হুভার বাঁধ: মরুভূমির বুকে আমেরিকার কিংবদন্তি প্রকৌশল……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হুভার বাঁধ: মরুভূমির বুকে আমেরিকার কিংবদন্তি প্রকৌশল কীর্তি

সিরিজ: বিশ্বের বিস্ময়কর বাঁধ ও প্রকৌশল কীর্তি

হুভার বাঁধ: মরুভূমির বুকে আমেরিকার কিংবদন্তি প্রকৌশল কীর্তি
কলোরাডোর গিরিখাতে নির্মিত প্রকৌশলের মহাকীর্তি

মোহাভি মরুভূমির শুষ্ক পাহাড়ের মাঝখানে কলোরাডো নদী যেখানে গভীর ব্ল্যাক ক্যানিয়নের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে হুভার বাঁধ। নেভাদা ও অ্যারিজোনার সীমান্তে নির্মিত বাঁকানো কংক্রিটের এই কাঠামো প্রায় ২২১ মিটার উঁচু। পেছনে বিস্তৃত লেক মিড, নিচে নদী ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। কিন্তু এর গুরুত্ব শুধু আকারে নয়। হুভার বাঁধ দেখিয়েছিল, একটি বিশাল নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে সরিয়ে দুর্গম মরুভূমিতে পরিকল্পিত শিল্পব্যবস্থার মতো নির্মাণকাজ চালানো সম্ভব। সেই সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহামন্দার বেকারত্ব, শ্রমিকদের কঠিন জীবন এবং আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবর্তন।

বাঁধ নির্মাণের আগে কলোরাডো নদীর পানি কাজে লাগানো ছিল অনিশ্চিত ব্যাপার। পাহাড়ে জমা তুষার গলে প্রবাহ বাড়ত, আবার শুষ্ক সময়ে পানি কমে যেত। নিচের কৃষিভূমি বন্যার ঝুঁকিতে থাকত। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইম্পেরিয়াল ভ্যালির সেচব্যবস্থায় নদীর পানি ঢুকে বিপর্যয় সৃষ্টির ঘটনাও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন স্পষ্ট করে। একটি বড় জলাধার দিয়ে বন্যার পানি ধরে রাখা, শুষ্ক সময়ে ছাড়া এবং বিদ্যুৎ তৈরি করার পরিকল্পনা তাই গুরুত্ব পায়।

তবে নদী আটকে দেওয়ার আগে রাজ্যগুলোর পানির দাবি নিয়ে সমঝোতা দরকার ছিল। ১৯২২ সালের কলোরাডো রিভার কমপ্যাক্ট অববাহিকাকে উজান ও ভাটির দুটি অঞ্চলে ভাগ করে পানি ব্যবহারের কাঠামো নির্ধারণ করে। তখনকার বাণিজ্যমন্ত্রী হারবার্ট হুভার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯২৮ সালের বোল্ডার ক্যানিয়ন প্রজেক্ট অ্যাক্ট প্রকল্পের আইনি ভিত্তি তৈরি করে। বাঁধের ইতিহাস তাই কংক্রিট ঢালাই শুরুর অনেক আগে থেকেই আন্তঃরাজ্য আলোচনা ও কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত।

১৯৩১ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। ছয়টি বড় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত সিক্স কোম্পানিজ মূল চুক্তি পায়; প্রকল্প পরিচালনায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব রিক্লেমেশন। মহামন্দার সময় কাজের খোঁজে বহু মানুষ এখানে আসে। কিন্তু নির্মাণস্থলে পৌঁছানো, শ্রমিকদের আবাসন এবং বিপুল উপকরণ সরবরাহ—সবই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বোল্ডার সিটি গড়ে তোলা হয় প্রকল্পের কর্মীদের জন্য। রাস্তা, রেলসংযোগ, বিদ্যুৎ এবং কংক্রিট তৈরির কারখানা প্রস্তুত করা মূল বাঁধ নির্মাণের পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়ায়।

সবচেয়ে জরুরি কাজ ছিল নির্মাণস্থল থেকে নদী সরানো। প্রবহমান কলোরাডোর তলদেশে সরাসরি বিশাল ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব ছিল না। তাই গিরিখাতের দুই পাশের শিলার ভেতর মোট চারটি বড় সুড়ঙ্গ খনন করা হয়। অস্থায়ী প্রতিবন্ধক দিয়ে প্রবাহকে প্রস্তুত সুড়ঙ্গের দিকে পাঠানো হয়; ১৯৩২ সালের নভেম্বরে নদী সরানোর গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়। এরপর মূল স্থানের পানি সরিয়ে নদীতলের আলগা উপাদান খনন করা যায়। প্রকৃত বাঁধ ওঠার আগে নদীর জন্য বিকল্প পথ তৈরি করাই ছিল নির্মাণের প্রথম বড় প্রকৌশল সাফল্য।

ভিত্তি ও পাশের শিলা প্রস্তুত করাও বিপজ্জনক কাজ ছিল। দড়িতে ঝুলে কর্মীরা গিরিখাতের দেয়াল থেকে আলগা পাথর সরাতেন, যাতে পরে তা নির্মাণস্থলে পড়ে দুর্ঘটনা না ঘটায় এবং শক্ত শিলার সঙ্গে বাঁধের সংযোগ তৈরি হয়। সুড়ঙ্গে ছিল তাপ, ধুলো ও যন্ত্রের ধোঁয়া। বাইরে মরুভূমির গরমে কাজ করাও কঠিন ছিল। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর প্রচলিত সরকারি হিসাবে ৯৬ জনের উল্লেখ রয়েছে; তবে কোন ধরনের মৃত্যু গণনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা বিবেচনা করা জরুরি। এই সংখ্যাই শ্রমিক ও পরিবারের সব দুর্ভোগ প্রকাশ করে না।

হুভার একটি আর্চ-গ্র্যাভিটি বাঁধ। অর্থাৎ নিজের বিপুল ওজন এবং বাঁকানো আকৃতি—দুই বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে এটি পানির চাপ প্রতিরোধ করে। খিলানের মতো আকৃতি চাপের একটি অংশ গিরিখাতের দুই পাশের শক্ত শিলায় পৌঁছে দেয়। নিচের দিকে পানির চাপ বেশি হওয়ায় কাঠামোর ভিত্তি অনেক চওড়া; ওপরের দিকে তা সরু হয়েছে। এই নকশায় বাঁধ ও আশপাশের শিলা একসঙ্গে কাজ করে। তাই উপযুক্ত গিরিখাত ও শিলাভিত্তি নির্বাচন ছিল কাঠামোর আকৃতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৩৩ সালের ৬ জুন মূল বাঁধে প্রথম কংক্রিট ঢালা হয়। কিন্তু এত বিশাল কাঠামো একবারে ঢালাই করা হয়নি। নির্দিষ্ট আকারের ব্লক পর্যায়ক্রমে তৈরি করে উচ্চতা বাড়ানো হয়। কেবলক্রেনে বড় বালতিতে কংক্রিট এনে ঢালা হতো, তারপর তা যথাযথভাবে বসানো হতো। বিপুল কংক্রিটের প্রধান সমস্যা ছিল তাপ: সিমেন্টের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ সহজে বের হয় না। ভেতর ও বাইরের অংশ অসমভাবে ঠান্ডা হলে ফাটল সৃষ্টির ঝুঁকি থাকে।

সমাধান হিসেবে কংক্রিটের ভেতর সরু ইস্পাতের পাইপ বসানো হয়। এসব পাইপে ঠান্ডা পানি প্রবাহিত করে ব্লকগুলোর তাপ কমানো হয়; পরে প্রয়োজনীয় সংযোগ ও ফাঁক পূরণের কাজ করা হয়। হুভারের বিস্ময় শুধু কত কংক্রিট ব্যবহার হয়েছে তাতে নয়, সেই কংক্রিটের তাপমাত্রা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে তাতেও। ১৯৩৫ সালের মে মাসে মূল বাঁধে কংক্রিট স্থাপনের কাজ শেষ হয়। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট বাঁধটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন; প্রকল্পের অন্যান্য কাজ পরবর্তী সময়ে সম্পন্ন হয়।

বাঁধের পেছনে পানি জমে তৈরি হয় লেক মিড। এটি কেবল বিদ্যুতের জন্য পানির উৎস নয়; বৃহত্তর কলোরাডো ব্যবস্থায় সঞ্চয় ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জলগ্রহণ টাওয়ার দিয়ে পানি পেনস্টক হয়ে নিচের বিদ্যুৎকেন্দ্রে যায়। উঁচু জলাধার ও নিচের নির্গমনপথের স্তরের পার্থক্য কাজে লাগিয়ে পানি টারবাইন ঘোরায়, আর জেনারেটর বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। তবে জলাধারের স্তর কমলে কাজে লাগানো উচ্চতার পার্থক্যও কমে। ফলে যন্ত্র অক্ষত থাকলেও পানির পরিস্থিতি উৎপাদন সীমিত করতে পারে।

অতিরিক্ত পানি সামলানোর জন্য বাঁধের দুই পাশে আলাদা স্পিলওয়ে রয়েছে। স্বাভাবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ এবং বিপুল অতিরিক্ত প্রবাহ বের করার পথের কাজ আলাদা। নিচের কাঠামো ও নদীতল যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য প্রবাহের গতি ও শক্তিও বিবেচনা করতে হয়। বাঁধের নাম নিয়েও রাজনৈতিক ইতিহাস আছে: বিভিন্ন সময়ে বোল্ডার ড্যাম নাম ব্যবহৃত হলেও ১৯৪৭ সালে কংগ্রেস হুভার ড্যাম নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করে। এর স্থাপত্য, টাওয়ার ও অলংকরণে সেই যুগের শিল্পরুচিও দেখা যায়।

হুভার বাঁধ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নগর, কৃষি ও শিল্পের বিকাশে সহায়তা করেছে, কিন্তু নদী নিয়ন্ত্রণের মূল্যও রয়েছে। জলাধারে পলি আটকে যায়, ভাটির প্রবাহের মৌসুমি ধরন বদলায় এবং নদীর বাস্তুতন্ত্র প্রভাবিত হয়। দীর্ঘ খরা ও অতিরিক্ত পানি ব্যবহারের চাপ স্মরণ করিয়ে দেয়, বড় জলাধার নতুন পানি তৈরি করতে পারে না। হুভারের স্থায়ী শিক্ষা হলো, অসাধারণ নির্মাণদক্ষতার সঙ্গে পানি ব্যবহারের বাস্তব সীমা বোঝাও জরুরি। মরুভূমির এই কীর্তি মানুষের প্রকৌশলসামর্থ্যের স্মারক, একই সঙ্গে একটি নদীর ওপর নির্ভরশীল অঞ্চলের জটিল ইতিহাস।