিয়াক কিলারের কিংবদন্তি এত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার অন্যতম কারণও সম্ভবত এই পরিকল্পিত রহস্য। অধিকাংশ অপরাধী পরিচয় লুকাতে চেষ্টা করে; জোডিয়াক পরিচয় লুকিয়েও নিজের একটি বিকল্প পরিচয়কে সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছিল। তার আসল নাম কেউ জানত না, কিন্তু তার বেছে নেওয়া নাম, প্রতীক এবং সাংকেতিক বার্তা সবাই চিনতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ মানুষটিকে অদৃশ্য রেখে “জোডিয়াক” নামের চরিত্রটিকে দৃশ্যমান করে তুলেছিল সে নিজেই।

তবে জনপ্রিয় সংস্কৃতির আকর্ষণের আড়ালে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ভুলে গেলে এই ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ডেভিড ফ্যারাডে, বেটি লু জেনসেন, ডার্লিন ফেরিন, সিসিলিয়া শেফার্ড এবং পল স্টাইন ছিলেন বাস্তব মানুষ, যাদের জীবন হঠাৎ সহিংসতায় শেষ হয়ে যায়। মাইকেল মাজো ও ব্রায়ান হার্টনেল প্রাণে বেঁচে গেলেও ভয়াবহ আক্রমণের অভিজ্ঞতা বহন করেছেন। রহস্যময় খুনির পরিচয় নিয়ে অসংখ্য বই, চলচ্চিত্র ও তত্ত্ব তৈরি হলেও মামলাটির কেন্দ্রে ছিল এই মানুষগুলো এবং তাদের পরিবার।

তাহলে জোডিয়াক কিলারের আসল পরিচয় কী ছিল? এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভুল উত্তর হলো—আমরা জানি না। আর্থার লি অ্যালেন সবচেয়ে আলোচিত সন্দেহভাজনদের একজন ছিলেন, কিন্তু তাকে অপরাধী প্রমাণ করার মতো চূড়ান্ত প্রমাণ নেই। অন্য সন্দেহভাজনদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা রয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি বা দল সময়ে সময়ে রহস্য সমাধানের দাবি করলেও আইনগত ও প্রমাণভিত্তিকভাবে জোডিয়াকের পরিচয় নিশ্চিত হয়নি।

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর জোডিয়াক কিলারের রহস্য তাই শুধু একজন অজ্ঞাত খুনিকে ঘিরে নেই। এটি দেখায় কীভাবে একটি অপরাধী সংবাদমাধ্যম, সাংকেতিক ভাষা, ভয় এবং মানুষের রহস্য সমাধানের প্রবল আকাঙ্ক্ষাকে ব্যবহার করে নিজের চারপাশে দীর্ঘস্থায়ী কিংবদন্তি তৈরি করতে পারে। তার সবচেয়ে জটিল সাংকেতিক বার্তার একটি কয়েক দশক পর সমাধান হয়েছে, প্রযুক্তিও অকল্পনীয়ভাবে উন্নত হয়েছে, তবু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেতটির উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি—“জোডিয়াক” নামের মুখোশটির আড়ালে আসলে কে ছিল?