বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বাহাদুর শাহ জাফর ও ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ: শেষ মুঘল সম্রাটের করুণ পরিণতি ও সাম্রাজ্যের অবসান

Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 27, 2026
বাহাদুর শাহ জাফর ও ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ: শেষ মুঘল সম্রাটের করুণ পরিণতি ও সাম্রাজ্যের অবসান
বাহাদুর শাহ জাফর ও ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ যখন উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তখন দিল্লির লালকেল্লায় বসবাসকারী বাহাদুর শাহ জাফর প্রকৃত অর্থে আর কোনো বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন না। তাঁর ক্ষমতা প্রধানত দিল্লির প্রাসাদ ও সীমিত ভাতা-নির্ভর রাজকীয় জীবনের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। বাংলার নবাবি, মারাঠা শক্তি, শিখ সাম্রাজ্য এবং শেষ পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থানের মধ্যে কয়েক প্রজন্ম ধরে মুঘল সার্বভৌম ক্ষমতা ক্ষয়ে গিয়েছিল। তবু ১৮৫৭ সালের মে মাসে বিদ্রোহী সিপাহিরা দিল্লিতে পৌঁছে যখন তাঁকেই ভারতের সম্রাট হিসেবে সামনে নিয়ে আসে, তখন প্রায় তিন শতাব্দী আগে বাবরের প্রতিষ্ঠিত মুঘল নাম আবার শেষবারের মতো ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক বৈধতার কেন্দ্রে উঠে আসে।

বাহাদুর শাহ জাফরের জন্ম ১৭৭৫ সালের ২৪ অক্টোবর দিল্লিতে। তাঁর পিতা ছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর শাহ দ্বিতীয়। কিন্তু জাফরের জন্মের সময় মুঘল সাম্রাজ্যের বাস্তব ক্ষমতা প্রায় বিলুপ্ত। ১৭৬৫ সালের পর থেকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার বিপুল রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ করছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ও উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে মারাঠা, মাইসোর এবং অন্যান্য ভারতীয় শক্তিকে পরাজিত করে কোম্পানি ক্রমশ উত্তর ভারতের ওপরও আধিপত্য বিস্তার করে।

১৮০৩ সালে ব্রিটিশরা মারাঠাদের কাছ থেকে দিল্লি দখল করার পর মুঘল সম্রাট কার্যত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুরক্ষিত পেনশনভোগীতে পরিণত হন। সম্রাটের নামের মর্যাদা ছিল, কিন্তু তাঁর নিজস্ব স্বাধীন সেনাবাহিনী, বিশাল রাজস্ব বা প্রাদেশিক প্রশাসন আর ছিল না। দিল্লির বাইরে তাঁর আদেশ কার্যকর করার বাস্তব ক্ষমতা প্রায় শূন্য।

১৮৩৭ সালে পিতার মৃত্যুর পর বাহাদুর শাহ জাফর সিংহাসনে বসেন। তাঁর বয়স তখন ষাটের বেশি। তিনি যুদ্ধবাজ শাসকের চেয়ে কবি, সুফিমনা ব্যক্তি এবং সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বেশি পরিচিত ছিলেন। উর্দু কবিতায় ‘জাফর’ ছদ্মনামে তাঁর রচনা বিখ্যাত হয়। দিল্লির দরবারে গালিব, জওক, মোমিনের মতো কবিদের সাহিত্যিক পরিবেশ তাঁর যুগকে রাজনৈতিক দুর্বলতার মধ্যেও সাংস্কৃতিকভাবে স্মরণীয় করে রেখেছে।

কিন্তু ব্রিটিশরা ধীরে ধীরে মুঘল রাজপরিবারের অবশিষ্ট মর্যাদাও কমিয়ে আনছিল। কোম্পানির নীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে জাফরের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরিকে আর একই সম্রাটের মর্যাদা দেওয়া হবে না। এমনকি লালকেল্লা ছেড়ে অন্যত্র বসবাসের পরিকল্পনাও রাজপরিবারের সামনে রাখা হয়েছিল। মুঘল নামকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে বিলুপ্ত করার প্রক্রিয়া ১৮৫৭ সালের আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল।

এই পটভূমিতে বিস্ফোরিত হয় ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ। এর কারণ শুধু একটি ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্প্রসারণ, দেশীয় রাজ্য দখলের নীতি, জমি ও রাজস্বব্যবস্থার পরিবর্তন, তালুকদার ও রাজপরিবারের অসন্তোষ, সেনাবাহিনীতে ভারতীয় সিপাহিদের বেতন ও পদমর্যাদার সমস্যা এবং ধর্মীয়-সামাজিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা বহুদিন ধরে উত্তেজনা তৈরি করেছিল।

তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল নতুন এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ নিয়ে গুজব। কার্তুজের মুখ দাঁত দিয়ে কাটতে হতো এবং সিপাহিদের মধ্যে বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে যে তাতে গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহার করা হয়েছে। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সিপাহির ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে এটি জড়িয়ে পড়ে। কোম্পানি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও বিশ্বাসের সংকট ইতোমধ্যে গভীর হয়ে গিয়েছিল।

১৮৫৭ সালের ১০ মে মীরাটে ভারতীয় সিপাহিদের বিদ্রোহ শুরু হয়। তারা ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে এবং পরদিন দ্রুত দিল্লির দিকে অগ্রসর হয়। মীরাট থেকে দিল্লির দূরত্ব বেশি ছিল না এবং বিদ্রোহীরা বুঝেছিল যে মুঘল সম্রাটকে পাশে পেলে তাদের আন্দোলন রাজনৈতিক বৈধতা পাবে।

১১ মে বিদ্রোহীরা দিল্লিতে প্রবেশ করে। শহরে ব্রিটিশ প্রশাসনের ওপর আক্রমণ শুরু হয় এবং ইউরোপীয় কর্মকর্তা ও সাধারণ নাগরিকদের অনেকেই নিহত হন। পরিস্থিতি অত্যন্ত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিদ্রোহী সিপাহিরা লালকেল্লায় পৌঁছে বাহাদুর শাহ জাফরকে তাদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করতে চাপ দেয়।

জাফর শুরুতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি বৃদ্ধ, সামরিকভাবে দুর্বল এবং জানতেন যে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার মতো সম্পদ তাঁর হাতে নেই। কিন্তু কয়েক হাজার সশস্ত্র বিদ্রোহী দিল্লির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তাঁর সামনে বাস্তব বিকল্প খুব সীমিত ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি বিদ্রোহীদের সমর্থন করেন এবং প্রতীকীভাবে ভারতের সম্রাট হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হন।

এই মুহূর্তের রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। বহু বিদ্রোহী বাহিনী এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের নেতারা নিজেদের সংগ্রামকে জাফরের নামে বৈধতা দিতে শুরু করেন। তাঁর নামে মুদ্রা তৈরি, ঘোষণা এবং ফরমান জারি করা হয়। বাস্তব ক্ষমতা সীমিত হলেও ‘মুঘল বাদশাহ’ নামটি এখনো এমন ঐতিহাসিক বৈধতা বহন করছিল, যা কোনো পৃথক বিদ্রোহী সেনাপতির ছিল না।

তবে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ কোনো একক কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীন জাতীয় সেনাবাহিনী ছিল না। দিল্লি, কানপুর, লক্ষ্ণৌ, ঝাঁসি, বিহার এবং অন্যান্য অঞ্চলে বিদ্রোহের আলাদা নেতৃত্ব ও লক্ষ্য ছিল। নানা সাহেব, তাতিয়া টোপে, রানি লক্ষ্মীবাই, বেগম হজরত মহল ও কুনওয়ার সিংহের মতো নেতারা নিজ নিজ অঞ্চলে লড়াই করেন। বাহাদুর শাহ জাফর এদের সবার কার্যকর সামরিক কমান্ডার ছিলেন না।

দিল্লির ভেতরেও শৃঙ্খলা ছিল বড় সমস্যা। বিভিন্ন রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সিপাহিদের মধ্যে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল ছিল। খাদ্য, বেতন ও গোলাবারুদের সমস্যা দেখা দেয়। লুটপাট ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা শহরের সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন করে তোলে।

পরবর্তীকালে বখত খান বেরেলি থেকে বিদ্রোহী বাহিনী নিয়ে দিল্লিতে এসে সামরিক সংগঠন শক্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি অভিজ্ঞ আর্টিলারি কর্মকর্তা ছিলেন এবং একটি প্রশাসনিক পরিষদের মাধ্যমে বিদ্রোহ পরিচালনার উদ্যোগ নেন। কিন্তু মুঘল রাজপরিবার, বিদ্রোহী সেনাপতি ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে পূর্ণ সমন্বয় তৈরি হয়নি।

ব্রিটিশদের কাছে দিল্লি পুনর্দখল ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরটি সামরিকভাবে যতটা, তার চেয়েও বেশি ছিল রাজনৈতিক প্রতীকের কেন্দ্র। দিল্লিতে মুঘল সম্রাটকে ঘিরে বিদ্রোহী রাষ্ট্র গড়ে উঠতে দিলে আন্দোলন আরও শক্তিশালী হতে পারত।

ব্রিটিশ ও কোম্পানি বাহিনী দিল্লির উত্তর-পশ্চিমে রিজ অঞ্চলে অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ অবরোধ শুরু করে। পাঞ্জাব ব্রিটিশদের হাতে থাকায় সেখান থেকে নতুন সৈন্য, শিখ ও পাঞ্জাবি বাহিনী, ইউরোপীয় সেনা এবং ভারী কামান আনা সম্ভব হয়। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দিল্লির জন্য তীব্র সংঘর্ষ চলে।

অবরুদ্ধ দিল্লির ভেতরে খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকট বাড়তে থাকে। বিদ্রোহীদের সংখ্যা অনেক হলেও তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নিয়মিত সরবরাহ এবং কেন্দ্রীয় যুদ্ধপরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। অন্যদিকে ব্রিটিশ বাহিনী ধীরে ধীরে অবরোধ কামান এনে শহরের প্রাচীরে আঘাত করার প্রস্তুতি নেয়।

১৮৫৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ বাহিনী দিল্লিতে চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু করে। কাশ্মীরি গেট এবং প্রাচীরের বিভিন্ন ভাঙা অংশ দিয়ে সৈন্য প্রবেশ করে। কয়েক দিনের ভয়াবহ নগরযুদ্ধের পর বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়তে থাকে।

বাহাদুর শাহ জাফর বুঝতে পারেন যে লালকেল্লায় থাকা আর নিরাপদ নয়। তিনি দুর্গ ত্যাগ করে হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় নেন। ইতিহাসের এক গভীর প্রতীকী দৃশ্য তৈরি হয়—দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের বিশাল সমাধিতে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁর রাজবংশের শেষ সম্রাট।

২০ সেপ্টেম্বর জাফর ব্রিটিশ কর্মকর্তা মেজর উইলিয়াম হডসনের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর নিরাপত্তার বিষয়ে শর্ত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরের দিন ঘটে আরও নিষ্ঠুর ঘটনা। জাফরের পুত্র মির্জা মুঘল ও মির্জা খিজর সুলতান এবং পৌত্র মির্জা আবু বকরকে হডসন বন্দি করেন।

তাঁদের দিল্লির কাছে নিয়ে এসে হডসন গুলি করে হত্যা করেন। পরে তাঁদের মৃতদেহ প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড মুঘল রাজপরিবারের পতনের সবচেয়ে করুণ ও অপমানজনক ঘটনাগুলোর একটি হয়ে আছে।

ব্রিটিশরা দিল্লি পুনর্দখলের পর শহরের ওপর ব্যাপক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বহু মানুষ নিহত, গ্রেপ্তার বা শহর থেকে বিতাড়িত হয়। বাড়িঘর ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয় এবং দিল্লির বহু ঐতিহাসিক মহল্লার সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। মুঘল রাজধানীর দীর্ঘ সাংস্কৃতিক জীবনও এই দমনের ফলে মারাত্মক আঘাত পায়।

বাহাদুর শাহ জাফরকে বন্দি করে লালকেল্লাতেই বিচার করা হয়—যে প্রাসাদে তিনি একসময় সম্রাট হিসেবে বসতেন। ১৮৫৮ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তাঁর বিচার চলে। তাঁর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, বিদ্রোহীদের সহায়তা, নিজেকে ভারতের সম্রাট ঘোষণা এবং ইউরোপীয়দের হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।

জাফরের প্রতিরক্ষার মূল যুক্তি ছিল তিনি বিদ্রোহের স্বাধীন পরিকল্পনাকারী নন; সশস্ত্র সিপাহিদের চাপে তিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং বহু ঘটনা তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঘটেছে। ইতিহাসের বিচারে এটিই বাস্তবতার কাছাকাছি—তিনি ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রতীকী কেন্দ্র ছিলেন, সামরিক স্থপতি নন।

তবু ব্রিটিশরা তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে। তাঁকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে নির্বাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পেছনে সম্ভবত তাঁকে শহীদে পরিণত না করার রাজনৈতিক হিসাবও ছিল।

১৮৫৮ সালের অক্টোবরে বাহাদুর শাহ জাফরকে তাঁর পরিবারসহ দিল্লি থেকে রেঙ্গুনে পাঠানো হয়, বর্তমান মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যাঁর পূর্বপুরুষেরা দিল্লি, আগ্রা, লাহোর ও ভারতের বিশাল অঞ্চলের ওপর শাসন করেছিলেন, সেই রাজবংশের শেষ সম্রাট এখন ব্রিটিশ বন্দি হিসেবে নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত।

রেঙ্গুনে তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সীমিত। তিনি আর রাজপ্রাসাদের কবিসভা বা দিল্লির সাংস্কৃতিক পরিবেশে ছিলেন না। বৃদ্ধ বয়স, অসুস্থতা এবং নিজের শহর থেকে বিচ্ছিন্নতা তাঁর শেষ জীবনকে গভীর বিষাদে আচ্ছন্ন করে।

জাফরের সঙ্গে বহু বিষণ্ণ উর্দু কবিতা জনপ্রিয়ভাবে যুক্ত। দিল্লির প্রতি তাঁর আকুলতা এবং নির্বাসনের বেদনা তাঁকে শুধু শেষ সম্রাট নয়, হারিয়ে যাওয়া এক সভ্যতার কবিতাময় প্রতীকেও পরিণত করেছে। তাঁর কিছু বিখ্যাত কবিতার নির্দিষ্ট রচয়িতা নিয়ে গবেষণাগত প্রশ্ন থাকলেও তাঁর কবি-সম্রাটের ভাবমূর্তি দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত।

১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর রেঙ্গুনে বাহাদুর শাহ জাফর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে সেখানেই খুব সাধারণভাবে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুর সময় মুঘল সাম্রাজ্য রাজনৈতিকভাবে বহু বছর ধরেই শেষ, কিন্তু ১৮৫৭-৫৮ সালের ঘটনাগুলো তার আনুষ্ঠানিক অবসান নিশ্চিত করেছিল।

বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ফল আসে ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন থেকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারত শাসনের অধিকার বাতিল হয় এবং ভারতের প্রশাসন সরাসরি ব্রিটিশ ক্রাউনের হাতে চলে যায়। অর্থাৎ যে কোম্পানি মুঘলদের কাছ থেকে ব্যবসার অনুমতি নিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিল, পলাশী ও বক্সারের পর সাম্রাজ্যিক শক্তি হয়ে উঠেছিল, সেই কোম্পানির শাসনও ১৮৫৭ সালের বিপর্যয়ের পর শেষ হলো।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে মুঘল রাজবংশও আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়। বাহাদুর শাহের উত্তরসূরিদের আর মুঘল সম্রাট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বাবরের ১৫২৬ সালের পানিপথ বিজয় থেকে শুরু হওয়া সাম্রাজ্যিক ধারার রাজনৈতিক সমাপ্তি ঘটে।

তবে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের চরিত্র নিয়ে পরবর্তী ইতিহাসে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক লেখায় দীর্ঘদিন এটিকে ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ বলা হয়েছে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ধারায় একে প্রায়ই প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলা হয়। বাস্তবে বিদ্রোহের মধ্যে সামরিক বিদ্রোহ, কৃষক ও জমিদার অসন্তোষ, ক্ষমতাচ্যুত রাজপরিবারের স্বার্থ, ধর্মীয় উদ্বেগ এবং ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা—সবই উপস্থিত ছিল।

সব অঞ্চল এতে অংশ নেয়নি। পাঞ্জাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, দক্ষিণ ভারত এবং বহু দেশীয় রাজ্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একইভাবে বিদ্রোহ করেনি। অনেক ভারতীয় সৈন্য ও শাসক ব্রিটিশ পক্ষেও ছিল। তাই একে আধুনিক সংগঠিত সর্বভারতীয় জাতীয় বিপ্লব হিসেবে দেখা যেমন অতিরঞ্জিত, তেমনি শুধু সামরিক কার্তুজ-বিদ্রোহ হিসেবে সীমাবদ্ধ করাও অসম্পূর্ণ।

বাহাদুর শাহ জাফরের ভূমিকার ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা জরুরি। তিনি কোনো শক্তিশালী বৃদ্ধ সম্রাট হিসেবে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের যুদ্ধ শুরু করেননি। বরং বিদ্রোহীরা তাঁর ঐতিহাসিক মর্যাদাকে ব্যবহার করেছিল, আর তিনি দ্রুত বদলে যাওয়া পরিস্থিতির মধ্যে সেই ভূমিকা গ্রহণ করেন।

কিন্তু প্রতীক কখনো কখনো বাস্তব সেনাবাহিনীর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দিল্লির সিংহাসন তখন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও ‘মুঘল বাদশাহ’ নামটি এখনো বিভিন্ন অঞ্চল ও সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পরিচিত সার্বভৌম কাঠামো ছিল। ১৮৫৭ সালে জাফরের নামে হিন্দু ও মুসলিম সিপাহিরা যুদ্ধ করেছে—এটি মুঘল সার্বভৌমত্বের দীর্ঘস্থায়ী প্রতীকী শক্তির অসাধারণ প্রমাণ।

লালকেল্লার ইতিহাসও এই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে। শাহজাহান এটিকে সাম্রাজ্যিক মহিমার কেন্দ্র হিসেবে নির্মাণ করেছিলেন। ১৮৫৭ সালে সেটিই বিদ্রোহের প্রতীকী সদরদপ্তর, পরে ব্রিটিশ সেনাঘাঁটি এবং জাফরের বিচারস্থলে পরিণত হয়। একই স্থাপত্যে মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ, পতন এবং ঔপনিবেশিক বিজয় যেন পরপর দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

বাহাদুর শাহ জাফরের নির্বাসন মুঘল পতনের দীর্ঘ ইতিহাসের শেষ অধ্যায় মাত্র। এই পতন শুরু হয়েছিল অনেক আগে—আওরঙ্গজেবের পর উত্তরাধিকার সংকট, প্রাদেশিক শক্তির উত্থান, নাদির শাহ ও আবদালির আক্রমণ, মারাঠা সম্প্রসারণ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আর্থিক-সামরিক উত্থানের মাধ্যমে। ১৮৫৭ সালে যা শেষ হয়, তার রাজনৈতিক ভিত আসলে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ক্ষয় হচ্ছিল।

তবু শেষ সম্রাটের ব্যক্তিগত পরিণতি ইতিহাসকে এক বিশেষ মানবিক মাত্রা দেয়। বাবর কাবুল থেকে এসে দিল্লির সিংহাসন জয় করেছিলেন; আকবর সেই সাম্রাজ্যকে সুসংহত করেছিলেন; শাহজাহান তার স্থাপত্যিক মহিমাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়েছিলেন; আওরঙ্গজেব তাকে ভৌগোলিক সর্বোচ্চ বিস্তারে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর তিন শতাব্দীরও বেশি সময় পরে সেই একই রাজবংশের শেষ প্রতিনিধি নিজের রাজধানী থেকে বন্দি হয়ে বিদেশে নির্বাসনে মৃত্যুবরণ করেন।

১৮৫৭ সালের দিল্লি পতন তাই শুধু একটি বিদ্রোহের পরাজয় ছিল না; এটি ভারতীয় ইতিহাসের একটি দীর্ঘ সাম্রাজ্যিক যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি। বাহাদুর শাহ জাফর বাস্তব ক্ষমতায় দুর্বল হলেও ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা অসাধারণভাবে প্রতীকী—তাঁর বন্দিত্বের সঙ্গে মুঘল সিংহাসনের স্বাধীন অস্তিত্ব শেষ হয়, তাঁর রেঙ্গুন নির্বাসনের সঙ্গে দিল্লির শেষ মুঘল দরবার বিলুপ্ত হয়, আর ১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে ভারত সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে প্রবেশ করে। বাবরের প্রথম পানিপথের বিজয়ে যে মুঘল যুগের সূচনা হয়েছিল, বাহাদুর শাহ জাফরের নির্বাসিত মৃত্যুতেই সেই দীর্ঘ ইতিহাসের শেষ পর্দা নেমে আসে।


You may also like