আকেমেনীয় রাজবংশ: সাইরাস থেকে দারিয়ুসের পারস্য সাম্রাজ্যের উত্থান
সিরিজ: রাজবংশের উত্থান-পতন: ক্ষমতা, গৌরব ও পতনের ইতিহাস
সাইরাসের বিজয় থেকে দারিয়ুসের প্রশাসন—পারস্যের মহাসাম্রাজ্য।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি পারস্য ছিল ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি আঞ্চলিক শক্তি। কয়েক দশকের মধ্যে সেই রাজ্য মিদিয়া, লিডিয়া ও ব্যাবিলনের মতো প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে পরাজিত করে পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেয়। এই উত্থানের কেন্দ্রে ছিলেন দ্বিতীয় সাইরাস, যিনি সাইরাস দ্য গ্রেট নামে পরিচিত। তাঁর উত্তরসূরিদের সময় সাম্রাজ্য মিশর থেকে সিন্ধু অঞ্চলের অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সাইরাস বিজয়ের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের ভিত্তি গড়েছিলেন; প্রথম দারিয়ুস সেই বিস্তৃত ভূখণ্ডকে আরও সুসংহত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় যুক্ত করেন। তাঁদের সাফল্য বুঝতে যুদ্ধের পাশাপাশি স্থানীয় সহযোগিতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার দিকে তাকাতে হয়।
আকেমেনীয় নামটি এসেছে আকেমেনেস নামে এক পূর্বপুরুষের নাম থেকে। তবে সাইরাসের পরিবার এবং দারিয়ুসের ঘোষিত বংশপরিচয়ের সম্পর্ক নিয়ে কিছু গবেষণাগত বিতর্ক আছে। সাইরাস নিজেকে আনশানের রাজপরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন; এই অঞ্চল প্রাচীন এলামীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পারস্যের উত্থান তাই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো যাযাবর শক্তির আকস্মিক আবির্ভাব নয়। ইরানি জনগোষ্ঠী, এলামীয় ঐতিহ্য এবং মেসোপটেমীয় রাজশাসনের অভিজ্ঞতা এর পটভূমিতে কাজ করেছিল। পরবর্তী সাম্রাজ্যিক প্রশাসনেও এই মিশ্র উত্তরাধিকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সাইরাস আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৯ সালে ক্ষমতায় আসেন। তখন মিদীয় রাজা আস্তিয়াগেস ইরান ও আশপাশের অঞ্চলে প্রধান শক্তি ছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ সালের দিকে সাইরাস তাঁকে পরাজিত করেন এবং একবাতানা অধিকার করেন। ব্যাবিলনীয় বিবরণে আস্তিয়াগেসের সেনাবাহিনীর বিদ্রোহ এবং তাঁকে সাইরাসের হাতে তুলে দেওয়ার উল্লেখ আছে। ফলে ঘটনাটি শুধু বাইরের আক্রমণ ছিল না; মিদীয় শক্তির অভ্যন্তরীণ ভাঙনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাইরাস অনেক মিদীয় অভিজাত ও সামরিক ব্যক্তিকে নতুন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করেন। পরাজিত প্রতিপক্ষের সম্পদ ও দক্ষতা কাজে লাগানো তাঁর সম্প্রসারণের কার্যকর উপায় হয়ে ওঠে।
পরবর্তী প্রধান লক্ষ্য ছিল পশ্চিম আনাতোলিয়ার সমৃদ্ধ লিডিয়া রাজ্য। রাজা ক্রোয়েসাসের সঙ্গে সংঘর্ষের পর সাইরাস সার্ডিস দখল করেন; ঘটনাটি প্রচলিতভাবে খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৭ বা ৫৪৬ সালের দিকে স্থাপন করা হয়, যদিও সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে মতভেদ আছে। লিডিয়া জয়ের ফলে পারস্য এজিয়ান উপকূলের গ্রিক নগরগুলোর রাজনীতিতেও প্রবেশ করে। তবে রাজধানী দখলের পরই অঞ্চলটি সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে যায়নি। বিদ্রোহ দমন ও উপকূলীয় নগরগুলোকে বশীভূত করতে আরও অভিযান প্রয়োজন হয়। বিজয়ের সীমানা বাড়ার সঙ্গে নতুন সামরিক দায়িত্বও সৃষ্টি হচ্ছিল।
খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ সালে সাইরাস নব্য-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য জয় করেন। ওপিসের সংঘর্ষের পর ব্যাবিলন নগর বড় যুদ্ধ ছাড়াই অধিকৃত হয় বলে সমসাময়িক বর্ষপঞ্জিতে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু পুরো অভিযানকে রক্তপাতহীন বলা যায় না। বিজয়ের পরে সাইরাস নিজেকে ব্যাবিলনের দেবতা মারদুকের অনুমোদিত শাসক হিসেবে উপস্থাপন করেন। স্থানীয় ধর্মীয় ভাষা ও রাজকীয় আচার গ্রহণ করে তিনি নতুন কর্তৃত্বকে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করেন। সাইরাস সিলিন্ডার সেই প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এটি প্রাচীন রাজকীয় বৈধতার দলিল; আধুনিক অর্থে সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র নয়।
সাইরাসের নীতিতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং কিছু স্থানচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তনের অনুমতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইহুদি ঐতিহ্যে তাঁর শাসন ব্যাবিলনীয় নির্বাসন থেকে প্রত্যাবর্তন ও জেরুজালেমের মন্দির পুনর্নির্মাণের সূচনার সঙ্গে যুক্ত। তবে সাম্রাজ্যের সর্বত্র সমান স্বাধীনতা বা একই নীতি কার্যকর ছিল—এমন ধারণা অতিরঞ্জিত। কর, আনুগত্য ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য ছিল; প্রতিরোধ হলে বলপ্রয়োগও চলত। সাইরাসের বিশেষ দক্ষতা ছিল স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস না করেও তাদের ওপর পারস্যের সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এতে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শাসক বদলানো সহজ হতো।
খ্রিস্টপূর্ব ৫৩০ সালের দিকে সাইরাস মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে প্রাচীন বিবরণগুলো একমত নয়; উত্তর-পূর্ব সীমান্তের অভিযানে মৃত্যুর কাহিনি সবচেয়ে পরিচিত। তাঁর পুত্র দ্বিতীয় ক্যাম্বাইসিস সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখেন এবং খ্রিস্টপূর্ব ৫২৫ সালে মিশর জয় করেন। মিশরের সম্পদ ও ভূমধ্যসাগরীয় অবস্থান পারস্যের শক্তি বাড়ায়। কিন্তু দূরবর্তী অভিযানের মধ্যেই রাজপরিবারের উত্তরাধিকারসংকট তীব্র হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৫২২ সালে ক্যাম্বাইসিসের মৃত্যু এবং তাঁর ভাই বার্দিয়াকে ঘিরে ক্ষমতার বিরোধ সাম্রাজ্যকে বড় অস্থিরতার মুখে ঠেলে দেয়।
প্রথম দারিয়ুস দাবি করেন, বার্দিয়া আসলে আগেই নিহত হয়েছিলেন এবং গৌমাতা নামে এক ব্যক্তি তাঁর পরিচয় নিয়ে সিংহাসন দখল করেছিলেন। দারিয়ুস ও তাঁর সহযোগীরা সেই শাসককে হত্যা করে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। কিন্তু এই বিবরণের প্রধান ভিত্তি দারিয়ুসের নিজের বেহিস্তুন শিলালিপি; স্বাধীনভাবে পুরো ঘটনা নিশ্চিত করা যায় না। কিছু ইতিহাসবিদ সন্দেহ করেন, নিহত ব্যক্তি প্রকৃত বার্দিয়াও হয়ে থাকতে পারেন। দারিয়ুসের ক্ষমতাগ্রহণ ছিল বিতর্কিত, এবং তাঁর রাজকীয় বংশপরিচয় ও বিদ্রোহবিরোধী প্রচার নতুন শাসনকে বৈধ দেখানোর কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল।
সিংহাসনে বসার পর দারিয়ুস ব্যাবিলনিয়া, মিদিয়া, এলামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহের মুখোমুখি হন। তিনি ধারাবাহিক সামরিক অভিযানে প্রতিপক্ষদের পরাজিত করেন। বেহিস্তুনে বিদ্রোহী নেতাদের বন্দি অবস্থায় দেখিয়ে বিজয়ের বর্ণনা খোদাই করা হয়; সেখানে আহুরামাজদার অনুমোদন তাঁর কর্তৃত্বের কেন্দ্রীয় ব্যাখ্যা। তবে সাম্রাজ্যের ধর্মীয় জীবন একরকম ছিল না। দারিয়ুসের রাজকীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি মিশরীয়, ব্যাবিলনীয় ও অন্যান্য উপাসনাপদ্ধতিও টিকে থাকে। বিদ্রোহ দমনের পরে তাঁর প্রধান কাজ ছিল এমন ব্যবস্থা শক্ত করা, যাতে দূরবর্তী প্রদেশ থেকেও নিয়মিত কর ও আনুগত্য পাওয়া যায়।
দারিয়ুস প্রাদেশিক শাসন ও করব্যবস্থাকে আরও সুসংহত করেন। প্রদেশের শাসককে সাধারণভাবে সাত্রাপ বলা হতো; তবে সাত্রাপি ব্যবস্থা তাঁর আগে থেকেই বিকশিত হচ্ছিল এবং সব অঞ্চলে একই কাঠামো ছিল না। স্থানীয় প্রশাসন, সামরিক কর্তৃপক্ষ ও রাজদরবারের তদারকির সম্পর্ক পরিস্থিতিভেদে বদলাত। বহু অঞ্চলে আগের আইন ও প্রতিষ্ঠান বহাল ছিল। রাজকীয় আদেশ ও হিসাব পরিচালনায় বিভিন্ন ভাষা ব্যবহৃত হতো; আরামীয় ভাষা বিস্তৃত যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পারস্যের ঐক্য গড়ে উঠেছিল স্থানীয় বৈচিত্র্যের ওপর একটি কার্যকর রাজকীয় কর্তৃত্ব স্থাপন করে।
যোগাযোগব্যবস্থা এই শাসনের মেরুদণ্ড ছিল। সুসা থেকে সার্ডিসমুখী বিখ্যাত রাজপথসহ বিভিন্ন পথে বিশ্রামকেন্দ্র ও ঘোড়া বদলের সুবিধা দূতদের চলাচল সহজ করত। পুরোনো পথগুলোকে ব্যবহার ও উন্নত করে রাজদরবার সংবাদ, নির্দেশ এবং কর্মকর্তাদের যাতায়াত ত্বরান্বিত করে। দারিক স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রার প্রচলনও সাম্রাজ্যিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়, যদিও সর্বত্র মুদ্রাভিত্তিক লেনদেন চালু হয়নি। শস্য, পশু ও অন্যান্য পণ্যেও অর্থনৈতিক দায় মেটানো হতো। পার্সেপোলিসের হিসাবফলক থেকে কর্মী, যাত্রী ও কর্মকর্তাদের রেশন এবং সরবরাহের জটিল ব্যবস্থা জানা যায়।
দারিয়ুস সুসার প্রাসাদ এবং পার্সেপোলিসে বিশাল নির্মাণকর্মের মাধ্যমে সাম্রাজ্যিক মর্যাদা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে পূর্বাঞ্চল, আনাতোলিয়া ও ইউরোপীয় সীমান্তে অভিযান চালান। কিন্তু তাঁর শক্তিরও সীমা ছিল: সিথীয় অভিযানে প্রত্যাশিত সিদ্ধান্তমূলক সাফল্য আসেনি এবং খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০ সালে ম্যারাথনে পারস্যের বাহিনী পরাজিত হয়। তবু এই পরাজয় সাম্রাজ্যের অবসান ঘটায়নি। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৬ সালে তাঁর মৃত্যুর সময় পারস্য ছিল সুবিশাল ও কার্যকর রাষ্ট্র। সাইরাসের বিজয়কে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যে রূপ দেওয়ার পেছনে দারিয়ুসের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল প্রশাসন, যোগাযোগ ও সম্পদ সংগ্রহের সমন্বয়—যা রাজপরিবারের ব্যক্তিগত শক্তির বাইরেও শাসনকে টিকিয়ে রাখত।
বিশ্বজুড়ে দাসপ্রথা নিষিদ্ধকরণ: ১৯২৬ সালের কনভেনশন, জাতিসংঘ ও আইনগত বিলুপ্তি
আফ্রিকা ও এশিয়ায় দাসপ্রথার বিলুপ্তি: আরব বাণিজ্য, ভারত মহাসাগর ও ঔপনিবেশিক শাসন
লাতিন আমেরিকায় দাসপ্রথার বিলুপ্তি: কিউবার মুক্তি ও ব্রাজিলের ১৮৮৮ সালের আইন
ব্ল্যাক ডেথের সমাপ্তি ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব: প্লেগের প্রত্যাবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের বিকাশ
ব্ল্যাক ডেথের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: শ্রমিকসংকট, কৃষকবিদ্রোহ ও সামন্ততন্ত্র
ব্ল্যাক ডেথে আতঙ্ক ও ধর্মীয় নিপীড়ন: ইহুদি গণহত্যা ও ফ্ল্যাজেল্যান্ট আন্দোলন