নন্দ রাজবংশ: বিপুল সম্পদ ও সামরিক শক্তি সত্ত্বেও পতন……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

নন্দ রাজবংশ: বিপুল সম্পদ ও সামরিক শক্তি সত্ত্বেও পতন কেন হয়েছিল?

সিরিজ: রাজবংশের উত্থান-পতন: ক্ষমতা, গৌরব ও পতনের ইতিহাস

নন্দ রাজবংশ: বিপুল সম্পদ ও সামরিক শক্তি সত্ত্বেও পতন কেন হয়েছিল?
মগধের বিপুল শক্তি থেকে মৌর্য উত্থান—নন্দ রাজবংশের পতনের ইতিহাস।

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মগধের নন্দ রাজবংশের হাতে ছিল বিস্তৃত ভূখণ্ড, সমৃদ্ধ কৃষি অঞ্চল, বিপুল কোষাগার এবং বৃহৎ সেনাবাহিনী। উত্তর-পশ্চিম ভারত পর্যন্ত পৌঁছানো গ্রিকদের বিবরণেও গঙ্গার পূর্বাঞ্চলের এক শক্তিশালী রাজ্যের সামরিক সামর্থ্যের কথা উঠে আসে। অথচ এই রাজবংশকে উৎখাত করে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও নন্দরা কেন নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি? উত্তরটি শুধু ধননন্দের অহংকার কিংবা চাণক্যের প্রতিশোধের গল্পে নেই; রয়েছে রাজনৈতিক সমর্থন, শাসনব্যবস্থা ও পরিবর্তিত আঞ্চলিক পরিস্থিতির মধ্যে।

নন্দদের ইতিহাস পুনর্গঠনের প্রথম সমস্যা হলো তথ্যের সীমাবদ্ধতা। তাঁদের নিজস্ব সমসাময়িক রাজকীয় নথি খুব কম পাওয়া যায়। প্রধান বিবরণ এসেছে পুরাণ, বৌদ্ধ ও জৈন ঐতিহ্য, গ্রিক-রোমান রচনা এবং পরবর্তী সাহিত্য থেকে। এসব উৎসের রচনাকাল, উদ্দেশ্য ও বক্তব্য এক নয়। কোথাও নন্দদের শক্তিশালী বিজেতা, কোথাও অযোগ্য ও লোভী শাসক হিসেবে দেখানো হয়েছে। পরাজিত রাজবংশ সম্পর্কে বিজয়ী বা পরবর্তী ঐতিহ্যের অভিযোগকে সরাসরি নিরপেক্ষ ইতিহাস ধরে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে পতনের বিস্তারিত ঘটনাক্রমে নিশ্চিত তথ্য ও কিংবদন্তি আলাদা করা জরুরি।

নন্দদের উত্থান সাধারণভাবে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে স্থাপন করা হয়, যদিও শাসনের সূচনা ও স্থায়িত্ব নিয়ে মতভেদ রয়েছে। পুরাণীয় ঐতিহ্যে মহাপদ্মনন্দকে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি শিশুনাগ রাজবংশের পর মগধের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তাঁর সামাজিক উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা আছে; কিছু উৎস তাঁকে প্রচলিত ক্ষত্রিয় রাজপরিবারের বাইরের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু এসব পরিচয়ের বিবরণ নিশ্চিত নয়। এগুলো আংশিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বংশমর্যাদার বাইরে থেকে ক্ষমতায় আসা এক পরিবারের বিরুদ্ধে অভিজাত মনোভাবও প্রতিফলিত করতে পারে।

মহাপদ্মনন্দকে পুরাণে বিভিন্ন ক্ষত্রিয় রাজশক্তির বিনাশকারী বলা হয়েছে। এর মধ্যে মগধের সম্প্রসারণ ও পুরোনো আঞ্চলিক রাজবংশগুলোর পরাজয়ের স্মৃতি থাকতে পারে। তবে তাঁর অধীন সাম্রাজ্যের সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ কঠিন। নন্দ শক্তির ভিত্তি ছিল গঙ্গার উর্বর সমভূমি এবং পূর্ববর্তী মগধ শাসকদের গড়ে তোলা রাজনৈতিক সুবিধা। নদীপথে যোগাযোগ, কৃষিজ উদ্বৃত্ত ও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের ওপর কর্তৃত্ব বৃহৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় সাহায্য করত। নন্দরা মগধের শক্তি সৃষ্টি করেননি একেবারে শূন্য থেকে; তাঁরা আগের সম্প্রসারণকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে গিয়েছিলেন।

রাজবংশে কতজন শাসক ছিলেন, সে বিষয়েও মতভেদ আছে। কিছু ঐতিহ্যে নয়জন নন্দের উল্লেখ পাওয়া যায়; তাঁদের পারিবারিক সম্পর্কের বর্ণনাও একরকম নয়। শেষ রাজাকে প্রচলিতভাবে ধননন্দ বলা হয়। গ্রিক বিবরণে উল্লিখিত গঙ্গার অঞ্চলের শাসকের সঙ্গে তাঁকে প্রায়ই যুক্ত করা হয়, কিন্তু নাম ও পরিচয়ের এই সমীকরণ পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তাই মহাপদ্মনন্দ থেকে ধননন্দ পর্যন্ত একটি নিখুঁত, অবিচ্ছিন্ন জীবনীমূলক তালিকা তৈরি করা সম্ভব নয়। রাজবংশের সামগ্রিক শক্তি সম্পর্কে ধারণা তুলনামূলক স্পষ্ট হলেও পৃথক শাসকের কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট।

নন্দদের কোষাগার নিয়ে পরবর্তী সাহিত্যে অতিরঞ্জিত সংখ্যার উল্লেখ রয়েছে। এসব সংখ্যা আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করা যায় না, তবে বিপুল সম্পদের খ্যাতি বিভিন্ন ঐতিহ্যে উপস্থিত। বৃহৎ কৃষিভিত্তিক রাজ্যে কর, পণ্য, বাণিজ্য এবং অন্যান্য রাজস্বের মাধ্যমে সম্পদ সংগৃহীত হতো। সেই সম্পদ সৈন্য, কর্মকর্তা ও রাজদরবারের ব্যয় বহন করত। নন্দ যুগের প্রশাসনিক কাঠামোর সম্পূর্ণ বিবরণ অবশ্য জানা নেই। পরবর্তী মৌর্য ব্যবস্থার সব বৈশিষ্ট্য নন্দদের ওপর বসিয়ে দেওয়াও ভুল। তাঁদের অর্থনৈতিক শক্তি স্বীকার করেও তার সুনির্দিষ্ট পরিচালনাপদ্ধতি নিয়ে সতর্ক থাকতে হয়।

গ্রিক-রোমান লেখকদের সংরক্ষিত বিবরণে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের কয়েক লাখ পদাতিক, বহু অশ্বারোহী, রথ এবং হাজার হাজার যুদ্ধহস্তীর কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন লেখকের সংখ্যা ভিন্ন, আর এগুলো সরাসরি গণনা করা সামরিক তালিকা নয়। তবু বিবরণগুলো নন্দ শক্তির ভয়াবহ খ্যাতি নির্দেশ করে। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ সালে আলেকজান্ডারের সৈন্যরা বিপাশা নদীর কাছে আরও পূর্বে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের ক্লান্তি, দীর্ঘ অভিযান ও বর্ষার দুর্ভোগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ কারণ; সামনে আরও শক্তিশালী বাহিনীর খবরও উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। আলেকজান্ডার নন্দদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করেননি।

বিশাল সেনাবাহিনী থাকলেও তাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা আলাদা বিষয়। বেতন, খাদ্য, পশুখাদ্য, অস্ত্র ও পরিবহনের নিয়মিত ব্যবস্থা ছাড়া সংখ্যার সুবিধা কমে যায়। বিস্তৃত ভূখণ্ডে বাহিনী ছড়িয়ে থাকলে এক স্থানে দ্রুত শক্তি কেন্দ্রীভূত করাও কঠিন হতে পারে। নন্দ পতনে ঠিক কোন সামরিক দুর্বলতা সিদ্ধান্তমূলক ছিল, তা জানা যায় না। কিন্তু রাজ্যের ঘোষিত সামর্থ্যকে যুদ্ধক্ষেত্রে অব্যর্থ সাফল্যের নিশ্চয়তা ভাবা যায় না। রাজধানীর শাসককে রক্ষা করতে সেনাপতি, কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক শক্তির আনুগত্যও প্রয়োজন।

পরবর্তী বর্ণনায় শেষ নন্দ শাসকের করলোভ ও অজনপ্রিয়তার কথা বারবার এসেছে। অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সাধারণ মানুষ ও সম্পদশালী গোষ্ঠীর অসন্তোষ বাড়াতে পারে। পুরোনো রাজপরিবারগুলোকে দমন করাও সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ তৈরি করেছিল। তবে নন্দদের বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় গণবিদ্রোহ হয়েছিল—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। অজনপ্রিয়তার অভিযোগ পতনের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, সম্পূর্ণ প্রমাণিত কারণ নয়। নতুন শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য পুরোনো রাজাকে লোভী, নিচু বংশজাত বা নৈতিকভাবে অযোগ্য দেখানোর প্রবণতাও বিবেচনায় রাখতে হয়।

চন্দ্রগুপ্তের উত্থান ঘটে এমন সময়ে, যখন উত্তর-পশ্চিম ভারত আলেকজান্ডারের অভিযান ও তার পরবর্তী ক্ষমতার পরিবর্তনে অস্থির ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালে আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তাঁর অধীন অঞ্চলগুলোতে নতুন সংঘর্ষ শুরু হয়। এই পরিবেশ চন্দ্রগুপ্তের মতো নেতার জন্য সৈন্য ও রাজনৈতিক সমর্থন সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করে থাকতে পারে। তবে তিনি প্রথমে কোথায় শক্তি গড়েছিলেন এবং কীভাবে মগধের দিকে এগিয়েছিলেন, তার নির্ভরযোগ্য ধারাবাহিক বিবরণ নেই। প্রচলিতভাবে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩২২–৩২১ সালের দিকে নন্দ শাসনের অবসান ও মৌর্য শাসনের সূচনা ধরা হয়।

চাণক্য বা কৌটিল্যের ভূমিকা এই কাহিনির সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ। পরবর্তী ঐতিহ্যে নন্দদরবারে অপমানিত হওয়া, প্রতিশোধের শপথ, গুপ্তচর ব্যবহার এবং চন্দ্রগুপ্তকে প্রশিক্ষণের গল্প রয়েছে। এগুলো রাজনৈতিক স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু সব ঘটনাকে প্রত্যক্ষ ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। মুদ্রারাক্ষস নাটকে মন্ত্রী রাক্ষসকে ঘিরে কূটনীতির যে চিত্র আছে, সেটিও বহু পরে রচিত সাহিত্য। একইভাবে অর্থশাস্ত্রকে নন্দবিরোধী অভিযানের সরাসরি দিনলিপি ভাবা ভুল। গ্রন্থটির বর্তমান রূপের গঠন ও রচনাকাল নিয়ে গবেষণাগত বিতর্ক রয়েছে।

নন্দদের পতনের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা তাই একাধিক বিষয়ের সমন্বয়: শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর সংগঠন, সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, অভিজাত সহযোগিতার পরিবর্তন এবং কার্যকর নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। চন্দ্রগুপ্তের সাফল্য দেখায়, রাজকোষের সম্পদকে রাজনৈতিক আনুগত্যে রূপান্তর করতে না পারলে সামরিক শক্তিও রাজবংশকে বাঁচাতে পারে না। নন্দদের রাষ্ট্র পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি; মগধ, পাটলিপুত্র ও সংগৃহীত সম্পদ নতুন মৌর্য শক্তির ভিত্তি হয়ে ওঠে। সিংহাসন হারিয়েছিল নন্দ পরিবার, কিন্তু তাদের গড়ে তোলা শক্তির একটি বড় অংশ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল বিজয়ী সাম্রাজ্য।


আপনার পছন্দ হতে পারে