আফ্রিকা ও এশিয়ায় দাসপ্রথার বিলুপ্তি: আরব বাণিজ্য, ভারত মহাসাগর ও ঔপনিবেশিক শাসন
সিরিজ: দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাস
সমুদ্রপথের বন্দিত্ব থেকে অসম্পূর্ণ মুক্তির ইতিহাস
ব্রাজিলে ১৮৮৮ সালে দাসপ্রথার অবসান আমেরিকা মহাদেশের ইতিহাসে একটি বড় অধ্যায় বন্ধ করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতাকে মর্যাদাপূর্ণ জীবনে রূপ দেওয়ার যে প্রশ্ন সেখানে উঠেছিল, আফ্রিকা ও এশিয়ায় তার সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন যুক্ত ছিল—মানুষের ওপর মালিকানার দাবি কোথায়, কীভাবে এবং কখন শেষ হবে? আটলান্টিকের বাইরে দাসত্বের বিস্তৃতি ছিল বহু পুরোনো ও বহুমুখী। সাহারার মরুপথ, লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের বন্দরগুলোকে যুক্ত করা ব্যবস্থার অবসান কোনো একক আইন বা সামরিক বিজয়ে ঘটেনি।
এই ইতিহাস বুঝতে প্রথমেই ‘আরব দাসবাণিজ্য’ কথাটির সীমা বোঝা দরকার। আরব ব্যবসায়ী ও শাসকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, কিন্তু সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটি শুধু তাঁদের পরিচালিত ছিল না। আফ্রিকান শাসক ও মধ্যস্থতাকারী, স্বাহিলি ব্যবসায়ী, পারস্যের বাজার, দক্ষিণ এশীয় বাণিজ্যিক গোষ্ঠী এবং পরে ইউরোপীয় শক্তিও বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিল। সাহারা অতিক্রম করা বাণিজ্য এবং ভারত মহাসাগরের নৌপথও এক ব্যবস্থা ছিল না। একটি জাতি বা ধর্মের পরিচয়ে সব পথ, সময় ও অংশগ্রহণকারীকে এক করে দেখলে দাসত্বের বাস্তব কাঠামো আড়াল হয়।
ভারত মহাসাগরীয় দাসবাণিজ্যে মানুষের চলাচল ছিল একাধিক দিকে। পূর্ব আফ্রিকা থেকে আরব উপদ্বীপ ও ভারতে মানুষ নেওয়া হতো; আবার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষকেও অন্য অঞ্চলে বিক্রি করা হতো। যুদ্ধবন্দিত্ব, অপহরণ, দুর্ভিক্ষ ও ঋণের চাপ মানুষকে বন্দিত্বে ঠেলে দিতে পারত। কেউ জাহাজে, কেউ দীর্ঘ স্থলযাত্রায় পরিচিত সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতেন। প্রত্যেক আফ্রিকান নাবিক বা অভিবাসী অবশ্য দাস ছিলেন না। স্বাধীন বণিক, সৈনিক ও ধর্মীয় ব্যক্তির স্বেচ্ছাযাত্রার পাশাপাশি জোরপূর্বক স্থানান্তরের ইতিহাসও চলছিল।
শ্রমের ধরনেও বৈচিত্র্য ছিল। গৃহস্থালির কাজ, কৃষি, বন্দর, জাহাজ, সামরিক বাহিনী এবং রাজদরবারে বন্দি মানুষদের ব্যবহার করা হতো। নারীরা গৃহশ্রমের পাশাপাশি যৌন শোষণ ও জোরপূর্বক উপপত্নীত্বের শিকার হতেন। কোনো কোনো সামরিক দাস বা সাবেক দাস ক্ষমতায় উঠতে পেরেছিলেন; ভারতে মালিক আম্বর তার পরিচিত উদাহরণ। কিন্তু ব্যতিক্রমী উত্থান সাধারণ মানুষের স্বাধীনতাহীনতা দূর করে না। বাগানের বাইরে কাজ করা বা পরিবারের ভেতরে থাকা দাসত্বকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোমল কিংবা নিরাপদ করে তুলত না।
ইউরোপীয় শক্তির আগমন এই ব্যবস্থাকে শুধু প্রতিস্থাপন করেনি; অনেক ক্ষেত্রে বিস্তৃত করেছে। পর্তুগিজরা পূর্ব আফ্রিকা, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে মানুষ বেচাকেনার পথ তৈরি ও ব্যবহার করে। গোয়ায় আফ্রিকানদের পাশাপাশি বাংলাসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষও বন্দি অবস্থায় পৌঁছাতেন। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তার কর্মচারীরাও মানুষ কিনে বাণিজ্যকেন্দ্র, দুর্গ, গৃহস্থালি ও কৃষিকাজে ব্যবহার করতেন। ফলে পরবর্তী ইউরোপীয় বিলোপনীতির ইতিহাস পড়তে হলে তাঁদের আগের দাসমালিকানা ও বাণিজ্যিক অংশগ্রহণও মনে রাখতে হয়।
উনিশ শতকে পূর্ব আফ্রিকার জাঞ্জিবার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওমানি শাসন ও স্বাহিলি বাণিজ্যিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত দ্বীপটির লবঙ্গবাগানে বিপুল শ্রমের প্রয়োজন হয়। আফ্রিকার অভ্যন্তর থেকে বন্দি মানুষ উপকূলে আনা হতো; কেউ দ্বীপের বাগানে থাকতেন, কেউ অন্য বাজারে যেতেন। ফলে আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান চললেও এখানে দাসশ্রমের চাহিদা বাড়তে পারত। ভিন্ন অঞ্চলে বিলোপের সময়সূচি আলাদা হওয়ার পেছনে এমন অর্থনৈতিক পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ব্রিটেন কূটনৈতিক চাপ, চুক্তি ও নৌটহলের মাধ্যমে পূর্ব আফ্রিকার দাসবাণিজ্য সীমিত করার চেষ্টা করে। মিশনারি প্রচার এবং ডেভিড লিভিংস্টোনের মতো ব্যক্তির বিবরণ ব্রিটিশ জনমতেও প্রভাব ফেলে। তবে চুক্তির আওতা সীমিত হলে ব্যবসায়ীরা পথ ও পদ্ধতি বদলাতেন। ১৮৭৩ সালে জাঞ্জিবারের সুলতানের সঙ্গে চুক্তি দাস আমদানি ও প্রকাশ্য বাজার বন্ধের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু দাসবাণিজ্য বন্ধের প্রতিশ্রুতি দ্বীপের বাগান ও গৃহস্থালিতে বিদ্যমান সব দাসত্ব সঙ্গে সঙ্গে শেষ করেনি। মালিকানার দাবি আলাদাভাবে মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
১৮৯৭ সালে জাঞ্জিবার ও পেম্বায় দাসত্বের আইনি মর্যাদা বিলোপের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে। তবু ঘোষণার পরও মুক্তি অর্জনের বাস্তব পথে বাধা ছিল। আশ্রয়, জীবিকা ও পরিবারের নিরাপত্তা না থাকলে মালিকের বাড়ি ছেড়ে যাওয়া কঠিন হতে পারত। মুক্তিকামী মানুষ ব্রিটিশ প্রতিনিধির দপ্তর, আদালত ও মিশনারি আশ্রয়ের সুযোগ ব্যবহার করতেন। তাঁদের আবেদন ও পালানোর উদ্যোগ বিলোপকে কার্যকর করায় ভূমিকা রাখে। তাই শুধু সুলতানের আদেশ বা বিদেশি কূটনীতির মাধ্যমে এই পরিবর্তন ব্যাখ্যা করলে বন্দি মানুষদের সক্রিয়তা হারিয়ে যায়।
উত্তর আফ্রিকায় তিউনিসিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, বিলোপের উদ্যোগ সব সময় সরাসরি ঔপনিবেশিক শাসনের ফল ছিল না। আহমদ বেয়ের শাসনকালে বাজার বন্ধ ও শিশুদের স্বাধীনতার ব্যবস্থার পর ১৮৪৬ সালের ২৩ জানুয়ারি দাসপ্রথা বিলোপের আদেশ জারি হয়। স্থানীয় সংস্কারপন্থী চিন্তা ও ধর্মীয় পণ্ডিতদের মতামতও এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সিদ্ধান্তটি ফরাসি প্রটেক্টরেট প্রতিষ্ঠার আগের ঘটনা। তবে শহরের বাইরে প্রতিরোধ ও সস্তা বাধ্যতামূলক শ্রমের চাহিদা থাকায় আইন গ্রহণ এবং সর্বত্র বাস্তব অবসান একই সঙ্গে ঘটেনি।
দক্ষিণ এশিয়ায়ও দাসত্বের রূপ এক ছিল না। গৃহদাসত্ব, কৃষিভিত্তিক বংশানুক্রমিক অধীনতা এবং ঋণনির্ভর শ্রমসম্পর্ক অঞ্চলভেদে আলাদা ছিল। ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসন দীর্ঘদিন স্থানীয় রীতি ও সম্পত্তির দাবির সঙ্গে আপস করেছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ১৮৩৩ সালের সাধারণ বিলোপ আইন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অঞ্চলকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করেনি। ফলে ভারতীয় বন্দি মানুষদের জন্য আলাদা আইনি পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। এই ব্যতিক্রম দেখায়, সাম্রাজ্যের ঘোষিত নৈতিক অবস্থান তার অধীন সব ভূখণ্ডে সমান গতিতে প্রয়োগ করা হতো না।
১৮৪৩ সালের ভারতীয় দাসত্বসংক্রান্ত আইন সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রীয় ধাপ। আইনটি দাস হিসেবে কাউকে ধরে রাখার দাবি আদালতের মাধ্যমে কার্যকর করার সুযোগ প্রত্যাহার করে। সরকারি রাজস্ব আদায়ে মানুষ বিক্রি নিষিদ্ধ হয়; দাস পরিচয়ের কারণে সম্পত্তির অধিকার অস্বীকার এবং অপরাধের ক্ষেত্রে সুরক্ষা কমিয়ে দেওয়ার পথও বন্ধ করা হয়। এটি ছিল দাসমালিকের দাবির পেছন থেকে রাষ্ট্রের আইনি সহায়তা সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু এক দিনে প্রত্যেক গ্রামে মানুষকে শনাক্ত করে মুক্ত করার অভিযান ছিল না। নির্ভরতা, অজ্ঞতা ও ক্ষমতার বৈষম্য পরিবর্তনকে সীমিত করত।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডাচ শাসিত অঞ্চলগুলোতে ১৮৬০ সাল থেকে বিলোপ কার্যকর হলেও পুরো দ্বীপপুঞ্জে একই সময়ে দাসত্ব শেষ হয়নি। আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকাতেও ইউরোপীয় শাসকেরা স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিরোধিতা এড়াতে সতর্ক নীতি নেন। ফরাসি পশ্চিম আফ্রিকায় ১৯০৫ সালের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও আইন এবং বাস্তব শ্রমসম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব ছিল। বহু ক্ষেত্রে মানুষ মালিকের বসতি ছেড়ে যাওয়া, নতুন জীবিকা খোঁজা এবং ফিরে আসা আত্মীয়দের সহায়তার মাধ্যমে স্বাধীনতার বাস্তব পরিসর বাড়ান।
ঔপনিবেশিক বিলোপের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য ছিল, দাসত্ববিরোধী ভাষার পাশেই জোরপূর্বক শ্রম চলতে পারত। রাস্তা নির্মাণ, বহনকাজ ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনে প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা শ্রমিকের স্বাধীনতা সীমিত করত। আবার চুক্তিভিত্তিক অভিবাসী শ্রমে প্রতারণা, ঋণ ও কাজ ছাড়ার শাস্তি তৈরি হতো। এসব ব্যবস্থাকে আইনি অর্থে সব ক্ষেত্রে দাসত্ব বলা ঠিক নয়; তবে কাগজে স্বাধীন শ্রমিকেরও কাজ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ সংকুচিত হতে পারত। বিলোপের সাফল্য বুঝতে শুধু মালিকানা নিষিদ্ধ হয়েছে কি না, শ্রমিক বাস্তবে চলে যেতে পারেন কি না, সেটিও দেখতে হয়।
আফ্রিকা ও এশিয়ার অভিজ্ঞতা তাই দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাসকে কোনো একক বিজয়ের গল্প হতে দেয় না। স্থানীয় সংস্কার, আন্তর্জাতিক চাপ, আদালতের পরিবর্তন এবং বন্দি মানুষের প্রতিরোধ একত্রে কাজ করেছে। কোথাও বাণিজ্য আগে নিষিদ্ধ হয়েছে, কোথাও মালিকানার দাবি অকার্যকর হয়েছে, আবার কোথাও সামাজিক নির্ভরতা দীর্ঘদিন টিকেছে। ব্রাজিলের পর সমুদ্রের এই অন্য তীরে তাকালে বোঝা যায়, বিশ্বব্যাপী দাসত্বের অবসানের কোনো একক দিন নেই। মানুষের ওপর মালিকানা অস্বীকার করার পরও স্বাধীন শ্রম, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার সংগ্রাম চলতে থাকে।
ব্ল্যাক ডেথের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: শ্রমিকসংকট, কৃষকবিদ্রোহ ও সামন্ততন্ত্র
ব্ল্যাক ডেথে আতঙ্ক ও ধর্মীয় নিপীড়ন: ইহুদি গণহত্যা ও ফ্ল্যাজেল্যান্ট আন্দোলন
মধ্যযুগে ব্ল্যাক ডেথের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ: প্লেগ ডাক্তার থেকে কোয়ারেন্টাইন
নব্য-ব্যাবিলনীয় রাজবংশ: নেবুচাদনেজারের গৌরব ও সাম্রাজ্যের পতন
অ্যাসিরীয় রাজবংশ: দুর্ধর্ষ সামরিক সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের কারণ
ঝৌ রাজবংশ: চীনের দীর্ঘতম রাজবংশ ও ক্ষমতার নতুন ধারণার ইতিহাস