বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থান: পলাশী ও বক্সারের যুদ্ধ কীভাবে মুঘল ক্ষমতার ভিত ধ্বংস করেছিল?

Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 27, 2026
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থান: পলাশী ও বক্সারের যুদ্ধ কীভাবে মুঘল ক্ষমতার ভিত ধ্বংস করেছিল?
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থান

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন এক পরিবর্তন ঘটেছিল, যার গভীরতা প্রথমে অনেকেই বুঝতে পারেননি। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভারতে এসেছিল, কিন্তু পলাশী ও বক্সারের যুদ্ধের পর সেটিই রাজস্ব আদায়কারী, সেনাবাহিনী পরিচালনাকারী এবং শেষ পর্যন্ত ভূখণ্ডশাসক শক্তিতে পরিণত হয়। এই পরিবর্তন শুধু বাংলার নবাবি শাসনের পতন ঘটায়নি; এটি মুঘল সম্রাটের অবশিষ্ট সার্বভৌম ক্ষমতাকেও কার্যত অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার পথ তৈরি করেছিল।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬০০ সালে ইংল্যান্ডে, মূল লক্ষ্য ছিল এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য। জাহাঙ্গীরের আমলে ইংরেজেরা সুরাটে বাণিজ্যিক অধিকার অর্জন করে, পরে মাদ্রাজ, বোম্বে এবং বাংলায় নিজেদের ঘাঁটি গড়ে তোলে। সপ্তদশ শতাব্দীতে তারা মূলত ভারতীয় শাসকদের অনুমতিনির্ভর বণিক ছিল। মুঘল সাম্রাজ্য তখন এত শক্তিশালী ছিল যে কোম্পানির রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সীমিত রাখতেই হতো।

বাংলায় ইংরেজদের আগ্রহের প্রধান কারণ ছিল এই অঞ্চলের অসাধারণ অর্থনৈতিক গুরুত্ব। মসলিন, তুলাবস্ত্র, রেশম, সল্টপিটার, চিনি ও অন্যান্য পণ্য ইউরোপীয় বাজারে বিপুল চাহিদাসম্পন্ন ছিল। হুগলি নদীর তীরে কোম্পানির বাণিজ্যকেন্দ্র ধীরে ধীরে কলকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুরকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

মুঘল সম্রাট ফাররুখসিয়ারের ১৭১৭ সালের ফরমান কোম্পানিকে বাংলায় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সুবিধা দেয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কোম্পানি এই সুবিধাকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। বিশেষ করে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অনুমতিপত্র বা দস্তক ব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে নবাবি সরকারের সঙ্গে সংঘাত বাড়ে।

বাংলা তখন আর দিল্লির প্রত্যক্ষ শাসনে ছিল না। মুর্শিদ কুলি খান, আলীবর্দী খান এবং তাঁদের উত্তরসূরিদের অধীনে বাংলা কার্যত স্বাধীন নবাবি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে তারা মুঘল সম্রাটের বৈধতা স্বীকার করত। এই দ্বৈত বাস্তবতা—প্রাদেশিক স্বাধীনতা কিন্তু মুঘল বৈধতার ধারাবাহিকতা—কোম্পানির উত্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করে।

১৭৫৬ সালে আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তাঁর নাতি সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হন। তিনি খুব দ্রুত বুঝতে পারেন যে ইংরেজ কোম্পানি শুধু বাণিজ্য করছে না; দুর্গ শক্তিশালী করছে, সৈন্য বাড়াচ্ছে এবং স্থানীয় রাজনীতিতেও হস্তক্ষেপ করছে। বিশেষ করে কলকাতায় কোম্পানির দুর্গসংস্কার তাঁর জন্য সরাসরি সার্বভৌমত্বের চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।

সিরাজ কলকাতার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ১৭৫৬ সালে ফোর্ট উইলিয়াম দখল করেন। ইংরেজেরা সাময়িকভাবে পালিয়ে যায়, কিন্তু মাদ্রাজ থেকে রবার্ট ক্লাইভ ও নৌবাহিনীর সহায়তা এসে পরিস্থিতি বদলে দেয়। ১৭৫৭ সালের শুরুতেই কোম্পানি কলকাতা পুনর্দখল করে।

এরপর সংঘর্ষ কেবল সামরিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কোম্পানি বাংলা দরবারের অসন্তুষ্ট অভিজাত, ব্যাংকার ও সেনাপতিদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ শুরু করে। মীর জাফর, জগৎশেঠ পরিবার, রায় দুর্লভ এবং অন্যান্য শক্তিশালী ব্যক্তির অসন্তোষ সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করে।

কোম্পানির জন্য এটি ছিল এক যুগান্তকারী কৌশল। শক্তিশালী বাংলা সেনাবাহিনীকে সরাসরি সম্পূর্ণ পরাজিত করার বদলে তারা নবাবের রাজনৈতিক কাঠামোকে ভিতর থেকে দুর্বল করে। মীর জাফরকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় যে সিরাজকে সরানো হলে তাঁকে নবাব বানানো হবে।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ এই ষড়যন্ত্রের ফল নির্ধারণ করে। সিরাজউদ্দৌলার বাহিনী সংখ্যায় কোম্পানির তুলনায় অনেক বড় ছিল, কিন্তু তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থাকে। মীর মদন ও মোহনলালের মতো কিছু কর্মকর্তা লড়াই চালালেও মীর জাফর ও তাঁর অনুসারীরা কার্যত অপেক্ষা করেন।

পলাশীর যুদ্ধ দীর্ঘ ও বৃহৎ সামরিক সংঘর্ষ ছিল না। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা এবং নেতৃত্বের ভাঙন এটিকে ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে পরিণত করে। সিরাজ পরাজিত হয়ে পালান, পরে বন্দি ও নিহত হন, এবং মীর জাফর বাংলার নবাব হন।

এখানেই কোম্পানির চরিত্র বদলাতে শুরু করে। তারা আর শুধু ব্যবসার সুবিধা চায় না; কে বাংলার নবাব হবে, সেটিও নির্ধারণ করতে শুরু করে। মীর জাফরকে ক্ষমতায় বসানোর বিনিময়ে কোম্পানি বিপুল অর্থ, জমি এবং বাণিজ্যিক সুবিধা পায়।

মুর্শিদাবাদের রাজকোষ থেকে কোম্পানি কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর হাতে বিপুল অর্থ চলে যায়। রবার্ট ক্লাইভসহ বহু কর্মকর্তা ব্যক্তিগত সম্পদও অর্জন করেন। বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রথমবার স্পষ্টভাবে এমন এক বিদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে প্রভাবিত হতে থাকে, যার নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল।

কিন্তু মীর জাফর দ্রুতই কোম্পানির ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক দাবির ভারে দুর্বল হয়ে পড়েন। কোম্পানি বুঝতে পারে যে তাঁকে সরিয়ে আরও অনুগত শাসক বসানো সম্ভব। ফলে ১৭৬০ সালে মীর কাসিমকে নবাব করা হয়।

মীর কাসিম প্রথমদিকে কোম্পানির সহযোগী হলেও দ্রুত বুঝতে পারেন যে প্রকৃত স্বাধীন শাসন চালাতে হলে কোম্পানির অর্থনৈতিক বিশেষাধিকার সীমিত করতে হবে। তিনি রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে স্থানান্তর করেন, সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করেন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের চেষ্টা করেন।

সবচেয়ে বড় বিরোধ সৃষ্টি হয় শুল্ক নিয়ে। কোম্পানির কর্মচারীরা দস্তক ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত ব্যক্তিগত বাণিজ্য করতেন, কিন্তু ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কর দিতে হতো। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়ছিলেন এবং নবাবের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।

মীর কাসিম এর মোকাবিলায় সব ব্যবসায়ীর ওপর অভ্যন্তরীণ শুল্কই তুলে দেন, যাতে কোম্পানি আর বিশেষ সুবিধা না পায়। অর্থনৈতিকভাবে এটি যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ হলেও কোম্পানির কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে সরাসরি আঘাত করে।

সংঘর্ষ দ্রুত যুদ্ধে পরিণত হয়। মীর কাসিম পরাজিত হয়ে আওধের নবাব শুজা-উদ-দৌলার কাছে আশ্রয় নেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয়। ফলে এবার কোম্পানির বিরুদ্ধে শুধু একটি প্রাদেশিক নবাব নয়, আওধের শক্তিশালী শাসক এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্যের সম্রাটও অবস্থান নেন।

এই জোটের সঙ্গে কোম্পানির নির্ণায়ক সংঘর্ষ ঘটে ১৭৬৪ সালের ২২ অক্টোবর বক্সারের যুদ্ধে। পলাশীর তুলনায় এটি ছিল অনেক বেশি প্রকৃত ও সংগঠিত সামরিক যুদ্ধ। কোম্পানির বাহিনী সংখ্যায় তুলনামূলক ছোট হলেও প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা, পদাতিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং কেন্দ্রীয় কমান্ডের দিক থেকে কার্যকর ছিল।

অন্যদিকে মীর কাসিম, শুজা-উদ-দৌলা ও শাহ আলমের সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে একই মাত্রার সমন্বিত নেতৃত্ব ছিল না। বক্সারের বিজয় কোম্পানিকে এমন সামরিক বৈধতা দেয়, যা পলাশীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রনির্ভর বিজয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

পলাশী কোম্পানিকে বাংলার দরবার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দিয়েছিল; বক্সার প্রমাণ করল তারা উত্তর ভারতের প্রধান দেশীয় শক্তির সম্মিলিত বাহিনীকেও যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত করতে পারে। এই পার্থক্যই বক্সারকে মুঘল পতনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে।

যুদ্ধের পর শাহ আলম দ্বিতীয় কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হন। আওধের নবাবও পরাজিত অবস্থায় আলোচনায় আসেন। এর ফল হয় ১৭৬৫ সালের আল্লাহাবাদ চুক্তি

এই চুক্তির সবচেয়ে যুগান্তকারী অংশ ছিল মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে কোম্পানির বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ। দেওয়ানি অর্থ মূলত রাজস্ব সংগ্রহ এবং দেওয়ানি প্রশাসনের অধিকার। অর্থাৎ যে কোম্পানি কয়েক দশক আগে বাংলায় কাপড় কিনতে এসেছিল, এখন সেই কোম্পানিই বাংলার কৃষকদের কাছ থেকে ভূমি রাজস্ব সংগ্রহের বৈধ অধিকার অর্জন করে।

এখানে মুঘল ক্ষমতার পতনের গভীরতা স্পষ্ট। সম্রাট এখন নিজেই তাঁর সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ধনী প্রদেশের রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার একটি বিদেশি কোম্পানিকে প্রদান করছেন। বিনিময়ে তাঁকে নির্দিষ্ট বার্ষিক অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়।

শাহ আলমের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সম্ভবত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ছিল। তাঁর নিজের কাছে বাংলায় সেনাবাহিনী পাঠিয়ে রাজস্ব আদায় করার বাস্তব ক্ষমতা ছিল না। কোম্পানি অন্তত তাঁর নামে দেওয়ানি গ্রহণ করছে এবং তাঁকে আনুষ্ঠানিক সার্বভৌম হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।

কিন্তু বাস্তবে নাম মুঘলের, অর্থ ও শক্তি কোম্পানির—এই নতুন ব্যবস্থা জন্ম নেয়। মুঘল সার্বভৌমত্ব ক্রমশ কাগজের বৈধতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

দেওয়ানি পাওয়ার পর কোম্পানি বাংলার অর্থনৈতিক সম্পদকে নিজস্ব সামরিক সম্প্রসারণের ভিত্তিতে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। আগে ভারত থেকে পণ্য কিনতে ইংল্যান্ড থেকে রৌপ্য আনতে হতো। এখন ভারতীয় কৃষকের কাছ থেকে সংগৃহীত রাজস্ব দিয়েই ভারতীয় পণ্য কেনা এবং কোম্পানির সেনাবাহিনী চালানো সম্ভব হয়ে ওঠে।

এটি ছিল কোম্পানির সাম্রাজ্য গঠনের অর্থনৈতিক বিপ্লব। বাংলা শুধু তাদের দখলকৃত অঞ্চল নয়; এটি হয়ে ওঠে ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযানের অর্থায়নের প্রধান উৎস। দক্ষিণ ও উত্তর ভারতে পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে বাংলার রাজস্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কোম্পানি প্রথমদিকে দেওয়ানি নিলেও সরাসরি পুরো প্রশাসন নিজের হাতে নেওয়ার বদলে তথাকথিত দ্বৈত শাসনব্যবস্থা চালু করে। রাজস্ব কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা ও কিছু প্রশাসনিক কাজ নবাবি কাঠামোর নামে চলতে থাকে। এতে কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের মধ্যে বিপজ্জনক বিভাজন সৃষ্টি হয়।

নবাবের হাতে দায়িত্ব ছিল, কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না; কোম্পানির হাতে অর্থ ছিল, কিন্তু জনগণের কল্যাণের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা সীমিত ছিল। এই ব্যবস্থা প্রশাসনিক দুর্নীতি ও শোষণকে বাড়ায়।

১৭৭০ সালের ভয়াবহ বাংলার দুর্ভিক্ষের কারণ বহুমাত্রিক—প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলের সমস্যা, বাজার এবং রাজস্বনীতি সবই ভূমিকা রেখেছিল। তবে কোম্পানির রাজস্ব সংগ্রহের কঠোরতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করেছিল বলে ব্যাপকভাবে বিবেচিত হয়। বাংলার বিপুল সম্পদ এখন আর শুধু স্থানীয় রাজদরবার বা মুঘল প্রশাসনের মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছিল না; এর একটি বড় অংশ কোম্পানির সামরিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় চলে যাচ্ছিল।

পলাশী ও বক্সারের আরেকটি বড় প্রভাব ছিল ভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। আগে কোনো প্রাদেশিক শাসক মুঘল সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন হতে পারতেন, কিন্তু তাঁর শাসনের ধরন মূলত ভারতীয় সাম্রাজ্যিক ব্যবস্থার মধ্যেই থাকত। কোম্পানি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির শক্তি—একটি শেয়ারহোল্ডারনির্ভর বাণিজ্যিক কর্পোরেশন, যার নিজস্ব সেনাবাহিনী, কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল।

তারা মুঘল প্রশাসনের বিদ্যমান কাঠামো ধ্বংস করে সঙ্গে সঙ্গে নতুন রাষ্ট্র বানায়নি। বরং সেই কাঠামোর ভেতরেই প্রবেশ করে দেওয়ান, নবাব, জমিদার এবং সম্রাটের বৈধতা ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষমতা বাড়ায়।

এই কারণে কোম্পানির উত্থান ছিল ধীরে ধীরে বাণিজ্য থেকে রাজনীতিতে এবং রাজনীতি থেকে সার্বভৌম ক্ষমতায় রূপান্তর। ১৭৫৭ সালে তারা নবাব বানাতে পারে; ১৭৬৪ সালে সম্রাটের বাহিনীকে পরাজিত করতে পারে; ১৭৬৫ সালে সম্রাটের কাছ থেকেই রাজস্ব আদায়ের অধিকার গ্রহণ করে।

মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষে এই পরিবর্তন ছিল ধ্বংসাত্মক। বাংলা ছিল সাম্রাজ্যের দীর্ঘদিনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল ও সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর একটি। কেন্দ্র ইতোমধ্যেই বাংলার ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, কিন্তু অন্তত নবাবি শাসন মুঘল রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ ছিল। দেওয়ানি কোম্পানির হাতে যাওয়ার ফলে বাংলার সম্পদের সঙ্গে মুঘল সম্রাটের বাস্তব সম্পর্কও প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এ সময় মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয়ের অবস্থান ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তিনি নিজের রাজধানী দিল্লি পর্যন্ত সব সময় স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। কখনো মারাঠা, কখনো অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির ওপর তাঁকে নির্ভর করতে হয়েছে। কোম্পানি তাঁকে অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁর সাম্রাজ্যিক মর্যাদাকে নিজেদের বৈধতার উৎস হিসেবে ব্যবহার করে।

এই পরিস্থিতির গভীর বৈপরীত্য হলো—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সম্রাটকে সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত করেনি; বরং তাঁর নাম ব্যবহার করেই নিজের ক্ষমতাকে বৈধ করেছে। কারণ মুঘল নাম তখনো রাজনৈতিক মর্যাদা বহন করত।

পলাশীর যুদ্ধকে তাই একা ব্রিটিশ ভারতের জন্মমুহূর্ত বলা কিছুটা সরলীকরণ। পলাশী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেখানে কোম্পানির সাফল্য মূলত বাংলা দরবারের রাজনৈতিক বিভাজনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বক্সার এবং ১৭৬৫ সালের দেওয়ানি সেই বিজয়কে স্থায়ী রাষ্ট্রশক্তিতে রূপ দেয়।

পলাশী ছাড়া কোম্পানি বাংলার দরবারে প্রাধান্য পেত না; বক্সার ছাড়া তারা এত দ্রুত মুঘল সম্রাট ও আওধের মতো বৃহৎ শক্তির ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারত না; আর দেওয়ানি ছাড়া তাদের হাতে ভবিষ্যৎ সামরিক সাম্রাজ্য গড়ার জন্য বাংলার রাজস্ব আসত না।

এ কারণেই পলাশী, বক্সার ও দেওয়ানি—এই তিনটি ঘটনাকে একই ধারাবাহিকতার মধ্যে দেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি রাজনৈতিক দরজা খুলেছে, দ্বিতীয়টি সামরিক ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে এবং তৃতীয়টি অর্থনৈতিক ভিত্তি দিয়েছে।

এই পরিবর্তনের প্রভাব ভারতীয় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ওপরও পড়ে। এখন যেকোনো নবাব বা রাজা বুঝতে পারছিলেন যে কোম্পানিকে শুধু বিদেশি বণিক হিসেবে দেখা বিপজ্জনক। তাদের সৈন্য নিয়মিত বেতন পায়, ইউরোপীয় পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত এবং ভারতীয় সিপাহিদের বড় বাহিনী পরিচালনা করতে সক্ষম।

কোম্পানির একটি মৌলিক সুবিধা ছিল ভারতীয় রাজস্ব দিয়ে ভারতীয় সৈন্য নিয়োগ করে ভারতীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। এর ফলে ইংল্যান্ড থেকে প্রতিটি যুদ্ধের পূর্ণ ব্যয় বহন করার দরকার পড়ত না। বাংলা তাদের হাতে আসার পর এই ব্যবস্থার ব্যাপ্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।

অন্যদিকে মুঘল সাম্রাজ্য রাজনৈতিকভাবে ভেঙে যাওয়ায় কোম্পানি একসঙ্গে পুরো ভারতকে মোকাবিলা করেনি। তারা পৃথক পৃথক শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ বা জোট করেছে—কখনো বাংলার নবাব, কখনো মাইসোর, কখনো মারাঠা, কখনো আওধ। মুঘল কেন্দ্রীয় শাসনের পতন কোম্পানিকে ভারতীয় শক্তিগুলোকে আলাদাভাবে মোকাবিলা করার সুযোগ দেয়।

তবে ১৭৬৫ সালেই ব্রিটিশরা সমগ্র ভারত দখল করে ফেলেছিল—এমন ধারণা ভুল। তখনও মারাঠা, মাইসোর, হায়দরাবাদ, শিখ এবং অন্যান্য শক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কোম্পানিকে পরবর্তী প্রায় এক শতাব্দী ধরে ধারাবাহিক যুদ্ধ, কূটনীতি ও দখলের মাধ্যমে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে হয়েছে।

কিন্তু বাংলার দেওয়ানি সেই ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের আর্থিক ইঞ্জিন তৈরি করেছিল। এই কারণে ১৭৬৫ সাল মুঘল-পরবর্তী ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

মুঘল সম্রাটের জন্য ঘটনাটি আরও প্রতীকীভাবে অপমানজনক। আওরঙ্গজেবের সময় বাংলা থেকে সংগৃহীত বিপুল রাজস্ব মুঘল সেনাবাহিনী ও রাজদরবারে প্রবাহিত হতো। এক শতাব্দীরও কম সময় পরে একই অঞ্চলের রাজস্ব একটি ইংরেজ বাণিজ্যিক কোম্পানির হাতে, আর মুঘল সম্রাট সেই ব্যবস্থার বিনিময়ে ভাতা গ্রহণ করছেন।

এটি ছিল সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত স্থানান্তর। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে মুঘল সাম্রাজ্য শেষ হয়নি; বরং তার আর্থিক শিরা-উপশিরা একে একে অন্য শক্তির হাতে চলে গেছে।

পলাশী মুঘল রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি প্রাদেশিক স্তম্ভ ভেঙেছিল, বক্সার মুঘল সম্রাটের সামরিক অক্ষমতাকে প্রকাশ করেছিল, আর দেওয়ানি বাংলার অর্থনৈতিক শক্তিকে কোম্পানির হাতে তুলে দিয়েছিল। এই তিন ঘটনার পর দিল্লির সম্রাটের নাম বেঁচে থাকলেও বাস্তব ক্ষমতার একটি নতুন কেন্দ্র তৈরি হয়ে গেছে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থানের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক এখানেই—যারা একসময় মুঘল সম্রাটের ফরমান নিয়ে ভারতে ব্যবসা করার অনুমতি চাইত, মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে তারাই সেই সম্রাটকে পরাজিত করে তাঁর কাছ থেকে সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ধনী অঞ্চলের রাজস্ব সংগ্রহের অধিকার আদায় করেছিল। পলাশী ও বক্সারের মধ্য দিয়েই তাই মুঘল পতনের রাজনৈতিক শূন্যতা প্রথমবার এমন এক বিদেশি কর্পোরেট শক্তির হাতে রূপ নিতে শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহৎ অংশে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে।

 

You may also like