বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

নাদির শাহের দিল্লি আক্রমণ ১৭৩৯: হত্যাযজ্ঞ, ময়ূর সিংহাসন ও মুঘল সাম্রাজ্যের অপমান

Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 27, 2026
নাদির শাহের দিল্লি আক্রমণ ১৭৩৯: হত্যাযজ্ঞ, ময়ূর সিংহাসন ও মুঘল সাম্রাজ্যের অপমান
নাদির শাহের দিল্লি আক্রমণ ১৭৩৯

১৭৩৯ সালের নাদির শাহের দিল্লি আক্রমণ মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাসে এমন এক ঘটনা, যা শুধু একটি পরাজিত যুদ্ধ বা রাজধানী লুণ্ঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের সামনে মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক দুর্বলতা, দরবারি বিভাজন এবং রাজনৈতিক অবক্ষয়কে নির্মমভাবে প্রকাশ করে দিয়েছিল। কয়েক দশক আগেও যে দিল্লি ছিল বিশ্বের অন্যতম ধনী সাম্রাজ্যের রাজধানী, সেই শহরই কয়েক দিনের মধ্যে বিদেশি সেনাবাহিনীর হাতে লুণ্ঠিত হয়, অসংখ্য মানুষ নিহত হয় এবং ময়ূর সিংহাসনসহ বিপুল রাজকীয় সম্পদ পারস্যে নিয়ে যাওয়া হয়।

এই বিপর্যয় বুঝতে হলে নাদির শাহের উত্থান এবং তৎকালীন মুঘল দুর্বলতার দিকে তাকাতে হয়। নাদির শাহ জন্মেছিলেন ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দরিদ্র তুর্কোমান পটভূমিতে। সামরিক প্রতিভা, নির্মম শৃঙ্খলা এবং দ্রুত অভিযানের মাধ্যমে তিনি আফগান ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করে পারস্যে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৩৬ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্যের শাহ হন।

অন্যদিকে দিল্লিতে তখন সম্রাট মুহাম্মদ শাহ শাসন করছিলেন। তাঁর আমলে মুঘল রাজদরবার সাংস্কৃতিকভাবে উজ্জ্বল হলেও রাজনৈতিকভাবে কেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বাংলা, হায়দরাবাদ ও আওধের মতো প্রদেশ কার্যত স্বায়ত্তশাসিত, মারাঠারা মধ্য ও উত্তর ভারতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে এবং সাম্রাজ্যের অভিজাতেরা নিজেদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ব্যস্ত ছিল।

মুঘল উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের দুর্বলতা নাদির শাহকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। আফগান হোতাকি শক্তিকে পরাজিত করার পর তাঁর কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী মুঘল ভূখণ্ডে আশ্রয় নিয়েছিল। সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অভিযোগকে সামনে রেখে নাদির শাহ ভারত আক্রমণের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু দ্রুতই পরিষ্কার হয় যে তাঁর লক্ষ্য শুধু সীমান্ত সমস্যা সমাধান নয়; মুঘল ভারতের বিপুল সম্পদও তাঁর প্রধান আকর্ষণ ছিল।

নাদির শাহ প্রথমে আফগানিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণে আনেন। কাবুল ও পেশোয়ারের দিকে অগ্রসর হওয়ার পর তিনি সিন্ধু অতিক্রম করে পাঞ্জাবের দিকে এগিয়ে যান। লাহোর খুব বেশি কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। মুঘল সাম্রাজ্যের একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ধসে পড়ছিল।

দিল্লির দরবার বিপদের গভীরতা বুঝতে দেরি করে। যখন অবশেষে বিশাল মুঘল বাহিনী সংগঠিত করা হয়, তখন অভিজ্ঞতা ও সমন্বয়ের অভাব ছিল প্রকট। নিজাম-উল-মুলক, খান-ই-দৌরান ও সাদাত খানের মতো শক্তিশালী অভিজাতেরা উপস্থিত থাকলেও তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল।

দুই বাহিনী ১৭৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি করনালের কাছে মুখোমুখি হয়। মুঘল বাহিনী সংখ্যায় বিশাল ছিল, কিন্তু একটি বড় সেনাবাহিনী থাকা আর সেটিকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা একই বিষয় নয়। বিপরীতে নাদির শাহের বাহিনী ছিল বহু বছরের যুদ্ধঅভিজ্ঞ, দ্রুতগতির এবং কেন্দ্রীয় কমান্ডে পরিচালিত।

পারস্য বাহিনীর বিশেষ শক্তি ছিল অশ্বারোহী বন্দুকধারী এবং উটের পিঠে বসানো হালকা কামান বা জাম্বুরাকের কার্যকর ব্যবহার। তারা দ্রুত অবস্থান বদলাতে পারত এবং শত্রুর ওপর ঘন আগ্নেয়াস্ত্রের চাপ তৈরি করতে সক্ষম ছিল। নাদির শাহ যুদ্ধক্ষেত্রের ভূগোল ও মুঘল সেনাপতিদের অসংগঠিত অগ্রযাত্রা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগান।

মুঘল অভিজাত সাদাত খান নিজ বাহিনী নিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেলে তিনি মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পারস্য বাহিনী তাঁকে ঘিরে ফেলে। খান-ই-দৌরান উদ্ধার করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন। কয়েক ঘণ্টার সংঘর্ষেই মুঘল সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব ভেঙে পড়ে।

করনালের যুদ্ধের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এত বড় সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত সময়েই কার্যত পরাজিত হয়। যুদ্ধের পর সম্রাট মুহাম্মদ শাহ নিজেই নাদির শাহের শিবিরে যেতে বাধ্য হন। মুঘল সামরিক মর্যাদার জন্য এটি ছিল এক বিশাল অপমান।

প্রাথমিকভাবে নাদির শাহ সম্ভবত বিশাল ক্ষতিপূরণ নিয়ে ফিরে যেতে পারতেন। কিন্তু অর্থের পরিমাণ, রাজনৈতিক আলোচনা এবং দিল্লির বিপুল সম্পদের সম্ভাবনা তাঁকে রাজধানীর দিকে এগোতে উৎসাহিত করে। মুহাম্মদ শাহকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দিল্লির দিকে অগ্রসর হন।

১৭৩৯ সালের মার্চ মাসে নাদির শাহ দিল্লিতে প্রবেশ করেন। শহরের লোকেরা এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়—তাদের নিজস্ব সম্রাট উপস্থিত, কিন্তু প্রকৃত সামরিক ক্ষমতা একজন বিদেশি বিজেতার হাতে। নাদির শাহ শহরে শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করেন এবং প্রথমদিকে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটে না।

কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। দিল্লিতে গুজব ছড়ায় যে নাদির শাহ নিহত হয়েছেন। এই খবরের পর শহরের বিভিন্ন স্থানে পারস্য সৈন্যদের ওপর হামলা শুরু হয় এবং অনেক সৈন্য নিহত হয়। নাদির শাহ জীবিত এবং ক্রুদ্ধ অবস্থায় পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেন।

২২ মার্চ ১৭৩৯ দিল্লির ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দিন। নাদির শাহ শহরের জনগণের ওপর হত্যাযজ্ঞের নির্দেশ দেন। পারস্য সৈন্যরা দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় আক্রমণ শুরু করে। অসংখ্য মানুষ নিহত হয়, দোকান ও বাড়ি লুট হয় এবং শহরের বিভিন্ন অংশে আগুন ও ধ্বংস ছড়িয়ে পড়ে।

নিহতের সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো বিবরণে অত্যন্ত উচ্চ সংখ্যা দেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নির্ধারণ কঠিন হলেও এতে সন্দেহ নেই যে হত্যাকাণ্ড ছিল ব্যাপক এবং দিল্লির নাগরিক সমাজে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।

জনপ্রিয় বর্ণনায় বলা হয়, নাদির শাহ দিল্লির কোনো উঁচু স্থান থেকে হত্যাযজ্ঞ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং তাঁর নির্দেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তা চলেছিল। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে ভিন্নতা থাকলেও মূল বাস্তবতা স্পষ্ট—পারস্য সৈন্যদের ওপর হামলার প্রতিশোধ হিসেবে সমগ্র শহরকে শাস্তি দেওয়ার নীতি নেওয়া হয়েছিল।

হত্যাযজ্ঞ থামার পর শুরু হয় আরও সংগঠিত সম্পদ সংগ্রহ। নাদির শাহ শুধু মুঘল রাজকোষ লুট করেননি; দিল্লির অভিজাত, ব্যবসায়ী ও ধনী পরিবারের কাছ থেকেও বিপুল অর্থ, সোনা, রৌপ্য ও রত্ন আদায় করা হয়।

শাহজাহান ও তাঁর উত্তরসূরিদের যুগে মুঘল রাজকোষে কয়েক প্রজন্ম ধরে জমা হওয়া সম্পদ ছিল অসাধারণ। ভারতীয় কৃষি রাজস্ব, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিজিত রাজ্যের ধনসম্পদ এবং রাজকীয় উপহার থেকে এই বিপুল সম্পদ গড়ে উঠেছিল। নাদির শাহ কার্যত সেই সঞ্চিত সম্পদের বড় অংশ এক আঘাতে নিয়ে যান।

লুণ্ঠনের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতীক ছিল শাহজাহানের কিংবদন্তিতুল্য ময়ূর সিংহাসন। সোনা ও অসংখ্য মূল্যবান রত্নে অলংকৃত এই সিংহাসন মুঘল সম্রাটের সার্বভৌম ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক ছিল। নাদির শাহ এটি পারস্যে নিয়ে যান।

ময়ূর সিংহাসন হারানোর প্রতীকী গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। যে সিংহাসন একসময় মুঘল সম্রাটের বিশ্বজয়ী মর্যাদা প্রকাশ করত, সেটিই এখন বিজয়ী পারস্য সম্রাটের যুদ্ধলব্ধ সম্পদে পরিণত হলো। এটি যেন মুঘল সার্বভৌমত্বকেই দিল্লি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যমান প্রতীক।

এই লুণ্ঠনের সঙ্গে বিখ্যাত কোহিনূর হীরা এবং দরিয়া-ই-নূর-এর মতো রত্নের নামও যুক্ত। কোহিনূর তখন মুঘল রাজপরিবারের সম্পদের অংশ ছিল। পরবর্তী সময়ে এটি নাদির শাহের কাছ থেকে আফগান দুররানি শাসকদের হাতে এবং আরও পরে পাঞ্জাব ও ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে যাবে।

কোহিনূর নাদির শাহের হাতে কীভাবে আসে, তা নিয়ে একটি জনপ্রিয় গল্প রয়েছে। বলা হয়, মুহাম্মদ শাহ নিজের পাগড়িতে হীরাটি লুকিয়ে রেখেছিলেন এবং নাদির শাহ ‘পাগড়ি বিনিময়’-এর একটি সৌজন্যমূলক প্রথা ব্যবহার করে সেটি অর্জন করেন। গল্পটি বিখ্যাত হলেও এর সব বিস্তারিত সমসাময়িক প্রমাণে নিশ্চিত নয়। তবু এটি নাদির শাহের দিল্লি লুণ্ঠনকে ঘিরে তৈরি ঐতিহাসিক কিংবদন্তির অংশ হয়ে গেছে।

নাদির শাহ কত সম্পদ নিয়ে গিয়েছিলেন তার নির্ভুল মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। সমসাময়িক ও পরবর্তী বিবরণে বিপুল অঙ্ক উল্লেখ করা হয়েছে। তবে লুণ্ঠনের পর তিনি পারস্যে কয়েক বছরের জন্য কর মওকুফ করতে পেরেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়, যা ভারত থেকে নেওয়া সম্পদের বিশালতার ধারণা দেয়।

কিন্তু মুঘলদের ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক ছিল না। তার চেয়েও বেশি ছিল রাজনৈতিক মর্যাদার ধ্বংস। বাবর, আকবর, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্যের রাজধানী বিদেশি বাহিনী দখল করেছে, সম্রাটকে কার্যত অধীনস্থ করেছে, নাগরিকদের হত্যা করেছে এবং রাজকোষ লুট করে চলে গেছে—এই সংবাদ পুরো উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এর ফলে প্রাদেশিক শাসকেরা আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন যে দিল্লির সম্রাট তাঁদের রক্ষা করার মতো শক্তিশালী নন। বাংলা, আওধ ও হায়দরাবাদের মতো অঞ্চল ইতোমধ্যেই কার্যত স্বাধীন ছিল। নাদির শাহের আক্রমণ এই রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে।

মারাঠারাও মুঘল দুর্বলতা থেকে সুবিধা নিতে থাকে। তারা ইতোমধ্যে মালওয়া ও মধ্য ভারতে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। দিল্লির সামরিক অক্ষমতা প্রকাশ পাওয়ার পর উত্তর ভারতে তাদের প্রভাব বিস্তারের পথ আরও সহজ হয়।

উত্তর-পশ্চিম সীমান্তেও বিপজ্জনক পরিবর্তন ঘটে। নাদির শাহ ভারত ছাড়ার সময় সিন্ধুর পশ্চিমের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

পরবর্তীকালে নাদির শাহের সেনাপতিদের মধ্য থেকেই আহমদ খান আবদালি, পরবর্তী আহমদ শাহ দুররানি, আফগানিস্তানে নিজস্ব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন। ১৭৪৭ সালে নাদির শাহ নিহত হওয়ার পর আহমদ শাহ বারবার উত্তর ভারতে অভিযান চালাবেন। অর্থাৎ ১৭৩৯ সালের আক্রমণ ভবিষ্যতের আফগান আক্রমণের পথও অনেকটা খুলে দেয়।

নাদির শাহের সাফল্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুধু তাঁকে অসাধারণ সেনাপতি বলা যথেষ্ট নয়। তাঁর বিপরীতে মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক প্রশাসন ও দরবারি নেতৃত্বের গুরুতর দুর্বলতা ছিল। বিশাল সেনাবাহিনী থাকলেও কেন্দ্রীয় কমান্ড দুর্বল, অভিজাতেরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সমন্বয় সীমিত ছিল।

মুঘল সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ মনসবদারদের নিজস্ব বাহিনীর ওপর নির্ভর করত। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের শক্তি দুর্বল হলে এসব অভিজাতের ব্যক্তিগত স্বার্থ সাম্রাজ্যিক স্বার্থকে ছাপিয়ে যেতে পারত। করনালে এই সমস্যা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সংখ্যাগত শক্তি কার্যকর সামরিক সংগঠনের বিকল্প হতে পারেনি।

অন্যদিকে নাদির শাহের সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে আফগান, অটোমান ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছিল। তাঁর বাহিনীতে দ্রুত অশ্বারোহী, উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র এবং কঠোর শৃঙ্খলা ছিল। তিনি নিজেও সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের পরিকল্পনা পরিচালনা করতেন।

১৭৩৯ সালের বিপর্যয়কে আবার মুঘল সাম্রাজ্যের ‘তাৎক্ষণিক মৃত্যু’ হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। মুহাম্মদ শাহ দিল্লির সিংহাসনে থেকেই যান এবং মুঘল রাজবংশ আরও এক শতাব্দীর বেশি আনুষ্ঠানিকভাবে টিকে থাকবে। কিন্তু ১৭৩৯-এর পর সাম্রাজ্যের বাস্তব শক্তি এবং তার প্রতীকী মর্যাদার মধ্যে ব্যবধান নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।

দিল্লির সম্রাট এখনো উপাধি দিতে পারেন, ফরমান জারি করতে পারেন এবং অনেক আঞ্চলিক শাসক তাঁর নামকে বৈধতার উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর রাজধানী রক্ষা করার ক্ষমতা যে সীমিত, তা সবাই দেখেছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও লুণ্ঠনের প্রভাব গুরুতর ছিল। শুধু রাজকোষের সোনা-রূপা হারানো নয়, দিল্লির ব্যবসায়ী, কারিগর ও অভিজাত শ্রেণির সম্পদের ওপরও ব্যাপক আঘাত পড়ে। শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত হয় এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে।

তবে মুঘল সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ অর্থনীতি দিল্লির রাজকোষের সমার্থক ছিল না। বাংলা, গুজরাট, দাক্ষিণাত্য এবং অন্যান্য অঞ্চলের কৃষি ও বাণিজ্যিক উৎপাদন চলতে থাকে। ফলে নাদির শাহ পুরো ভারতীয় অর্থনীতিকে ধ্বংস করেননি। তিনি মূলত মুঘল কেন্দ্রের সঞ্চিত সম্পদ ও মর্যাদায় এক বিধ্বংসী আঘাত করেছিলেন।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। নাদির শাহের লুণ্ঠনের পরও ভারতীয় বস্ত্র উৎপাদন, কৃষি ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চলছিল। কিন্তু যে কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্য সেই সম্পদ থেকে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব তৈরি করত, সেটিই এখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

নাদির শাহও ভারতে স্থায়ী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মূলত সামরিক বিজয়, সীমান্তের নিরাপত্তা এবং বিপুল সম্পদ অর্জন। দিল্লি দখল করে তিনি সেখানে পারস্য প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি মুহাম্মদ শাহকে মুঘল সম্রাট হিসেবেই রেখে ভারত ত্যাগ করেন।

এটিই ঘটনাটিকে আরও অপমানজনক করে তোলে। মুঘল সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করারও প্রয়োজন হয়নি; নাদির শাহ তাকে সামরিকভাবে পরাজিত করে, সম্পদ নিয়ে এবং নিজের ইচ্ছামতো সম্রাটকে সিংহাসনে রেখে চলে যেতে পেরেছিলেন।

১৭৩৯ সালের দিল্লি আক্রমণ তাই মুঘল পতনের কারণ যতটা, তার চেয়েও বেশি ছিল ইতোমধ্যে চলমান পতনের নির্মম প্রকাশ। আওরঙ্গজেবের পর উত্তরাধিকার যুদ্ধ, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, মারাঠা সম্প্রসারণ এবং রাজস্বসংকট যে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রকে দুর্বল করেছিল, করনালের যুদ্ধ সেই দুর্বলতার পর্দা সরিয়ে দেয়।

এরপর মুঘল পতনের গতি আরও দ্রুত হবে। আহমদ শাহ দুররানির আক্রমণ, মারাঠাদের উত্তর ভারতীয় সম্প্রসারণ, বাংলায় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক উত্থান এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে দিল্লির সম্রাট ক্রমেই অন্য শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন।

ময়ূর সিংহাসনের ভাগ্যও এই পরিবর্তনের প্রতীক। শাহজাহানের আমলে এটি ছিল মুঘল সম্পদ ও বিশ্বসম্রাটের ধারণার শীর্ষ প্রকাশ। এক শতাব্দীরও কম সময়ের মধ্যে সেটি দিল্লি থেকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে নিয়ে যাওয়া হলো। এর চেয়ে স্পষ্টভাবে মুঘল ভাগ্যের পরিবর্তন আর খুব কম ঘটনাই প্রকাশ করতে পারে।

করনালের পরাজয় মুঘল সামরিক দুর্বলতা প্রকাশ করেছিল, দিল্লির হত্যাযজ্ঞ সাম্রাজ্যের প্রজাদের রক্ষা করার অক্ষমতা দেখিয়েছিল, আর ময়ূর সিংহাসনের লুণ্ঠন তার রাজকীয় মর্যাদাকে অপমানের প্রতীকে পরিণত করেছিল। ১৭৩৯ সালের নাদির শাহের আক্রমণ তাই শুধু দিল্লির একটি ভয়াবহ বিপর্যয় ছিল না—এটি ছিল সেই মুহূর্তগুলোর একটি, যখন ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে যে একসময়ের অপরাজেয় মুঘল সাম্রাজ্য আর আগের মতো নেই।