ব্ল্যাক ডেথে আতঙ্ক ও ধর্মীয় নিপীড়ন: ইহুদি গণহত্যা ও……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ব্ল্যাক ডেথে আতঙ্ক ও ধর্মীয় নিপীড়ন: ইহুদি গণহত্যা ও ফ্ল্যাজেল্যান্ট আন্দোলন

সিরিজ: ব্ল্যাক ডেথ: ইউরোপের ভয়াবহ মহামারি

ব্ল্যাক ডেথে আতঙ্ক ও ধর্মীয় নিপীড়ন: ইহুদি গণহত্যা ও ফ্ল্যাজেল্যান্ট আন্দোলন
মহামারির আতঙ্কে গুজব, আত্মদণ্ড ও সংখ্যালঘু নিপীড়নের ইতিহাস।

১৩৪৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্ট্রাসবুর্গে ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, অথচ শহরে প্লেগের বড় প্রাদুর্ভাব তখনো শুরু হয়নি। এই ঘটনাই দেখায়, ব্ল্যাক ডেথের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক কখনো রোগের আগেই মানুষের জীবন ধ্বংস করেছিল। মৃত্যুর কারণ অজানা থাকায় অনেকে আশ্রয় খুঁজেছিলেন প্রার্থনায়; অন্যরা খুঁজেছিলেন এমন কাউকে, যাকে বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করা যায়। মহামারির জীবাণুর সঙ্গে ধর্মীয় বিদ্বেষ, রাজনৈতিক স্বার্থ ও গুজব মিলিত হয়ে ইউরোপে নিপীড়নের আরেকটি বিপর্যয় তৈরি করেছিল।

চতুর্দশ শতকের খ্রিস্টীয় ইউরোপে ধর্ম মানুষের জীবন, মৃত্যু ও সামাজিক পরিচয় বোঝার প্রধান কাঠামো ছিল। রোগকে ঈশ্বরের শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা তাই অস্বাভাবিক ছিল না। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ কিংবা আকস্মিক মৃত্যুর মতো প্লেগও অনেকের কাছে মানুষের পাপের ফল মনে হয়েছিল। তবে সবাই একইভাবে ভাবতেন না। চিকিৎসকেরা শরীরের রস ও দূষিত বাতাসের কথা বলতেন, কেউ জ্যোতিষীয় ব্যাখ্যা খুঁজতেন। একই মানুষ চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি প্রার্থনাও করতে পারতেন; এসব ব্যাখ্যা সব সময় পরস্পরবিরোধী বলে বিবেচিত হতো না।

মহামারিকে ঐশী শাস্তি ভাবলে তার প্রতিকার হিসেবে অনুশোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। বিশেষ প্রার্থনা, উপবাস, দান এবং ধর্মীয় শোভাযাত্রার মাধ্যমে করুণা প্রার্থনা করা হতো। এই বিশ্বাস বহু মানুষকে অসুস্থের পরিচর্যা ও মৃতের সৎকারেও অনুপ্রাণিত করেছিল। ধর্মীয় প্রতিক্রিয়ার সবটাই সহিংসতা ছিল না। কিন্তু বিপর্যয় চলতেই থাকলে কার পাপের জন্য এমন হচ্ছে, সেই প্রশ্ন বিপজ্জনক রূপ নিতে পারত। নিজের আচরণ সংশোধনের আহ্বান তখন কখনো দুর্বল প্রতিবেশীকে অপরাধী বানানোর প্রচেষ্টায় পরিণত হয়েছিল।

ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ব্ল্যাক ডেথের সময় প্রথম জন্মায়নি। তার আগে থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় বৈষম্য, সামাজিক বর্জন ও সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। যিশুর মৃত্যুর জন্য ইহুদিদের সমষ্টিগতভাবে দায়ী করার মতো অন্যায় ধর্মীয় ধারণা প্রচারিত হতো। বসবাস, পেশা ও নাগরিক অধিকারে নানা বিধিনিষেধও ছিল। ফলে মহামারি যখন পরিচিত জীবন ভেঙে দেয়, তখন আগে থেকেই প্রচলিত সন্দেহকে নতুন বিপর্যয়ের ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা সহজ হয়। পুরোনো বিদ্বেষ নতুন গুজবের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছিল।

সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিযোগ ছিল, ইহুদিরা নাকি কুয়া ও পানির উৎসে বিষ দিয়ে খ্রিস্টানদের হত্যা করছেন। এই দাবির কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিল না। প্লেগ সৃষ্টি করেছিল ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস ব্যাকটেরিয়া; কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর গোপন বিষপ্রয়োগ নয়। ইহুদিরাও রোগে আক্রান্ত হচ্ছিলেন এবং মারা যাচ্ছিলেন। তবু তাঁদের বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত ষড়যন্ত্রের গল্প বানানো হয়। ইহুদিরা প্লেগে আক্রান্ত হতেন না—এমন জনপ্রিয় ধারণাও ভুল; তাঁদের মৃত্যুর ঐতিহাসিক সাক্ষ্য রয়েছে।

মিথ্যা অভিযোগকে বিশ্বাসযোগ্য দেখাতে ব্যবহার করা হয়েছিল নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তি। ১৩৪৮ সালে সাভয় অঞ্চলে আটক ইহুদিদের ওপর জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের নথি এই প্রক্রিয়ার উদাহরণ। বন্দিরা যন্ত্রণার মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদকারীদের প্রত্যাশামতো কথা বলতেন এবং অন্য মানুষের নাম উল্লেখ করতেন। পরে সেই বক্তব্য অন্য শহরে পাঠানো হতো। আদালতের নথিতে লেখা হওয়ায় গুজবটি সরকারি সত্যের চেহারা পেত। নির্যাতনে আদায় করা বক্তব্য অপরাধের প্রমাণ ছিল না; বরং অভিযোগ তৈরির পদ্ধতির সাক্ষ্য।

এই যোগাযোগব্যবস্থা গুজবকে স্থানীয় সীমা পেরিয়ে ছড়াতে সাহায্য করেছিল। একটি শহরের কথিত অনুসন্ধান অন্য শহরে গ্রেপ্তার ও হামলার যুক্তি হয়ে দাঁড়াত। সুইস অঞ্চল, রাইন উপত্যকা এবং জার্মানভাষী বিভিন্ন নগরে ইহুদি সম্প্রদায় আক্রান্ত হয়। কোথাও নগরকর্তৃপক্ষ প্রথমে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলেও পরে জনতার চাপ বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের কাছে নতি স্বীকার করে। ফলে ঘটনাগুলোকে কেবল হঠাৎ উত্তেজিত জনতার কাজ বলা অসম্পূর্ণ। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং আইনগত সুরক্ষা প্রত্যাহারও সহিংসতার সুযোগ তৈরি করেছিল।

স্ট্রাসবুর্গের ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৩৪৯ সালের হত্যাকাণ্ড এই সমন্বয়ের অন্যতম পরিচিত উদাহরণ। ইহুদিদের সুরক্ষা দিতে আগ্রহী নগরনেতৃত্ব ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর হত্যাযজ্ঞ ঘটে। বহু মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়; অন্যদের ধর্মান্তরের চাপের মুখে পড়তে হয়। প্রচলিত বিবরণে প্রায় দুই হাজার মানুষের উল্লেখ থাকলেও নিহতের নির্ভুল সংখ্যা নিয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। সংখ্যার অনিশ্চয়তা ঘটনাটির প্রকৃতি বদলায় না: একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে মিথ্যা অভিযোগে সংগঠিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল।

সহিংসতার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থও যুক্ত ছিল। স্ট্রাসবুর্গের ঐতিহাসিক বিবরণে ঋণ বাতিল এবং সম্পদ বণ্টনের কথা উঠে আসে। ইহুদি জনগোষ্ঠীকে শুধু ধনী ঋণদাতা হিসেবে দেখা অবশ্য ভুল; তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন পেশা ও আর্থিক অবস্থার মানুষ ছিলেন। কিন্তু কোনো কোনো ঋণগ্রহীতা, ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা সম্পদ দখলকারী নিপীড়ন থেকে লাভবান হয়েছিল। ধর্মীয় বিদ্বেষ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, আর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ হামলাকে উৎসাহিত করতে পারে। রোগের ভয় ছিল এই প্রক্রিয়ার একটি অংশ, সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়।

খ্রিস্টীয় নেতৃত্বের অবস্থানও একরকম ছিল না। কিছু ধর্মযাজক বিদ্বেষ ছড়িয়েছিলেন, অন্যদিকে পোপ ষষ্ঠ ক্লেমেন্ট ১৩৪৮ সালে ইহুদিদের রক্ষার নির্দেশ দেন। তাঁর যুক্তির মধ্যে ছিল, ইহুদিরাও প্লেগে মারা যাচ্ছেন এবং ইহুদি বসতি নেই এমন এলাকাতেও রোগ ছড়িয়েছে। আভিনিয়ঁতে তিনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করেন। ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভেতর থেকেই মিথ্যা অভিযোগের বিরোধিতা এসেছিল, কিন্তু সেই নির্দেশ সব নগরে কার্যকর হয়নি। স্থানীয় ক্ষমতার বাস্তবতা কেন্দ্রীয় নির্দেশের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছিল।

একই আতঙ্কের অন্য প্রকাশ ছিল ফ্ল্যাজেল্যান্ট বা প্রকাশ্যে আত্মপ্রহারকারী অনুতাপকারীদের আন্দোলন। এর পূর্ববর্তী ইতিহাস থাকলেও ১৩৪৮–১৩৪৯ সালের বিপর্যয়ে নতুন মাত্রা আসে। দলবদ্ধ মানুষ শহর থেকে শহরে যেতেন, ধর্মীয় গান গাইতেন এবং নিজেদের চাবুক মেরে অনুশোচনা করতেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, শারীরিক যন্ত্রণা স্বীকার করে ঈশ্বরের ক্রোধ প্রশমিত করা সম্ভব। অসহায় পরিস্থিতিতে তাঁরা এমন একটি কাজ খুঁজে পেয়েছিলেন, যা তাঁদের সক্রিয়ভাবে বিপর্যয়ের মোকাবিলা করার অনুভূতি দিত।

এই আন্দোলনের প্রকাশ্য আচার দর্শকের ওপর গভীর প্রভাব ফেলত। দলগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট নিয়ম, নেতৃত্ব ও যৌথ পরিচয় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সব ফ্ল্যাজেল্যান্ট দল একই বিশ্বাস বা আচরণ অনুসরণ করত না। কোনো কোনো স্থানে আন্দোলন ইহুদিবিরোধী উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল; তবু প্রতিটি গণহত্যার পেছনে তাদের উপস্থিতি ধরে নেওয়া যায় না। বৃহত্তর সহিংসতার ইতিহাসে স্থানীয় রাজনীতি, পূর্ববিদ্বেষ এবং প্রশাসনিক ভূমিকা আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়। একই সময়ে ঘটেছে বলেই দুটি ঘটনার সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক নিশ্চিত হয় না।

চার্চের কাছে সমস্যা ছিল শুধু আত্মপ্রহারের কঠোরতা নয়। অনুমোদিত ধর্মীয় নেতৃত্বের বাইরে নিজেদের বিশেষ আধ্যাত্মিক ক্ষমতা বা মুক্তির পথ দাবি করা কর্তৃত্বের প্রশ্ন তুলেছিল। পোপ ষষ্ঠ ক্লেমেন্ট ১৩৪৯ সালের অক্টোবরে আন্দোলনের বিরুদ্ধে নির্দেশ দেন। এরপর বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ দলগুলোর কার্যক্রম দমন বা সীমিত করার চেষ্টা করে। একই পোপ ইহুদি নিপীড়নের বিরোধিতা এবং ফ্ল্যাজেল্যান্ট আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা নিয়েছিলেন, যদিও দুটি পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক কারণ ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ এক ছিল না।

এই ইতিহাসের বিবরণ পড়তেও সতর্কতা দরকার। মধ্যযুগীয় লেখকেরা প্রায়ই অতিরঞ্জিত সংখ্যা, ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং নিজেদের সমাজের পক্ষপাত ব্যবহার করেছেন। কোনো নথিতে ‘স্বীকারোক্তি’ বা ‘বিষ পাওয়া গেছে’ লেখা থাকলেই তা সত্য প্রমাণিত হয় না। পাশাপাশি নিপীড়িত মানুষের নিজের কণ্ঠ তুলনামূলকভাবে কম সংরক্ষিত হয়েছে। সমাধিলিপি, পারিবারিক স্মৃতি ও সম্প্রদায়ের ক্ষতির চিহ্ন মনে করিয়ে দেয়, তাঁরা কেবল হামলার শিকার একটি গোষ্ঠী ছিলেন না; তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, বিশ্বাস ও সম্পর্ক ছিল।

ব্ল্যাক ডেথের সময় ইউরোপের আতঙ্ক তাই মানুষকে একদিকে সাহায্য, দান ও পরিচর্যায় উদ্বুদ্ধ করেছিল, অন্যদিকে গুজব ও নিপীড়নের পথও খুলেছিল। আত্মপ্রহার মহামারি থামায়নি, ইহুদিদের হত্যা করেও কোনো শহর সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত হয়নি। রোগের অজানা কারণের জায়গায় পরিচিত কোনো সংখ্যালঘুকে বসিয়ে দেওয়া ছিল মানুষের তৈরি অপরাধ। সেই অপরাধ সম্ভব হয়েছিল যখন মিথ্যা অভিযোগকে কর্তৃত্ব দেওয়া হয়, সুরক্ষা ভেঙে পড়ে এবং অন্যের দুর্দশা থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।