মৌর্য রাজবংশ: চন্দ্রগুপ্ত থেকে অশোকের সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন
সিরিজ: রাজবংশের উত্থান-পতন: ক্ষমতা, গৌরব ও পতনের ইতিহাস
চন্দ্রগুপ্তের বিজয় থেকে অশোকের ধম্ম—মৌর্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস।
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের শেষভাগে গঙ্গার সমভূমি থেকে এমন একটি রাজশক্তির উত্থান ঘটে, যা ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে একই সাম্রাজ্যিক কর্তৃত্বের অধীনে আনে। প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নন্দদের উৎখাত করে ক্ষমতা গ্রহণ করেন; তাঁর পৌত্র অশোক যুদ্ধজয়ের পাশাপাশি নৈতিক শাসনের ঘোষণা দিয়ে ইতিহাসে স্বতন্ত্র স্থান পান। কিন্তু অশোকের মৃত্যুর প্রায় অর্ধশতাব্দীর মধ্যেই রাজবংশটির অবসান ঘটে। মৌর্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস সামরিক বিজয়, প্রশাসনিক সংহতি এবং রাজশক্তির সীমাবদ্ধতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি উপমহাদেশের প্রথম বৃহৎ সাম্রাজ্য হলেও সমগ্র বর্তমান ভারতবর্ষ তার অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
চন্দ্রগুপ্তের উত্থানের সময় মগধে নন্দ শাসন চলছিল। তাদের শক্তির ভিত্তি ছিল গঙ্গার উর্বর কৃষিভূমি, পাটলিপুত্রের অবস্থান এবং বিপুল সম্পদ। অন্যদিকে আলেকজান্ডারের অভিযানের পর উত্তর-পশ্চিমে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায়। এই পরিস্থিতির মধ্যে চন্দ্রগুপ্ত আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩২২–৩২১ সালে নন্দ শাসনের অবসান ঘটান। তবে অভিযানটির নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত বিবরণ নেই। চাণক্যের সহযোগিতা সম্পর্কে পরবর্তী বৌদ্ধ, জৈন ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও অপমান, প্রতিশোধ ও গুপ্তকৌশলের সব গল্পকে নিশ্চিত সমসাময়িক ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
মৌর্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর চন্দ্রগুপ্ত উত্তর-পশ্চিমে কর্তৃত্ব বিস্তার করেন। আলেকজান্ডারের উত্তরসূরি সেলিউকাস প্রথম নিকাতরের সঙ্গে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০৫–৩০৩ সালে সংঘর্ষের পর একটি সমঝোতা হয়। এর ফলে চন্দ্রগুপ্ত উত্তর-পশ্চিমের গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড পান এবং সেলিউকাস পাঁচশ যুদ্ধহস্তী লাভ করেন বলে গ্রিক ঐতিহ্যে উল্লেখ আছে। বৈবাহিক সম্পর্কসংক্রান্ত চুক্তির কথাও পাওয়া যায়, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট রাজকন্যার সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের বিয়ের জনপ্রিয় কাহিনি নিশ্চিত নয়। এই সমঝোতা মৌর্যদের সামরিক সাফল্যকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয় এবং পশ্চিম সীমান্তে স্থিতি আনতে সাহায্য করে।
সেলিউকাসের দূত মেগাস্থিনিস চন্দ্রগুপ্তের দরবারে এসেছিলেন। তাঁর মূল রচনা হারিয়ে গেলেও পরবর্তী গ্রিক-রোমান লেখকেরা অংশবিশেষ সংরক্ষণ করেছেন। পাটলিপুত্র, রাজদরবার ও সমাজ সম্পর্কে এই বিবরণ মূল্যবান, তবে তার সব তথ্য নির্ভুল নয়। একই সতর্কতা প্রয়োজন অর্থশাস্ত্র ব্যবহারে। গ্রন্থটি কৌটিল্যের নামে পরিচিত হলেও এর সংকলন ও বর্তমান রূপের সময়কাল নিয়ে বিতর্ক আছে। তাই সেখানে বর্ণিত প্রতিটি দপ্তর, গুপ্তচরব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক বিধানকে সরাসরি চন্দ্রগুপ্তের প্রশাসনের হুবহু বিবরণ বলা যায় না।
বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনায় মৌর্যদের প্রধান সুবিধা ছিল মগধের সম্পদ ও নদীপথের যোগাযোগ। কৃষিজ রাজস্ব, বাণিজ্য এবং বিভিন্ন ধরনের উৎপাদন রাজকীয় শক্তিকে সহায়তা করত। প্রাদেশিক কেন্দ্রগুলোতে রাজপরিবারের সদস্য বা গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করতেন; তক্ষশিলা ও উজ্জয়িনী উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র ছিল। তবে সর্বত্র একই মাত্রায় সরাসরি প্রশাসন কার্যকর ছিল—এমন ধারণা অতিসরল। কেন্দ্রের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের সম্পর্ক ভূগোল, স্থানীয় শক্তি ও যোগাযোগের সুবিধা অনুযায়ী বদলাত। রাজধানীর নির্দেশ পৌঁছানো এবং বাস্তবে তা কার্যকর করা ছিল পৃথক চ্যালেঞ্জ।
চন্দ্রগুপ্তের পর বিন্দুসার আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৯৭ সালে সিংহাসনে বসেন। তাঁর শাসন সম্পর্কে তথ্য তুলনামূলক কম। সাধারণভাবে মনে করা হয়, তিনি সাম্রাজ্য ধরে রাখেন এবং দাক্ষিণাত্যে মৌর্য প্রভাব সুসংহত করেন; তবে কোন অঞ্চল ঠিক তাঁর সময়ে জয় করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। ভূমধ্যসাগরীয় হেলেনীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগও চলতে থাকে। চন্দ্রগুপ্তের শেষজীবনে জৈনধর্ম গ্রহণ ও শ্রবণবেলগোলায় যাওয়ার কাহিনি জৈন ঐতিহ্যে সংরক্ষিত, কিন্তু এর বিবরণ অনেক পরবর্তী। রাজবংশের ইতিহাসে এই ঐতিহ্যের গুরুত্ব থাকলেও প্রমাণের সীমা মনে রাখা দরকার।
বিন্দুসারের পর অশোক আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮ সালে অভিষিক্ত হন। তাঁর সিংহাসনলাভ ঘিরে ভ্রাতৃহত্যা ও নিষ্ঠুরতার বহু কাহিনি আছে, কিন্তু সেগুলোর সব বিবরণ নিশ্চিত নয়। অশোকের ইতিহাসের বিশেষ সুবিধা হলো তাঁর নিজের শিলালিপি। এগুলো সমসাময়িক রাজকীয় বক্তব্য, যদিও সেগুলোও শাসকের নির্বাচিত আত্মপ্রতিনিধিত্ব। তাঁর অভিষেকের অষ্টম বছরে, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৬১ সালে, কলিঙ্গ জয় করা হয়। পূর্ব উপকূলের এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ সাম্রাজ্যের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ত্রয়োদশ প্রধান শিলালিপিতে অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরেন। সেখানে দেড় লাখ মানুষকে স্থানান্তর, এক লাখ মানুষকে হত্যা এবং আরও বহু মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। সংখ্যাগুলো রাজকীয় বিবরণের অংশ, কিন্তু যুদ্ধজনিত বিপর্যয়ের স্বীকৃতিটি অসাধারণ। তিনি শুধু যোদ্ধাদের ক্ষয়ক্ষতি নয়, পরিবার, ব্রাহ্মণ, শ্রমণ ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ নিয়েও অনুশোচনা প্রকাশ করেন। এই ঘোষণায় বিজয়ী সম্রাট নিজের বিজয়ের মানবিক মূল্যকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক আলোচনায় এনেছিলেন। তবে কলিঙ্গ জয়ের পর তাঁর বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের সম্পূর্ণ ঘটনাক্রমকে একটি মুহূর্তে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়।
অশোকের ধম্ম ছিল নৈতিক আচরণ ও সামাজিক সহাবস্থানের রাজকীয় কর্মসূচি। এতে পিতামাতার প্রতি শ্রদ্ধা, কর্মচারী ও দাসভৃত্যদের সঙ্গে সদাচরণ, প্রাণহানি কমানো এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি সংযমের কথা ছিল। তিনি বৌদ্ধধর্মের অনুসারী হলেও ধম্মকে শুধু বৌদ্ধ ধর্মীয় মতবাদের সমার্থক করা যায় না। ধম্মমহামাত্র নামে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মানুষ ও পশুর চিকিৎসাব্যবস্থা, ভেষজ উদ্ভিদ, কূপ এবং পথের পাশে গাছ লাগানোর উদ্যোগের কথাও তাঁর শিলালিপিতে রয়েছে। এগুলো শাসককে প্রজাদের কল্যাণে দায়বদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করে।
তবে অশোক সামরিক রাষ্ট্র সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করেননি। শিলালিপিতে বনবাসী জনগোষ্ঠীকে সতর্ক করার ভাষা আছে; শাস্তির ক্ষমতাও বহাল ছিল। তাই তাঁর অনুশোচনাকে সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়া বা সব ধরনের বলপ্রয়োগ পরিত্যাগের প্রমাণ বলা যায় না। উত্তর-পশ্চিমে গ্রিক ও আরামীয় ভাষার লিপি এবং অন্য অঞ্চলে ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপির ব্যবহার সাম্রাজ্যের বহুভাষিক চরিত্র প্রকাশ করে। দক্ষিণের চোল, পাণ্ড্যসহ কিছু রাজ্যকে তাঁর বক্তব্যে পৃথক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মৌর্য প্রভাবের বিস্তার এবং প্রত্যক্ষ শাসনের সীমানা এক করে দেখা উচিত নয়।
অশোকের মৃত্যু সাধারণভাবে খ্রিস্টপূর্ব ২৩২ সালের দিকে ধরা হয়। এরপর উত্তরাধিকারীদের তালিকা ও শাসনক্রম সব উৎসে এক নয়। দশরথের গুহালিপি পরবর্তী রাজশক্তির উপস্থিতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেয়, কিন্তু বিস্তৃত সাম্রাজ্য দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা, উত্তরাধিকারসংকট এবং কেন্দ্রের সঙ্গে প্রদেশের সম্পর্ক শিথিল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা। বিশাল সেনা ও প্রশাসন রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও সম্ভাব্য চাপ ছিল। তবে নির্ভরযোগ্য হিসাব ছাড়া রাজকোষ সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গিয়েছিল বা অশোকের দানেই রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
মৌর্য পতনকে কেবল অশোকের অহিংস নীতির ফল বলা প্রমাণসমর্থিত নয়। তাঁর মৃত্যুর বহু দশক পর, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৮৫ সালে, শেষ মৌর্য শাসক বৃহদ্রথকে সেনাপতি পুষ্যমিত্র হত্যা করে শুঙ্গ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন বলে পরবর্তী বিবরণ জানায়। তখন সাম্রাজ্যের বহু অংশ আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছিল। শেষ রাজাকে হত্যা ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক ভাঙনের চূড়ান্ত ঘটনা, গোটা পতনের একমাত্র কারণ নয়। মৌর্য শাসন শেষ হলেও চন্দ্রগুপ্তের বৃহৎ রাষ্ট্র নির্মাণ এবং অশোকের শিলালিপিতে প্রকাশিত নৈতিক রাজকর্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে স্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে যায়।
বিশ্বজুড়ে দাসপ্রথা নিষিদ্ধকরণ: ১৯২৬ সালের কনভেনশন, জাতিসংঘ ও আইনগত বিলুপ্তি
আফ্রিকা ও এশিয়ায় দাসপ্রথার বিলুপ্তি: আরব বাণিজ্য, ভারত মহাসাগর ও ঔপনিবেশিক শাসন
লাতিন আমেরিকায় দাসপ্রথার বিলুপ্তি: কিউবার মুক্তি ও ব্রাজিলের ১৮৮৮ সালের আইন
ব্ল্যাক ডেথের সমাপ্তি ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব: প্লেগের প্রত্যাবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের বিকাশ
ব্ল্যাক ডেথের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: শ্রমিকসংকট, কৃষকবিদ্রোহ ও সামন্ততন্ত্র
ব্ল্যাক ডেথে আতঙ্ক ও ধর্মীয় নিপীড়ন: ইহুদি গণহত্যা ও ফ্ল্যাজেল্যান্ট আন্দোলন