বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রোয়ানোকের হারিয়ে যাওয়া উপনিবেশ: শতাধিক মানুষ কোনো চিহ্ন ছাড়াই কোথায় উধাও হয়েছিল?

  • Author: Admin
  • August 27, 2026
রোয়ানোকের হারিয়ে যাওয়া উপনিবেশ: শতাধিক মানুষ কোনো চিহ্ন ছাড়াই কোথায় উধাও হয়েছিল?
রোয়ানোকের হারিয়ে যাওয়া উপনিবেশ

১৫৯০ সালের আগস্ট। আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে দীর্ঘ ও বিপজ্জনক যাত্রার পর ইংরেজ গভর্নর জন হোয়াইট অবশেষে উত্তর আমেরিকার রোয়ানোক দ্বীপে ফিরে এলেন। তিন বছর আগে তিনি এখানেই রেখে গিয়েছিলেন শতাধিক ইংরেজ নারী, পুরুষ ও শিশুকে। তাদের মধ্যে ছিলেন তাঁর নিজের মেয়ে এলেনর ডেয়ার, জামাতা অ্যানানিয়াস ডেয়ার এবং সদ্য জন্ম নেওয়া নাতনি ভার্জিনিয়া ডেয়ার। হোয়াইটের প্রত্যাশা ছিল পরিচিত মুখগুলো তাঁকে স্বাগত জানাবে। কিন্তু বসতির কাছে পৌঁছে তিনি পেলেন এক অস্বাভাবিক নীরবতা। মানুষ নেই, পরিবারের সদস্য নেই, দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ব্যস্ততা নেই। এমনকি উপনিবেশটি আগের অবস্থাতেও নেই। সবচেয়ে বিস্ময়কর সূত্র ছিল একটি কাঠের স্থাপনায় খোদাই করা মাত্র একটি শব্দ—“ক্রোয়াটান”। এই একটি শব্দই পরবর্তী চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রোয়ানোকের রহস্যের কেন্দ্রে রয়েছে।

রোয়ানোকের ঘটনা বুঝতে হলে ইংল্যান্ড কেন উত্তর আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা করছিল, সেটি বোঝা জরুরি। ষোড়শ শতকের শেষভাগে ইংল্যান্ড ও স্পেনের মধ্যে সামুদ্রিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা দ্রুত তীব্র হচ্ছিল। স্পেন ইতোমধ্যে আমেরিকার বিশাল অঞ্চল থেকে সম্পদ সংগ্রহ করে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। ইংরেজরা উত্তর আমেরিকায় নিজেদের স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করতে চাইছিল। রানি প্রথম এলিজাবেথের অনুমোদনে স্যার ওয়াল্টার র‍্যালি উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলে ইংরেজ বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেন। ইংরেজদের কাছে অঞ্চলটি শুধু নতুন ভূমি নয়; এটি বাণিজ্য, সম্পদ, সামুদ্রিক শক্তি এবং স্পেনের বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধার সম্ভাবনাও বহন করছিল।

রোয়ানোক দ্বীপ বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলাইনা উপকূলের বাধাদ্বীপ অঞ্চলের কাছে অবস্থিত। অঞ্চলটি ইউরোপীয়দের কাছে নতুন হলেও জনশূন্য ছিল না। বহু প্রজন্ম ধরে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী সেখানে বসবাস করছিল। ফলে ইংরেজরা কোনো খালি ভূখণ্ডে এসে বসতি স্থাপন করেনি; তারা প্রবেশ করেছিল এমন এক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে, যেখানে বিভিন্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সম্পর্ক, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভূখণ্ডগত স্বার্থ ছিল।

১৫৮৫ সালে রোয়ানোকে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ইংরেজ বসতি স্থাপনের চেষ্টা হয়। রালফ লেনের নেতৃত্বে আসা এই দলটির অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন পুরুষ। উদ্দেশ্য ছিল অঞ্চলটি পর্যবেক্ষণ করা, সম্ভাব্য সম্পদ অনুসন্ধান করা এবং একটি স্থায়ী ঘাঁটির ভিত্তি তৈরি করা। কিন্তু খাদ্যের অভাব, সরবরাহ সমস্যা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। ইংরেজদের আচরণও সংঘাত বাড়িয়েছিল। স্থানীয় নেতা উইঙ্গিনার সঙ্গে বিরোধ শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নেয়। ১৫৮৬ সালে স্যার ফ্রান্সিস ড্রেকের বহর সেখানে পৌঁছালে অধিকাংশ বসতি স্থাপনকারী সুযোগ পেয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যায়।

এই ব্যর্থতার পরও রোয়ানোক প্রকল্প পরিত্যক্ত হয়নি। ১৫৮৭ সালে আরও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এবার শুধু সৈন্য বা অভিযাত্রী নয়, পরিবারসহ স্থায়ী সমাজ গড়ার উপযোগী একটি দল পাঠানো হয়। জন হোয়াইটকে গভর্নর করা হয়। ঐতিহাসিক তালিকা অনুযায়ী এই অভিযানে শতাধিক বসতি স্থাপনকারী ছিলেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। পরিকল্পিত গন্তব্য ছিল আরও উত্তরের চেসাপিক উপসাগরীয় অঞ্চল। কিন্তু পরিস্থিতির জটিলতায় দলটি শেষ পর্যন্ত আবার রোয়ানোকেই অবস্থান করতে বাধ্য হয়।

নতুন উপনিবেশের শুরুতেই তারা উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। আগের ইংরেজ ঘাঁটির অবস্থা ভালো ছিল না। ইংরেজদের রেখে যাওয়া একটি ছোট দলের সদস্যদেরও আর স্বাভাবিকভাবে পাওয়া গেল না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ইংরেজদের প্রতি বৈরী হয়ে উঠেছিল। আগের অভিযানের সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি তখনও জীবিত ছিল। ফলে নতুন বসতি স্থাপনকারীরা এমন এক জায়গায় সমাজ গড়তে শুরু করেছিল যেখানে খাদ্য, নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক—তিনটিই অনিশ্চিত।

এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই ১৫৮৭ সালের আগস্টে ঘটেছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। জন হোয়াইটের মেয়ে এলেনর ডেয়ার একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেন। শিশুটির নাম রাখা হয় ভার্জিনিয়া ডেয়ার। ইংরেজ ঐতিহাসিক বিবরণে তাকে উত্তর আমেরিকায় জন্ম নেওয়া প্রথম ইংরেজ শিশুরূপে পরিচিত করা হয়। কিন্তু তার জন্মের কয়েক দিনের মধ্যেই উপনিবেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে থাকে। বসতি স্থাপনকারীদের প্রয়োজন ছিল খাদ্য, সরঞ্জাম এবং নতুন জনবল।

উপনিবেশবাসীদের অনুরোধে জন হোয়াইট ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে সাহায্য আনার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল দ্রুত সরবরাহ নিয়ে ফিরে আসা। কিন্তু ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ তাঁর পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। ইংল্যান্ড তখন স্পেনের সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। ১৫৮৮ সালে স্পেনীয় মহাবহর ইংল্যান্ড আক্রমণের চেষ্টা করলে প্রায় সব উপযুক্ত ইংরেজ জাহাজ সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতে থাকে। ফলে হোয়াইট চাইলেও সহজে রোয়ানোকে ফিরতে পারলেন না।

অবশেষে ১৫৯০ সালে তিনি একটি অভিযানের সঙ্গে উত্তর আমেরিকায় ফেরার সুযোগ পান। অর্থাৎ যে মানুষগুলোকে কয়েক মাসের জন্য রেখে যাওয়ার কথা ছিল, তাদের কাছে তিনি ফিরলেন প্রায় তিন বছর পরে। এই দীর্ঘ ব্যবধানই রোয়ানোকের রহস্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিন বছরে খাদ্যাভাব, ঝড়, রোগ, স্থানীয় সংঘর্ষ, অন্যত্র স্থানান্তর—অসংখ্য ঘটনা ঘটতে পারত।

হোয়াইট রোয়ানোকের কাছে পৌঁছানোর সময় দিনটি তাঁর নাতনি ভার্জিনিয়া ডেয়ারের তৃতীয় জন্মদিনের কাছাকাছি ছিল। কিন্তু দ্বীপে পৌঁছানোর আগেই অশুভ ঘটনা ঘটে। উত্তাল সমুদ্রে নৌকা চালানোর সময় অভিযানের কয়েকজন সদস্য দুর্ঘটনায় মারা যান। তারপরও হোয়াইট উপনিবেশের দিকে এগিয়ে যান। দূর থেকে ধোঁয়া বা আগুনের মতো কিছু দেখে প্রথমে তাঁর মনে আশা জেগেছিল যে বসতি স্থাপনকারীরা হয়তো এখনো সেখানে রয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধান করে মানুষের উপস্থিতি পাওয়া গেল না।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বসতিটি এমনভাবে ধ্বংস হয়ে পড়ে ছিল না যা সরাসরি কোনো আকস্মিক গণহত্যা বা সর্বগ্রাসী আক্রমণের প্রমাণ দেয়। বরং বিভিন্ন বিবরণ থেকে ধারণা করা হয়, ঘরবাড়ি বা কাঠের কাঠামোর অংশ পরিকল্পিতভাবে খুলে নেওয়া হয়েছিল। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো শত্রু হঠাৎ আক্রমণ করে সবাইকে হত্যা বা অপহরণ করলে মানুষ সাধারণত নিজেদের বাড়ির কাঠামো খুলে নিয়ে যাওয়ার সময় পায় না। পরিকল্পিত স্থানান্তরের ধারণার সঙ্গে এই পরিস্থিতি অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তারপর পাওয়া গেল সেই বিখ্যাত সংকেত। একটি স্থাপনায় খোদাই করা ছিল “CROATOAN”। অন্য একটি গাছে আংশিকভাবে “CRO” অক্ষরও দেখা গিয়েছিল বলে হোয়াইটের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ক্রোয়াটান কোনো অর্থহীন রহস্যময় শব্দ ছিল না। এটি কাছাকাছি একটি দ্বীপ এবং সেখানে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নামের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। বর্তমান হ্যাটেরাস দ্বীপের সঙ্গে সেই ক্রোয়াটান এলাকার পরিচয় যুক্ত করা হয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জন হোয়াইট ও উপনিবেশবাসীরা তাঁর ইংল্যান্ডে যাওয়ার আগে একটি সংকেত ব্যবস্থা ঠিক করেছিলেন। যদি বসতি স্থাপনকারীরা অন্যত্র চলে যায়, তারা গাছ বা কাঠের ওপর গন্তব্যের নাম খোদাই করে রাখবে। আর যদি বিপদের মুখে বাধ্য হয়ে স্থান ত্যাগ করতে হয়, তবে সেই লেখার সঙ্গে বিশেষ বিপদচিহ্ন যুক্ত করার কথা ছিল। হোয়াইট যখন “ক্রোয়াটান” শব্দটি দেখলেন, সেখানে সেই নির্ধারিত বিপদচিহ্ন দেখতে পাননি। ফলে তাঁর কাছে এটি আতঙ্কের চেয়ে আশার সংকেত ছিল। তাঁর ধারণা হয়েছিল, উপনিবেশবাসীরা সম্ভবত নিজেদের সিদ্ধান্তেই ক্রোয়াটান এলাকায় চলে গেছে।

স্বাভাবিকভাবেই হোয়াইট সেখানে গিয়ে তাঁদের খুঁজতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আবহাওয়া, নৌযাত্রার সমস্যা এবং জাহাজসংক্রান্ত পরিস্থিতি তাঁর পরিকল্পনায় বাধা সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত তিনি ক্রোয়াটান দ্বীপে গিয়ে নিখোঁজদের সন্ধান করতে পারেননি এবং ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে বাধ্য হন। এই ঘটনাই রহস্যটিকে স্থায়ী করে দেয়। যদি তিনি কয়েক দিনের মধ্যেই ক্রোয়াটানে পৌঁছাতে পারতেন, সম্ভবত রোয়ানোকের হারিয়ে যাওয়া উপনিবেশ আজ ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি হতো না।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—তারা যদি ক্রোয়াটানে গিয়েই থাকে, তারপর কী ঘটেছিল? এখানেই ইতিহাসের নিশ্চিত তথ্য শেষ হয়ে সম্ভাবনার জগৎ শুরু হয়। বহু বছর ধরে একটি জনপ্রিয় ধারণা ছিল, পুরো উপনিবেশ হয়তো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আক্রমণে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এমন ঘটনা অসম্ভব ছিল না। আগের ইংরেজ অভিযাত্রীদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু গোষ্ঠীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। কিন্তু রোয়ানোক বসতিতে এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি যা প্রমাণ করে যে শতাধিক মানুষ সেখানেই একসঙ্গে নিহত হয়েছিল।

আরেকটি ধারণা হলো, উপনিবেশবাসীরা সমুদ্রপথে ইংল্যান্ডে ফেরার চেষ্টা করেছিল এবং ঝড়ে মারা যায়। কিন্তু এই ব্যাখ্যাতেও সমস্যা আছে। এত বড় একটি দলের জন্য আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হতো। তাদের কাছে থাকা ছোট নৌযান দীর্ঘ মহাসাগরীয় যাত্রার জন্য উপযুক্ত ছিল কি না, সেটিও সন্দেহজনক। উপরন্তু “ক্রোয়াটান” লেখাটি স্পষ্টভাবে অন্য একটি সম্ভাবনার দিকে নির্দেশ করে।

সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলো, খাদ্যসংকট এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে উপনিবেশটি ভেঙে গিয়েছিল এবং বাসিন্দারা এক বা একাধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিল। ক্রোয়াটান জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ইংরেজদের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। জন হোয়াইটের পরিচিত মান্তেও নামের একজন স্থানীয় ব্যক্তি ইংরেজদের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ছিলেন। ফলে উপনিবেশবাসীদের অন্তত একটি অংশ ক্রোয়াটানদের কাছে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে।

এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে “হারিয়ে যাওয়া” শব্দটির অর্থও বদলে যায়। সম্ভবত তারা একদিনে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়নি। বরং কয়েক মাস বা কয়েক বছরের মধ্যে ইংরেজ বসতি হিসেবে তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব শেষ হয়ে গিয়েছিল। কেউ রোগে বা খাদ্যসংকটে মারা যেতে পারে, কেউ সংঘর্ষে নিহত হতে পারে, আবার অন্যরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমাজে মিশে যেতে পারে। তখন লিখিত ইংরেজ নথিতে তাদের আর খুঁজে পাওয়া না গেলেও বাস্তবে তাদের বংশধারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকে থাকা অসম্ভব নয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব বলছে, সবাই একই জায়গায় যায়নি। উপনিবেশবাসীদের একটি অংশ ক্রোয়াটানের দিকে গেলেও অন্য একটি অংশ মূল ভূখণ্ডের ভেতরের দিকে চলে যেতে পারে। এ ধরনের বিভাজন বাস্তব পরিস্থিতিতে যুক্তিসঙ্গত। শতাধিক ক্ষুধার্ত মানুষকে একটি ছোট স্থানীয় সমাজের পক্ষে দীর্ঘ সময় খাদ্য দেওয়া কঠিন হতে পারে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেওয়া তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াত।

পরবর্তী ইংরেজ উপনিবেশ জেমসটাউনের যুগেও রোয়ানোকের নিখোঁজ মানুষদের নিয়ে নানা খবর ও গুজব শোনা যায়। কিছু ইংরেজ অনুসন্ধানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে এমন তথ্য পাওয়ার দাবি করেছিলেন যে রোয়ানোকের কিছু মানুষ মূল ভূখণ্ডে বসবাস করেছিল এবং পরে সংঘর্ষে নিহত হয়। আবার ইউরোপীয় বৈশিষ্ট্যযুক্ত স্থানীয় মানুষের কথাও বিভিন্ন সময়ে প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু এসব বিবরণ অনেক ক্ষেত্রেই পরোক্ষ, বহু বছর পর সংগৃহীত অথবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রভাবিত হতে পারে। তাই এগুলোকে নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন।

আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব রহস্যটির নতুন দিক উন্মোচন করেছে। রোয়ানোক ও হ্যাটেরাস অঞ্চলে ইউরোপীয় উৎসের বিভিন্ন ষোড়শ শতকের বস্তু পাওয়া গেছে। তবে একটি ইউরোপীয় বস্তু পাওয়া মানেই সেটি নিখোঁজ উপনিবেশবাসীর ছিল—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ইংরেজ অভিযাত্রী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাণিজ্য ও উপহার বিনিময়ও হতো। ফলে প্রতিটি বস্তু কোথা থেকে এসেছে এবং কীভাবে সেখানে পৌঁছেছে, তা আলাদাভাবে বিচার করতে হয়।

রোয়ানোক রহস্যের আরেকটি আকর্ষণীয় সূত্র জন হোয়াইটের তৈরি মানচিত্রের সঙ্গে যুক্ত। আধুনিক পরীক্ষায় তাঁর একটি মানচিত্রে কাগজের নিচে লুকানো বা পরিবর্তিত একটি চিহ্নের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে, যা মূল ভূখণ্ডের একটি সম্ভাব্য স্থানের দিকে ইঙ্গিত করে। এর ফলে ধারণা তৈরি হয়েছে যে উপনিবেশবাসীদের বিকল্প আশ্রয়স্থলের পরিকল্পনা থাকতে পারে। সেই সম্ভাব্য অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানও হয়েছে এবং ইংরেজ উপস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু নিদর্শন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সেগুলো রোয়ানোকের নির্দিষ্ট বাসিন্দাদেরই ছিল—এটি এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়।

পরিবেশগত পরিস্থিতিও উপেক্ষা করা যায় না। বৃক্ষের বৃদ্ধিবলয় নিয়ে করা গবেষণা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে রোয়ানোক উপনিবেশ স্থাপনের সময় অঞ্চলটি গুরুতর খরার একটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। কৃষিনির্ভর একটি নতুন বসতির জন্য এটি বিপর্যয়কর হতে পারে। নতুন পরিবেশে অভ্যস্ত নয় এমন ইংরেজদের খাদ্যের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরতা বাড়লে সম্পর্কের ওপরও চাপ সৃষ্টি হতো। অর্থাৎ উপনিবেশটির পতনের জন্য কোনো রহস্যময় শত্রু বা অজানা দুর্যোগের প্রয়োজন ছিল না; খরা, খাদ্যসংকট, রাজনৈতিক শত্রুতা এবং বিচ্ছিন্নতা মিলেই যথেষ্ট ছিল।

এই কারণেই রোয়ানোকের ঘটনাকে “কোনো চিহ্ন ছাড়াই শতাধিক মানুষের উধাও হয়ে যাওয়া” হিসেবে বর্ণনা করা কিছুটা বিভ্রান্তিকর। তারা আসলে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন রেখে গিয়েছিল—“ক্রোয়াটান”। তাদের বসতিও এমন অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল যা পরিকল্পিতভাবে স্থানত্যাগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রকৃত রহস্য হলো তারা কোথায় গিয়েছিল, কতজন কোন দিকে গিয়েছিল এবং পরবর্তী কয়েক বছরে তাদের প্রত্যেকের ভাগ্যে কী ঘটেছিল।

রহস্যটিকে আরও নাটকীয় করেছে ভার্জিনিয়া ডেয়ারের পরিণতি। মাত্র কয়েক দিনের শিশু অবস্থায় তার দাদা জন হোয়াইট তাকে রেখে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। তিন বছর পরে ফিরে এসে তিনি আর নাতনিকে খুঁজে পাননি। ভার্জিনিয়া বেঁচে ছিল কি না, স্থানীয় কোনো সমাজে বড় হয়েছিল কি না, কিংবা অল্প বয়সেই মারা গিয়েছিল কি না—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। ফলে একটি ব্যর্থ উপনিবেশের ইতিহাসের সঙ্গে একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিও মিশে গেছে।

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে রোয়ানোককে ঘিরে অসংখ্য অতিপ্রাকৃত কাহিনি, অভিশাপ, অজানা শক্তি এবং অদ্ভুত ষড়যন্ত্রের গল্প তৈরি হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রমাণ এসবের প্রয়োজনীয়তা দেখায় না। বাস্তব ঘটনাই যথেষ্ট নাটকীয়। আটলান্টিকের অপর প্রান্তে রাজনৈতিক সংকটে আটকে পড়া একজন গভর্নর, সাহায্যের অপেক্ষায় থাকা বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলো, খাদ্যাভাব, খরা, স্থানীয় সংঘাত এবং শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার জন্য বসতি ছেড়ে যাওয়া—এই পরিস্থিতি থেকেই রহস্যটির যৌক্তিক কাঠামো তৈরি হয়।

সম্ভবত রোয়ানোকের রহস্যের কোনো একক উত্তরও নেই। “সবাই কোথায় গেল?” প্রশ্নটির পরিবর্তে হয়তো জিজ্ঞেস করা উচিত, “কোন দলটি কোথায় গেল?” একটি অংশ ক্রোয়াটান জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যেতে পারে, অন্য একটি অংশ মূল ভূখণ্ডের দিকে চলে যেতে পারে, আর কেউ কেউ রোগ, অনাহার বা সংঘর্ষে মারা যেতে পারে। কয়েক বছরের মধ্যে একটি ছোট ইংরেজ সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তাদের সম্মিলিত পরিচয় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া মোটেও অসম্ভব নয়।

আজ চার শতাব্দীরও বেশি সময় পরও কোনো সমাধি, লিখিত নথি বা প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার শতাধিক মানুষের প্রত্যেকের ভাগ্য ব্যাখ্যা করতে পারেনি। নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান মাঝেমধ্যে সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করে, কিন্তু চূড়ান্ত উত্তর এখনো অধরা। এ কারণেই রোয়ানোক ইতিহাসের একটি বিশেষ ধরনের রহস্য—এখানে সম্পূর্ণ সূত্রহীন অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা নেই; বরং সূত্র আছে, কিন্তু সেই সূত্রের পরের অধ্যায়টি হারিয়ে গেছে।

রোয়ানোকের পর ইংরেজরা উত্তর আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা বন্ধ করেনি। ১৬০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত জেমসটাউন শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের প্রথম স্থায়ী সফল বসতিতে পরিণত হয়। সেখানেও অনাহার, রোগ, যুদ্ধ এবং মৃত্যুর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। জেমসটাউনের ইতিহাস দেখায়, রোয়ানোকের মানুষের সামনে কী ধরনের বাস্তব বিপদ ছিল। পার্থক্য হলো, জেমসটাউনের দুর্দশার বিস্তারিত লিখিত বিবরণ টিকে গেছে; রোয়ানোকের ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিক নথিই অনুপস্থিত।

তাই রোয়ানোকের হারিয়ে যাওয়া উপনিবেশকে ইতিহাসের এমন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক নয় যেখানে শতাধিক মানুষ হঠাৎ এক রাতে বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল। প্রমাণ বরং ইঙ্গিত করে একটি দুর্বল, বিচ্ছিন্ন এবং সরবরাহহীন বসতি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছিল। বাসিন্দারা সম্ভবত নিজেদের বাঁচাতে অন্যত্র চলে গিয়েছিল এবং অন্তত কিছু মানুষ স্থানীয় সমাজের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। কিন্তু জন হোয়াইট যখন তিন বছর পরে ফিরে এলেন, তখন সেই পরিবর্তনের পুরো কাহিনি বলার মতো কেউ আর রোয়ানোকে ছিল না।

পরিত্যক্ত দ্বীপে রয়ে গিয়েছিল শুধু নীরব কাঠামো, অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পরিবারগুলোর স্মৃতি এবং কাঠের গায়ে খোদাই করা একটি শব্দ—“ক্রোয়াটান”। সেটি হয়তো কোনো রহস্যময় বার্তা ছিল না; বরং নিখোঁজ মানুষগুলোর রেখে যাওয়া অত্যন্ত সরল একটি ঠিকানা। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, জন হোয়াইট সেই ঠিকানায় পৌঁছাতে পারেননি। আর সেই অসমাপ্ত অনুসন্ধানের কারণেই রোয়ানোকের মানুষের প্রকৃত পরিণতি আজও ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রহস্যগুলোর একটি হয়ে আছে।