নব্য-ব্যাবিলনীয় রাজবংশ: নেবুচাদনেজারের গৌরব ও সাম্রাজ্যের পতন
সিরিজ: রাজবংশের উত্থান-পতন: ক্ষমতা, গৌরব ও পতনের ইতিহাস
ইশতার গেটের গৌরব থেকে পারস্যের বিজয়—নব্য-ব্যাবিলনের ইতিহাস।
নীল চকচকে ইটের তোরণ, সিংহচিত্রে সাজানো শোভাযাত্রার পথ, বিশাল মন্দির এবং ইউফ্রেটিসের ব্যস্ত নৌবাণিজ্য—প্রাচীন ব্যাবিলনের সবচেয়ে পরিচিত মহিমান্বিত চিত্রটি মূলত নব্য-ব্যাবিলনীয় যুগের উত্তরাধিকার। খ্রিস্টপূর্ব ৬২৬ থেকে ৫৩৯ সালের মধ্যে এই রাজশক্তি অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে পশ্চিম এশিয়ার প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। অথচ তার সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক দ্বিতীয় নেবুচাদনেজারের মৃত্যুর মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে স্বাধীনতা শেষ হয়। ব্যাবিলনের পতন নগরের বিলুপ্তি ছিল না; এটি ছিল একটি স্বাধীন সাম্রাজ্যের পারস্যের অধীন হয়ে যাওয়া।
নব্য-ব্যাবিলনীয় শক্তির প্রতিষ্ঠাতা নাবোপোলাসার এমন সময়ে বিদ্রোহ করেন, যখন অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্য অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে দুর্বল হচ্ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৬২৬ সালে তিনি ব্যাবিলনের সিংহাসনে বসেন। তবে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই অ্যাসিরীয় কর্তৃত্বের অবসান ঘটেনি; দীর্ঘ যুদ্ধ প্রয়োজন হয়েছিল। মিদীয়দের সঙ্গে সহযোগিতা শক্তির ভারসাম্য বদলে দেয়। খ্রিস্টপূর্ব ৬১৪ সালে আশুর এবং ৬১২ সালে নিনেভেহ পতিত হয়। নাবোপোলাসার এই সংঘর্ষে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিলেন। অ্যাসিরীয় প্রতিরোধ ভাঙার পর ব্যাবিলনীয়দের সামনে সিরিয়া ও লেভান্তের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়।
এই সম্প্রসারণের প্রধান সামরিক নেতা ছিলেন নাবোপোলাসারের পুত্র নেবুচাদনেজার। খ্রিস্টপূর্ব ৬০৫ সালে কারকেমিশের যুদ্ধে তিনি মিশরীয় বাহিনীকে পরাজিত করেন। মিশর তখন সাবেক অ্যাসিরীয় ভূখণ্ডে প্রভাব ধরে রাখতে চাইছিল। এই বিজয় সিরিয়া-ফিলিস্তিন অঞ্চলে ব্যাবিলনীয় আধিপত্যের পথ খুলে দেয়। একই বছর পিতার মৃত্যুর পর নেবুচাদনেজার রাজা হন এবং খ্রিস্টপূর্ব ৫৬২ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তাঁর সাম্রাজ্যের ভিত্তি ছিল বিজয়, অধীন রাজাদের আনুগত্য এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু মিশরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও স্থানীয় বিদ্রোহ তাঁকে বারবার পশ্চিমে অভিযান চালাতে বাধ্য করে।
যিহূদা রাজ্যের সঙ্গে সংঘর্ষ এই সাম্রাজ্যিক রাজনীতির সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৫৯৭ সালে জেরুজালেম আত্মসমর্পণ করে; রাজা যিহোয়াখিনসহ রাজপরিবার, অভিজাত ও দক্ষ কর্মীদের একটি অংশকে ব্যাবিলনে নেওয়া হয়। ব্যাবিলনের বসানো রাজা সিদিকিয় পরে বিদ্রোহ করলে আবার অবরোধ শুরু হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৭ বা ৫৮৬ সালে জেরুজালেম দখল ও মন্দির ধ্বংস করা হয়; সুনির্দিষ্ট বছর নিয়ে কালপঞ্জিগত মতভেদ আছে। আরও মানুষ নির্বাসিত হন। তবে সব অধিবাসীকে সরিয়ে নেওয়া হয়নি। এই ঘটনাগুলো ইহুদি ইতিহাস, ধর্মীয় স্মৃতি ও পরিচয় গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।
নির্বাসন ব্যাবিলনীয় শাসনের বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বিদ্রোহের নেতৃত্ব দুর্বল করা, দক্ষ শ্রম সংগ্রহ এবং জনসম্পদ পুনর্বণ্টনের জন্য বিজিত জনগোষ্ঠীকে স্থানান্তর করা হতো। নির্বাসিতদের অবস্থাও এক ছিল না—কেউ রাজকীয় রেশন পেতেন, কেউ কৃষি বা অন্যান্য কাজে যুক্ত হতেন। মাটির ফলকে যিহূদা থেকে আসা মানুষের বসতি, সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক লেনদেনের চিহ্ন পাওয়া যায়। জোরপূর্বক স্থানান্তর রাজনৈতিক শাসনকে শক্ত করলেও মানুষের পরিবার, ভূমি ও সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করত। রাজধানীর গৌরবের পেছনে বিজিত জনগোষ্ঠীর এই অভিজ্ঞতাও ছিল।
নেবুচাদনেজার ব্যাবিলনের নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণে বিপুল সম্পদ ব্যয় করেন। ইশতার গেট ও শোভাযাত্রার পথ ছিল রাজকীয় এবং ধর্মীয় মহিমার দৃশ্যমান প্রকাশ। গেটের চকচকে নীল ইটে ষাঁড় ও মুশহুশশু নামের পৌরাণিক প্রাণীর নকশা ছিল; পথের দেয়ালে সিংহচিত্র দেখা যেত। মারদুকের এসাগিলা মন্দির ও এতেমেনানকি জিগুরাটের পুনর্নির্মাণও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নগরপ্রাচীর, প্রাসাদ ও জলসংক্রান্ত কাজ রাজধানীকে সুসংহত করে। এসব প্রকল্প শুধু সৌন্দর্যের জন্য ছিল না; রাজাকে দেবতাদের অনুমোদিত রক্ষক এবং সমৃদ্ধির উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করত।
তবে নেবুচাদনেজারের সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা—ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান—নিয়ে নিশ্চিত প্রমাণ নেই। পরবর্তী গ্রিক-রোমান বিবরণে এর উল্লেখ থাকলেও সমসাময়িক ব্যাবিলনীয় নথি ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে প্রচলিত কাহিনি নিশ্চিত করা যায়নি। কোনো কোনো গবেষক নিনেভেহর উদ্যানের সঙ্গে ঐতিহ্যটির সম্পর্ক খুঁজেছেন। স্ত্রীকে তাঁর পাহাড়ি জন্মভূমির কথা মনে করিয়ে দিতে নেবুচাদনেজার উদ্যান বানিয়েছিলেন—এই জনপ্রিয় গল্পও প্রমাণিত নয়। ব্যাবিলনের বাস্তব স্থাপত্যিক অর্জন এত সমৃদ্ধ যে অনিশ্চিত কিংবদন্তিকে নিশ্চিত ইতিহাসে পরিণত করার প্রয়োজন নেই।
সাম্রাজ্যের অর্থনীতি চলত সেচনির্ভর কৃষি, খেজুর উৎপাদন, পশুপালন, কারুশিল্প ও বাণিজ্যের ওপর। মন্দির ছিল উপাসনার পাশাপাশি জমি, কর্মী ও উৎপাদন পরিচালনার বড় প্রতিষ্ঠান। প্রভাবশালী পরিবারগুলো ঋণ, ইজারা, পণ্য সরবরাহ ও অন্যান্য লেনদেনে যুক্ত ছিল। কিউনিফর্ম চুক্তি ও হিসাবফলক থেকে এই অর্থনৈতিক জগতের বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়। রাজকীয় নির্মাণ ও সেনাবাহিনীর জন্য কর, পণ্য এবং শ্রম সংগ্রহ করতে হতো। ফলে সমৃদ্ধি সর্বস্তরে সমান ছিল না; রাজধানীর বিস্তারকে সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্ন সুখের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।
নেবুচাদনেজারের মৃত্যুর পর রাজপরিবারের স্থিতিশীলতা দ্রুত ভেঙে পড়ে। তাঁর পুত্র আমেল-মারদুক স্বল্পকাল শাসনের পর নিহত হন। পরে নেরিগ্লিসার সিংহাসনে বসেন; তাঁর মৃত্যুর পর অল্পবয়সী লাবাশি-মারদুকও ক্ষমতাচ্যুত হন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৬ সালে নাবোনিদাস রাজা হন। তিনি নাবোপোলাসারের সরাসরি পিতৃসূত্রের বংশধর ছিলেন না। তাই ‘নব্য-ব্যাবিলনীয় রাজবংশ’ বলতে এখানে একটি সাম্রাজ্যিক পর্বও বোঝানো হয়। বারবার প্রাসাদীয় ক্ষমতার পালাবদল দেখায়, সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি স্থিতিশীল উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা এই রাষ্ট্রের বড় দুর্বলতা ছিল।
নাবোনিদাস চন্দ্রদেব সিনের উপাসনায় বিশেষ গুরুত্ব দেন এবং আরবের তায়মা মরূদ্যানে বহু বছর অবস্থান করেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে পুত্র বেলশৎসর ব্যাবিলনিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ শাসনদায়িত্ব পালন করেন। রাজধানীর মারদুককেন্দ্রিক ধর্মীয় ব্যবস্থার সঙ্গে এই অবস্থানের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। কিছু সময় নববর্ষের গুরুত্বপূর্ণ উৎসবও যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে নাবোনিদাসকে সম্পূর্ণ উন্মাদ বা সর্বজনঘৃণিত শাসক হিসেবে দেখানো পক্ষপাতদুষ্ট। তাঁর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ বিজয়ী পারস্যের প্রচার এবং বিরূপ ব্যাবিলনীয় বিবরণের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে; এগুলো বিচার করে ব্যবহার করতে হয়।
এদিকে পারস্যের সাইরাস মিদিয়া ও লিডিয়া জয় করে বিশাল শক্তি গড়ে তুলছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ সালে তাঁর বাহিনী ব্যাবিলনিয়ায় প্রবেশ করে। ওপিসে সংঘর্ষের পর সিপ্পার দখল হয় এবং পরে ব্যাবিলন নগর বড় যুদ্ধ ছাড়াই অধিকৃত হয় বলে ব্যাবিলনীয় বর্ষপঞ্জিতে উল্লেখ আছে। কিন্তু পুরো অভিযানকে রক্তপাতহীন বলা ভুল। ইউফ্রেটিসের পানি সরিয়ে সৈন্য ঢোকানোর বিখ্যাত কাহিনি পরবর্তী বিবরণে পাওয়া যায়; এর বিস্তারিত নিশ্চিত নয়। সাইরাসের সামরিক সাফল্য, ব্যাবিলনের নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ একসঙ্গে ক্ষমতা পরিবর্তন সহজ করেছিল।
সাইরাস নিজেকে মারদুকের মনোনীত শৃঙ্খলা-পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেন। সাইরাস সিলিন্ডারে সেই রাজকীয় বৈধতার ভাষা স্পষ্ট, কিন্তু এটিকে আধুনিক মানবাধিকারের সনদ বলা ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ নয়। নতুন শাসনে ব্যাবিলন গুরুত্বপূর্ণ নগর ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে টিকে থাকে; মন্দির, বাণিজ্য ও লিখিত চুক্তির জীবনও চলতে থাকে। নব্য-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য তাই নিজের সমৃদ্ধি হারিয়ে নিঃশেষ হওয়ার পর পতিত হয়নি। এর অবসান ঘটেছিল উত্তরাধিকারসংকট, শাসনের টানাপোড়েন এবং আরও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিজয়ে। নেবুচাদনেজারের নগর টিকে গিয়েছিল, কিন্তু তাকে কেন্দ্র করে স্বাধীন সাম্রাজ্য পরিচালনাকারী রাজশক্তি আর টেকেনি।
যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন: ডগলাস, টাবম্যান ও আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসপ্রথার বিলুপ্তি: ১৮৩৩ সালের আইন থেকে ১৮৩৮ সালের মুক্তি
ব্রিটেনে দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলন: উইলবারফোর্স, একুইয়ানো ও ১৮০৭ সালের আইন
অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরি: যেভাবে এক কিশোরী হলোকাস্টের বিশ্বজনীন প্রতীক হয়ে উঠল
মার্গারেট স্যাঙ্গার: জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের অগ্রদূত ও তাঁর বিতর্কিত উত্তরাধিকার
র্যাচেল কারসন ও সাইলেন্ট স্প্রিং: যে বই পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাস বদলে দিল