লাতিন আমেরিকায় দাসপ্রথার বিলুপ্তি: কিউবার মুক্তি ও……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

লাতিন আমেরিকায় দাসপ্রথার বিলুপ্তি: কিউবার মুক্তি ও ব্রাজিলের ১৮৮৮ সালের আইন

সিরিজ: দাসপ্রথা বিলুপ্তির ইতিহাস

লাতিন আমেরিকায় দাসপ্রথার বিলুপ্তি: কিউবার মুক্তি ও ব্রাজিলের ১৮৮৮ সালের আইন
স্বাধীন দেশের মাটিতেও স্বাধীনতার দীর্ঘ অপেক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রে দাসত্বের সাংবিধানিক অবসানের পরও স্বাধীনতাকে বাস্তব অধিকারে পরিণত করার সংগ্রাম চলছিল। একই সময়ে আরও দক্ষিণে, কিউবার আখবাগান ও ব্রাজিলের কফিখেতে মানুষ তখনো মালিকের সম্পত্তি হিসেবে বন্দি ছিলেন। আটলান্টিকের দাসব্যবস্থার শেষ বড় কেন্দ্রগুলো টিকে ছিল রপ্তানি আয়, রাজনৈতিক প্রভাব এবং শ্রমের ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে। লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ ইতিমধ্যে স্বাধীন হলেও স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম সর্বত্র দাসমুক্তি আনেনি। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির ঘোষণা আর সেই দেশের প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনতা ছিল দুটি পৃথক রাজনৈতিক প্রশ্ন।

উনিশ শতকের গোড়ায় স্পেনীয় আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধ পুরোনো শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে। যুদ্ধরত পক্ষগুলোর সৈন্য ও শ্রমিক প্রয়োজন হওয়ায় দাসত্বে আবদ্ধ মানুষ নিজেদের মুক্তির জন্য দরকষাকষির সুযোগ পান। কেউ স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতিতে বিদ্রোহী বাহিনীতে যোগ দেন, কেউ রাজতান্ত্রিক পক্ষকে সমর্থন করেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত সব সময় কোনো জাতীয়তাবাদী আদর্শ অনুসরণ করেনি; পরিবারকে রক্ষা এবং বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে আসাও ছিল প্রধান লক্ষ্য। দাসত্বে আবদ্ধ মানুষের কাছে কোন পক্ষ স্বাধীনতা দিতে পারে, সেই প্রশ্ন প্রায়ই পতাকার পরিচয়ের চেয়ে জরুরি ছিল।

স্বাধীনতার নেতাদের অবস্থানও এক ছিল না। কেউ মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিলেও সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করতে চাওয়া প্রভাবশালীদের বিরোধিতায় পিছিয়ে যান। সিমোন বলিভারের মুক্তিসংক্রান্ত উদ্যোগও যুদ্ধ, সামরিক প্রয়োজন ও রাজনৈতিক সমর্থনের সীমার মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছিল। অনেক নতুন রাষ্ট্র সরাসরি সর্বজনীন বিলোপের বদলে দাসত্বে আবদ্ধ নারীর ভবিষ্যৎ সন্তানদের স্বাধীন ঘোষণা করার পথ বেছে নেয়। এতে বংশানুক্রমিক দাসত্বের ভিত্তি দুর্বল হয়, কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম বন্দি থেকে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রেও অভিভাবকত্ব বা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শ্রমের শর্ত স্বাধীনতাকে দীর্ঘ অপেক্ষায় পরিণত করতে পারত।

দেশভেদে ফলাফল তাই ভিন্ন হয়। চিলি ১৮২৩ সালে দাসপ্রথা বিলোপ করে। মেক্সিকোতে স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় থেকেই বিলোপের ঘোষণা এলেও ১৮২৯ সালে প্রেসিডেন্ট ভিসেন্তে গেরেরোর জাতীয় আদেশ গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে। ভেনেজুয়েলা ও পেরুতে চূড়ান্ত বিলোপ আসে ১৮৫৪ সালে। এসব পার্থক্যের পেছনে ছিল দাসশ্রমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব, মালিকদের রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং যুদ্ধের প্রভাব। স্বাধীনতার ভাষা নতুন দাবি তোলার সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু সেই ভাষাকে কার্যকর আইনে পরিণত করতে মুক্তিকামী মানুষদের আরও সংগ্রাম করতে হয়েছিল।

কিউবার পরিস্থিতি ছিল বিশেষভাবে জটিল। স্পেনীয় আমেরিকার অধিকাংশ মূল ভূখণ্ড স্বাধীন হলেও দ্বীপটি স্পেনের অধীন থাকে। হাইতির বিপ্লবের পর আন্তর্জাতিক চিনিবাজারে পরিবর্তন এবং কিউবার উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে দাসশ্রমের চাহিদাও বাড়ে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার মানেই এখানে স্বাধীন শ্রমের বিস্তার ছিল না; উন্নত উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে নিষ্ঠুর বাধ্যতামূলক শ্রম পাশাপাশি চলতে পারত। কিউবায় দাসত্ব অর্থনৈতিকভাবে অপ্রয়োজনীয় হয়ে আপনাআপনি শেষ হয়নি। যুদ্ধ, প্রতিরোধ, আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক চাপ তার ভিত্তি ক্ষয় করেছিল।

১৮৬৮ সালে শুরু হওয়া দশ বছরের যুদ্ধ স্বাধীনতা ও দাসমুক্তির প্রশ্নকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে। কার্লোস মানুয়েল দে সেস্পেদেসের নেতৃত্বে বিদ্রোহ শুরু হলেও আন্দোলনের ভেতরে মুক্তির গতি ও শর্ত নিয়ে মতভেদ ছিল। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের অংশগ্রহণ যুদ্ধকে কেবল স্পেনীয় শাসনের বিরুদ্ধে উচ্চবিত্তের বিদ্রোহের সীমায় থাকতে দেয়নি। বন্দি মানুষ পালিয়ে, সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে এবং সুযোগমতো স্বাধীনতার দাবি তুলে ব্যবস্থাটিকে দুর্বল করেন। তবে ১৮৭৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিউবার সব দাসত্বের অবসান ঘটেনি।

স্পেনীয় সরকার ধাপে ধাপে পরিবর্তনের পথ নেয়। ১৮৭০ সালের মোরেত আইন নির্দিষ্ট শর্তে শিশু ও প্রবীণদের স্বাধীনতার ব্যবস্থা করে। এরপর ১৮৮০ সালের আইন দাসত্বের আইনি অবস্থান বদলালেও তার জায়গায় চালু হয় ‘পাত্রোনাতো’ ব্যবস্থা। সাবেক মালিকেরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আগের বন্দি মানুষদের শ্রম ব্যবহারের অধিকার ধরে রাখেন। সামান্য পারিশ্রমিক ও কিছু সুরক্ষার বিধান থাকলেও শ্রমিক নিজের কাজ ও চলাচলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাননি। ব্রিটিশ উপনিবেশের শিক্ষানবিশ ব্যবস্থার মতো এখানেও মুক্তির পথে মালিকদের সুবিধার একটি অন্তর্বর্তী পর্যায় বসানো হয়েছিল।

এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলতে থাকে আদালতে, কর্মক্ষেত্রে এবং ব্যক্তিগত মুক্তি অর্জনের প্রচেষ্টায়। কেউ অর্থ দিয়ে নিজের স্বাধীনতা কেনেন, কেউ মালিকের বিধিভঙ্গের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। শ্রমিক আন্দোলন ও বিলোপবাদী চাপও বাড়ছিল। অবশেষে ১৮৮৬ সালের ৭ অক্টোবরের রাজকীয় ডিক্রি পাত্রোনাতো ব্যবস্থার অবসানের নির্দেশ দেয়, যা কিউবায় দাসপ্রথা বিলোপের চূড়ান্ত আইনি মাইলফলক। তবে দাসমুক্তি এবং জাতীয় স্বাধীনতা একসঙ্গে আসেনি। কিউবা তখনো স্পেনীয় শাসনে ছিল; আর মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গদের সামনে বর্ণবৈষম্য ও শ্রমনিয়ন্ত্রণের নতুন বাধা থেকে যায়।

ব্রাজিলে বিলম্বের কারণ বুঝতে তার স্বাধীনতার ধরনও দেখতে হয়। ১৮২২ সালে পর্তুগাল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর দেশটি রাজতন্ত্র হিসেবে গড়ে ওঠে এবং দাসমালিক অভিজাতদের শক্তি বহাল থাকে। কফি উৎপাদনের বিস্তার দাসশ্রমের নতুন চাহিদা তৈরি করে। ১৮৫০ সালে আটলান্টিক দাসবাণিজ্য দমনের কার্যকর পদক্ষেপ এলেও অভ্যন্তরীণ কেনাবেচা চলতে থাকে। ফলে আফ্রিকা থেকে নতুন বন্দি আনা বন্ধ হওয়া মানে বিদ্যমান বন্দি মানুষের মুক্তি ছিল না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাঁদের কফি উৎপাদনকারী এলাকায় স্থানান্তর করা হতো।

১৮৭১ সালের ‘মুক্ত গর্ভ আইন’ দাসত্বে আবদ্ধ নারীদের পরে জন্ম নেওয়া সন্তানদের স্বাধীন ঘোষণা করে। কিন্তু এই স্বাধীনতার সঙ্গে কঠিন শর্ত যুক্ত ছিল। শিশু আট বছর পর্যন্ত মায়ের মালিকের অধীনে থাকত; এরপর মালিক ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে তাকে সরকারের কাছে দিতে অথবা একুশ বছর পর্যন্ত তার শ্রম নিতে পারতেন। ১৮৮৫ সালের প্রবীণদের মুক্তির আইনেও অতিরিক্ত শ্রমের বিধান ছিল। জন্মের সময় স্বাধীন ঘোষিত হওয়া এবং বাস্তবে নিজের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে পারা এক বিষয় ছিল না। ধাপে বিলোপের নীতিতে মালিকের ক্ষতি কমানোর চেষ্টা স্পষ্ট ছিল।

এই সীমিত সংস্কারের বাইরে গড়ে ওঠে বিস্তৃত বিলোপ আন্দোলন। লুইস গামা আইনি যুক্তি ব্যবহার করে অন্যায়ভাবে বন্দি রাখা মানুষদের মুক্তির জন্য লড়েন। আন্দ্রে রেবৌসাস ও জোয়াকিম নাবুকো দাসপ্রথার বিরুদ্ধে জনমত ও রাজনৈতিক সমর্থন গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁদের পাশাপাশি সংবাদকর্মী, শ্রমিক, স্থানীয় সংগঠন ও কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায় সক্রিয় ছিল। বন্দি মানুষের পালানো এবং আশ্রয় খোঁজার প্রচেষ্টা মালিকের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে। আন্দোলন তাই সংসদের বক্তৃতায় সীমিত থাকেনি; বাগান, বন্দর ও শহরের দৈনন্দিন সম্পর্কের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল।

সেয়ারা প্রদেশের ঘটনায় এই জনসম্পৃক্ততা স্পষ্ট হয়। বন্দি মানুষদের জাহাজে পৌঁছে দেওয়ার কাজে যুক্ত নৌকার শ্রমিকেরা পরিবহন করতে অস্বীকার করেন। ফ্রান্সিসকো জোসে দো নাসিমেন্তো এই প্রতিরোধের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ১৮৮৪ সালে সেয়ারায় দাসপ্রথার অবসান ঘটে। অন্যত্রও গণপলায়ন, আশ্রয়দান ও বিলোপবাদী সংগঠনের চাপ বাড়তে থাকে। পুরোনো ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এসব ঘটনা দেখায়, শেষ আইনটি আসার আগেই মানুষ নিজেদের উদ্যোগে দাসমালিকানার বাস্তব ক্ষমতাকে ভাঙছিলেন।

অবশেষে ১৮৮৮ সালের ১৩ মে রাজপ্রতিনিধি রাজকুমারী ইসাবেল ‘স্বর্ণ আইন’ অনুমোদন করেন। সংক্ষিপ্ত এই আইনে ব্রাজিলের দাসত্ব তাৎক্ষণিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়; সাবেক মালিকদের জন্য ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়নি। ব্রাজিল আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে সর্বশেষ দাসপ্রথা বিলোপ করল। তবে এই অর্জনকে শুধু রাজকুমারীর দয়া হিসেবে দেখলে দীর্ঘ প্রতিরোধের ইতিহাস হারিয়ে যায়। আইন স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিলেও মুক্ত মানুষদের জমি, শিক্ষা ও জীবিকার নিশ্চয়তা দেয়নি। লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতা তাই একই প্রশ্ন ফিরিয়ে আনে—মালিকানা শেষ হওয়ার পর স্বাধীনতাকে মর্যাদাপূর্ণ জীবনে রূপ দেওয়ার দায় রাষ্ট্র কতটা নেবে?