মেরি সেলেস্ট রহস্য: মাঝসমুদ্রে অক্ষত জাহাজ পাওয়া গেলেও সব মানুষ কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল?
- Author: Admin
- August 27, 2026
মেরি সেলেস্ট রহস্য
১৮৭২ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে উত্তর আটলান্টিকের বিশাল জলরাশির মধ্যে একটি পালতোলা বাণিজ্যিক জাহাজকে অস্বাভাবিকভাবে চলতে দেখা যায়। দূর থেকে জাহাজটি ডুবে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল না, বড় ধরনের কোনো ক্ষতির চিহ্নও ছিল না। তার পাল বাতাসে ছিল, কাঠের কাঠামো অক্ষত ছিল এবং জাহাজটি তখনো সমুদ্রযাত্রার উপযোগী অবস্থায় ছিল। কিন্তু কাছে গিয়ে অনুসন্ধানকারীরা এমন একটি দৃশ্যের মুখোমুখি হন, যা পরবর্তী দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সামুদ্রিক ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত রহস্য হয়ে আছে। জাহাজটির নাম ছিল মেরি সেলেস্ট। জাহাজ ছিল, মালামাল ছিল, খাবার ও পানির মজুত ছিল, নাবিকদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও ছিল—শুধু মানুষগুলো ছিল না।
মেরি সেলেস্টের গল্পকে ঘিরে পরবর্তী সময়ে এত কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে যে প্রকৃত ঘটনা এবং কল্পকাহিনিকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও বলা হয়েছে জাহাজে গরম খাবার সাজানো অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, কোথাও দাবি করা হয়েছে আধখাওয়া খাবার রেখে সবাই যেন কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। আবার জলদস্যু, বিশাল সামুদ্রিক প্রাণী, অতিপ্রাকৃত শক্তি থেকে শুরু করে অজানা সমুদ্রঘূর্ণি পর্যন্ত অসংখ্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বাস্তব নথিপত্র অবশ্য আরও সংযত, কিন্তু একই সঙ্গে আরও আকর্ষণীয় একটি চিত্র তুলে ধরে। কারণ সত্যিকার প্রমাণগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, জাহাজের মানুষগুলো সম্ভবত কোনো অজ্ঞাত অতিপ্রাকৃত শক্তির কারণে অদৃশ্য হননি; বরং ক্যাপ্টেন এমন কোনো বিপদের আশঙ্কা করেছিলেন, যা তাকে একটি আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ জাহাজ ছেড়ে ছোট নৌকায় নামার মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল।
জাহাজটির ইতিহাসও শুরু থেকেই ঘটনাবহুল। এটি ১৮৬১ সালে কানাডার নোভা স্কশিয়ায় নির্মিত হয় এবং প্রথমে এর নাম ছিল অ্যামাজন। প্রায় ২৮২ টনের এই পালতোলা জাহাজটি শুরু থেকেই একাধিক দুর্ঘটনা, মালিকানা পরিবর্তন এবং আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হয়। এর প্রথম ক্যাপ্টেন রবার্ট ম্যাকলেলান জাহাজটির প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রার আগেই অসুস্থ হয়ে মারা যান। পরবর্তী বছরগুলোতে জাহাজটি সংঘর্ষ ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। ১৮৬৭ সালে কেপ ব্রেটন দ্বীপের কাছে ঝড়ের মধ্যে জাহাজটি আটকে পড়ার পর এটিকে কার্যত পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পরে একজন মার্কিন ব্যবসায়ী জাহাজটি কিনে মেরামত করেন। যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধনের পর এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মেরি সেলেস্ট।
১৮৭২ সালে জাহাজটির নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন স্পুনার ব্রিগস। তিনি কোনো অনভিজ্ঞ বা বেপরোয়া নাবিক ছিলেন না। বরং সমুদ্রযাত্রায় অভিজ্ঞ এবং পেশাদার ক্যাপ্টেন হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। সেই বছরের নভেম্বর মাসে মেরি সেলেস্ট নিউইয়র্ক থেকে ইতালির জেনোয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। জাহাজে ছিল প্রায় এক হাজার সাতশো একটি পিপে শিল্পকার্যে ব্যবহৃত অ্যালকোহল। এই মালামালই পরবর্তী সময়ে রহস্যটির সম্ভাব্য সমাধানের কেন্দ্রে চলে আসে।
ব্রিগস একা ছিলেন না। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী সারা এলিজাবেথ ব্রিগস এবং তাদের দুই বছরের কন্যা সোফিয়া। তাদের আরেক সন্তান স্কুলে পড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে থেকে গিয়েছিল। জাহাজের কর্মীদের নিয়ে মোট দশজন মানুষ মেরি সেলেস্টে যাত্রা করছিলেন। ক্যাপ্টেন তার নাবিকদের বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক ছিলেন। ফলে এমন ধারণার পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ নেই যে জাহাজে একদল অনভিজ্ঞ বা অবিশ্বস্ত নাবিক ছিল যারা সামান্য সমস্যায় আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারত।
১৮৭২ সালের ৭ নভেম্বর মেরি সেলেস্ট নিউইয়র্ক বন্দর ছেড়ে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া শুরু করে। আবহাওয়া প্রথম থেকেই পুরোপুরি অনুকূল ছিল না। উত্তর আটলান্টিকের নভেম্বরের সমুদ্র এমনিতেই কঠিন হতে পারে। জাহাজটিকে প্রতিকূল বাতাস ও উত্তাল পানির মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছিল। তারপরও কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি যে জাহাজটি মারাত্মক সংকটে পড়েছিল।
মেরি সেলেস্টের কয়েক দিন পর নিউইয়র্ক থেকে জেনোয়ার উদ্দেশেই আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজ যাত্রা করে। এর নাম ছিল দেই গ্রাতিয়া। এর ক্যাপ্টেন ছিলেন ডেভিড মোরহাউস। ১৮৭২ সালের ৪ ডিসেম্বর আজোরেস দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি অবস্থান করার সময় দেই গ্রাতিয়ার নাবিকেরা দূরে একটি জাহাজ দেখতে পান। জাহাজটির চলাফেরা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। সেটি যেন সঠিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই বাতাস ও ঢেউয়ের প্রভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল।
দেই গ্রাতিয়া কাছাকাছি গিয়ে সংকেত পাঠানোর চেষ্টা করে। কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। অবশেষে জাহাজটির প্রধান সহকারী অলিভার ডেভোর নেতৃত্বে কয়েকজন নাবিক ছোট নৌকায় করে রহস্যময় জাহাজটির কাছে যান। তারা উঠে বুঝতে পারেন, এটি মেরি সেলেস্ট। কিন্তু জাহাজের ডেকে কেউ তাদের অভ্যর্থনা জানাতে এল না। ক্যাপ্টেন নেই, তার স্ত্রী ও শিশুকন্যা নেই, নাবিকেরা নেই। জাহাজে থাকা দশজন মানুষের একজনও সেখানে ছিলেন না।
তবে মেরি সেলেস্ট কোনো বিধ্বস্ত জাহাজ ছিল না। এর কাঠামো এমন অবস্থায় ছিল যে সেটিকে পরে চালিয়ে বন্দরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। জাহাজের ভেতরে কিছু পানি ঢুকেছিল, কিন্তু সেটি ডুবে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। খাবার ও পানির পর্যাপ্ত মজুত ছিল। ব্যক্তিগত মালামালের বড় অংশও রয়ে গিয়েছিল। ক্যাপ্টেনের কেবিন এবং নাবিকদের থাকার জায়গা এমনভাবে লুট করা হয়নি, যা সাধারণ জলদস্যু হামলার সঙ্গে সহজে মেলে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জাহাজের ছোট নৌকাটি অনুপস্থিত। জাহাজ ছেড়ে জরুরি অবস্থায় মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত নৌকাটি যেখানে থাকার কথা, সেখানে ছিল না। এর অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষগুলো যেন রহস্যজনকভাবে বাতাসে মিলিয়ে যায়নি; বরং তারা সম্ভবত নিজেরাই মেরি সেলেস্ট ছেড়ে ওই ছোট নৌকায় উঠেছিল।
এ ছাড়া কিছু নৌযাত্রার যন্ত্রপাতি ও নথিও অনুপস্থিত ছিল। ক্যাপ্টেনের কালপঞ্জি এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সরঞ্জাম সঙ্গে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। জাহাজের শেষ লিখিত অবস্থান ২৫ নভেম্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। সেই সময় মেরি সেলেস্ট আজোরেসের সান্তা মারিয়া দ্বীপের কাছাকাছি ছিল। অথচ জাহাজটি আবিষ্কৃত হয় আরও কয়েক দিন পরে এবং সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য দূরত্বে। অর্থাৎ মানুষহীন অবস্থাতেও জাহাজটি সমুদ্রে ভেসে চলেছিল।
এই তথ্যটি রহস্য সমাধানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি ২৫ নভেম্বরের কাছাকাছি সময়ে জাহাজটি পরিত্যক্ত হয়ে থাকে, তবে ক্যাপ্টেন ব্রিগস ও তার সঙ্গীরা এমন একটি জাহাজ ছেড়েছিলেন, যেটি পরবর্তী দিনগুলোতে নিজে থেকেই ভেসে থাকার ক্ষমতা দেখিয়েছিল। প্রশ্ন তাই শুধু তারা কোথায় গেলেন নয়; কেন একজন অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন এমন একটি জাহাজ ছেড়ে বিপজ্জনক ছোট নৌকায় নামার সিদ্ধান্ত নিলেন?
জলদস্যু হামলার ধারণা প্রথমেই আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু সমস্যাটি হলো, জাহাজের মূল্যবান মালামাল ব্যাপকভাবে লুট করা হয়নি। ক্যাপ্টেন ও নাবিকদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও অনেকাংশে রয়ে গিয়েছিল। কোনো ব্যাপক সংঘর্ষের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জলদস্যুরা যদি সবাইকে হত্যা বা অপহরণ করত, তবে মূল্যবান জাহাজ ও মালামাল অক্ষত রেখে চলে যাওয়া অস্বাভাবিক হতো।
নাবিকদের বিদ্রোহের তত্ত্বও উত্থাপিত হয়েছিল। বলা হয়েছিল, অ্যালকোহলের মালামাল থেকে মদ পান করে নাবিকেরা মাতাল হয়ে ক্যাপ্টেন ও তার পরিবারকে হত্যা করে পালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। জাহাজে বহন করা অ্যালকোহল পান করার উপযোগী সাধারণ মদ ছিল না। তাছাড়া নাবিকদের চরিত্র সম্পর্কে পাওয়া তথ্যও এমন বিদ্রোহের পক্ষে শক্তিশালী ভিত্তি দেয় না। কোনো রক্তাক্ত সংঘর্ষের নির্ভরযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
আরেকটি সন্দেহ পড়েছিল দেই গ্রাতিয়ার ক্যাপ্টেন ও নাবিকদের ওপর। সমুদ্র থেকে পরিত্যক্ত জাহাজ উদ্ধার করে বন্দরে পৌঁছে দিলে উদ্ধারকারীরা জাহাজ ও মালামালের মূল্যের একটি অংশ পুরস্কার হিসেবে পেতে পারতেন। ফলে প্রশ্ন ওঠে, তারা কি অর্থের জন্য মেরি সেলেস্টের মানুষদের হত্যা করেছিলেন? জিব্রাল্টারে অনুষ্ঠিত উদ্ধারসংক্রান্ত তদন্তে এই সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু দেই গ্রাতিয়ার লোকেরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উপরন্তু দুই জাহাজের যাত্রার সময় ও গতিপথ বিবেচনা করলে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের তত্ত্বটি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
মেরি সেলেস্টে থাকা অ্যালকোহলের পিপেগুলো বরং অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়। জাহাজে মোট প্রায় এক হাজার সাতশো একটি পিপে ছিল এবং পরে দেখা যায় নয়টি পিপে খালি। এই পিপেগুলো অন্যগুলোর তুলনায় ভিন্ন ধরনের কাঠ দিয়ে তৈরি ছিল বলে জানা যায়। কাঠের ছিদ্র দিয়ে অ্যালকোহলের বাষ্প বেরিয়ে জাহাজের নিচের আবদ্ধ অংশে জমে থাকতে পারে। ক্যাপ্টেন ব্রিগস যদি তীব্র অ্যালকোহলের গন্ধ পান অথবা বাষ্প বের হওয়ার শব্দ শোনেন, তবে তিনি বিস্ফোরণের আশঙ্কা করতে পারেন।
এখানেই একটি সম্ভাব্য ঘটনাক্রম তৈরি হয়। অ্যালকোহল বহনকারী পিপে থেকে বাষ্প বের হচ্ছে। জাহাজের আবদ্ধ মালামাল রাখার অংশে সেই বাষ্প জমছে। কোনো পিপে থেকে অস্বাভাবিক শব্দ হচ্ছে অথবা ছোটখাটো চাপজনিত ঘটনা ঘটছে। ক্যাপ্টেন জানতেন, অ্যালকোহলের বাষ্প অত্যন্ত দাহ্য। তার সঙ্গে স্ত্রী ও মাত্র দুই বছরের কন্যা রয়েছে। এমন অবস্থায় তিনি হয়তো জাহাজটি তাৎক্ষণিকভাবে ছেড়ে কিছু দূরে অপেক্ষা করাকে নিরাপদ মনে করেছিলেন।
এটি ব্যাখ্যা করতে পারে কেন সবাই ছোট নৌকায় উঠেছিল, কিন্তু কেন তারা আর ফিরে আসতে পারেনি? সম্ভাব্য উত্তর লুকিয়ে আছে জাহাজ ও ছোট নৌকার সংযোগে। একটি ধারণা অনুযায়ী, তারা পুরোপুরি জাহাজ ত্যাগ করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং বিস্ফোরণের আশঙ্কায় সাময়িকভাবে ছোট নৌকায় নেমেছিল। নৌকাটিকে একটি দড়ি দিয়ে মেরি সেলেস্টের সঙ্গে বেঁধে কিছুটা দূরে রাখা হয়ে থাকতে পারে। পরিস্থিতি নিরাপদ মনে হলে তারা আবার জাহাজে উঠতেন।
কিন্তু উত্তাল সমুদ্রে একটি দড়ি ছিঁড়ে যাওয়াই ছিল যথেষ্ট। মেরি সেলেস্টের পাল বাতাস ধরে দ্রুত দূরে চলে যেতে পারত, অথচ ছোট খোলা নৌকাটি ঢেউয়ের মধ্যে পিছিয়ে পড়ত। জাহাজের মূল পালতোলা কাঠামোর তুলনায় ছোট নৌকার গতি ও সমুদ্র সহ্য করার ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। একবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে দশজন মানুষ আজোরেসের কাছাকাছি বিশাল আটলান্টিকে কার্যত অসহায় হয়ে পড়তেন।
আরেকটি ব্যাখ্যা জাহাজে পানি ঢোকা এবং পানির গভীরতা পরিমাপের সমস্যাকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় কাঠের জাহাজে কিছু পানি ঢোকা স্বাভাবিক ছিল এবং পাম্পের মাধ্যমে তা বের করা হতো। মেরি সেলেস্টের পাম্প নিয়ে সমস্যা হয়ে থাকতে পারে। মালামালের কারণে জাহাজের নিচের অংশ সরাসরি পরীক্ষা করাও কঠিন হতে পারে। ফলে ক্যাপ্টেন হয়তো নিশ্চিত হতে পারছিলেন না ঠিক কত দ্রুত পানি বাড়ছে।
এখানে আবহাওয়া পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দিনের কঠিন সমুদ্রযাত্রা, জাহাজে পানি, পাম্প নিয়ে অনিশ্চয়তা, অবস্থান নির্ধারণে সম্ভাব্য ত্রুটি এবং অ্যালকোহলের বাষ্প—এই সবকিছু একসঙ্গে ঘটলে ব্রিগসের কাছে পরিস্থিতি বাস্তবের তুলনায় অনেক বেশি বিপজ্জনক মনে হতে পারে। আজোরেসের ভূমি কাছাকাছি বলে বিশ্বাস করলে ছোট নৌকায় সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তখন সম্পূর্ণ অযৌক্তিক মনে নাও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে মেরি সেলেস্ট রহস্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এখানেই। রহস্যটির সমাধানের জন্য কোনো একটি নাটকীয় বিপর্যয়ের প্রয়োজন নেই। বরং একাধিক ছোট সমস্যার ভুল ব্যাখ্যা থেকে একটি মারাত্মক সিদ্ধান্ত তৈরি হয়ে থাকতে পারে। ক্যাপ্টেন ভাবলেন জাহাজ ডুবতে পারে বা বিস্ফোরিত হতে পারে। তিনি সবাইকে ছোট নৌকায় নামালেন। অথচ বাস্তবে জাহাজটি ডোবেনি, বিস্ফোরিতও হয়নি। তারপর কোনো কারণে নৌকা জাহাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে যে মেরি সেলেস্টকে তারা ছেড়েছিলেন, সেটিই মানুষহীন অবস্থায় বেঁচে গেল; আর মানুষগুলো হারিয়ে গেল সমুদ্রে।
বিস্ফোরণ নিয়ে একটি আপত্তি দীর্ঘদিন ধরে ছিল—জাহাজে আগুন বা বড় বিস্ফোরণের সুস্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কিন্তু পরবর্তী পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অ্যালকোহলের বাষ্প দ্রুত জ্বলে উঠলেও কাঠের পৃষ্ঠে প্রত্যাশিত মাত্রার পোড়া চিহ্ন নাও থাকতে পারে। তবে মেরি সেলেস্টে সত্যিই এমন ঘটনা ঘটেছিল—এটি প্রমাণিত নয়। এটি কেবল দেখায় যে বিস্ফোরণের ভয় পুরোপুরি অবাস্তব ছিল না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা ক্যাপ্টেন ব্রিগসের শেষ কয়েক ঘণ্টার চিন্তাভাবনা জানি না। শেষ মুহূর্তে তিনি কী দেখেছিলেন, কী শুনেছিলেন বা কোন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—তার কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য নেই। জাহাজে থাকা সবাই নিখোঁজ হওয়ায় ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীরাও হারিয়ে যান। ফলে তদন্তকারীদের হাতে ছিল শুধু একটি পরিত্যক্ত জাহাজ এবং সেখানে রেখে যাওয়া ভৌত সূত্র।
মেরি সেলেস্টকে শেষ পর্যন্ত দেই গ্রাতিয়ার নাবিকেরা জিব্রাল্টারে নিয়ে যান। সেখানে জাহাজ উদ্ধারের পুরস্কার নির্ধারণের জন্য তদন্ত শুরু হয়। তদন্তের সময় সম্ভাব্য অপরাধের বিষয়টিও পরীক্ষা করা হয়। জাহাজে পাওয়া কিছু চিহ্ন প্রথমে রক্ত বা সহিংসতার প্রমাণ বলে সন্দেহ করা হলেও সেগুলো থেকে হত্যাকাণ্ডের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত মেরি সেলেস্টের দশ আরোহীর ভাগ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
ঘটনাটি আরও বিখ্যাত হয়ে ওঠে সাহিত্য ও সংবাদমাধ্যমের কারণে। ১৮৮৪ সালে আর্থার কোনান ডয়েল মেরি সেলেস্ট দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে একটি গল্প প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি প্রকৃত ঘটনার বিভিন্ন তথ্য পরিবর্তন করেছিলেন। গল্পটি জনপ্রিয় হওয়ার পর বাস্তব ঘটনা ও সাহিত্যিক কল্পনার সীমা সাধারণ মানুষের কাছে ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তী সংবাদপত্র, বই, চলচ্চিত্র ও রহস্যবিষয়ক রচনায় নতুন নতুন কাল্পনিক বিবরণ যোগ হতে থাকে।
এই কারণেই আজও অনেক মানুষ মনে করেন, মেরি সেলেস্টে খাবার টেবিলে গরম অবস্থায় ছিল, চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল অথবা সবাই যেন এক মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। ঐতিহাসিক নথি এসব নাটকীয় বিবরণের অনেকটিই সমর্থন করে না। একইভাবে বিশাল অক্টোপাস, অজানা সামুদ্রিক দানব, অতিপ্রাকৃত শক্তি কিংবা তথাকথিত রহস্যময় সমুদ্রাঞ্চলের সঙ্গে ঘটনাটিকে যুক্ত করারও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।
মেরি সেলেস্টের পরবর্তী জীবনও খুব সুখকর ছিল না। জাহাজটি আবার বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হয় এবং বিভিন্ন মালিকের অধীনে চলতে থাকে। অবশেষে ১৮৮৫ সালে এর শেষ ক্যাপ্টেন গিলম্যান পার্কার বীমা জালিয়াতির উদ্দেশ্যে হাইতির কাছে জাহাজটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রবালপ্রাচীরে উঠিয়ে ধ্বংস করার চেষ্টা করেন। এই ঘটনার সঙ্গে ১৮৭২ সালের নিখোঁজ হওয়ার রহস্যের কোনো সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু জাহাজটির অদ্ভুত ইতিহাসে এটি আরেকটি নাটকীয় অধ্যায় যোগ করে।
সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যাটি তাই কোনো ভূতুড়ে ঘটনা নয়। প্রমাণগুলো ইঙ্গিত করে যে ক্যাপ্টেন ব্রিগস ও তার সঙ্গীরা নিজেদের ইচ্ছাতেই কিন্তু কোনো জরুরি বিপদের আশঙ্কায় মেরি সেলেস্ট ছেড়েছিলেন। সেই বিপদ হয়তো অ্যালকোহলের বাষ্প, জাহাজে পানি ঢোকা, পাম্পের সমস্যা, খারাপ আবহাওয়া অথবা এসবের সম্মিলিত ফল ছিল। তারা সম্ভবত ছোট নৌকায় নেমেছিলেন এবং এরপর কোনোভাবে মূল জাহাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। আটলান্টিকের কঠিন আবহাওয়ায় একটি অতিরিক্ত বোঝাই ছোট নৌকার পরিণতি কী হতে পারে, তা অনুমান করা কঠিন নয়।
তবুও এটি একটি সম্ভাব্য পুনর্গঠন মাত্র। ছোট নৌকাটি কখনো উদ্ধার হয়নি। ক্যাপ্টেন ব্রিগস, তার স্ত্রী সারা, দুই বছরের সোফিয়া কিংবা জাহাজের সাত নাবিকের কোনো নিশ্চিত চিহ্ন আর পাওয়া যায়নি। তাদের শেষ মুহূর্তের কোনো লিখিত বিবরণও নেই। ফলে মেরি সেলেস্টের রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মিনিট ইতিহাস থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে।
এই ঘটনাকে এত শক্তিশালী রহস্যে পরিণত করেছে জাহাজটির অক্ষত অবস্থাই। যদি মেরি সেলেস্ট ডুবে যেত, তবে ঘটনাটি হয়তো উত্তর আটলান্টিকের অসংখ্য সামুদ্রিক দুর্ঘটনার একটি হিসেবে ইতিহাসে হারিয়ে যেত। কিন্তু জাহাজটি বেঁচে ছিল এবং মানুষগুলো হারিয়ে গিয়েছিল। যে জাহাজকে ছেড়ে যাওয়া হয়েছিল, সেটিই নিরাপদে আরেকটি বন্দরে পৌঁছেছিল; যারা নিজেদের বাঁচানোর জন্য সম্ভবত জাহাজ ছেড়েছিলেন, তাদের আর কখনো দেখা যায়নি।
এই বৈপরীত্যই মেরি সেলেস্টকে সাধারণ একটি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা থেকে ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত সামুদ্রিক রহস্যে পরিণত করেছে। প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে অসংখ্য গবেষণা ও ব্যাখ্যার পর আজ আমরা হয়তো ঘটনার সম্ভাব্য কাঠামো বুঝতে পারি—একটি বিপদের আশঙ্কা, জাহাজ ত্যাগের সিদ্ধান্ত, ছোট নৌকায় আশ্রয় এবং মূল জাহাজ থেকে আকস্মিক বিচ্ছিন্নতা। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঠিক আগে মেরি সেলেস্টের ডেকে কী ঘটেছিল, ক্যাপ্টেন ব্রিগস কী দেখে এতটা উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন এবং ছোট নৌকায় ওঠার পর দশজন মানুষের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল—এই প্রশ্নগুলোর নিশ্চিত উত্তর আজও আটলান্টিকের গভীরেই হারিয়ে আছে।
ভয়নিচ পাণ্ডুলিপির রহস্য: শত চেষ্টা করেও কেন কেউ এই অদ্ভুত বইয়ের ভাষা পড়তে পারেনি?
জ্যাক দ্য রিপার: লন্ডনের কুখ্যাত অজ্ঞাত ধারাবাহিক খুনিকে কেন কখনো ধরা যায়নি?
ডায়াটলভ পাস ঘটনা: বরফের পাহাড়ে নয় অভিযাত্রীর রহস্যময় মৃত্যুর রাতে কী ঘটেছিল?
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের রহস্য: সত্যিই কি এখানে অস্বাভাবিকভাবে হারিয়ে যায় জাহাজ ও বিমান?
ইংল্যান্ডের ‘প্রিন্সেস ইন দ্য টাওয়ার’: দুই রাজপুত্রের রহস্যময় অন্তর্ধানের পেছনে কে ছিল?
নাইটস টেম্পলারদের পতন: রাজা চতুর্থ ফিলিপের ষড়যন্ত্র নাকি সত্যিই অপরাধী ছিল তারা?