বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

এমকে-আল্ট্রা: মানুষের মন নিয়ন্ত্রণে সিআইএ-এর গোপন পরীক্ষায় আসলে কী ঘটেছিল?

  • Author: Admin
  • August 27, 2026
এমকে-আল্ট্রা: মানুষের মন নিয়ন্ত্রণে সিআইএ-এর গোপন পরীক্ষায় আসলে কী ঘটেছিল?
এমকে-আল্ট্রা: মানুষের মন নিয়ন্ত্রণে সিআইএ-এর গোপন পরীক্ষা

১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার শীতল যুদ্ধ শুধু পারমাণবিক অস্ত্র, সামরিক জোট কিংবা গুপ্তচরবৃত্তির প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। মানুষের চিন্তা, স্মৃতি, আচরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকেও সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে দেখা শুরু হয়েছিল। মার্কিন গোয়েন্দা মহলে আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন কিংবা উত্তর কোরিয়া হয়তো এমন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে, যার মাধ্যমে বন্দি বা গুপ্তচরদের মানসিকভাবে ভেঙে ফেলা, তাদের কাছ থেকে তথ্য বের করা কিংবা তাদের আচরণ পরিবর্তন করা সম্ভব। এই আতঙ্কের পরিবেশ থেকেই জন্ম নেয় ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোপন গবেষণা কর্মসূচিগুলোর একটি—এমকে-আল্ট্রা

এমকে-আল্ট্রা সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে এত কিংবদন্তি, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও অতিরঞ্জিত গল্প তৈরি হয়েছে যে বাস্তব ঘটনাগুলো কখনো কখনো কল্পকাহিনির আড়ালে চাপা পড়ে যায়। বাস্তবে এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষার নাম ছিল না এবং বিজ্ঞানীরা এমন কোনো কার্যকর যন্ত্র আবিষ্কার করেননি যা দিয়ে মানুষের মস্তিষ্ককে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যেত। বরং এটি ছিল বহু উপপ্রকল্পে বিভক্ত একটি বিস্তৃত গোপন গবেষণা কর্মসূচি, যেখানে মাদক, সম্মোহন, ঘুম, সংবেদন বঞ্চনা, মানসিক চাপ, জিজ্ঞাসাবাদের কৌশল এবং মানুষের আচরণ পরিবর্তনের সম্ভাব্য পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, কিছু পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা জানতেনই না যে তাদের ওপর পরীক্ষা চলছে।

এমকে-আল্ট্রা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ১৯৫৩ সালে। সিআইএ-এর তৎকালীন পরিচালক অ্যালেন ডালেস কর্মসূচিটির অনুমোদন দেন এবং সংস্থার রসায়নবিদ সিডনি গটলিব এর অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। তবে এর পেছনের চিন্তাভাবনা আরও আগে শুরু হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবং শীতল যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমন রাসায়নিক ও মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতির সন্ধান করছিল, যা জিজ্ঞাসাবাদে সুবিধা দিতে পারে। এমকে-আল্ট্রার আগে ব্লুবার্ড এবং পরে আর্টিচোক নামে কর্মসূচিও পরিচালিত হয়েছিল। এমকে-আল্ট্রা সেই ধারার আরও বিস্তৃত ও উচ্চাভিলাষী রূপ হয়ে ওঠে।

এই কর্মসূচির পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ছিল কোরীয় যুদ্ধ। যুদ্ধের সময় বন্দি হওয়া কিছু মার্কিন সেনা দেশে ফিরে এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন যা যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। একই সময়ে চীনা কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক পুনঃশিক্ষা এবং সোভিয়েত জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি নিয়ে নানা প্রতিবেদন ছড়িয়ে পড়ছিল। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে “মস্তিষ্ক ধোলাই” ধারণাটি দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মার্কিন গোয়েন্দারা ভাবতে শুরু করেন, প্রতিপক্ষ যদি সত্যিই মানুষের বিশ্বাস বা আচরণ পরিবর্তনের কোনো কার্যকর পদ্ধতি তৈরি করে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকেও তার পাল্টা ব্যবস্থা খুঁজে বের করতে হবে।

এমকে-আল্ট্রার সবচেয়ে পরিচিত উপাদান ছিল এলএসডি নিয়ে পরীক্ষা। এই শক্তিশালী মনঃপ্রভাবকারী পদার্থ অতি অল্প মাত্রাতেই মানুষের উপলব্ধি, সময়বোধ, চিন্তার ধরন এবং আবেগে গভীর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সিআইএ প্রথমদিকে ভাবছিল, এটি হয়তো জিজ্ঞাসাবাদের সময় মানুষের মানসিক প্রতিরোধ দুর্বল করতে পারে। আবার এমন ধারণাও পরীক্ষা করা হচ্ছিল যে কোনো ব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করা, সাময়িকভাবে অক্ষম করে দেওয়া কিংবা তার স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব কি না।

সমস্যা ছিল, এসব পরীক্ষার সবগুলো আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত সম্মতি নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবীরা জানতেন তারা মাদক গ্রহণ করছেন। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে মানুষকে তাদের অজ্ঞাতসারে এলএসডি দেওয়া হয়েছিল। সিআইএ-এর নিজেদের কর্মী, সামরিক সদস্য এবং সাধারণ নাগরিকসহ বিভিন্ন মানুষ এ ধরনের পরীক্ষার আওতায় এসেছিলেন। আজকের গবেষণা নৈতিকতার বিচারে এটি অত্যন্ত গুরুতর লঙ্ঘন, কারণ একজন মানুষ কী গ্রহণ করছেন এবং তার সম্ভাব্য ঝুঁকি কী—এগুলো না জানিয়ে তার শরীরে মনঃপ্রভাবকারী পদার্থ প্রয়োগ করা সচেতন সম্মতির মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

এই গোপন পরীক্ষাগুলোর সঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি হলো ফ্র্যাঙ্ক ওলসন। তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত একজন জীবাণু ও রাসায়নিক যুদ্ধবিষয়ক গবেষক ছিলেন। ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে মেরিল্যান্ডে এক বৈঠকের সময় তাকে এবং আরও কয়েকজনকে তাদের পূর্বসম্মতি ছাড়াই এলএসডি দেওয়া হয়। এরপর ওলসনের আচরণ ও মানসিক অবস্থায় গুরুতর পরিবর্তন দেখা দেয়। কয়েক দিন পরে নিউইয়র্কের একটি হোটেলের জানালা থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি প্রথমে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচিত হলেও বহু বছর পর গোপন পরীক্ষার বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ায় তার মৃত্যু নিয়ে গভীর বিতর্ক শুরু হয়। ওলসনের মৃত্যুকে ঘিরে পরবর্তী দশকগুলোতে বিভিন্ন সন্দেহ ও বিকল্প ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত বিষয় হলো—তাকে তার জ্ঞাত সম্মতি ছাড়াই এলএসডি দেওয়া হয়েছিল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তার মৃত্যু ঘটে।

এমকে-আল্ট্রার আরেকটি বিশেষভাবে বিতর্কিত অংশ ছিল অপারেশন মিডনাইট ক্লাইম্যাক্স। এই কার্যক্রমে সান ফ্রান্সিসকোসহ কয়েকটি স্থানে গোপন সেফহাউস ব্যবহার করা হয়। সেখানে যৌনকর্মীদের মাধ্যমে কিছু পুরুষকে নিয়ে আসা হতো এবং তাদের অজ্ঞাতসারে এলএসডি দেওয়া হতো। একমুখী আয়নার পেছন থেকে সিআইএ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতেন। উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল মাদক মানুষের আচরণ, যৌন পরিস্থিতি এবং জিজ্ঞাসাবাদের সম্ভাব্য পরিবেশে কী ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে তা বোঝা। এই কার্যক্রম এমকে-আল্ট্রার নৈতিক সমস্যার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি, কারণ পরীক্ষাধীন ব্যক্তিদের সম্মতি নেওয়া হয়নি এবং তারা জানতেনও না যে একটি সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের পর্যবেক্ষণ করছে।

তবে এমকে-আল্ট্রা শুধু এলএসডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন গবেষণায় অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ, ঘুমের ওপর প্রভাব, সম্মোহন, স্মৃতি, ব্যক্তিত্ব, জিজ্ঞাসাবাদের সময় মানসিক চাপ এবং মানুষের আচরণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়। কর্মসূচিটির আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, গবেষণাগার, কারাগার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছিল। অর্থায়নের প্রকৃত উৎস গোপন রাখতে অনেক ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী প্রতিষ্ঠান বা গবেষণা তহবিলের ব্যবস্থা ব্যবহার করা হতো। ফলে কোনো কোনো গবেষক সিআইএ-এর অর্থায়নের বিষয়টি জানলেও অন্যরা হয়তো পুরো কাঠামো সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।

এই বিস্তৃত ব্যবস্থার সবচেয়ে কুখ্যাত অধ্যায়গুলোর একটি তৈরি হয় কানাডার মন্ট্রিয়লে। মনোরোগ চিকিৎসক ডোনাল্ড ইউয়েন ক্যামেরন অ্যালান মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউটে এমন কিছু পরীক্ষা পরিচালনা করেছিলেন, যার অর্থায়নের সঙ্গে সিআইএ-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা যুক্ত ছিল। ক্যামেরন তখন মনোরোগবিদ্যার একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি মনে করতেন, রোগীর বিদ্যমান মানসিক আচরণের ধরন ভেঙে দিয়ে নতুন আচরণ গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।

এই উদ্দেশ্যে তার কিছু রোগীর ওপর অত্যন্ত আক্রমণাত্মক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। দীর্ঘ সময় ওষুধের মাধ্যমে ঘুমিয়ে রাখা, শক্তিশালী বৈদ্যুতিক আঘাতভিত্তিক চিকিৎসা এবং একই ধরনের রেকর্ড করা বার্তা বারবার শোনানোর মতো পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছিল। ক্যামেরনের ধারণার একটি অংশ ছিল পুরোনো মানসিক কাঠামোকে দুর্বল করে পরে নতুন বার্তার মাধ্যমে আচরণ পুনর্গঠন করা। বাস্তবে অনেক রোগীর জন্য এর ফল ছিল ভয়াবহ। স্মৃতিভ্রংশ, দৈনন্দিন দক্ষতার ক্ষতি এবং গুরুতর মানসিক সমস্যার অভিযোগ পরবর্তী সময়ে সামনে আসে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার। এমকে-আল্ট্রা সত্য ছিল, কিন্তু জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে দেখানো নিখুঁত “মন নিয়ন্ত্রণ” বাস্তবে অর্জিত হয়েছিল—এমন প্রমাণ নেই। মানুষের স্মৃতি, উপলব্ধি বা মানসিক স্থিতি নষ্ট করা এবং কাউকে নির্ভুলভাবে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। বিভিন্ন পরীক্ষায় মানুষকে বিভ্রান্ত, আতঙ্কিত বা মানসিকভাবে দুর্বল করা সম্ভব হলেও কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্ককে নির্ভরযোগ্যভাবে পুনর্লিখন করে তাকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রে পরিণত করার প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়েছিল—এমন গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।

বরং কর্মসূচির ইতিহাস থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হলো, সিআইএ নিজেই দীর্ঘ সময় ধরে নানা পদ্ধতি পরীক্ষা করছিল কারণ কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য সমাধান তাদের হাতে ছিল না। এলএসডির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দেয়। পদার্থটির প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত অনিশ্চিত ছিল। একই মাত্রা ভিন্ন মানুষের মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ফল তৈরি করতে পারত। কেউ উৎফুল্ল হতে পারতেন, কেউ আতঙ্কিত, কেউ সন্দেহপ্রবণ, আবার কেউ বাস্তবতা উপলব্ধির ক্ষমতা হারাতে পারতেন। এমন অনিশ্চিত পদার্থকে নির্ভরযোগ্য জিজ্ঞাসাবাদ বা আচরণ নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা কঠিন ছিল।

এমকে-আল্ট্রা কত বড় ছিল তা বোঝাও সহজ নয়। কর্মসূচির অধীনে শতাধিক উপপ্রকল্প পরিচালিত হয়েছিল এবং অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ও গবেষকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। এর সব কার্যক্রম একই ধরনের ছিল না। কোনো প্রকল্প ছিল সাধারণ বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাছাকাছি, আবার কিছু কার্যক্রমে নৈতিক সীমা গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয়েছিল। ফলে পুরো কর্মসূচিকে একটি মাত্র পরীক্ষার মতো বিবেচনা করলে এর প্রকৃত জটিলতা বোঝা যায় না।

আরও বড় সমস্যা তৈরি হয় ১৯৭৩ সালে, যখন সিআইএ পরিচালক রিচার্ড হেলমসের নির্দেশে এমকে-আল্ট্রা-সংক্রান্ত বিপুলসংখ্যক নথি ধ্বংস করা হয়। ঠিক কত নথি নষ্ট হয়েছিল এবং সেগুলোর মধ্যে কী ছিল, তা আর সম্পূর্ণভাবে জানা সম্ভব নয়। এই নথি ধ্বংসের কারণেই পরবর্তী তদন্তকারীরা পুরো কর্মসূচির একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পুনর্গঠন করতে পারেননি। একই কারণে এমকে-আল্ট্রাকে ঘিরে অসংখ্য ষড়যন্ত্রতত্ত্ব টিকে থাকার সুযোগ পেয়েছে। যেখানে সরকারি নথির বড় অংশই নেই, সেখানে প্রমাণিত ঘটনা এবং অনুমানের সীমারেখা সাধারণ মানুষের কাছে সহজেই অস্পষ্ট হয়ে যায়।

তারপরও কর্মসূচিটি পুরোপুরি চাপা থাকেনি। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু হয়। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের গোপন কার্যক্রম নিয়ে জনসন্দেহের পরিবেশে সিআইএ-এর অতীত কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আসে। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি জেরাল্ড ফোর্ডের গঠিত রকফেলার কমিশন এবং মার্কিন সিনেটের চার্চ কমিটি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন বিতর্কিত কার্যক্রম অনুসন্ধান করে। এর ফলে অজ্ঞাতসারে মার্কিন নাগরিকদের ওপর মাদক পরীক্ষাসহ এমকে-আল্ট্রার কিছু কার্যক্রম জনসমক্ষে আসে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ১৯৭৭ সালে। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় অনুসন্ধানের সময় এমন হাজার হাজার পৃষ্ঠার আর্থিক ও প্রশাসনিক নথি খুঁজে পাওয়া যায়, যেগুলো ১৯৭৩ সালের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পেয়েছিল। এসব নথির মাধ্যমে কর্মসূচির বহু উপপ্রকল্প এবং অর্থায়নের কাঠামো সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যায়। এরপর মার্কিন সিনেটে আবার শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং এমকে-আল্ট্রার ব্যাপ্তি সম্পর্কে জনসাধারণ আরও বিস্তারিত ধারণা পেতে শুরু করে।

তবে আজও এমকে-আল্ট্রা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বড় সতর্কতা প্রয়োজন। প্রকৃত কর্মসূচিটি এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে এর সঙ্গে কাল্পনিক দাবি মিশিয়ে দেওয়া খুব সহজ। সিআইএ যে গোপনে মানুষের ওপর এলএসডি পরীক্ষা করেছে, সম্মতি ছাড়া কিছু ব্যক্তিকে মাদক দিয়েছে, আচরণ পরিবর্তন ও জিজ্ঞাসাবাদের পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেছে এবং পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি ধ্বংস করেছে—এসব ইতিহাসসমর্থিত ঘটনা। কিন্তু এমকে-আল্ট্রার মাধ্যমে দূর থেকে মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ, নির্ভুলভাবে হত্যাকারী তৈরি, মানুষের মধ্যে গোপন নির্দেশ স্থাপন কিংবা জনসমষ্টিকে অদৃশ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার মতো বহু জনপ্রিয় দাবি একই মাত্রার প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত নয়।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এমকে-আল্ট্রার প্রকৃত ইতিহাসকে ভয়াবহ করে তুলতে কোনো কাল্পনিক উপাদানের প্রয়োজন নেই। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে এমন গবেষণায় অর্থায়ন করেছিল যেখানে কিছু মানুষ জানতেনই না যে তারা পরীক্ষার অংশ। চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতিষ্ঠিত নৈতিক সীমা অতিক্রম করা হয়েছিল, গোপনীয়তার কারণে কার্যকর বাহ্যিক তদারকি ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং পরে গুরুত্বপূর্ণ নথির বড় অংশ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।

এমকে-আল্ট্রার ইতিহাস একই সঙ্গে শীতল যুদ্ধের আতঙ্কের ইতিহাস। সে সময় মার্কিন নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ বিশ্বাস করতেন যে প্রতিপক্ষ এমন কোনো মানসিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে, যার বিরুদ্ধে প্রস্তুত না থাকলে জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। এই ভয়ের কারণে এমন গবেষণাও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে শুরু করে, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গুরুতর নৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়ত। “শত্রু যদি করে থাকে, আমাদেরও জানতে হবে”—এই মানসিকতা গোপন গবেষণার সীমা ক্রমেই বিস্তৃত করেছিল।

এখানেই এমকে-আল্ট্রার সবচেয়ে গভীর শিক্ষা নিহিত। বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নিজে নৈতিক বা অনৈতিক নয়; কিন্তু সেই জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি এবং তার প্রয়োগ অবশ্যই নৈতিক বিচারের বিষয়। একজন মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, শরীরের ওপর অধিকার এবং সচেতন সম্মতি কোনো গবেষণার সুবিধার জন্য উপেক্ষা করা হলে বিজ্ঞান সহজেই ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে গবেষণা যখন রাষ্ট্রের গোপন নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, তখন স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহির গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।

এমকে-আল্ট্রা শেষ পর্যন্ত মানুষের মনকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো কার্যকর প্রযুক্তি তৈরি করতে পেরেছিল—এমন প্রমাণ ইতিহাসে নেই। কিন্তু কর্মসূচিটি অন্য একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে: মানুষের মন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে গিয়ে রাষ্ট্র নিজেই কত দূর যেতে পারে। এলএসডি, সম্মোহন, ঘুম, মানসিক চাপ কিংবা আচরণ পরিবর্তনের গবেষণার চেয়েও তাই এমকে-আল্ট্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষমতা, গোপনীয়তা এবং মানবাধিকারের সম্পর্ক।

আজ এমকে-আল্ট্রার সমস্ত সত্য জানা সম্ভব নয়। ধ্বংস হয়ে যাওয়া নথি আর ফিরবে না, অনেক অংশগ্রহণকারী ও কর্মকর্তা মারা গেছেন এবং বহু ঘটনার পূর্ণ বিবরণ কখনোই উদ্ধার করা যাবে না। কিন্তু যে নথিগুলো টিকে আছে, সরকারি তদন্তে যে তথ্য উঠে এসেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের যেসব অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোই যথেষ্ট অস্বস্তিকর একটি ছবি তৈরি করে। বাস্তব এমকে-আল্ট্রা কোনো অতিপ্রাকৃত মন নিয়ন্ত্রণের গল্প নয়। এটি এমন এক সময়ের ইতিহাস, যখন শীতল যুদ্ধের ভয়, গোয়েন্দা প্রতিযোগিতা এবং বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার মোহ একত্রিত হয়ে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গবেষণা নীতির সীমাকে বিপজ্জনকভাবে অতিক্রম করেছিল। আর সম্ভবত সেই কারণেই, কর্মসূচিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরও এমকে-আল্ট্রা আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও অস্বস্তিকর সরকারি গোপন পরীক্ষাগুলোর প্রতীক হয়ে আছে।