গ্লেন ক্যানিয়ন বাঁধ: লেক পাওয়েল ও কলোরাডো নদীর… | এসো-জানি

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

গ্লেন ক্যানিয়ন বাঁধ: লেক পাওয়েল ও কলোরাডো নদীর বিতর্কিত ইতিহাস

সিরিজ: বিশ্বের বিস্ময়কর বাঁধ ও প্রকৌশল কীর্তি

গ্লেন ক্যানিয়ন বাঁধ: লেক পাওয়েল ও কলোরাডো নদীর বিতর্কিত ইতিহাস
লেক পাওয়েলের নীল জলে উন্নয়ন ও হারানোর ইতিহাস

অ্যারিজোনার পেজ শহরের কাছে লালচে বেলেপাথরের দুই দেয়ালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে গ্লেন ক্যানিয়ন বাঁধ। সামনে গভীর গিরিখাতে কলোরাডো নদী, পেছনে বিস্তৃত লেক পাওয়েল। এই দৃশ্য একই সঙ্গে প্রকৌশলের শক্তি ও একটি হারিয়ে যাওয়া উপত্যকার ইতিহাস প্রকাশ করে। যে বাঁধ আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলের জন্য পানি সঞ্চয় ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করেছিল, সেটিই গ্লেন ক্যানিয়নের দীর্ঘ নদীপথ ও অসংখ্য পাশের গিরিখাতকে জলাধারে পরিণত করেছে। ফলে এর ইতিহাসে নির্মাণসাফল্যের পাশাপাশি প্রকৃতি সংরক্ষণ, আদিবাসী ঐতিহ্য এবং সীমিত পানির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।

কলোরাডো নদীর প্রবাহ বছরভেদে অনেক বদলে যায়। রকি পর্বতমালায় তুষারপাত, বসন্তের বরফগলা পানি এবং শুষ্ক সময়ের দৈর্ঘ্য নদীর পানির পরিমাণ নির্ধারণ করে। বিশ শতকে পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও নগর বিস্তারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পানি সঞ্চয়ের চাহিদা বাড়ে। উজানের রাজ্যগুলোও নিজেদের পানি ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ চেয়েছিল। পরিকল্পনাকারীদের কাছে বড় জলাধার ছিল ভেজা বছরের পানি ধরে রেখে শুষ্ক বছরে সরবরাহ বজায় রাখার উপায়। তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করত নদীতে বাস্তবে কত পানি আসবে, তার ওপর।

১৯৫৬ সালের কলোরাডো রিভার স্টোরেজ প্রজেক্ট অ্যাক্ট গ্লেন ক্যানিয়নসহ একাধিক জলাধার প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। গ্লেন ক্যানিয়ন ছিল এই ব্যবস্থার প্রধান সঞ্চয়কেন্দ্র। এর উদ্দেশ্য শুধু কাছের কৃষিজমিতে পানি দেওয়া ছিল না; বৃহত্তর অববাহিকায় পানি সংরক্ষণ এবং উজান থেকে ভাটিতে সরবরাহের সময় নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিদ্যুৎ বিক্রির আয় প্রকল্পের অর্থনৈতিক কাঠামোকে সমর্থন করত। সুতরাং বাঁধটির মূল্যায়নে জলাধার, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আন্তঃরাজ্য পানি ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে দেখতে হয়।

নির্মাণের রাজনৈতিক ইতিহাসে ইকো পার্কের বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ডাইনোসর ন্যাশনাল মনুমেন্টের মধ্যে প্রস্তাবিত বাঁধের বিরুদ্ধে পরিবেশবাদীরা তীব্র আন্দোলন করেন। শেষ পর্যন্ত ইকো পার্ক প্রকল্প বাদ পড়ে, কিন্তু গ্লেন ক্যানিয়ন পরিকল্পনা এগিয়ে যায়। অনেক সংরক্ষণকর্মী তখন গ্লেন ক্যানিয়নের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য পুরোপুরি জানতেন না। পরে সিয়েরা ক্লাবের ডেভিড ব্রাওয়ারসহ অনেকে এই আপসের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন। ঘটনাটি মার্কিন পরিবেশ আন্দোলনে একটি কঠিন শিক্ষা হয়ে ওঠে: একটি স্থান রক্ষার সমঝোতায় অন্য স্থান কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেটিও গভীরভাবে বিচার করতে হয়।

১৯৫৬ সালে নির্মাণ শুরু হয়। দুর্গম এলাকায় কাজ চালাতে রাস্তা, সেতু, শ্রমিকদের আবাসন এবং উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা গড়তে হয়। পেজ শহরের বিকাশও প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। মূল স্থানে কাজ করার জন্য নদীকে গিরিখাতের দুই পাশের সুড়ঙ্গে সরানো হয়। এরপর আলগা উপাদান সরিয়ে ভিত্তি প্রস্তুত করে কংক্রিট স্থাপন করা হয়। প্রায় ২১৬ মিটার উঁচু বাঁধটি একটি কংক্রিট আর্চ কাঠামো; এর বাঁকানো আকৃতি পানির চাপের অংশ দুই পাশের শিলায় পৌঁছে দেয়। তাই শিলার গুণমান ও কাঠামোর সংযোগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিপুল কংক্রিট একবারে ঢালাই করা হয়নি। পৃথক ব্লক ও স্তরে কাজ এগিয়েছে, আর তাপ নিয়ন্ত্রণে শীতলীকরণব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৬৩ সালে মূল বাঁধ চূড়ান্ত উচ্চতায় পৌঁছায়; বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্র স্থাপন ও প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির ধাপ পরে এগোয়। একই বছরের মার্চে পানি জমা শুরু হয়। জলাধারের নাম রাখা হয় উনিশ শতকের অভিযাত্রী জন ওয়েসলি পাওয়েলের নামে। লেক পাওয়েল প্রথম পূর্ণ সঞ্চয়স্তরে পৌঁছায় ১৯৮০ সালে—পানি জমা শুরুর প্রায় সতেরো বছর পর।

লেক পাওয়েলের জন্ম মানে শুধু নদীর স্তর বাড়া ছিল না। পানি ক্রমে পাশের সরু গিরিখাত, বালুকাতীর, উদ্ভিদসমৃদ্ধ স্থান এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ঢেকে ফেলে। নিমজ্জনের আগে জরিপ ও উদ্ধারকাজ হলেও একটি সম্পূর্ণ ভূদৃশ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও পবিত্র স্থানও পরিবর্তনের মুখে পড়ে। রেইনবো ব্রিজকে ঘিরে জলাধারের প্রভাব বিশেষ বিতর্ক তৈরি করে। হারিয়ে যাওয়া উপত্যকার মূল্য জমির আয়তন বা উদ্ধার করা নিদর্শনের সংখ্যা দিয়ে পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না।

অন্যদিকে জলাধার নতুন বিনোদনভিত্তিক অর্থনীতিও তৈরি করে। নৌভ্রমণ, মাছ ধরা, হাউসবোট এবং পর্যটনসেবা আশপাশের এলাকায় ব্যবসার সুযোগ বাড়ায়। নীল পানির চারপাশে লাল বেলেপাথরের দৃশ্য লেক পাওয়েলের পরিচিতি গড়ে তোলে। কিন্তু পর্যটনের এই অভিজ্ঞতা আগের প্রবহমান নদীর অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা। জলস্তর বদলালে নৌঘাট, প্রবেশপথ ও ব্যবহারযোগ্য অঞ্চলও বদলাতে পারে। ফলে জলাধারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থনীতিও পানি সঞ্চয়ের ওঠানামার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

বাঁধের প্রভাব ভাটির গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন পর্যন্ত পৌঁছেছে। জলাধারে পলি আটকে যাওয়ায় নিচের নদীতে পলি সরবরাহ কমে; প্রবাহের মৌসুমি ধরনও নিয়ন্ত্রিত হয়। জলাধারের গভীর অংশ থেকে পানি ছাড়লে তার তাপমাত্রা আগের স্বাভাবিক নদীর তুলনায় আলাদা হতে পারে। এসব পরিবর্তন দেশীয় মাছ, বালুচর এবং নদীতীরের পরিবেশকে প্রভাবিত করে। পরে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরীক্ষামূলক বেশি প্রবাহ ছেড়ে ভাটির উপনদী থেকে আসা বালি পুনর্বণ্টনের চেষ্টা করা হয়েছে। এতে কিছু বালুচর পুনর্গঠিত হতে পারে, তবে আগের নদী সম্পূর্ণ ফিরে আসে না।

১৯৮৩ সালের প্রবল প্রবাহ বাঁধের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে। জলাধারে বিপুল পানি আসায় স্পিলওয়ে চালাতে হয়। সুড়ঙ্গের মধ্যে অত্যন্ত দ্রুত প্রবাহে ক্যাভিটেশন সৃষ্টি হয়ে কংক্রিট ও নিচের শিলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সহজভাবে বললে, স্থানীয় চাপ কমে বাষ্পের ক্ষুদ্র ফাঁপা অংশ তৈরি হয়; সেগুলো ভেঙে পড়ার সময় পৃষ্ঠে প্রবল আঘাত দিতে পারে। মূল বাঁধ ভেঙে পড়েনি, কিন্তু নিষ্কাশনপথের ক্ষতি গুরুতর ছিল। পরে মেরামত ও বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা যুক্ত করে ঝুঁকি কমানো হয়।

পরবর্তী দীর্ঘ শুষ্ক সময়ে লেক পাওয়েল আরেক ধরনের সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। পানির স্তর কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যকর উচ্চতার পার্থক্য কমে এবং অতিরিক্ত নিচে নামলে টারবাইন দিয়ে উৎপাদন চালানো কঠিন হয়। বাষ্পীভবন, পানি ব্যবহারের চাহিদা ও নদীর সরবরাহের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কেউ জলাধারের অপরিহার্য সঞ্চয়ভূমিকার ওপর জোর দেন, আবার কেউ গ্লেন ক্যানিয়ন পুনরুদ্ধারের পক্ষে যুক্তি দেন। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একই প্রশ্ন: সীমিত নদীর পানি দিয়ে কতটা উন্নয়ন সম্ভব, এবং তার জন্য কোন প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য গ্রহণযোগ্য?