আহমদ শাহ আবদালি ও তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ: মুঘল পতনের মধ্যে ভারত দখলের লড়াই
Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস
- Author: Admin
- August 27, 2026
আহমদ শাহ আবদালি ও তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ
১৭৬১ সালের ১৪ জানুয়ারি তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ ছিল শুধু আহমদ শাহ আবদালি ও মারাঠাদের সংঘর্ষ নয়; এটি ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর ভারতে কে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে সেই প্রশ্নের এক রক্তক্ষয়ী উত্তর। একদিকে আফগানিস্তানের দুররানি সম্রাট আহমদ শাহ আবদালি, অন্যদিকে দাক্ষিণাত্য থেকে দ্রুত উত্তর ভারতে বিস্তার ঘটানো মারাঠা শক্তি। মাঝখানে দুর্বল মুঘল দরবার, রোহিলা আফগান, আওধের নবাব, জাট, রাজপুত এবং অসংখ্য আঞ্চলিক শক্তি। ফলে পানিপথের যুদ্ধ বুঝতে হলে প্রথমে দেখতে হয়—কীভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ভারতীয় উপমহাদেশকে এমন এক রাজনৈতিক শূন্যতায় নিয়ে গিয়েছিল যেখানে দিল্লির সিংহাসন আর প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল না, বরং অন্য শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
নাদির শাহের ১৭৩৯ সালের দিল্লি আক্রমণ এই পরিবর্তনকে নির্মমভাবে প্রকাশ করে দিয়েছিল। করনালের যুদ্ধে মুঘল বাহিনীর পরাজয়, দিল্লির হত্যাযজ্ঞ এবং ময়ূর সিংহাসনসহ বিপুল সম্পদ লুণ্ঠনের পর সবাই বুঝতে পারে যে মুঘল কেন্দ্রীয় শক্তি আর আগের মতো অপ্রতিরোধ্য নয়। নাদির শাহ ভারত ত্যাগ করলেও তাঁর সাম্রাজ্যের ভেতর থেকেই উঠে আসেন এমন একজন সেনাপতি, যিনি পরবর্তী দুই দশক উত্তর ভারতের রাজনীতিকে বারবার কাঁপিয়ে তুলবেন—আহমদ খান আবদালি, পরবর্তী আহমদ শাহ দুররানি।
১৭৪৭ সালে নাদির শাহ নিহত হলে তাঁর সাম্রাজ্য দ্রুত ভেঙে পড়ে। আহমদ খান কান্দাহারে ফিরে নিজের অনুসারীদের সমর্থনে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন এবং আহমদ শাহ দুররানি নামে নতুন আফগান সাম্রাজ্যের শাসক হন। তাঁর সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ছিল আফগানিস্তান, কিন্তু পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম ভারত তাঁর জন্য সামরিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তিনি খুব দ্রুত বুঝতে পারেন যে মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দুর্বল। পাঞ্জাবের মতো সমৃদ্ধ অঞ্চল কার্যত এমন এক সীমান্তভূমিতে পরিণত হয়েছিল যেখানে দিল্লির নিয়ন্ত্রণ ছিল অনিশ্চিত। ১৭৪৮ সাল থেকে আহমদ শাহ একাধিকবার ভারতে অভিযান শুরু করেন। প্রথম আক্রমণেই তিনি স্থায়ী সাফল্য পাননি, কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁর চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
এই সময় মুঘল দরবার নিজেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে দুর্বল ছিল। সম্রাটদের বাস্তব ক্ষমতা কমছিল, আর উজির, প্রাদেশিক সুবাদার এবং সামরিক অভিজাতদের শক্তি বাড়ছিল। দিল্লি কখনো আফগান চাপ, কখনো মারাঠা প্রভাব এবং কখনো বিভিন্ন দরবারি গোষ্ঠীর প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ছিল।
আহমদ শাহ আবদালির লক্ষ্যকে সরলভাবে ‘ভারত দখল’ বলা পুরোপুরি যথাযথ নয়। তিনি দিল্লিতে বসে সমগ্র ভারত সরাসরি শাসনের মতো স্থায়ী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেননি। তাঁর প্রধান আগ্রহ ছিল পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভারতীয় সম্পদ ও রাজস্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ। তবে বারবার সফল অভিযানের ফলে তিনি উত্তর ভারতের ক্ষমতার অন্যতম প্রধান নির্ধারকে পরিণত হন।
১৭৫৭ সালে তাঁর দিল্লি আক্রমণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দিল্লিতে প্রবেশ করেন এবং মুঘল দরবারের ওপর নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেন। মথুরা ও আশপাশের এলাকাতেও তাঁর বাহিনীর অভিযানে ভয়াবহ ধ্বংস ও হত্যাকাণ্ড ঘটে। পাঞ্জাবকে নিজের প্রভাবাধীন রেখে তিনি আফগানিস্তানে ফিরে যান।
কিন্তু আবদালির প্রস্থান উত্তর ভারতের সমস্যা সমাধান করেনি। বরং তাঁর অনুপস্থিতিতে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে মারাঠারা। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর কয়েক দশকের মধ্যে মারাঠা শক্তি দাক্ষিণাত্য থেকে মালওয়া, গুজরাট এবং উত্তর ভারতের দিকে বিস্তার লাভ করেছিল। পেশওয়া বাজিরাও প্রথমের যুগে এই সম্প্রসারণ শুরু হয় এবং তাঁর উত্তরসূরিদের সময় আরও গভীর হয়।
মারাঠারা তখন শুধু শিবাজীর পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের পাহাড়ি রাষ্ট্র নয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি তারা একটি বিশাল কনফেডারেট সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়, যার প্রভাব দিল্লি থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত বিস্তৃত হতে শুরু করে। সিন্ধিয়া, হোলকার, গায়কোয়াড় ও ভোঁসলে প্রভৃতি শক্তিশালী মারাঠা পরিবার বৃহত্তর পেশওয়া নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করছিল।
মুঘল দরবারও নিজের নিরাপত্তার জন্য কখনো মারাঠাদের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। ফলে একটি গভীর ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে—যে মারাঠাদের দমন করতে আওরঙ্গজেব জীবনের শেষ কয়েক দশক ব্যয় করেছিলেন, কয়েক দশক পর সেই মারাঠারাই দিল্লির মুঘল সম্রাটের রক্ষাকর্তা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রকে পরিণত হচ্ছিল।
১৭৫৮ সালে মারাঠা বাহিনী আরও সাহসী পদক্ষেপ নেয়। তারা পাঞ্জাবের দিকে অগ্রসর হয়ে লাহোর এবং আটকের দিক পর্যন্ত নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। আবদালির প্রতিনিধিদের সরিয়ে দিয়ে তারা কার্যত আফগান স্বার্থের কেন্দ্রে আঘাত হানে।
এটি আহমদ শাহের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। পাঞ্জাব শুধু মর্যাদার বিষয় নয়; আফগান সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা ও ভারতের দিকে প্রবেশের প্রধান পথও ছিল। ফলে তিনি আরেকটি বড় অভিযান প্রস্তুত করেন। ১৭৫৯ সালে তিনি আবার ভারতে প্রবেশ করেন, এবার লক্ষ্য ছিল উত্তর ভারতে মারাঠাদের অগ্রযাত্রা থামানো।
আবদালির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হন রোহিলা আফগান নেতা নাজিব-উদ-দৌলা। রোহিলারা উত্তর ভারতের রাজনৈতিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এবং মারাঠাদের সম্প্রসারণকে তারা নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছিল। পরে আওধের নবাব শুজা-উদ-দৌলাও আবদালির জোটে যুক্ত হন।
অন্যদিকে মারাঠাদের সামনে বড় সমস্যা ছিল উত্তর ভারতে নির্ভরযোগ্য স্থানীয় জোট গড়ে তোলা। জাট শাসক সুরজমল শক্তিশালী সহযোগী হতে পারতেন, কিন্তু মারাঠা নেতৃত্বের সঙ্গে কৌশল ও রাজনৈতিক মতভেদের কারণে সম্পর্ক ভেঙে যায়। রাজপুতরাও পূর্ণ শক্তিতে মারাঠাদের পাশে দাঁড়ায়নি।
এখানে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মারাঠারা সামরিকভাবে উত্তর ভারতে পৌঁছেছিল, কিন্তু সেই ভূখণ্ডে স্থায়ী রাজনৈতিক সহযোগিতা ও সরবরাহের নেটওয়ার্ক সমানভাবে শক্তিশালী করতে পারেনি।
মারাঠা অভিযানের প্রধান নেতৃত্বে ছিলেন পেশওয়া বালাজি বাজিরাওয়ের আত্মীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি সদাশিবরাও ভাউ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পেশওয়ার তরুণ পুত্র বিশ্বাসরাও। মারাঠা বাহিনী ছিল বিশাল এবং সঙ্গে ছিল কামান, পদাতিক, অশ্বারোহী ও বিপুলসংখ্যক অযোদ্ধা অনুসারী।
ভাউয়ের বাহিনীতে ইব্রাহিম খান গার্দির নেতৃত্বে ইউরোপীয় পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত পদাতিক ও কামানবাহিনী ছিল। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে মারাঠাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে ওঠে। ফলে এই যুদ্ধকে শুধু আফগান অশ্বারোহী বনাম ঐতিহ্যবাহী মারাঠা অশ্বারোহীর সংঘর্ষ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
তবে মারাঠা সেনাবাহিনীর আকারই তাদের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সঙ্গে ছিল রাজপরিবারের সদস্য, অভিজাত পরিবার, সেবক, বাজার এবং বিশাল রসদ কাফেলা। দ্রুতগতির ঐতিহ্যবাহী মারাঠা যুদ্ধকৌশলের তুলনায় এই বাহিনী অনেক ভারী ও ধীর হয়ে পড়েছিল।
আবদালি ঠিক এই দুর্বলতাকে কাজে লাগান। তিনি সঙ্গে সঙ্গে একটি সর্বাত্মক সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধের দিকে যাননি। বরং যোগাযোগপথ ও রসদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মারাঠাদের দুর্বল করার কৌশল গ্রহণ করেন।
১৭৬০ সালের শেষদিকে দুই পক্ষ পানিপথ অঞ্চলে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। মারাঠারা একটি শক্তিশালী শিবির তৈরি করে, কিন্তু উত্তর ও দক্ষিণের যোগাযোগ ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আবদালির বাহিনী তাদের খাদ্য ও রসদ সরবরাহের পথ কেটে দিতে সক্ষম হয়।
পানিপথে অবস্থান দীর্ঘ হতে থাকে। মারাঠা শিবিরে খাদ্যসংকট তীব্র হয়। ঘোড়ার জন্য পশুখাদ্য, সৈন্যদের শস্য এবং বিশাল অযোদ্ধা জনসংখ্যার জন্য খাদ্য জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। শীতের মধ্যে অনাহার, রোগ এবং ক্লান্তি সেনাদের শক্তি ক্ষয় করতে থাকে।
এই অবস্থা ভাউকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। অপেক্ষা করলে বাহিনী ক্ষুধায় ভেঙে পড়বে; যুদ্ধ করলে অন্তত সামরিকভাবে পথ খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। ফলে ১৭৬১ সালের জানুয়ারিতে মারাঠারা সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধের দিকে এগোয়।
১৪ জানুয়ারি ১৭৬১ ভোরে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে মারাঠা বাহিনী উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। ইব্রাহিম খান গার্দির প্রশিক্ষিত পদাতিক ও কামান রোহিলা এবং আফগান বাহিনীর কিছু অংশের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।
মারাঠা কেন্দ্রে সদাশিবরাও ভাউ এবং বিশ্বাসরাও অবস্থান করছিলেন। তাদের ভারী অশ্বারোহী ও অভিজাত বাহিনীও তীব্র আক্রমণ চালায়। প্রথম কয়েক ঘণ্টায় যুদ্ধের ফল মোটেও পূর্বনির্ধারিত ছিল না।
কিন্তু আবদালি তাঁর বাহিনীর একটি অংশ সংরক্ষিত রেখেছিলেন। তাঁর দ্রুত অশ্বারোহী এবং জাম্বুরাক বা উটের পিঠে বসানো হালকা কামান গতিশীলভাবে ব্যবহার করা হয়। যুদ্ধ দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে মারাঠাদের ক্লান্তি ও রসদসংকটের প্রভাব স্পষ্ট হতে থাকে।
এক পর্যায়ে বিশ্বাসরাও নিহত হন। তাঁর মৃত্যু মারাঠা কেন্দ্রের মনোবলে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সদাশিবরাও ভাউও এরপর প্রচণ্ড সংঘর্ষে নিহত হন বলে সাধারণভাবে গ্রহণ করা হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভেঙে পড়লে মারাঠা বাহিনীর সংগঠন দ্রুত দুর্বল হতে থাকে।
এই মুহূর্তে আবদালির সংরক্ষিত অশ্বারোহী বাহিনী চাপ বাড়ায়। মারাঠাদের পশ্চাদপসরণের পথও নিরাপদ ছিল না। দুপুরের পর যুদ্ধ একটি পূর্ণাঙ্গ মারাঠা বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে এবং পরবর্তী ধাওয়া ও হত্যাকাণ্ডে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যায়। মারাঠা বাহিনীর সঙ্গে থাকা বহু সাধারণ মানুষও বিপর্যয়ের শিকার হয়। তৃতীয় পানিপথ তাই অষ্টাদশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম রক্তক্ষয়ী সামরিক বিপর্যয় হিসেবে স্মরণীয়।
মারাঠাদের বহু গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি ও অভিজাত পরিবার এই যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুনেতে সংবাদ পৌঁছানোর পর রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত ছিল গভীর। প্রায় প্রতিটি প্রভাবশালী মারাঠা পরিবারের কেউ না কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত বা নিখোঁজ হয়েছিল—এমন ধারণা সমসাময়িক স্মৃতিতেও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা এড়ানো প্রয়োজন। পানিপথের পর মারাঠা শক্তি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়নি। তারা ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হলেও এক দশকের মধ্যে পুনর্গঠিত হতে শুরু করে। পেশওয়া মাধবরাও প্রথমের সময় মারাঠা শক্তি আবার উল্লেখযোগ্যভাবে পুনরুদ্ধার হয়।
১৭৭০-এর দশকে মারাঠারা আবার উত্তর ভারতের রাজনীতিতে প্রবল হয়ে ওঠে এবং দিল্লির ওপরও প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে। ফলে ১৭৬১ সালকে ‘মারাঠা সাম্রাজ্যের সমাপ্তি’ বলা সঠিক নয়। এটি ছিল একটি বিপর্যয়কর পরাজয়, যা তাদের উত্তর ভারতীয় সম্প্রসারণ সাময়িকভাবে থামিয়ে দেয়।
একইভাবে আবদালির বিজয় মানেই তিনি ভারত দখল করে নতুন আফগান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেননি। যুদ্ধের পর তিনি দিল্লিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসন গড়ে তোলার চেষ্টা করেননি। তিনি পাঞ্জাবের ওপর প্রভাব এবং উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করে আফগানিস্তানে ফিরে যান।
এখানেই যুদ্ধটির অন্যতম গভীর বৈপরীত্য। আবদালি যুদ্ধ জিতেছিলেন, কিন্তু দিল্লিতে স্থায়ী সাম্রাজ্য গড়েননি; মারাঠারা যুদ্ধ হেরেছিল, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে আবার শক্তিশালী হয়েছিল; আর মুঘল সম্রাট যুদ্ধের প্রধান পক্ষই ছিলেন না, যদিও যুদ্ধটি তাঁর সাম্রাজ্যের পুরোনো কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছিল।
মুঘল সম্রাট তখন কার্যত অন্যদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল প্রতীকী শাসকে পরিণত হয়েছেন। দিল্লির সিংহাসনের মর্যাদা এখনো ছিল, কিন্তু তার সামরিক শক্তি ছিল না। ফলে আফগান, মারাঠা, রোহিলা বা অন্য যে শক্তি দিল্লির ওপর প্রভাব বিস্তার করত, সে মুঘল সম্রাটকে বৈধতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে পারত।
তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ তাই মুঘল পতনের প্রকৃত রূপ স্পষ্ট করে। একসময় যে সাম্রাজ্য নিজেই পানিপথে যুদ্ধ করে ভারতের ক্ষমতা দখল করেছিল, এখন তার পুরোনো রাজধানী ও ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য অন্য দুই শক্তি একই পানিপথে যুদ্ধ করছে।
১৫২৬ সালে প্রথম পানিপথে বাবর ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। ১৫৫৬ সালে দ্বিতীয় পানিপথে আকবরের পক্ষের বাহিনী হেমুকে পরাজিত করে মুঘল শাসন রক্ষা করেছিল। আর ১৭৬১ সালের তৃতীয় পানিপথে মুঘল সাম্রাজ্য ছিল যুদ্ধের কেন্দ্রীয় বিজেতা বা পরাজিত কোনো পক্ষই নয়। এই পরিবর্তনই তিন পানিপথের মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক পার্থক্য।
যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল উত্তর ভারতে একটি নতুন ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হওয়া। মারাঠারা সাময়িকভাবে দুর্বল, আবদালি স্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছেন না, আর মুঘলদের সামরিক শক্তি নেই। এই পরিস্থিতিতে আওধ, রোহিলা, জাট, শিখ এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
পাঞ্জাবে বিশেষ করে শিখ শক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়। আবদালির একাধিক আক্রমণ পাঞ্জাবকে বিধ্বস্ত করলেও তাঁর প্রত্যাহারের পর শিখ মিসলগুলো ক্রমে নিজেদের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করে। পরবর্তী শতাব্দীতে এই ধারাই রণজিৎ সিংহের শিখ সাম্রাজ্যের দিকে এগোবে।
আরও দীর্ঘ পরিসরে দেখতে গেলে এই আঞ্চলিক বিভাজন ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্যও সুযোগ সৃষ্টি করে। পানিপথের মাত্র চার বছর আগে, ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে কোম্পানি বাংলার রাজনীতিতে বিশাল প্রভাব অর্জন করেছিল। ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধের পর তারা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্বের ওপর কার্যকর কর্তৃত্বের দিকে এগিয়ে যায়।
অর্থাৎ যখন আবদালি ও মারাঠারা উত্তর ভারতের রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য লড়ছে, একই সময়ে পূর্ব ভারতে একটি ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানি রাজস্বনির্ভর আঞ্চলিক রাষ্ট্রশক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। এটি অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমান্তরাল প্রক্রিয়াগুলোর একটি।
পানিপথের পর আবদালির নিজের সাম্রাজ্যও স্থায়ীভাবে ভারতকেন্দ্রিক হয়ে ওঠেনি। তিনি আরও কয়েকবার ভারতীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেন, কিন্তু তাঁর প্রধান রাষ্ট্র আফগানিস্তানেই ছিল। ১৭৭২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়, এবং পরবর্তী দুররানি শাসকেরা তাঁর মতো ভারতের ওপর একই মাত্রার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারেনি।
মারাঠারা পুনরায় শক্তিশালী হলেও তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ক্রমে একাধিক শক্তিশালী পরিবারের কনফেডারেশনে পরিণত হয়। পেশওয়ার কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের পাশাপাশি সিন্ধিয়া, হোলকার, ভোঁসলে ও গায়কোয়াড়দের নিজস্ব স্বার্থ বাড়তে থাকে। ফলে তাদের পুনরুত্থানও একক কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্য হিসেবে ছিল না।
তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে তাই কোনো এক ধর্মীয় দ্বন্দ্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঐতিহাসিকভাবে ভুল হবে। আবদালির পাশে রোহিলা আফগান ও আওধের মুসলিম নবাব ছিলেন ঠিকই, কিন্তু বিভিন্ন ভারতীয় মুসলিম গোষ্ঠী মারাঠাদের সঙ্গেও কাজ করেছিল। ইব্রাহিম খান গার্দির মতো মুসলিম সেনাপতি মারাঠা বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতা ছিলেন। এই যুদ্ধের মূল প্রশ্ন ছিল ক্ষমতা, ভূখণ্ড, রাজস্ব, জোট ও উত্তর ভারতের রাজনৈতিক আধিপত্য।
এটি একই সঙ্গে অতিবিস্তৃত সামরিক শক্তির সীমাও দেখায়। মারাঠারা দাক্ষিণাত্য থেকে এত দূরে বিশাল বাহিনী নিয়ে এসে উত্তর ভারতের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু স্থানীয় রসদ ও রাজনৈতিক সহযোগিতা যথেষ্ট নিশ্চিত করতে পারেনি। আবদালি সেই দুর্বলতাকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছিলেন।
তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের প্রকৃত তাৎপর্য তাই শুধু কে যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ী হয়েছিল সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখিয়েছিল যে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর ভারতীয় উপমহাদেশে আর কোনো একক শক্তি সহজে পুরোনো মুঘল আধিপত্যের জায়গা নিতে পারছে না।
আহমদ শাহ আবদালি ১৭৬১ সালে মারাঠাদের বিপর্যস্ত করেছিলেন, কিন্তু ভারত শাসনের নতুন স্থায়ী কাঠামো তৈরি করতে পারেননি। মারাঠারা পরাজিত হলেও আবার ফিরে আসে, আর মুঘল সম্রাট ক্রমেই অন্য শক্তির ছায়ায় পরিণত হন। এই অনির্ধারিত ফলই তৃতীয় পানিপথকে মুঘল-পরবর্তী ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পরিণত করে—একটি যুদ্ধ যা পুরোনো সাম্রাজ্যের পতনকে দৃশ্যমান করেছিল, কিন্তু তার জায়গায় কে নতুন সর্বভারতীয় শক্তি হবে সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারেনি।
ক্রুসেডের উত্তরাধিকার: ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, বাণিজ্য, রাজনীতি ও ধর্মীয় সম্পর্ক কীভাবে বদলে দিয়েছিল?
ক্রুসেডে মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের অভিজ্ঞতা: যুদ্ধ, হত্যাযজ্ঞ, সহাবস্থান ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা
মামলুকদের উত্থান ও একরের পতন ১২৯১: কীভাবে শেষ হলো পবিত্র ভূমিতে ক্রুসেডার শাসন?
অষ্টম ও নবম ক্রুসেড: তিউনিসিয়া থেকে পবিত্র ভূমি—শেষ বড় ক্রুসেডগুলোর ব্যর্থতার ইতিহাস
সপ্তম ক্রুসেড (১২৪৮–১২৫৪): ফ্রান্সের রাজা নবম লুইয়ের মিশর অভিযান ও বন্দিত্ব